কাঠগড়ায় ঈশ্বর : পেরিয়ার Vs সনাতন ধর্ম
ওহে ঈশ্বর-
১. তুমি কি কাপুরুষ, যে সর্বদা লুকিয়ে থাকো, কখনো কারও সামনে আসো না?
২. তুমি কি চাটুকারিতা বা তোষামোদপ্রিয়, যে মানুষের দ্বারা দিনরাত পূজা-অর্চনা করাও?
৩. তুমি কি সর্বদা ক্ষুধার্ত, যে মানুষের কাছ থেকে মিষ্টি, দুধ, ঘি ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকো?
৪. তুমি কি মাংসাশী, যে মানুষের কাছ থেকে দুর্বল পশুদের বলি চাও?
৫. তুমি কি সোনার ব্যবসায়ী, যে মন্দিরগুলিতে লক্ষ লক্ষ টন সোনা জমা করে রেখেছ?
৬. তুমি কি ব্যভিচারী, যে মন্দিরে দেবদাসী রাখো?
৭. তুমি কি দুর্বল, যে প্রতিদিন সংঘটিত হওয়া ধর্ষণসমূহ থামাতে পারো না?
৮.
তুমি কি মূর্খ, যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য ও অনাহার থাকা সত্ত্বেও
কোটি কোটি টাকার অন্ন, দুধ, ঘি, তেল না খেয়ে নদী-নালায় প্রবাহিত হতে
দাও?
৯. তুমি কি বধির, যে অকারণে মারা যেতে থাকা মানুষের আর ধর্ষিত নিরপরাধ শিশুদের আর্তনাদ শুনতে পাও না?
১০. তুমি কি অন্ধ, যে প্রতিদিন সংঘটিত অপরাধ দেখতে পাও না?
১১. তুমি কি সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যুক্ত, যে ধর্মের নামে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে মরতে দাও?
১২. তুমি কি সন্ত্রাসবাদী, যে চাও মানুষ তোমাকে ভয় করে থাকুক?
১৩. তুমি কি বোবা, যে একটি শব্দও বলতে পারো না, অথচ কোটি কোটি মানুষ তোমাকে লক্ষ লক্ষ প্রশ্ন করে?
১৪.
তুমি কি দুর্নীতিগ্রস্ত, যে দরিদ্রদের কখনো কিছু দাও না, অথচ দরিদ্ররা
পশুর ন্যায় পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থের কণাকণা তোমার উপর উৎসর্গ করে
দেয়?
১৫. তুমি কি মূর্খ, যে আমাদের মতো নাস্তিকদের সৃষ্টি করেছ, যারা তোমাকে কটুক্তি করে এবং তোমার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে?
[পেরিয়র ই. ভি. রামস্বামী]
১.
ঈশ্বর
কাপুরুষ নন। ঈশ্বর নিরাকার হওয়ার কারণে তিনি সামনে আসছেন না কেন এই
প্রশ্নই অযৌক্তিক। আগে জানা উচিত যে ঈশ্বরে বিশ্বাসীরা কীভাবে ঈশ্বর
বিশ্বাস করেন তারপর প্রশ্ন করা উচিত। নতুবা এটি Straw man Fallacy-র
অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর
নিরাকার হওয়া প্রয়োজন, যাতে তিনি ব্রহ্মাণ্ডকে যথাযথভাবে পরিচালনা করতে
পারেন। যদি তিনি সাকার হতেন তবে তিনি একদেশীয় হয়ে যেতেন; এতে বিজ্ঞানের
নিয়ম ভঙ্গ হয়ে যেত, এবং ঈশ্বর কখনো নিজের নিয়ম ভঙ্গ করেন না।
বিজ্ঞানের
একটি নিয়ম হলো, যেখানে ক্রিয়া ঘটে, সেখানে সেই ক্রিয়ার কর্তা বিদ্যমান
থাকে। ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণায় ক্রিয়া ঘটছে। যেহেতু ব্রহ্মাণ্ড অনন্ত,
তাই ঈশ্বরকে সর্বব্যাপী হতে হবে, এবং সর্বব্যাপী হতে হলে নিরাকার হওয়া
আবশ্যক, কারণ কেবল নিরাকারই সর্বব্যাপী হতে পারে।
প্রশ্ন
ওঠে, ঈশ্বর সামনে আসবেন কেন? প্রায়ই মানুষ জিজ্ঞাসা করে ঈশ্বরের প্রয়োজন
কী? এর উত্তর এটিও হতে পারে যে, যতক্ষণ মানুষ অলস বসে থাকে ততক্ষণ কোনো
প্রয়োজন নেই। ঈশ্বর আসার কোনো প্রয়োজন নেই। ঈশ্বর মানুষকে পুরুষার্থ করার
জন্য বেদের জ্ঞান সমাজের মাধ্যমে দিয়েছেন। মানুষকে কেবল ঈশ্বরের ভরসায়
বসে না থেকে পুরুষার্থ করা উচিত- এটাও বেদেরই শিক্ষা। মহর্ষি দয়ানন্দ
সরস্বতী প্রার্থনা ও পুরুষার্থের সংজ্ঞাতে তাই বলেছেন,
ক.
