মহাকালের গল্পে গল্পে মানব বিবর্তনের ইতিহাস;পর্ব ২ - অগ্নিবীর

মহাকালের গল্পে গল্পে মানব বিবর্তনের ইতিহাস;পর্ব ২

Share This




পৃথিবী নামক সবুজ গ্রহটির শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার জীববৈচিত্র্য।গতপর্বে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের উত্তপ্ত গ্যাসীয় পরিধি হতে পৃথিবীর উত্থান দেখলেও আমরা এখনো তাতে দেখিনি প্রাণময়তার কোন ছাপ।ভ্রমর ব্যাতিত পুষ্পের বর্ণালী যেমন বিবর্ণ, তেমনি প্রাণের কল্লোল ব্যাতিত বসুন্ধরার স্পন্দন অনুপস্থিত।আজ থেকে ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী ছিল এমন ই অসংখ্য উত্তপ্ত রাসায়নিক পদার্থে পরিপূর্ণ প্রাণহীন নিষ্পন্দ এক মরুভূমি।ধীরে ধীরে তাপ বিকীর্ণ হতে হতে শীতলতর ধরণী ক্রমশ প্রস্তুত হচ্ছিল প্রাণের ধারণ হেতু।এমনই একসময় ঘটল আপাতদৃষ্টিতে এক  রাসায়নিক দূর্ঘটনা।


দুটি রাসায়নিক পদার্থ উত্তপ্ত পরিবেশে পাশাপাশি থাকলে বিক্রিয়ার সংঘটন করে,আর সে সময় অসংখ্যা সক্রিয় রাসায়নিক মৌল ছিল যারা পারস্পরিক অসংখ্য বিক্রিয়ায় রত ছিল।ছিল পানি(H2O),মিথেন গ্যাস(CH4),এমোনিয়া(NH3),হাইড্রোজেন গ্যাস(H2)।এভাবে চলতে লাগল সময়,পেরিয়ে গেল প্রায় ৫০-৭০ কোটি বছর।বিক্ষিপ্তভাবে চলতে থাকা কোটি কোটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হতে লাগল অসংখ্য নতুন নতুন জটিলতর যৌগ।এমন ই কোটি কোটি বিক্রিয়ার উৎপন্ন হতে থাকা জটিলতর যৌগ পদার্থের মধ্যেই হঠাৎ উৎপন্ন হয়ে গেল বিশেষ একটি যৌগ যার নাম নিউক্লিয়িক এসিড।আজ আমরা যত প্রাণ দেখি সারা পৃথিবীতে এই সব প্রাণ ই হল আসলে নিউক্লিয়িক এসিড।আপনার মেয়ের চোখদুটো দেখলে তার মায়ের কথা মনে পড়ে,আপনার ভাইটা দেখতে অবিকল যেন আপনার মত,আপনার আর আপনার বাবার পায়ের আঙ্গুলগুলো দেখতে একই লাগে; এইসব কিছুর একদম মূলে হল এই নিউক্লিয়িক এসিড নামক জীবন্ত রাসায়নিক পদার্থটি যা প্রাণের মূল ধারক।সকল প্রাণীর জীবনের কোড হল এই কার্বন-ফসফরাস-নাইট্রোজেনঘটিত যৌগটি।

জীবনের মূলসত্ত্বা নিউক্লিয়িক এসিড


আর আজ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে এরকম ই এক স্বতস্ফুর্ত দূর্ঘটনার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল নিউক্লিয়িক এসিড নামক যৌগযুক্ত পৃথিবীর প্রথম জীবন্ত কোষটি।এমন এক আপাত দৃষ্টিতে একটি অকস্মাৎ রাসায়নিক বিক্রিয়া যাতে সাধারণ কোন রাসায়নিক যৌগ নয় বরং তৈরী হয়ে গেল জীবন্ত কোষ তাকে আপনি রাসায়নিক দূর্ঘটনা বা কাকতাল বলবেন নাকি অলৌকিক বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ বলবেন তা ব্যাক্তিবিশেষের উপর নির্ভরশীল।পবিত্র বেদ একেই বলছে ঈক্ষণ বা ঈশ্বরীয় মহত্ব।

