পরমেশ্বর কেন নিরাকার ? - অগ্নিবীর

পরমেশ্বর কেন নিরাকার ?

Share This

 


নিরাকারবাদ সনাতনধর্মের অনন্যতা। সনাতনধর্ম ব্যতিত পৃথিবীর আর কোনো ধর্মবিশ্বাসেই নিরাকারবাদ বলতে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। ইসলাম অনুসারে সৃষ্টিকর্তা তার নীজ আকৃতিতেই পৃথিবীর প্রথম মানবকে সৃষ্টি করেছেন। বাইবেলেও প্রায় অনুরূপ বর্ণনা বিদ্যমান। কিন্তু একমাত্র সনাতনধর্মেই বলা হচ্ছে পরমাত্মা "অকায়েম্" অর্থাৎ শরীররহিত বা নিরাকার [যজুর্বেদ ৪০|৮]। কিন্তু সনাতনধর্মে বর্ণিত এই নিরাকারবাদের যৌক্তিকতা কি? সাকারবাদের ভুলগুলো কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়েই নীচে আলোচনার চেষ্টা করব।
১) সনাতনধর্মে পরমাত্মা অসীম (সাম ৩৩৫), অনন্ত (ঋক্ ৪|১|৭)। অসীম অর্থাৎ কোনো সীমা যাকে বাঁধতে পারেনা, অনন্ত অর্থাৎ কোনো অন্তই যার ব্যাপ্তিকে সমাপ্ত করতে পারেনা। এমন কোন শরীর, কোন আকার রয়েছে যা পরমাত্মার সেই অসীম স্বরূপকে নীজের মধ্যে ধারণ করবে?
 
২) তাই অসীম বা অনন্ত কোন সত্ত্বা কখনোই কোনো আকার বা শরীরযুক্ত কিছু হতে পারেনা। আপনি যখন পরমাত্মাকে কোনো আকার দিলেন আপনি মূলত সেই আকারের মধ্যেই তাকে সীমাবদ্ধ করে দিলেন। অসীম পরমাত্মাকে কি কখনোই একটা মানবাকৃতি বা অন্য যেকোনো আকার দিয়ে ব্যক্ত করা সম্ভব? কোনোকিছুর আকার আছে মানেইত তার একটা সীমনা বা বাউন্ডারি আছে। বস্তুত পরমাত্মা আপনার কল্পিত সেই আকার ও তার বাহিরেও যেই অন্তহীন ব্রহ্মান্ড সমস্তই পূর্ণ করে আছেন। তাহলে আপনার সেই কল্পিত মানবাকৃতিটুকুতেই কেন কেবল ঈশ্বর-বুদ্ধি হবে? যারা এরূপ বিশেষ আকৃতি বা রূপেই পরমাত্মাকে দেখে তাদের বিষয়ে উপনিষদে এসেছে, 
 
যদ্ এবেহ তদ্ অমুত্র যদ্ অমুত্র তদন্বিহ।
মৃত্যো স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানেব পশ্যতি।।
[কঠোপনিষদ ২|১|১০]
(যৎ) যেই ব্রহ্ম (ইহ) এখানে (তৎ এব) সেই ব্রহ্মই (অমুত্র) ওখানেও (যৎ) যেই ব্রহ্ম (অমুত্র) ওখানে (তৎ) সেই ব্রহ্ম (ইহ অনু) এখানেও একইভাবেই বিদ্যমান। (যঃ) যেই ব্যাক্তি (ইহ) এই ব্রহ্মতে (নানা ইব) নানাত্ব (পশ্যতি) দর্শন করে (সঃ) সে (মৃত্যোঃ) মৃত্যু হতে (মৃত্যুম্) মৃত্যুকে (আপ্নোতি) প্রাপ্ত হয়। 
 
তিনি যে কোনো আকৃতি, প্রতিমা বা স্থানেই বিশেষভাবে বিদ্যমান আছেন এমনটা নয়। তিনি নিখিল ব্রহ্মান্ড ও তার পরেও যাকিছু সমস্ততেই এক অদ্বিতীয় স্বরূপে পূর্ণ হয়ে আছেন। যারা কোনো বিশেষ আকৃতি, প্রতিমা বা স্থানেই কেবল তাকে দর্শন করার চেষ্টা করে তারা সেই পরমাত্মার প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারেনা এবং সেই অজ্ঞানতাবশত মৃত্যু হতে মৃত্যুকে অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর এই সংসারচক্রে আবদ্ধ হয়ে থাকে। 
 
৩) পদার্থ বা আকারের সংজ্ঞাই হলো যা স্থান বা আয়তন দখল করে। কোনো পদার্থ বা আকার সামগ্রিকভাবে যেই স্থান দখল করে সেই স্থানে অন্য কোনো পদার্থ বা আকার উপস্থিতি থাকতে পারেনা। যেমন একটি ইলেকট্রন যেই পরিমাণ স্থান দখল করে সেই স্থানে অন্য একটি ইলেকট্রন বিদ্যমান থাকতে পারবেনা। অর্থাৎ একস্থানে দুইটি আকার কখনোই একইসাথে বিদ্যমান হতে পারেনা। কিন্তু হিন্দুদর্শনে পরমাত্মা সর্বত্র পূর্ণ। এই বিশ্বজগতের সমস্ত আকার যতটুকু স্থান দখল করে আছে এবং যতটুকু করে নেই উভয়তেই পরমাত্মা পূর্ণ হয়ে আছেন।
 
তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহতঃ।[যজু ৪০|৫]
(তত্) সেই ব্রহ্ম (অস্য সর্বস্য) এই সমস্তকিছুর (অন্তঃ) ভেতরে (তত্ উ) সেই ব্রহ্মই (সর্বস্যাস্য) এই সমস্তকিছুর (বাহতঃ) বাহিরে।
 
তাই সর্বত্র পূর্ণ সেই পরমাত্মা যদি স্বয়ং আকারযুক্ত কিছু হতেন তাহলে এই জগতের সমস্ত আকারের মধ্যে তিনি পূর্ণ হতে পারতেন না। তিনি নিরাকার, জড়জগতের অতীত বলেই সমস্ত আকারের মধ্যে পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত হয়ে তা অতিক্রম করেও বিদ্যমান আছেন। 
 
তাই বেদে বলা হচ্ছে,
 
প্রজাপতে ন ত্বদেতান্যন্যো বিশ্বা জাতানি পরি তা বভূব।
[ঋগ্বেদ ১০|১২১|১০]
(প্রজাপতে) হে সমস্ত জীবের অধিপতি, (ত্বত্ অন্য) আপনি ভিন্ন দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা (তা এতানি বিশ্বা জাতানি) এই সমস্ত সৃষ্টিকে (ন পরি বভূব) পরিব্যাপ্ত করে নেই। 
 
৪) আকারত হয় এই জড়জগতের বা জড়জাগতিক বস্তুসমূহের। আকার জড়জাগতিক বস্তুসমূহেরই ধর্ম। হিন্দুদর্শনে পরমেশ্বর জড়জাগতিক কোনো সত্তা নন। তিনি এই সমস্ত জড়জগতেরই অতীত। দেবীসুক্তে পরমাত্মা বলছেন, "আরভামাণা ভুবনানি বিশ্বা। পরো দিবা পর এনা পৃথিব্যা। [ঋগ্বেদ ১০|১২৫|৮] অর্থাৎ আমিই নিখিল জগতের নির্মাণ করি। আমি আকাশের অতীত, এই পৃথিবীর অতীত। " তার সদৃশ কিছু না আছে পৃথিবীতে, না আছে আকাশে। না জন্মেছে, না জন্মাবে [ঋগ্বেদ ৭|৩২|২৩]।
অতএব জড়জগতের অতীত সেই অনন্ত অপার পরব্রহ্মকে আমরা কেন জড়জগতিক কোনো বস্তুর ন্যায় আকার-আকৃতিযুক্ত কোনো সত্তারূপে চিন্তন করব? 
 
উপনিষদে স্বয়ং ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিগণের বর্ণনায়, 
 
ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগ্গচ্ছতি নো মনো ন বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাদন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি।
[কেনোপনিষদ ১|৩,৪]
(তত্র) সেই ব্রহ্মে (ন) না (চক্ষু) চক্ষু (গচ্ছতি) গমন করে (ন বাক্ গচ্ছতি) না বাক্ গমন করতে পারে (নো মনঃ) না মন। (ন বিদ্মঃ) আমরা সেই ব্রহ্মকে জানি না (যথা এতৎ অনুশিষ্যাৎ) যেই প্রকারে এই ব্রহ্মতত্ত্বের উপদেশ দিতে হয় (ন বিজানীমঃ) তাও আমরা জ্ঞাত নই। (তৎ) সেই ব্রহ্ম (বিদিতাৎ অন্যত্ এব) সমস্ত জ্ঞাত পদার্থ হতে বিলক্ষণ (অবিদিতাৎ অধি) আমাদের কাছে যা কিছু অজ্ঞাত সেই সমস্তকিছুরও অতীত। 
 
উপনিষদের উক্ত শ্লোকে বর্ণিত জ্ঞাত-অজ্ঞাত সমস্ত পদার্থের অতীত এই পরব্রহ্মকে কি একটা মানবাকৃতি বা অন্য যেকোনো আকৃতি দিয়ে ব্যক্ত করা যায়? 
 
তাই উপনিষদে যথার্থই বলা হয়েছে,
স বৃক্ষকালাকৃতিভিঃ পরোন্যো।
[শেতাশ্বতর ৬|৬]
(সঃ) তিনি (বৃক্ষাকালাকৃতিভিঃ) এই সংসারবৃক্ষ, কাল, আকৃতি আদি (পরঃ) এই সমস্তকিছুর অতীত (অন্যঃ) এই সমস্ত হতে বিলক্ষণ। 
 