প্রার্থনা – উত্তম কর্ম সিদ্ধির জন্য নিজের পরিপূর্ণ পুরুষার্থ করার পর
পরমেশ্বর অথবা কোনও সামর্থ্যবান মানুষের সাহায্য গ্রহণকে ‘প্রার্থনা’ বলে।
খ.
প্রার্থনার ফল - অভিমানতার নাশ, আত্মায় আর্দ্রতা (কোমলতা), গুণ গ্রহণে
পুরুষার্থ পরায়ণতা এবং অত্যন্ত প্রীতি যুক্ত হওয়া ‘প্রার্থনার ফল’।
[সূত্র: আর্যোদ্দেশ্যরত্নমালা]
২.
ঈশ্বর
কোথাও বেদে এই জ্ঞান দেননি যে তোমরা আমার চাটুকারিতার জন্য তথাকথিত
পূজা-অর্চনা করো। তবে প্রকৃত পূজা-অর্চনা অর্থাৎ উপাসনা ও শ্রদ্ধা করার কথা
অবশ্যই বলা হয়েছে। উপাসনা এমন, যার দ্বারা মানুষেরই উপকার হয়; ঈশ্বরের
কোনো লাভের ইচ্ছা থাকে না। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
‘প্রার্থনা’
– যে জ্ঞান-বিজ্ঞানাদি নিজশক্তির অতীত কিন্তু ঈশ্বরের সাথে সংযোগবশতঃ লাভ
করা যায়, তার জন্য ঈশ্বরের নিকট যাচনা করাকে ‘প্রার্থনা’ বলে। প্রার্থনার
ফল নিরহঙ্কার ইত্যাদি।
[সূত্র: স্বমন্তব্যামন্তব্যপ্রকাশঃ, সত্যার্থপ্রকাশঃ]
উপাসনা কী? সেই উপাসনার নাম অষ্টাঙ্গ যোগ।
অষ্টাঙ্গ
যোগ (আট অঙ্গবিশিষ্ট যোগ) আটটি পৃথক ধাপ নয়; এটি আটটি মাত্রার পথ, যেখানে
আটটি মাত্রার অনুশীলন একসঙ্গে করা হয়। যোগের এই আট অঙ্গ হলো—
১) যম ২) নিয়ম ৩) আসন ৪) প্রাণায়াম ৫) প্রত্যাহার ৬) ধারণা ৭) ধ্যান ৮) সমাধি
যম:(ক) অহিংসা — বাক্য, চিন্তা ও কর্ম দ্বারা অকারণে কাউকে ক্ষতি না করা
(খ) সত্য — চিন্তায় সত্যনিষ্ঠ থাকা এবং যা মনে আছে তা সত্যভাবে বলা
(গ) অস্তেয় — চুরির প্রবৃত্তি না থাকা
(ঘ) ব্রহ্মচর্য — দুই অর্থে ব্যবহৃত-
(i) চেতনাকে ব্রহ্মজ্ঞানে স্থিত করা (ii) ইন্দ্রিয়জনিত সুখে সংযম রাখা
(ঙ) অপরিগ্রহ — প্রয়োজনের অতিরিক্ত সঞ্চয় না করা এবং অন্যের সম্পদের আকাঙ্ক্ষা না করা
নিয়ম:(ক) শৌচ — শরীর ও মনের পবিত্রতা
(খ) সন্তোষ — সন্তুষ্ট ও আনন্দিত থাকা
(গ) তপ — আত্মনিয়ন্ত্রিত থাকা
(ঘ) স্বাধ্যায় — আত্মচিন্তন করা
(ঙ) ঈশ্বর-প্রণিধান — ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ ও শ্রদ্ধা রাখা
আসন: স্থির ও সুখদায়কভাবে বসার প্রক্রিয়া (স্থিরসুখমাসনম্ ~ যোগ ও সাংখ্য), যা দেহস্থিতির সাধনা।
প্রাণায়াম:
আসন সিদ্ধ হওয়ার পরে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাণায়াম বলা
হয়। বাহ্য বায়ু গ্রহণ শ্বাস এবং অন্তঃস্থ বায়ু ত্যাগ প্রশ্বাস নামে
পরিচিত। প্রাণায়াম প্রাণস্থিতির সাধনা। এর অনুশীলনে প্রাণ স্থির হয় এবং
সাধক মনকে স্থির করার পথে অগ্রসর হয়। শেষ তিনটি অঙ্গ মনস্থিতির সাধনা।