জীবন্ত কোষের বৈশিষ্ট্য ই হল সে সন্তানের জন্ম দিতে পারে,কথাটি স্থুল অর্থে ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ  হল তার থেকেই হুবহু এরকম অন্য কোষ উৎপন্ন হতে পারে যাতে পূর্বকোষের সকল রাসায়নিক তথ্য সরবরাহকৃত হয়,পিতার চুলের রঙ বা মায়ের চোখের বর্ণালী এভাবেই পিতামাতা হতে সন্তানে স্থানান্তরিত হয়।এভাবে সেই একটি জীবন্ত কোষ থেকেই চেইন বিক্রিয়ার মত ক্রমে উৎপন্ন হতে লাগল অসংখ্য কোষ যাতে রয়ে গেল আদি সেই কোষটির ছাপ।মনে রাখতে হবে সেগুলো ছিল কেবল একটিমাত্র কোষ।আপনার আমার মত প্রাণীদের শরীরে কোটি কোটি কোষ রয়েছে,কিন্তু তখনের সেই নতুন প্রাণগুলোর কোষ ছিল শুধু একটি,আসলে এদেরকে প্রাণী বলাও দুরূহ,বলা যেতে পারে কেবল সজিব একটি কোষ।এরা এতই ক্ষুদ্র যে খুব শক্তিশালী মাইক্রেস্কোপ ছাড়া দেখাও সম্ভব নয় এমন।আজ পৃথিবীতে আপনি যে এত কোটি কোটি মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ দেখছেন সবাই ই আজ থেকে প্রায় ৩.৮ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর আগে জন্ম নেয়া সেই একটি কোষ থেকেই বিভিন্ন ধাপে উৎপন্ন হয়েছে।অর্থাৎ আপনার বাসার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কুকুরটি বা আপনার বেলকনিতে বসে থাকা পায়রাটিও আপনার আত্মীয়ই!উপনিষদ যখন বলে বসুধৈব কুটুম্বকম্ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বই আপনার আত্মীয় তখন এমনিতেই তা বলেনা এটাই তার প্রমাণ।বিজ্ঞানীরা একে বলেন Abiogenesis,অর্থাৎ প্রাণহীন রাসায়নিক পদার্থ থেকেই পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উদ্ভব আর তার থেকেই অসংখ্য ধাপে ক্রমান্বয়ে সকল জীবজগতের উৎপত্তি।এ কারণেই দেখবেন আপনার বাসার ইঁদুরটির সাথেও আপনার DNA এর মিল ৮৫% কেননা সমগ্র প্রাণীজগতের আগমন যে সেই একটি কোষ থেকেই! আমাদের সকলের আদি উৎপত্তি তো সেই এক!এজন্যেই মহর্ষি কণাদ বৈশেষিক দর্শনে বলেছেন-


দ্রব্যগুণয়ো সজাতীয়ারম্ভকম্ সাধর্মম্

(বৈশেষিক দর্শন ১.১.৯)

অনুবাদ-বস্তুসমূহের ধর্ম ও গুণ সজাতীয়(একইরকম) হওয়া তাদের একই উৎপত্তির(আরম্ভ) নির্দেশক।


আর এভাবেই ধীরে ধীরে প্রথমে জগতের সৃষ্টি এবং তারপরে বিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে অন্য সকল কিছুর সৃষ্টিকে নিয়ে সনাতন ধর্মের যে দর্শনটি কাজ করে তাকে আমরা মহর্ষি কপিলের সাংখ্য দর্শন নামে চিনি।সাংখ্যদর্শনে এই বিবর্তনবাদের অপর নাম পরিণামবাদ।পরিণামবাদ ব্যাখ্যা করে জগতের বিবর্তনের মূল কাঠামো-


