জ্ঞানালোকের আদি উৎস বেদ এবং বৈদিক শাস্ত্রসমূহ মানবজাতিকে সর্বদা একটি সত্যনিষ্ঠ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা দেয়। একটি সুস্থ ও ঋদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্ত হলো ভ্রান্তির বিনাশ এবং পরম সত্যের প্রতিষ্ঠা। বৈদিক ঋষিরা অনুধাবন করেছিলেন যে, সমাজ থেকে কুসংস্কার, মিথ্যাচার ও কুতর্ক দূর না করে কেবল সত্যের বাণী প্রচার করা অসম্ভব; কারণ ঋষিদের জ্ঞানস্রোত বেদের ছত্রে ছত্রে ‘মিথ্যার খণ্ডন’ এবং ‘সত্যের মহিমা প্রচারের’ এক আপসহীন ও বলিষ্ঠ সুর ধ্বনিত হয়েছে। যজুর্বেদের সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে ঋগ্বেদের জ্ঞানদীপ্ত মন্ত্রসমূহ স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, পরমেশ্বর স্বয়ং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং মিথ্যার প্রতি অনীহা স্থাপন করেছেন। একই সাথে বৈদিক সমাজ বিদ্বান ও ধীমান ব্যক্তিদের এই দায়িত্ব দিয়েছে যেন তাঁরা সমাজে প্রচলিত যাবতীয় অপকর্ম ও কুযুক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ঋতম্ভরা প্রজ্ঞা বা পরম সত্যের শস্যকে প্রকাশ করেন। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব, বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রের আলোকে কীভাবে মিথ্যার কঠোর খণ্ডন ও অবিনশ্বর সত্যের শাশ্বত প্রচারের মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।
দৃষ্ট্বা রূপে ব্যাকরোৎ সত্যানৃতে প্রজাপতিঃ।
অশ্রদ্ধামনৃতেঽদধাচ্ছ্রদ্ধাং সত্যে প্রজাপতিঃ।
ঋতেন সত্যমিন্দ্রিয়ং বিপানং শুক্রমন্ধসঽইন্দ্রস্যেন্দ্রিয়মিদং পয়োঽমৃতং মধু ॥
যজুর্বেদ ১৯.৭৭
→ সৃষ্টির অস্তিত্বের দুটি দিক প্রত্যক্ষ করে পরমেশ্বর প্রজাপতি একে দুটি রূপে বিশ্লেষণ করেছেন- একটি হলো বাস্তবতা, সত্য ও ধর্ম; অন্যটি হলো অবাস্তবতা, মিথ্যা ও অধর্ম। অতঃপর প্রজাপতি সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা স্থাপন করেছেন এবং মিথ্যার প্রতি অশ্রদ্ধা ও অনীহা যুক্ত করেছেন। সত্য ও শ্রদ্ধার সাথে তিনি ঋতম্ভরা প্রজ্ঞা (যা পরম সত্যকে ধারণ করে) যুক্ত করেছেন, যা অবিদ্যার অন্ধকার থেকে রক্ষাকারী, পবিত্রকারী এবং আলোকদানকারী ঈশ্বরের এক পরম অনুকম্পা ও আশীর্বাদ। আর এটিই হলো আত্মার প্রকৃত শক্তি ও অনুষঙ্গ, যা অমৃতের মধুর স্বাদ ও দুগ্ধধারার মতো অমরত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অভিনক্ষন্তো অভি যে তমানশুর্নিধিং পণীনাং পরমং গুহা হিতম্ ।
তে বিদ্বাংসঃ প্রতিচক্ষ্যানৃতা পুনর্যত উ আয়ন্তদুদীয়ুরাবিশম্ ॥
ঋগ্বেদ ২.২৪.৬
→ সেই সমস্ত বিদ্বান ব্যক্তি, যাঁরা সব দিক থেকে জ্ঞানবান, তাঁরা মানবজাতির জ্ঞানের ভাণ্ডারকে খুব কাছ থেকে লাভ করেন। সেই বিদ্বান ব্যক্তিরাই আবার অন্যদের মিথ্যা ভাষণ ও অন্যান্য অপকর্ম সরাসরি খণ্ডন করার জন্য, অথবা আপনারা যে বিষয়ের প্রতি অনুরাগী, তা অর্জন বা প্রচার করার জন্য কাজ করেন।
অসৌ যঃ পন্থা আদিত্যো দিবি প্রবাচ্যং কৃতঃ ।
ন স দেবা অতিক্রমে তং মর্তাসো ন পশ্যথ বিত্তং মে অস্য রোদসী ॥
ঋগ্বেদ ১.১০৫.১৬