প্রত্যাহার:
প্রাণস্থিতি ও মনস্থিতির মধ্যবর্তী সাধনার নাম প্রত্যাহার। প্রাণায়ামের
দ্বারা প্রাণ শান্ত হলে মন বাহিরমুখী প্রবৃত্তি কমে যায়। ফলে ইন্দ্রিয়
বাহ্য বিষয় থেকে সরে অন্তর্মুখী হয়। একেই প্রত্যাহার বলে।
ধারণা: একাগ্রচিত্ত হওয়া এবং মনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
ধ্যান: অবিরাম ধ্যান।
সমাধি: আত্মার সঙ্গে সংযোগ; শব্দের অতীত পরম চৈতন্যের অবস্থা, যা আমরা সকলেই অনুভব করতে পারি।
এইভাবে
ঈশ্বরের উপাসনা হয়। ঈশ্বরের কোনো মূর্তি নেই যে তাঁর পূজা করা যাবে।
মন্দিরে যাদের পূজা করা হয় তারা ঈশ্বর নন, বরং অনেক সময় মহাপুরুষ হন।
"ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্যশঃ' [যজুর্বেদ ৩২।৩]অর্থ: সেই ঈশ্বরের কোনো প্রতিমা নেই, যার মহান যশ আছে।
৩.
ঈশ্বরের
কোনো শরীর নেই, তাই তিনি ক্ষুধার্ত হতে পারেন না। তাঁকে কখনো ক্ষুধা লাগে
না। কিন্তু অজ্ঞতাবশত মানুষ মূর্তির সামনে দুধ, ঘি ইত্যাদি নিবেদন করে। এটি
মানুষের ভুল। এই ভুলের দায় ঈশ্বর বা সেই মহাপুরুষের উপর চাপানো উচিত নয়
যার মূর্তি নির্মিত হয়েছে। বরং ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপন করা হয় এবং
প্রাকৃতিক পরিশুদ্ধি ও ভক্তিসমর্পণের জন্য পঞ্চমহাযজ্ঞের মাধ্যমে জাগতিক
কল্যাণের পরেই নিজের আহার গ্রহণের বা ভোগের উল্লেখ বৈদিক শাস্ত্রে পাওয়া
যায়।
৪.
ঈশ্বর
কখনো বেদে বলি বা মাংস ভক্ষণ করার আদেশ দেননি। আপনি একটি মন্ত্রও দেখাতে
পারবেন না। মানুষ অজ্ঞতার কারণে ঈশ্বরের নামে বলি দেয়, কিন্তু এতে ঈশ্বরের
কোনো ভূমিকা নেই।
যজুর্বেদ
৪০/৭ মন্ত্রে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি সমস্ত প্রাণীকে নিজের আত্মার সমান
ভাবে দেখে, তার মোহ বা শোক থাকে না, কারণ সে সকল প্রাণীর সঙ্গে ঐক্যের
অনুভূতি করে।
যজুর্বেদ ৩৬/১৮ মন্ত্রে বলা হয়েছে—সমস্ত প্রাণী যেন আমাকে বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখে এবং আমিও যেন তাদের বন্ধুর মতো আচরণ করি।
যজুর্বেদ
১৬/৩ — মানুষ কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করবে না।যজুর্বেদ ১২/৩২ — কোনো
প্রাণীকে হত্যা করো না।যজুর্বেদ ১৩/৪৭ — দ্বিপদ বা চতুষ্পদ প্রাণীর প্রতি
হিংসা করো না।যজুর্বেদ ১৩/৪৩ ও ১৩/৪৯ — গোহত্যা নিষিদ্ধ।
এইসব
নির্দেশ থেকে প্রমাণিত হয় যে বৈদিক সাহিত্য প্রাণীহত্যার বিরোধী। অতএব
ঈশ্বর বলি চান—এই ধারণা ভিত্তিহীন। মানুষ বেদ না পড়ার কারণে এ ভুল ধারণা
করে।
৫.