সত্ত্বরজস্তমসাংসাম্যবস্থা প্রকৃতিঃ

প্রকৃতের্মহানমহতোহহংকারঃ

অহংকারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণ্যুভয়মিন্দ্রিয়ং

তন্মাত্রেভ্যঃস্থূলভূতানিপুরুষঃ ইতি পঞ্চবিংশতির্গণঃ

(সাংখ্যদর্শন,অধ্যায় ১,শ্লোক ৬১)


এই শ্লোকটির এবং সাংখ্যদর্শনের প্রথম অধ্যায়ের তাৎপর্য অনেক ব্যাপক।কারণ হিন্দুধর্মই একমাত্র মেজর রিলিজিয়ন হিসেবে পরিচিত যা বিবর্তনবাদকে সমর্থন করে।Pew Research এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী শতকরা ৮৫ শতাংশ সনাতন ধর্মালম্বী ই বিশ্বাস করেন বিবর্তনবাদে।অপরদিকে অন্যান্য রিলিজিয়নসমূহ খুব তীব্রভাবে বিবর্তনবাদের বিরোধিতা করে এবং কাল্পনিক এডাম-ইভ নামক দুইজন মানুষ থেকে সমগ্র মানবপ্রজাতির আবির্ভূত হবার অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রচার করে।


শ্লোকটির এবং সাংখ্যদর্শনে বিবর্তনবাদ তথা পরিণামবাদের সারাংশ হল-


১)যখন সত্ত্ব,রজঃ ও তম গুণের সম্পূর্ণ সাম্যবস্থা বিদ্যমান থাকে তখন সৃষ্টি অপ্রকাশিত অবস্থায় থাকে।

২)ঈশ্বর কর্তৃক যখন এই সাম্যবস্থার অসাম্য ঘটে তখন ই সৃষ্টি শুরু হয়,জগতের সৃজন ঘটে,প্রকাশিত হয় মূল প্রকৃতি।

৩)প্রকৃতির পরমাণু থেকে প্রথম সৃষ্টি হয় মহত্তত্ত্ব,অর্থাৎ এই সকল কিছুর প্রকাশ হয়।

৪)মহত্তত্বের পর আসে অহংকারের,অর্থাৎ অস্তিত্বের। প্রথম কোন কিছুর তৈরী হয় জড় প্রকৃতি থেকে যার নিজস্ব অস্তিত্ব(অহংকার) আছে,সে জড় নয়।পুরুষ এবং প্রকৃতির যখন মিলন হয় তখন ই জড় প্রকৃতি থেকে প্রাণময় অহংকারের সৃজন হয়।সাংখ্য দর্শনে পরিণামবাদের এই মহত্তত্ব থেকে অহংকার বা অস্তিত্বের প্রথম সৃজন ই বিবর্তনবাদের জড় রাসায়নিক পদার্থ থেকে নিউক্লিয়িক এসিড নামক প্রাণময় প্রথম প্রাণের সৃজন তথা Abiogenesis. বিজ্ঞান যাকে বলছে Abiogenesis,সাংখ্যদর্শন তাকে বলছে মহত্তত্ব থেকে অস্তিত্বের(অহংকার) সৃষ্টি।


এই প্রথম চারটি ধাপ বিজ্ঞানের সাথে মিলে গেল,এরপরের ধাপগুলো এখানেই বলে রাখি।পরে ঘটনাপ্রবাহে দেখব বিজ্ঞানের সুত্রে কিভাবে অপূর্ব নিয়মে সেগুলোও মিলে যাবে।

৫) অহংকারের পর সৃষ্টি হবে বুদ্ধি,মানে Brain বা মস্তিস্ক।একইসাথে সৃজন হয় তন্মাত্রা (চক্ষু,স্পর্শ ইত্যাদি)