৫) যদি ধরেও নিই পরমেশ্বর সাকার তাহলে প্রশ্ন আসে পরমেশ্বরের সেই আকার কি উপাদান দিয়ে গঠিত এবং সেই উপাদান কে সৃষ্টি করেছে? যদি পরমেশ্বর সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তা সৃষ্টি করার পূর্বে তিনি নিশ্চয়ই নিরাকার ছিলেন আর যদি অন্য কেউ সৃষ্টি করে থাকে তাহলে তিনি সৃষ্টিকর্তা নন। তাই আপনি যতই সাকারবাদের নাম দিয়ে নিরাকারবাদকে মিথ্যা বলুন না কেন সাকারবাদ মানলেও নিরাকারবাদকে একটা পর্যায় পর্যন্ত সত্য বলেই স্বীকার করতে হচ্ছে আপনাকে। 
 
৬) পরমাত্মা সর্বভূতেই প্রবিষ্ট হয়ে আছেন [যজু ৪০|৬], এই সমস্তকিছুর মধ্যেই সেই পরমাত্মা বিদ্যমান [যজু ৪০|৫]। তাই উপনিষদে বলা হচ্ছে, 
 
"পরমেশ্বর সমস্ত ভূতেই প্রবিষ্ট হয়ে আছেন, সমস্ত ভূতই তার শরীর। [বৃহদারণ্যক ৩|৭|১৫] " এভাবে বলা হচ্ছে, "পৃথিবী, অগ্নি, বায়ু, জল, অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, দিকসমূহ, আকাশ, অন্ধকার, তেজ সমস্তকিছুর মধ্যে তিনি বিদ্যমান। এই সমস্তকিছুই তার শরীর। [বৃহ ৩|৭|৩-১৪] "
 
অর্থাৎ নিখিল জগতে পূর্ণ অনন্ত অপার সেই পরব্রহ্মের যে বিশেষ কোনো আকার বা শরীর আছে এমনটা নয়। তার দ্বারা ব্যাপ্ত জগতের প্রতিটা বস্তুই তার শরীর, এই সমস্ত জগতই তার শরীর।
 
পবিত্র বেদেও একইভাবেই সেই নিরাকার পরমাত্মার স্বরূপ বর্ণনা করা হচ্ছে, 
 
যস্য ভূমিঃ প্রমান্তরিক্ষমুত্ উদরম্। দিবং যশ্চক্রে মূর্ধানং তস্মৈ জ্যষ্ঠায ব্রহ্মণে নমঃ॥
[অথর্ববেদ ১০|৭|৩২]
(ভূমিঃ) ভূমি (যস্য) যার (প্রমা) পাদমূল (উত) ও (অন্তরিক্ষম্) অন্তরিক্ষ (উদরম্) যার উদর (দিবম্) এই দ্যুলোক (মূর্ধানম্) যার মস্তক (যঃ চক্রে) যিনি একে রচনা করেছেন (তস্মৈ জ্যেষ্ঠায়) সেই সব থেকে মহান, ( ব্রহ্মণে) সব থেকে বিশাল পরমাত্মাকে (নমঃ) নমস্কার করি।
 
যস্য সূর্যশ্চক্ষুশ্চন্দ্রমাশ্চ পুনর্ণবঃ। অগ্নিং যশ্চক্র আস্যং তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ॥
[অথর্ববেদ ১০|৭|৩৩]
(পুনর্ণব) পুনঃপুনঃ নবীন (সূর্যঃ চ চন্দ্রমাঃ) এই সূর্য ও চন্দ্রমা (যস্য) যার (চক্ষুঃ) নয়ন। (অগ্নিম্) প্রকাশ (আস্যম্) যার বদন। (যঃ) যিনি (চক্রে) একে রচনা করেছেন। (তস্মৈ) সেই (জ্যেষ্ঠায়) সব থেকে মহান, (ব্রহ্মণে) সব থেকে বিশাল পরমাত্মাকে (নমঃ) নমস্কার করি।
 
অর্থাৎ এই সমস্ত জগৎ পরমাত্মারই, এই জগতের সমস্ত রূপের স্রষ্টা তিনিই, তাই জগতের সমস্ত রূপও তার। জগতের সমস্ত রূপের মধ্যে তিনি ব্যাপ্ত[ঋক্ ৯|২৫|৪]। বিশেষ কোনো আকার, শরীর বা রূপকেই পরমেশ্বররূপে কল্পনা করা ভ্রান্তমত ব্যতিত কিছুইনা। অসীম, নিরাকার বা কায়াহীন সেই পরমেশ্বর সমস্ত জগতে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন যেন এইসমস্ত জগতই তার শরীর। ওই সূর্য ও চন্দ্রমা যেন তারই দুইটি চোখ, দীপ্তি যেন তার বদন, দ্যূলোক তার মস্তক, অন্তরিক্ষ তার উদর, এই ভূমি যেন তারই পাদমূল। অর্থাৎ এই নিখিল জগতই তার রূপ এবং এইসমস্ত সৃষ্টির মধ্য দিয়েই রূপহীন তার রূপ ব্যক্ত হয়। সমস্ত জগতময় তার সেই বিশ্বরূপকে উপলব্ধি না করে যারা তাকে মানুষের মতো চোখ, মুখ, হাত-পা, আকৃতি দিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা করে তারা পরমেশ্বরের প্রকৃত স্বরূপকে জানতে পারেনা।

No comments:

Post a Comment

Pages