মন্দিরের
মূর্তির কোনো প্রাণ নেই যে সে কারও কাছ থেকে অর্থ চাইবে। ঈশ্বর
সর্বব্যাপী; তাঁর কোনো কিছুর অভাব নেই। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড তাঁর।
মানবকল্যাণেই মন্দির ও দাতব্য সংস্থার কার্যক্রম। সুতরাং যদি কেউ স্বেচ্ছায়
মানব-কল্যাণার্থে মন্দিরে দান করে তবে তা সামাজিক সংস্থার মতোই বিবেচিত
হবে। পাশাপাশি উক্ত দানের যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু
মানবকল্যাণ ব্যতীত শুধুমাত্র ব্যবসায়ী দৃষ্টিতে ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য
কতিপয় মন্দিরে বিপুল অর্থ জমা রাখা কিছু ভণ্ড মানুষের কাজ; এর সঙ্গে
ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। যেভাবে অনেক ট্রাস্টের আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়
বাকি দাতব্য সংস্থার উপর দেওয়া যায় না, মন্দিরের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য।
৬.
মন্দিরে
দেবদাসী রাখার বিষয়েও মূর্তি বা ঈশ্বরের কোনো ভূমিকা নেই। এটিও
প্রতারকদের কাজ। যদি কেউ নিয়ম ভাঙে সেটা আইনের দোষ নয়, বরং উচিত আইনের
অধীনে এনে শাস্তি দেওয়া৷ দোষারোপ সমস্যা থেকে মুক্তি দেয় না।
৭.
ঈশ্বর
মানুষকে কর্মে স্বাধীন রেখেছেন। ঈশ্বর মানুষের কর্মে বাধা দেন না। যদি
বাধা দিতেন তবে মানুষের স্বাধীন কর্মনীতির নিয়ম ভেঙে যেত। মানুষ
পূর্বজন্মের কর্মফল ভোগ করার জন্য স্বাধীন। প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া
আছে; তাই কর্মফল নীতি সত্য। ঈশ্বর প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী ফল দেন।
ধর্ষণের বিষয়টিতে ধর্ষিতা দায়ী নয়, কেননা সে আধিভৌতিক দুঃখ ভোগ করছে, এতে
তার কোনো হাতই নেই। পাশাপাশি, সমস্ত দুঃখই কর্মফলজনিত নয়। নতুবা যে
অকর্মণ্য তার কোনো দুঃখই থাকতো না। জগতে ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড
ন্যায়ব্যবস্থা ও দণ্ডাদেশ যথাক্রমে প্রতিস্থাপিত ও পালিত হলে অপর তত্ত্ব
দ্বারা প্রাপ্তব্য দুঃখ কমে আসবে। কিন্তু দেহধারী জীবদের দুঃখ লাভ হবেই।
সেই দুঃখ যেন কমে আসে বা সীমার মধ্যে থাকে তার জন্যই ঈশ্বর কেন্দ্রীক
সিদ্ধান্তের আবশ্যকতা।
৮.
এর উত্তর আগেই দেওয়া হয়েছে—এ সব মানুষের কাজ, ঈশ্বরের নয়।
৯.
এর উত্তরও ৭ নম্বরে দেওয়া হয়েছে।
১০.
এর উত্তরও ৭ নম্বরে দেওয়া হয়েছে।
১১.
এর উত্তরও ৭ নম্বরে দেওয়া হয়েছে।
১২.