৬) বুদ্ধির পর সৃজন হয় চিত্তের এবং মানসের(Mind&Consciousness) 

সাংখ্যদর্শনে বিবর্তন তথা পরিণামবাদের একটি সংক্ষিপ্ত ছক


আবার বিজ্ঞানে ফিরে যাই।এককোষী প্রাণের সৃষ্টি তো হল,সময়ও বয়ে চলল।সেই একটি কোষ থেকে শত শত কোটি কোষ সৃষ্টি হতে লাগল।মহর্ষি কপিল বলছেন-


পারস্পর্য্যত অণ্বেষণা বীজাংকুরবৎ।।

(সাংখ্যদর্শন ১.১২২)

অর্থাৎ পরম্পরা হিসেবে বীজ হইতে অঙ্কুর হয় আবার সেই অঙ্কুর হইতেই বীজের উৎপত্তি,এই প্রবাহরূপ অনাদি।


আর এই প্রবাহরূপেই চলতে লাগল সৃষ্টির ধারা, পেরিয়ে গেল আরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর।আজ থেকে দুই বিলিয়ন বছর আগে এরূপ দুইটি কোষের স্বতস্ফুর্ত, অকস্মাৎ মিলন ঘটল।এই একটি ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দিল সৃষ্টির ইতিহাসের।এতদিন ছিল একক কোষ।হঠাৎ দুইটি কোষের মিলনে নতুন যে কোষ তৈরী হল তা এখন আর একক কোন সত্ত্বা নয়,তা বহন করছে দুইটি আলাদা কোষের সত্ত্বা,তার পিতামাতার সত্ত্বা।এখন মিউটেশন তথা জীনের বিন্যাসের সম্ভাবনা বেড়ে গেল কয়েককোটি গুণ।নতুন নতুন বহুকোষী প্রাণের সৃষ্টি হতে থাকল স্বতস্ফূর্তভাবে।জলজ পরিবেশে জন্ম হতে থাকা এইসব প্রাণের তখনো কিন্তু নিবাস ছিল জলাশয় তথা সমুদ্র।স্থলে তখনও প্রাণের আগমন ঘটেনি।এজন্যেই এখনো ৪ বিলিয়ন বছর আগের LUCA(Last Universal Common Ancestor),LECA(Last Eukaryotic Common Ancestor) ইত্যাদি প্রাণের আদিপুরুষদের অস্তিত্বসমূহ এখনো পাওয়া যায় গভীর সমুদ্রের ফাটলে(Deep Sea Vent)।এভাবেই বিবর্তনের মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে সমুদ্রে সৃষ্টি হল বিলিয়ন বিলিয়ন প্রজাতির,ছড়িয়ে পড়তে লাগল জীবনবৃক্ষের শাখাপ্রশাখা।কিন্তু এত বিলিয়ন প্রজাতির মধ্যে কেবল একটি প্রজাতিই শেষপর্যন্ত পরিণত হবে মানুষে।বাকীদের ভাগ্য হবে আলাদা।


এভাবে ক্রমে ক্রমে জটিল হতে লাগল প্রাণীদের গঠন,বাড়তে লাগল তাদের দেহে কোষের সংখ্যা।আজ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন বছর আগে সেই অসংখ্য প্রজাতির মধ্যে একটি ছিল Xenoturbella Churro,একটি মাত্র ৩ ইঞ্চি লম্বা জলজ পোকা।বিজ্ঞান বলছে এই পোকাটিই হল সকল Bilateran(যাদের মুখ এবং পায়ুপথ আছে এবং এই দুটি ছিদ্র সমগ্র পরিপাকতন্ত্র দিয়ে যুক্ত) প্রাণীর আদিপুরুষ।যখন ই পুকুরে মাছ ধরতে যাবেন মনে রাখবেন আপনার পূর্বপুরুষও একসময় ছিল জলজ মাছ!

