✅ অগ্নিবীর কী ❓ বৈদিক স্বরূপ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ - অগ্নিবীর

✅ অগ্নিবীর কী ❓ বৈদিক স্বরূপ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ

Share This

 


বাংলাদেশ অগ্নিবীরের নামকরণ সম্পর্কে প্রশ্ন এবং আগ্রহ বহুদিনের । অগ্নিবীর শব্দটি মূলতঃ যজুর্বেদের ১৫তম অধ্যায়ের ৫২ ক্রমিক সংখ্যক পরমেষ্ঠি ঋষি দৃষ্ট নিচৃদার্ষী ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ ও ধৈবত স্বর বিশিষ্ট অগ্নিদেবতা সূচক মন্ত্রের "অয়মগ্নির্বীরতমো" থেকে অনুপ্রাণিত ।

অয়মগ্নির্বীরতমো বয়োধাঃ সহস্রিয়ো দ্যোততামপ্রয়ুচ্ছন্ ।
বিভ্রাজমানঃ সরিরস্য মধ্যঽউপপ্রয়াহি দিব্যানি ধাম ॥
যজুর্বেদ ১৫।৫২

  • আধিভৌতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রেরণার্থে -
যে ( প্রথম ) এই ( বীরতমঃ ) স্বীয় বল দ্বারা শত্রুদের বলের উপর অধিকারী , ( বয়োধাঃ) সর্ব জীবনধারক , ( সহস্রিয়ঃ ) সহস্র = অসংখ্য যোদ্ধার সমতুল্য, (সরিরস্য) অন্তরিক্ষ মধ্যে (বিভ্রা জমানঃ) বিশেষরূপে বিদ্যা ও ন্যায় দ্বারা দেদীপ্যমান, (অপ্রয়ুচ্ছন্ ) প্রমাদরহিত (অগ্নিঃ ) অগ্নির ন্যায় তেজস্বী সেনাপতি বিদ্যমান রয়েছে, সে ( দ্যোততাম্ ) সর্বত্র প্রকাশিত হোক (দিব্যানি ) ; প্রকাশযুক্ত (ধাম) জন্ম, কর্ম ও স্থানকে তুমি ( উপপ্রয়াহি) লাভ করো ।
ভাবার্থঃ মানব ধার্মিকদের সাথে থেকে সৎসঙ্গ করে , প্রমাদ ত্যাগ করে জিতেন্দ্রিয় হয়ে জীবনায়ু বৃদ্ধি করে , বিদ্যা ও ধর্মাচরণ দ্বারা পবিত্র হয়ে পরোপকারী হবে ।
[ ভাষ্যকারঃ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ]

  • আধ্যাত্মিক অর্থে -

১। অয়ম্ অগ্নিঃ= এই শত্রুদাহক প্রগতিশীল মানব - বীরতমঃ= সর্বোত্তম বীর । যে বাহ্য শত্রুদের জয় করেছে সে 'বীর' । যে নিজের শত্রু ও ভৌতিক কষ্টকে জয় করেছে সে 'বীরতর'। কামাদি অন্তঃশত্রুদের বিজেতাই হলো 'বীরতম' ।
২। বয়োধাঃ = বস্তুতঃ জীবনকে ধারণ এই মানবই করেছে , কামনাবাসনার ঊর্ধ্বে উত্থিত জীবনই তো প্রকৃত জীবন ।
৩। যহ সদা সহস্ত্রিয়ঃ = প্রফুল্লচিত্ত ও সদা প্রসন্ন (স+হস)।
৪। দ্যোততাম্= এই মানব জ্ঞানের জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মান ।
৫। অপ্রয়ুচ্ছন্ = স্বীয় কর্মে প্রমাদহীন
৬। সরিরস্য মধ্যে= পঞ্চকোশে স্থিত বিভ্রাজমানঃ= সেই কোশের শক্তি দ্বারা জ্বাজ্জল্যমান ।
৭। এই প্রকারের জীবনযুক্ত অগ্রণী হে মানব , তুমি 'দিব্যানি ধাম'= দৈবীগুণ সম্পন্ন অবস্থা 'উপ প্রয়াহি' = লাভ করো । এভাবে জীবনকে গড়ে তুলে তুমি সুখী জীবনধারণ ও মোক্ষলাভ করো ।

ভাবার্থঃ কামাদি শত্রু-বিজেতা অগ্নি অর্থাৎ অগ্রণী শত্রুনাশক বীরতম , উৎকৃষ্ট জীবনযুক্ত, প্রসন্ন, জ্ঞানী, অপ্রমত্ত মানবই উৎকৃষ্ট সুখ লাভ করে ।