→ সেটিই সেই পথ, যা দ্যুলোকে সূর্যের মতো দীপ্তিময় ও মহিমান্বিত, সনাতন ও অবিনশ্বর, নিত্য জ্ঞান বেদের আলোয় নির্মিত, যা ধ্যান করার, বলার এবং অনুসরণ করার যোগ্য। প্রকৃতির বা মানবজাতির মহানতম কেউও এটিকে অতিক্রম করতে বা লঙ্ঘন করতে পারে না। হে মরণশীল নর-নারীগণ! তোমরা এটি দেখতে পাও না। আমি প্রার্থনা করি, দ্যুলোক ও পৃথিবী অর্থাৎ সকলেই যেন এটি জানতে পারে এবং তোমাদের ও আমার কাছে তা প্রকাশ করে।
ইন্দ্র ইদ্ধর্যোঃ সচা সম্মিশ্ল আ বচোয়ুজা ।
ইন্দ্রো বজ্রী হিরণ্যয়ঃ ॥
সামবেদ ৭৯৭
→ দেহের অধিষ্ঠাতা জীবাত্মাই তার নিজের আজ্ঞাধীন জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়সমূহকে একত্রে জ্ঞান ও কর্মের সাথে যুক্ত করেন। সেই জীবাত্মা বাণী রূপ বজ্রধারক এবং প্রাণময়, জ্যোতির্ময় ও কীর্তিময়।
অর্থাৎ, যে জীবাত্মার প্রেরণায় জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়সমূহ নিজ নিজ কার্যে নিযুক্ত হয়; যে জীবাত্মা বাণী রূপ বজ্রের [ঐ০ ব্রা০ ৪।১] দ্বারা কুতার্কিকদের কুতর্ক খণ্ডন করে; এবং যিনি প্রাণসমূহের অধিষ্ঠাতা, তেজস্বী ও যশস্বী—তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে সকল মানুষ যেন নিজেদের অভীষ্ট (কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য) সিদ্ধ করে।
যুবং বস্ত্রাণি পীবসা বসাথে যুবোরচ্ছিদ্রা মন্তবো হ সর্গাঃ ।
অবাতিরতমনৃতানি বিশ্ব ঋতেন মিত্রাবরুণা সচেথে ॥
ঋগ্বেদ ১.১৫২.১
→ হে প্রাণ ও উদানের মতো বিরাজমান অধ্যাপক ও উপদেষ্টাগণ! আপনারা আপনাদের স্থূল শরীরকে আচ্ছাদনকারী বস্ত্র দ্বারা নিজেদের শরীরকে আবৃত করেন। আপনাদের স্বভাব ত্রুটিহীন এবং আপনারা সৃষ্ট সকল বস্তুর প্রকৃত রূপ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত। আপনারা সমস্ত মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ বা দূর করেন এবং আমাদের সত্যের সাথে যুক্ত করেন। অতএব, আমরা কেন আপনাদের সম্মান করব না? (অর্থাৎ, আপনারা অবশ্যই আমাদের পরম পূজনীয়)।
সক্তুমিব তিতউনা পুনন্তো যত্র ধীরা মনসা বাচমক্রত ।
অত্রা সখায়ঃ সখ্যানি জানতে ভদ্রৈষাং লক্ষ্মীর্নিহিতাধি বাচি ॥
ঋগ্বেদ ১০.৭১.২
→ ধৈর্যশীল ও স্বচ্ছ মনের ঋষিগণ যখন তাঁদের চিন্তা ও সাধনার দ্বারা দিব্য বেদবাণীকে ধারণ করেন, দর্শন করেন এবং প্রকাশ করেন, এবং লৌকিক বৈচিত্র্যের তুষ থেকে সত্যের শস্যকে আলাদা করে সেই বাণীকে পবিত্রতার রূপ দান করেন, তখন বন্ধু ও সহযোদ্ধারা সেই ধারণা, শব্দ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে শব্দ ও অর্থের মিলনকে জানতে পারেন; আর তখনই ঋষির ভাষার গভীরতা থেকে তাঁদের সেই মহৎ ও পবিত্র জ্ঞান প্রকাশিত ও গৃহীত হয়।
বৈদিক সংহিতার মন্ত্রসমূহের পর উপনিষদ ভাগে এসে সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি আরও গভীর চিন্তন ও মননশীলতায় রূপ নেয়। সনাতন ঐতিহ্য কেবল শাস্ত্রবাক্যকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার কথা বলে না, বরং তাকে নিজের বুদ্ধিবৃত্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করার তাগিদ দেয়। বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই সুপ্রসিদ্ধ নির্দেশটি আমাদের শেখায় যে, পরম সত্যকে জানতে হলে কেবল শ্রবণ করাই যথেষ্ট নয়, তার পেছনে সুতীক্ষ্ণ যুক্তি ও মননের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম—
আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যঃ।
বৃহদারণ্যক ২.৪.৫
= আত্মতত্ত্ব দ্রষ্টব্য, শ্রোতব্য, মন্তব্য ও নিদিধ্যাসসিতব্য। অর্থাৎ, এই আত্মতত্ত্ব [পরমাত্মা ও জীবাত্মা সম্পর্কিত জ্ঞান] জ্ঞানদৃষ্টিতে দর্শনীয়, আচার্য-শাস্ত্রমুখে শ্রবণ করতে হবে, মনন = যুক্তি-তর্কে চিন্তা করতে হবে এবং নিরন্তর ধ্যান করতে হবে।
সনাতন দর্শনের ইতিহাসে মহর্ষি অক্ষপাদ গৌতমের ন্যায়দর্শন হলো কুতর্ক খণ্ডন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে সুসংগঠিত ও বৈজ্ঞানিক প্রণালী। সমাজ থেকে বিভ্রান্তি দূর করতে এবং পরম কল্যাণ বা মোক্ষ লাভ করতে হলে কোন কোন যৌক্তিক উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক, তা ন্যায়দর্শনের প্রথম সূত্রেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ষোলটি পদার্থের মাধ্যমে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে—
প্রমাণপ্রমেয়সংশয়প্রয়োজনদৃষ্টান্তসিদ্ধান্তাবয়বতর্কনির্ণয়বাদজল্পবিতণ্ডাহেত্বাভাসচ্ছলজাতিনিগ্রহস্থানানাম্ তত্ত্বজ্ঞানাৎ নিঃশ্রেয়সাধিগমঃ ॥
ন্যায়দর্শন ১.১.১
= প্রমাণ, প্রমেয়, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, সিদ্ধান্ত, অবয়ব, তর্ক, নির্ণয়, বাদ, জল্প, বিতণ্ডা, হেত্বাভাস, ছল, জাতি ও নিগ্রহস্থানের - এই ষোল প্রকার পদার্থের যথার্থজ্ঞানে নিঃশ্রেয়স অর্থা মোক্ষ লাভ হয়।
কূটাভাস ও কুতর্ক নয়, বরং সত্যনিষ্ঠ বিচারই যে সনাতন ধর্মের মূল সুর তা মহাভারতের কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিভেদকামী বা অহংকারী বিতণ্ডার ঊর্ধ্বে উঠে যেখানে কেবল তত্ত্ব ও সত্যকে জানার উদ্দেশ্যে আলোচনা করা হয়, সেই বিচারকে বিভূতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন—
বাদঃ প্রবদতামহম্
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৩২
= পারস্পারিক বিবাদসমূহের মধ্যে আমি (তত্ত্বনির্ণয়কারী) ‘বাদ’ হই।
সত্যকে জানার জন্য এবং কুতর্ককারীদের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে বিচারপদ্ধতিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ন্যায়দর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আলোচনার উদ্দেশ্য সবসময় এক থাকে না; কখনো তা হয় সত্য অন্বেষণের জন্য, কখনো কেবল জয়ের জন্য, আবার কখনো বা অন্যের মতকে ধ্বংস করার জন্য। এই মানসিকতার ওপর ভিত্তি করেই শাস্ত্রার্থের তিনটি প্রধান ধারা নির্ধারণ করা হয়েছে— ১. বাদ ২. জল্প ৩. বিতণ্ডা
১. বাদ: প্রমাণতর্কসাধনোপালম্ভঃ সিদ্ধান্তাবিরুদ্ধঃ পঞ্চাবয়বোপপন্নঃ পক্ষপ্রতিপক্ষপরিগ্রহো বাদঃ। [ন্যায় দর্শন ১।২।১]