৩ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের আমাদের প্রাচীন আদিপুরুষ Xenoturbella এর একটি ডিজিটাল উপস্থাপন


আশ্চর্য হলেও সত্যি যে তখনকার সময়ে জগতে যে বিলিয়ন বিলিয়ন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটছিল তার ৯৯ শতাংশ ই এখন বিলুপ্ত।পারবে কি মানবজাতির আদিপুরুষ সেই জলজ পোকা প্রজাতিটি টিকে থাকতে প্রকৃতির বাঁধাবিপত্তি পেরিয়ে? নির্ভর করবে অনেকগুলো বিষয়ের উপর।আজ থেকে ৫৪০ মিলিয়ন বছর আগে সেই প্রজাতিটির শরীরে মিউটেশনের মাধ্যমে কিছু বিশেষ কোষের উৎপত্তি ঘটল,সেই কোষসমূহের বিশেষত্ব কি? বিশেষত্ব হল সেগুলো দিয়ে আশেপাশে কে আছে,আলো নাকি অন্ধকার,কোন শিকারি আসছে কিনা তা বুঝতে পারা যায়।পরবর্তী ২০ মিলিয়ন বছর ধরে সেই কোষগুলো আরও উন্নত হতে লাগল,আজ সেই কোষগুলোকে আমরা বলি চোখ!আমরা দেখতে পারতে লাগলাম আমাদের আশেপাশের পরিবেশকে,শত্রুদের,আলাদা করতে পারলাম আলো অন্ধকারকে।প্রকৃতির এই দানের ফলে আমাদের প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক গুন বেড়ে গেল অন্য প্রজাতির চেয়ে।ততদিনে আমরা পরিণত হয়েছি এক মৎস্য প্রজাতিতে,আমাদের সেই মৎস্য পূর্বপুরুষের নাম Myllokunmingia,আমরা শ্বাস নিই ফুলকার সাহায্যে অর্থাৎ আমরা বাতাস থেকে শ্বাস নিইনা,আমরা পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন এই ফুলকা নামক জিনিসের সাহায্যে গ্রহণ করি।আর এই Myllokunmingia এর এখন আছে অসামান্য একটি অস্ত্র।কি তা?


আজ থেকে ৫২১ মিলিয়ন বছর আগে চোখের কোষগুলোর রিলে স্টেশন হিসেবে চোখের পিছনে তৈরী হল অল্প কিছু কোষ,একদম সুচাগ্র পরিমাণ।সেই কোষগুলো একসময় কালের বিবর্তনে হয়ে উঠল আধুনিক পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি,তার নাম মস্তিস্ক।Myllokunmingia এখন একদম প্রাথমিক জিনিস বুঝতে পারে,প্রসেস করতে পারে তার সেই ছোট্ট মস্তিস্ক দিয়ে।তাহলে দেখলেন তো,অহংকারের পর তৈরী হল চক্ষু(তন্মাত্রা) এবং বুদ্ধি বা ব্রেইন,ঠিক যেমনটা সাংখ্য দর্শন বলছে।

Myllokunmingia


কিন্তু বিপদের তো আর কখনোই শেষ নেই।আমাদের মৎস্য পূর্বপুরুষও সম্মুখীন হল এক মহাবিপদের,Anomalocaris নামক এক শিকারি জলজ প্রজাতির চোখ পড়ল আমাদের উপর।কিন্তু জিনের পাশাখেলায় আমরা পেলাম আরেকটি সুযোগ।

জগতের প্রথম শিকারী প্রজাতি Anomalocaris যাদের ধাওয়া খেয়ে বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ঠ্য লাভ করেছিল আমাদের পূর্বপুরুষরা