আমরা
যেমন নিজের পিতা বা গুরুজনের ভয়ে ভুল কাজ করা থেকে বিরত থাকি, তেমনই
ঈশ্বরকে ভয় করা উচিত, কারণ তিনি সর্বব্যাপী এবং সব দেখেন। তবে ঈশ্বর এত
ভয়ঙ্কর নন যে তাঁকে সন্ত্রাসবাদী বলা যায়। ঈশ্বর সকলের বন্ধু ও
কল্যাণকামী। এজন্য বেদ পড়ে এবং যুক্তির দ্বারা ঈশ্বরকে বুঝতে হবে।
১৩.
কোটি
কোটি মানুষ কার সামনে প্রশ্ন করে? মূর্তির সামনে, না ঈশ্বরের কাছে?
বর্তমান সময়ে খুব কম মানুষ ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ জানে। কীভাবে ঈশ্বরের
কাছে জ্ঞান লাভ করতে হয়, তার উত্তর অষ্টাঙ্গ যোগের আলোচনায় দেওয়া
হয়েছে। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন,
‘উপাসনা’:
ঈশ্বরের পবিত্র গুণ-কর্ম-স্বভাবের ন্যায় নিজের গুণ-কর্ম-স্বভাব পবিত্র
করা, ঈশ্বরকে সর্বব্যাপক, নিজেকে ব্যাপ্য জেনে আমি ঈশ্বরের নিকটে আছি এবং
তিনি আমার নিকটে আছেন, এইরূপ জ্ঞান সহকারে যোগাভ্যাস দ্বারা ঈশ্বর
সাক্ষাৎকার করার নাম ‘উপাসনা’। উপাসনার ফল জ্ঞানোন্নতি ইত্যাদি।
[সূত্র: স্বমন্তব্যামন্তব্যপ্রকাশঃ, সত্যার্থপ্রকাশঃ]
১৪.
এর উত্তরও ৭ নম্বরে দেওয়া হয়েছে। ঈশ্বর মানুষকে পুরুষার্থ করতে বলেছেন।
অথর্ববেদ ৭.৫৮.৮ — আমাদের ডান হাতে পুরুষার্থ এবং বাম হাতে বিজয় থাকুক।
ঋগ্বেদ
১০.১৯১.৩ — তোমাদের বিচার নিরপেক্ষ হোক; সবাই মিলে স্বাস্থ্য, বিদ্যা ও
সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করো; সকলের উন্নতিতেই নিজের উন্নতি ভাবো; সত্য অনুসন্ধান
করো এবং অসত্য দূর করো।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী বলেছেন,
ক.
পুরুষার্থ - সর্বদা আলস্য পরিহার করে উত্তম [কর্ম], ব্যবহারসমূহ-সিদ্ধির
জন্য দেহ, মন, বাণী ও ধনসম্পদ দ্বারা অত্যন্ত প্রচেষ্টা করাকে ‘পুরুষার্থ’
বলে।
খ. পুরুষার্থের প্রকারভেদ –
[১] অপ্রাপ্ত বস্তু প্রাপ্তির ইচ্ছা,
[২] প্রাপ্ত বস্তু উত্তমরূপে রক্ষা করা,
[৩] রক্ষিত বস্তুর বৃদ্ধি, এবং
[৪] বৰ্দ্ধিত পদার্থকে সত্যবিদ্যার উন্নতিতে তথা সর্বহিতার্থে ব্যয় করা, এই চতুর্বিধ কর্মকে ‘পুরুষার্থ’ বলে।
[সূত্র: আর্যোদ্দেশ্যরত্নমালা]
১৫.
ঈশ্বর
আস্তিক বা নাস্তিক কাউকে সৃষ্টি করেননি; তিনি কেবল মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
একটি শিশু জন্মের সময় না আস্তিক, না নাস্তিক। যে বেদ মানে না এবং ঈশ্বরকে
মানে না তাকে নাস্তিক বলা হয়; বিপরীত ব্যক্তি আস্তিক। মানুষ আস্তিক বা
নাস্তিক যাই হোক ভালো কাজের ফল ভালো ও মন্দ কাজের ফল মন্দ পাবে। নৈতিকতার
প্রসঙ্গেই ঈশ্বর ও বেদের মূল তাৎপর্য ও মানদণ্ড। মানুষ নিজেই নির্ধারণ করে
সে আস্তিক হবে না নাস্তিক হবে, কারণ কর্মে মানুষ স্বাধীন।
শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