  • অগ্নি শব্দের তাৎপর্য -
পারমার্থিক দৃষ্টিতে অগ্নি শব্দের মুখ্য অর্থ পরমাত্মা হয়ে থাকে। এই বিষয়ে প্রমাণও রয়েছে, 'যিনি বেদমন্ত্রসমূহের প্রতিপাদ্য পরমাত্মাকে জানেন না, তিনি বেদ মন্ত্র দ্বারা কি করবেন' ঋক০ ১।১৬৪।৩৯, 'একই পরমাত্মাকে জ্ঞানীজন অগ্নি, যম, মাতরিশ্বা প্রভৃতি অনেক নামে ডেকে থাকেন' ঋক০ ১।১৬৪।৪৬, 'সেই পরমাত্মার নাম অগ্নি, আদিত্য, বায়ু, চন্দ্রমা' যজু০ ৩২।১, 'ব্রহ্মই অগ্নি' শত০ ১।৪।২।১১ প্রভৃতি। পরমাত্মা ছাড়াও পরমার্থ বিষয়ে অগ্নি শব্দ দ্বারা আত্মা, মন, প্রাণ, বাণী প্রভৃতিও বাচ্যার্থ হতে পারে। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, 'আত্মাই অগ্নি' শত০ ৬।৭।১।২০, 'মনই অগ্নি' শত০ ১০।১।২।৩, 'প্রাণই অগ্নি' শত০ ৯।৫।১।৬৮, 'বাণীই অগ্নি' শত০ ৩।২।২।১৩। আর ব্যবহারিক দৃষ্টিতে পার্থিব অগ্নি, বিদ্যুৎ, সূর্য, বিদ্বান পুরুষ, রাজা, সেনাপতি প্রভৃতি অগ্নি শব্দের বাচ্যার্থ হয়ে থাকে।

♨️ যাস্কাচার্য নিরুক্ত (৭।১৪) তে যে নির্বচন দেখিয়েছেন, সেই অনুসারে অগ্নি শব্দ 'অগ্র-নী' যা 'অংগ-নী' দ্বারা নিষ্পন্ন হয়। পরমাত্মার নাম অগ্নি এই কারণে যে তিনি উপাসকদের অগ্র-নী অর্থাৎ অগ্র-নায়ক অথবা পথপ্রদর্শক হন এবং তিনি অগ্নিহোত্র থেকে অশ্বমেধ পর্যন্ত যজ্ঞসমূহে অথবা অধ্যয়ন-অধ্যাপনরূপ যজ্ঞসমূহে অথবা সর্বজনীন, কূপ, হ্রদ, উদ্যান, চিকিৎসালয় প্রভৃতির নির্মাণরূপ যজ্ঞসমূহে তথা অন্য পরোপকার যজ্ঞসমূহে আদর্শরূপে সকলকে সম্মুখে নিয়ে যান (অগ্র-নী)। তিনি যে উপাসকের অনুকূল হন, তাকেই নিজের আশ্রয়রূপ কোলে নিয়ে নেন (অংগ-নী)। নিরুক্ত অনুসারে স্থৌলাষ্টীবি আচার্য 'ন'-পূর্বক সিক্তকারী অর্থসম্পন্ন ক্নূয়ী ধাতু দ্বারা অগ্নি শব্দর সিদ্ধি করেন। যিনি দুঃখ-দ্রব্য দ্বারা অথবা পাপ-পঙ্ক দ্বারা নিজের উপাসককে সিক্ত হতে দেন না, সেই পরমাত্মার নাম অগ্নি (ন-ক্নি = অগ্নি)। নিরুক্ততে উদ্ধৃত শাকপূণি আচার্যের মতানুসারে অগ্নি শব্দ তিন ধাতু মিলে তৈরি হয়। অগ্নির অ গত্যর্থক ইণ্ ধাতুর 'অয়ন' থেকে নেয়া হয়েছে, ক্ অথবা গ্ মার্জন অর্থসম্পন্ন অজূ ধাতুর 'অক্ত' থেকে অথবা দাহার্থক 'দহ' ধাতুর 'দগ্ধ' থেকে নেয়া হয়েছে এবং নি নয়নার্থক নী (ণীঞ্ প্রাপণে) থেকে গৃহীত হয়েছে। পরমাত্মা অগ্নি এই কারণে যে, তিনি নিজের উপাসককে উন্নত করার জন্য গতিশীল বা সক্রিয় হন, উপাসকের হৃদয়কে মার্জন করে স্বচ্ছ করে দেন, হৃদয়-স্থিত মালিন্যকে দগ্ধ করেন এবং উপাসককে তিনি নির্ধারিত লক্ষ্য মোক্ষে পৌঁছিয়ে দেন।