আমাদের চোয়াল বড় হতে লাগল,যত বড় চোয়াল তত বেশী খাবার,যত বেশী খাবার তত বেশী শক্তি।এতে শিকারি প্রজাতি থেকে আমাদের পালানোর ক্ষমতা বাড়তে থাকল।আর আমাদের পূর্বপুরুষরা বেশী বেশী করে থাকতে লাগল একদম গভীর সমুদ্রে যাতে শিকারি সহজে খুঁজে না পায়।কিন্তু গভীর সমুদ্রে অক্সিজেনের পরিমাণ তো কম।এভাবে চলতে চলতে ৩ বিলিয়ন বছর পেরিয়ে আজ থেকে প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন বছর আগে আমরা তখন ১ ফুট দৈর্ঘ্যের মৎস প্রজাতি।আর গভীর সমুদ্রে শিকারির ভয়ে লুকিয়ে থাকতে থাকতে আমাদের অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে লাগল,শরীরে অক্সিজেনের অভাব প্রকট হল।আস্তে আস্তে ৩৭০ মিলিয়ন বছর আগে অতিরিক্ত অক্সিজেন গ্রহণের উদ্দেশ্যে আমাদের দেহে একটি নতুন অঙ্গের সৃষ্টি হল যার নাম ফুসফুস।আজকেও যখন প্রতিদিন বুকভরে শ্বাস নেবেন মনে রাখবেন আজ থেকে ৩৭০ মিলিয়ন বছর আগে এক শিকারির থাবার কাছে জীবনরক্ষার সার্বক্ষণিক তাড়া থেকে বাঁচার জন্যেই আমাদের এই বাতাস থেকে শ্বাস নেবার ফুসফুসের আবির্ভাব হয়েছিল।আমাদের পূর্বপুরুষের নাম তখন হল Ichthyostega,তাদের ফুলকা হতে থাকল বিলুপ্ত,সৃষ্টি হল ফুসফুস,তারা কিছুক্ষণের জন্য পানির উপরে ভেসে উঠে,বাতাস থেকে শ্বাস নেয় আবার ডুব দিয়ে নিচে চলে যায়।এই Ichthyostega হল এমন এক মৎসের ন্যায় প্রজাতি যারা একধরনের মাছও আবার যাদের চারটি প্রত্যঙ্গ এবং ফুসফুসও ছিল(Tetrapodomorph)।মাছ এবং চতুর্পদী প্রাণীর মধ্যেকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃপ্রজাতি এই Ichthyostega এবং ছবিতে থাকা Tiktaalik । তার পূর্বপুরুষের চারটি ডানা হয়ে উঠল তার চারটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ,আজ তা হয়ে উঠেছে আমাদের হাত পা।তারও কিন্তু ছিল আমাদের হাতের মতই বাহুর হাড়(Humerus),আংগুলের হাড়(Phallanx)।

Ichthyostega

Ichthyostega এর হাতের গঠন ছিল প্রায় আমাদের মতন

Moscow Paleontological Museum এ Ichthyostega এর একটি Reconstructed কংকাল


আজ আমরা যখন হেঁচকি(Hiccup) দিই কেন দিই?


কারণ আমাদের আদিপুরুষ Myllokunmingia(ফুলকাযুক্ত)থেকে যখন Icthyostega হল তখন তার ফুসফুস তৈরী হল(এই পর্যায়ে আমরা মাছের মত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনও নিতে পারি আবার পানির উপরে ভেসে উঠে বাতাস থেকেও অক্সিজেন নিতে পারি)।যখন পানির উপর থেকে সরাসরি বাতাস ফুসফুসে নেয়ার পর পানির গভীরে গিয়ে আবার ফুলকা দিয়ে শ্বাস নিতে হত তখন সেই প্রক্রিয়ায় আমাদের কণ্ঠনালীটা বন্ধ করে ফেলতে হত যাতে ভেতরে পানি না ঢুকতে পারে ফুসফুসে আর হঠাৎ কণ্ঠনালী বন্ধ করার সেই ঢাক্কাটা আমাদের বক্ষপিঞ্জরের মধ্যে একধরনের কাঁপুনি সৃষ্টি করত। আজও সেই কাঁপুনিটা আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে অতীতের চিহ্ন হিসেবে যার নাম Hiccup বা হেঁচকি!