অর্থ: সিদ্ধান্ত বা মূল সত্যের বিরোধ না করে, যথার্থ প্রমাণ ও তর্কের সাহায্যে নিজের পক্ষকে স্থাপন (সাধন) এবং বিপক্ষের যুক্তির খণ্ডন (উপালম্ভ) করার নাম 'বাদ'। এই ধরনের বিচার-আলোচনায় পক্ষ ও প্রতিপক্ষ উভয়েই নির্দিষ্ট পাঁচটি অবয়ব বা যুক্তির ধাপ অনুসরণ করে কথোপকথন বা শাস্ত্রার্থ করেন।
ন্যায় দর্শন (১।১।৩২) অনুযায়ী এই পাঁচটি অবয়ব হলো:
১. প্রতিজ্ঞা: যে বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে (সাধ্য)।
২. হেতু: প্রমাণের মূল কারণ বা যুক্তি (সাধন)।
৩. উদাহরণ: যুক্তির সপক্ষে বাস্তব ও সর্বসম্মত দৃষ্টান্ত।
৪. উপনয়: উদাহরণের সাথে আলোচ্য বিষয়টিকে যুক্ত করা বা তুলনা করা।
৫. নিগমন: পূর্ববর্তী ধাপগুলোর ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।
২. জল্প : যথোক্তোপপন্নশ্ছলজাতিনিগ্রহস্থানসাধনোপালম্ভো জল্পঃ। [ন্যায় দর্শন ১।২।২]
অর্থ: 'বাদ'-এর মতো সমস্ত নিয়ম ও অবয়ব ঠিক রেখেও, যখন সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে কেবল জয়লাভের উদ্দেশ্যে 'ছল', 'জাতি' এবং 'নিগ্রহস্থান' প্রয়োগ করে বিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন বা নিজের পক্ষ মণ্ডন করা হয়, তখন তাকে 'জল্প' বলে।
জল্প-এর প্রধান উপাদানসমূহ:
ছল: বচনবিঘাতোঽর্থবিকল্পোপপত্যা ছলম্। [ন্যায় দর্শন ১।২।১০] = বক্তা যে অর্থে কথাটি বলেছেন, তা জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন অর্থ কল্পনা করে বক্তার পক্ষে আক্ষেপ বা দোষ খোঁজা হলো ছল। এটি বাক ছল, উপচার ছল ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।
জাতি: সাধর্ম্যবৈধম্যাভ্যাং প্রত্যবস্থানং জাতিঃ। [ন্যায় দর্শন ১।২।১৮] = কেবল সাদৃশ্য (সাধর্ম্য) বা বৈসাদৃশ্যের (বৈধর্ম্য) ওপর ভিত্তি করে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়াই বিপক্ষকে আক্রমণ বা বিবাদ করা হলো জাতি। এটি মূলত শাস্ত্রীয় নিয়মের উপেক্ষা করা।
নিগ্রহস্থান: বিপ্রতিপত্তিরপ্রতিপত্তিশ্চ নিগ্রহস্থানম্। [ন্যায় দর্শন ১।২।২০] = অভিমত বিপরীত, অবাঞ্ছনীয় কথাবার্তা বা অজ্ঞানতার কারণে খণ্ডন-মণ্ডন ব্যতীত নীরবতাই হলো নিগ্রহস্থান (পরাজয়ের স্থান)।
'জাতি' এবং 'নিগ্রহস্থান' অনেক প্রকারের হয়ে থাকে।
হেত্বাভাস (ভ্রান্ত হেতু বা হেতুর মতো আভাস): সব্যভিচারবিরুদ্ধপ্রকরণসমসাধ্যসমকালাতীতা হেত্বাভাসাঃ। [ন্যায় দর্শন ১।২।৪]
অর্থ: যা আসলে প্রকৃত হেতু বা যুক্তি নয়, কিন্তু দেখতে যুক্তির মতো মনে হয়, তা-ই হেত্বাভাস। এগুলো ৫ প্রকার:
১. সব্যভিচার (অনৈকান্তিক বা ব্যভিচারী হেতু)
২. বিরুদ্ধ (যা সিদ্ধান্তের বিপরীত কথা বলে)
৩. প্রকরণসম (যা সংশয় দূর না করে উল্টো সংশয় বাড়ায়)
৪. সাধ্যসম (যা নিজেই অপ্রমাণিত এবং প্রমাণের অপেক্ষা রাখে)
৫. কালাতীত (সময় পেরিয়ে যাওয়া বা নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে অনুপযুক্ত হেতু)
৩. বিতণ্ডা: স প্রতিপক্ষস্থাপনাহীনো বিতণ্ডা। [ন্যায় দর্শন ১।২।৩]
অর্থ: যে বিচারে নিজের কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ বা সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা থাকে না, বরং কোনো যুক্তি ছাড়াই কেবল বিপক্ষের মত বা সিদ্ধান্তকে আক্রমণ ও খণ্ডন করা হয়, তাকে 'বিতণ্ডা' বলে।
