স্বামী (ড.) সত্যপ্রকাশ সরস্বতী
ভগবানকে দর্শনের লালসা সকলেরই আছে। প্রত্যেক আস্তিক ব্যক্তিই বলেন, "আমাকে ভগবান দর্শন করিয়ে দাও।" কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সত্য এই যে, আমরা সকলেই ভগবানের দর্শন পেতে ভয় পাই। আমাদের ভয় হয়। পাছে ভগবান আমাদের এই প্রশ্ন না করে বসেন যে, "তুই নাম তো নিস আমার, কিন্তু তোর ভালোবাসা তো পাপের প্রতি! তুই কেন পাপী? কেন ভাই হয়ে ভাইয়ের সাথে লড়াই করিস? মিথ্যার ব্যবসা করিস অথচ এই ব্যবসা ছাড়তেও চাস না, তবে আমাকে ডাকছিস কেন? তোর মন পড়ে আছে অন্য কোথাও, আর ঠোঁটে কেবল আমার নাম জপছিস?"
স্মরণ রেখো, তুমি জগতকে ধোঁকা দিতে পারো, কিন্তু না নিজেকে ধোঁকা দিতে পারবে, না প্রভুকে। প্রভু তোমাকে হৃদয়ে বিবেক দিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন, "তুমি আমাকে কেন ডাকছিস? কী চাস তুই?"
এর উত্তরে তোমার কাছে কী বলার আছে? তুমি কি এই বর চাইতে চাও যে তোমার দোকান যেন খুব চলে, কিন্তু প্রতিবেশীর দোকানে যেন লোকসান হয় এবং তার দোকান বন্ধ হয়ে যায়? প্রভু হাসবেন যে, তুমি স্বার্থের এমন কথা বলছ যাতে ঈর্ষা, দ্বেষ আর বৈরিতার ভাবনা মিশে আছে। এই কারণেই আমি বলে থাকি যে, মানুষ ঈশ্বরকে ভয় পায় এবং কেবল মিথ্যা-মিথ্যা তাঁর নাম নেয়। আমরা পাপী, আর পাপের এই ভয় আমাদের মস্তকে সওয়ার হয়ে থাকে। যার মন্দ অভ্যাস হয়ে যায়, সে যেমন মাতা-পিতা ও গুরুর সম্মুখে যেতে ভয় পায় এবং তাঁদের এড়িয়ে চলে, আমাদের অবস্থাও ঠিক তদ্রূপ।
আমরা ঈশ্বরকেও এক বিচিত্র উপায়ে দর্শন করতে চাই। আমরা তাঁকে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে চাই এবং নিজের কানে তাঁর শব্দ শুনতে চাই। কিন্তু কেন-উপনিষদ বলছে, চক্ষু সেখানে পৌঁছাতেই পারে না। এটি ধ্রুব সত্য বলে জেনে রেখো, যে বস্তুকে তুমি চোখের দ্বারা দেখে ফেলবে, তা নিশ্চিতভাবে আর যা-ই হোক, ঈশ্বর হতে পারে না। যুক্তিটি স্পষ্ট- যেহেতু আমরা চোখে দেখলাম, সেহেতু সেই অমুক বস্তু ঈশ্বর নয়। তা ঈশ্বরের কারিগরি বা তাঁর চিত্রকর্ম হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর নয়। ঈশ্বর তো তিনি, যাকে নেত্র দেখতে পায় না; বরং যিনি নেত্রকে সেই শক্তি দেন যাতে আমাদের চক্ষু সংসারের মূর্ত পদার্থসমূহ দেখতে সমর্থ হয়। ঈশ্বরের অনুগ্রহেই আমাদের কর্ণ শ্রবণশক্তি লাভ করে, কিন্তু ঈশ্বরের বাণী তারা শুনতে পায় না। ঈশ্বরের বাণী কোনো যন্ত্রে (টেপ রেকর্ডারে) ধরে রাখা যায় না। ঈশ্বরকে না এই বাহ্যিক চক্ষু দিয়ে দেখা যায়, না এই বাহ্যিক কর্ণে শোনা যায়। তাঁর দর্শনের জন্য আমাদের অন্তশ্চক্ষু উন্মীলিত করতে হবে এবং তাঁর শব্দ শোনার জন্য অন্তঃকরণের কর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে।