একটি মজার কাকতাল দিয়ে আজকের পর্বটি শেষ করব।আমরা জানি Hindu Mythology তে দশাবতারের প্রথম ৩ টি হল মৎস,কূর্ম,বরাহ।ঠিক তেমনি মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসেও আমরা দেখি প্রথমে ছিল জলজ প্রাণী>মৎস্য,এরপর Ichthyostega যা জলের একদম গভীরে থেকেও শ্বাস নিতে পারে আবার জলের উপরে ভেসে উঠে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।ঠিক যেন কূর্ম বা কচ্ছপের মতন।কচ্ছপও জলের গভীরে Cloacal Respiration এর সাহায্যে শ্বাস নিতে পারে আবার জলের উপরেও বাতাস থেকে ফুসফুসের মাধ্যমে শ্বাস নিতে পারে।এ যেন মৎস থেকে কূর্ম অবতারে রূপান্তর।

Eusthenopteron

Tiktaalik

Acanthostega

মৎস্যপ্রজাতি হতে Tetrapod(চতুর্পদী) Ichthyostega তে রূপান্তর

Fish থেকে Tetrapod এ যাত্রা


এই প্রথম,প্রায় ৩৬৭.৫ মিলিয়ন আমাদের আদিপুরুষ Ichthyostega জলের উপরিভাগের দুনিয়াটা দেখতে পেল,তার সামনে খুলে গেল বিশাল এক নতুন জগতের দ্বার।সে বেরিয়ে পড়ল জল ছেড়ে স্থলের পথে।আজ থেকে প্রায় ৩৬৮ মিলিয়ন বছর পূর্বে প্রথম মৎস থেকে উদ্ভূত এই কুমিরের মত দেখতে চার বাহু আর ফুসফুস যুক্ত Ichthyostega পানি ছেড়ে চলে এসেছিল মাটিতে,জলচর থেকে স্থলচর প্রাণীর জীবন বেছে নিয়েছিল।জলের ভিতরের মৎস অবতার থেকে জল ও জলের উপর উভয়খানেই থাকা কূর্ম অবতারের জীবন পারি দিয়ে এখন যেন সম্পূর্ণ স্থল জীবনের বরাহ অবতারের যাত্রা শুরু।দশাবতারের মিথের সাথে মানব বিবর্তনের এই অদ্ভূত মিলকে আপনারা কাকতালীয় ভাববেন নাকি রহস্যের গন্ধ পাবেন তা আপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।কিভাবেই বা সেই অলৌকিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জড় রাসায়নিক পদার্থ থেকে জীবন্ত কোষের উদ্ভব হল!নাকি এটাই ঈশ্বরীয় প্রেরণা? জলে থাকা শিকারি মাছের হাত থেকে আপাতত বাঁচা গেল,কিন্তু স্থল কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?দেখা যাক স্থলে আমাদের পূর্বপুরুষ Ichthyostega এর নতুন জীবন কেমন হয়।আজ এখানেই শেষ,আগামী পর্বে Ichythyostega কে নিয়ে আবার দেখা হবে।সে পর্যন্ত,বিদায়!


চলবে...

6 comments:

  1. বিবর্তনবাদ আর বিবর্তনতত্ত্ব দুইটা ভিন্ন জিনিস। বিজ্ঞান বিবর্তনতত্ত্ব নিয়ে কথা বলে, বিবর্তনবাদ নিয়ে নয়। সুতরাং এখানে বিবর্তনবাদ কথাটা ব্যবহার করা ভুল।

    ReplyDelete
  2. শুধু ichthyostega থেকেই বিবর্তন হইছে তারপর মানুষ হইছে?
    আর অন্য কোন প্রজাতির বিবর্তন ঘটেনাই?

    ReplyDelete

Pages