সমগ্র আলোচনা পর্যালোচনা করলে এটি সুষ্পষ্ট হয় যে, সনাতন বৈদিক ধারা কোনো অন্ধ বিশ্বাসের পথ নয়, বরং তা যুক্তি, প্রজ্ঞা এবং সত্যনিষ্ঠার এক চিরন্তন বিজ্ঞান। বৈদিক দর্শন আমাদের শেখায় যে, অবিদ্যা ও মিথ্যার কুয়াশা ভেদ করার জন্য মানুষের বাণীকে হতে হবে বজ্রের মতো দীপ্তিময়, যা সমাজে প্রচলিত যাবতীয় কুতর্ক ও অপকর্মকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবে। ধীর ও স্বচ্ছ মনের ঋষিগণ যেভাবে তুষ থেকে শস্য আলাদা করার মতো করে লৌকিক বৈচিত্র্যের মাঝ থেকে পবিত্র জ্ঞানকে ছেঁকে তোলেন, সেই ধারাকেই পরবর্তীতে উপনিষদ ও দর্শন শাস্ত্রসমূহ আরও প্রণালীবদ্ধ রূপ দিয়েছে। বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই শাশ্বত নির্দেশ—আত্মতত্ত্বকে কেবল শ্রবণ নয়, বরং যুক্তি-তর্কের (মনন) মাধ্যমে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে—প্রমাণ করে যে সনাতন ধর্মে অন্ধ অনুকরণের কোনো স্থান নেই।
সত্যের এই অনুসন্ধানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে মহর্ষি গৌতমের ন্যায়দর্শন। সেখানে কেবল সত্য প্রচারের কথাই বলা হয়নি, বরং ‘বাদ’, ‘জল্প’ এবং ‘বিতণ্ডা’র মতো বিচারপদ্ধতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে কুতর্ক খণ্ডনের অকাট্য নিয়মাবলি তৈরি করা হয়েছে। ‘প্রতিজ্ঞা’ থেকে ‘নিগমন’ পর্যন্ত পাঁচটি যৌক্তিক ধাপ বা অবয়বের মাধ্যমে তত্ত্বনির্ণয় করার যে বিধান শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে, তা খণ্ডন-মণ্ডনের এক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক রূপ। একই সাথে, কেবল জয়লাভের উদ্দেশ্যে করা ‘ছল’, ‘জাতি’, ‘নিগ্রহস্থান’ কিংবা ভ্রান্ত হেতুরূপ ‘হেত্বাভাস’কে চিহ্নিত করে শাস্ত্রে কুতর্ককারীদের মুখোশ খুলে দেওয়ার অস্ত্রও তুলে দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যখন ঘোষণা করেন, "পারস্পরিক বিবাদসমূহের মধ্যে আমি তত্ত্বনির্ণয়কারী ‘বাদ’"—তখন তা সত্য প্রতিষ্ঠার এই বিচারপ্রক্রিয়াকে পরম ঐশ্বরিক মর্যাদায় ভূষিত করে।
সূর্যের মতো দীপ্তিময় ও অবিনশ্বর যে সত্যের পথ বেদে নির্মিত হয়েছে, তাকে জীবনের ধেয় ও অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করাই মানুষের প্রকৃত পুরুষার্থ। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কেবল কূটতর্ক বা বিতণ্ডা করা বৈদিক সদাচারের পরিপন্থী। অতএব, আজকের বিভ্রান্তিময় ও অপপ্রচারে ভরা পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বৈদিক চেতনার এই মূল ভাবধারা—অর্থাৎ জবরদস্তিমূলক ও কপট মিথ্যার সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক খণ্ডন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে যুক্তিভিত্তিক পরম সত্যের নিঃশঙ্ক প্রকাশ ও প্রচার—আমাদের এক প্রবুদ্ধ, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রকৃত জ্ঞানালোকিত সমাজ গঠনের চিরন্তন দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