মনে রেখো, চক্ষুগোলক দিয়ে আমরা যা দেখি বা কর্ণগোলক দিয়ে যা শুনি, সেগুলি অত্যন্ত অসার বস্তু। আমাদের শরীরে অন্নময় কোষের চেয়ে প্রাণময় কোষ এবং মনোময় কোষের গুরুত্ব অনেক বেশি; অথচ এগুলিকে কেউ চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেনি। আজ পর্যন্ত না তুমি আমাকে দেখেছ, না আমি তোমাকে দেখেছি। আমি যা দেখেছি তা কেবল তোমার শরীরের বস্ত্র। তোমার শরীরের চর্ম এবং অস্থি-পিঞ্জরও তো এক প্রকারের সিন্দুক, যার অভ্যন্তরে অতি ক্ষুদ্র এক গুহায় তুমি বসে আছ। যখন আমরা পরস্পরকেই এই চোখে দেখতে পাই না, তবে ঈশ্বরকে এই চোখে কীভাবে দেখবে? যদি কেউ বলে যে "আমি তোমাকে ঈশ্বর দেখিয়ে দেব", তবে তা হবে মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।
তবে এটি স্মরণে রাখা কর্তব্য যে, ঈশ্বর একেবারেই আমাদের কাছে আছেন যেখানে আমরা আছি, সেখানেই তিনি আছেন। সামান্য সময়ের জন্য এটি খুঁজে বের করো যে তুমি কোথায় আছ, সেখানেই তোমার প্রিয় ঈশ্বরকে অন্বেষণ করো। আমরা জানি বা না জানি, আমরা বারবার ঈশ্বরের কাছে উপলব্ধির যাই। সাংখ্য দর্শনের আচার্য কপিল মুনি বলেন যে, সুষুপ্তি, সমাধি এবং মোক্ষ - এই তিন অবস্থায় পরমাত্মার সাথে আমাদের সাক্ষাৎকার ঘটে। জগতে সুষুপ্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো অবস্থা নেই। গভীর নিদ্রার নামই সুষুপ্তি; কিন্তু সেই নিদ্রা এমন গভীর হওয়া চাই যাতে স্বপ্নও না দেখা যায়, যাতে কোনো বাসনা বা কামনা না থাকে, কেবল এক অচৈতন্য অবস্থা। এমন সুষুপ্তিতে প্রভু পরম স্নেহে আমাদের নিজের কোলে তুলে নেন এবং আমাদের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। যখন আমরা জাগ্রত হই, তখন বলি, "খুব আনন্দে ঘুমিয়েছি।" এই আনন্দ কোথা থেকে এল? এই ক্লান্তি কীভাবে দূর হলো? এটি প্রভুর কোলেরই প্রসাদ ছিল। এই কথাটি ভুলে যেয়ো না। তুমি জানতে না, তুমি ঘুমাচ্ছিলে আর প্রভু অতি মমতায় তোমার ক্লান্তি মোচন করছিলেন।
যোগের সমাধিতে তোমার প্রভুর সাক্ষাৎ দর্শন লাভ হয়। সেই দর্শনের সময় তুমি জাগ্রত থাকো। প্রভুর সাক্ষাৎকারে তোমার হৃদয়ের মালিন্য ধুয়ে মুছে যায়। সুষুপ্তিতে কেবল শারীরিক ক্লান্তি দূর হয়েছিল, কিন্তু সমাধি থেকে যখন তুমি ফিরে আসো, তখন তুমি পবিত্র হয়েই প্রত্যাবর্তন করো। সেটিই প্রভু দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রসাদ।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