♨️ উণাদি প্রক্রিয়া অনুসারে অগ্নি শব্দের সিদ্ধি গত্যর্থক 'অগি' ধাতু থেকে হয়ে থাকে। গতির তিনটি অর্থ হয়- জ্ঞান, গমন ও প্রাপ্তি। যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বগত অর্থাৎ সর্বব্যাপক এবং নিজের উপাসক দ্বারা প্রাপ্ত হন, সেই পরমাত্মার নাম অগ্নি। পরমাত্মাকে অগ্নি একটি অন্য কারণেও বলা যায়। পার্থিব অগ্নি, বিদ্যুৎরূপ অগ্নি এবং সূর্যরূপ অগ্নির ন্যায় প্রকাশমান এবং প্রকাশক হওয়ার কারণে রূপকাতিশয়োক্তি অলংকারের আশ্রয় নিয়ে তাঁকে সাক্ষাৎ অগ্নিই বলা হয়। অগ্নির কর্ম বর্ণনা করতে গিয়ে নিরুক্তকার বলেছেন, "অগ্নি হবিসমূহকে বহন করেন, দেবতাদের আবাহন করেন এবং যে দর্শনবিষয়ক প্রকাশ প্রদান প্রভৃতি কর্ম রয়েছে সেগুলোও অগ্নিরই (নিরু০ ৭।৮)।" যজ্ঞাগ্নির ন্যায় পরমাত্মারূপ অগ্নিও এই কার্যসমূহ করেন। তিনি অধ্যাত্ম যাজ্ঞিকদের দ্বারা হবিরূপে সমর্পিত সকল জ্ঞান, কর্ম প্রভৃতিকে তথা বাক, চক্ষু, শ্রোত্র, প্রাণ, মন, বুদ্ধি প্রভৃতিকে বহন অর্থাৎ স্বীকার করেন; হৃদয়রূপ যজ্ঞস্থলে দেব অর্থাৎ দিব্য গুণের আবাহন করেন এবং মনের তামসিকতার নিবারণ করে প্রকাশদৃষ্টি প্রদান করেন। এই কারণে অগ্নি নাম দ্বারা পরমাত্মা চিন্তন যোগ সাধকের জন্য মহান কল্যাণকারী হয়ে থাকে। এজন্য আগ্নেয় পর্বে পরমাত্মার অগ্নি নাম দ্বারা ধ্যান করা হয়েছে।
['অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ভবতি। অগ্রং য়জ্ঞেষু প্রণীয়তে৷ অঙ্গং নয়তি সন্নমমানঃ। অক্নোপনো ভবতীতি স্থৌলাষ্ঠীবিঃ। ন ক্নোপয়তি। ন স্নেহয়তি। ত্রিভ্যঃ আখ্যাতেভ্যঃ জায়ত ইতি শাকপূণিঃ' নিরু০ ৭।১৪; 'অগ্নির্বৈ সর্বেষা দেবানামাত্মা' শত০ ১৪।৩।২।৫; 'অগ্নির্বৈ দেবতানা মুখ প্রজনয়িতা স প্রজাপতি' শত০ ৩।৯।১।৬; 'অগ্নিরেব ব্রহ্ম অগ্নির্বৈ' শত০ ১০।৪।১।৫; 'অমৃতো হ্যগ্নি' শত০ ১।৯।২।২০; 'অগ্নির্বৈ ধর্ম' শত০ ১১।৬।২।২; 'অগ্নির্বৈদ্রষ্টা' গো০ ব্রা০ উ০ ২।১৯; 'প্রজাপতিরগ্নি' শত০ ৬।২।১।২৩; 'অগ্নির্বৈ য়জ্ঞ' শত০ ৩।৪।৩।১৯] !

♨️ বিদ্বানকেও অগ্নি বলা হয়। এই বিষয়ে ''বিদ্বানই অগ্নি, যিনি ঋতের সংগ্রাহক এবং সত্যময় হয়ে থাকেন।’ [ঋক০ ১।১৪৫।৫], 'বিদ্বানই অগ্নি, যিনি বল প্রদান করে থাকেন।’ [ঋক০ ৩।২৫।২] ইত্যাদি মন্ত্র প্রমাণ রয়েছে। রাজাকেও অগ্নি বলা হয়। এই বিষয়ে 'হে অগ্নি! তুমি প্রজাপালক, উত্তম দাতা প্রজাদের রাষ্ট্ররূপ গৃহকে রাজা রূপে অলঙ্কৃত করো।’ [ঋক০ ২।১।৮]; 'রাজাই অগ্নি, যিনি রাষ্ট্ররূপ গৃহের অধিপতি এবং রাষ্ট্রযজ্ঞের ঋত্বিক হয়ে থাকেন।’ [ঋক০ ৬।১৫।১৩] ইত্যাদি প্রমাণ রয়েছে

✅ এজন্যই বাংলাদেশ অগ্নিবীর " অগ্নিবীর " শব্দটি বেদোক্ত অগ্নির ন্যায় শত্রুদাহক, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ শত্রু বিদারক , প্রগতিশীল, তেজস্বী হিসেবে নিজেদের ও সবাইকে গড়ে তুলতে চায় । বাংলাদেশ অগ্নিবীরের নামকরণের পেছনে এই বৈদিক মন্ত্রটির অনুপ্রেরণাই মূলত কাজ করেছে ।



বাংলাদেশ অগ্নিবীর 

No comments:

Post a Comment

Pages