দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







'বেদব্রত-দীক্ষা' ~ কী, কেন, কীভাবে ?

সত্যান্বেষী
0

 

বেদব্রত-দীক্ষা : বেদানুকূল জীবনের প্রথম পদক্ষেপ

আজকের সমাজে অনেকেই বেদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখেন, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা জীবনের অভ্যাসে পরিণত হয় না। কেউ বেদের নাম শুনেছেন, কেউ কিছু মন্ত্র পড়েছেন, কিন্তু প্রতিদিনের আহার, উপাসনা, আচরণ ও কর্তব্যে বেদের আদর্শ প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের সামনে অনেকেই থমকে যান। ইচ্ছা আছে, পথ নেই। এই ফাঁক পূরণের জন্যই বেদব্রত-দীক্ষা। এটি একটি ছোট আনুষ্ঠানিক সূচনা, যার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ আচার্যের নির্দেশনায় নিজের জীবনকে ধাপে ধাপে বেদের অনুকূলে সাজাতে শুরু করেন। এই প্রবন্ধে বেদব্রত-দীক্ষা কী, তার শাস্ত্রীয় ভিত্তি, বর্তমান সমাজে তার প্রয়োজন, পূর্বপ্রস্তুতি এবং দীক্ষার পরের কর্তব্য আলোচনা করা হয়েছে।

১. বেদব্রত-দীক্ষা কী

নামটি তিনটি শব্দের সমন্বয়।

  • বেদ শব্দ এসেছে 'বিদ্' ধাতু থেকে, যার অর্থ জ্ঞান। এখানে এর অর্থ পরমেশ্বর-প্রদত্ত চার বেদের জ্ঞান।
  • ব্রত মানে কোনো উচ্চ লক্ষ্যের জন্য গৃহীত দৃঢ় সংকল্প, সংযম ও নিয়মনিষ্ঠা।
  • দীক্ষা মানে কোনো পবিত্র কর্মের জন্য নিজেকে সংকল্পবদ্ধ করা। এর ভাব হলো, যা পরমজ্ঞান দেয় এবং অজ্ঞতা ও কলুষতা ক্ষয় করে।

অতএব বেদব্রত-দীক্ষা হলো বেদের জ্ঞান অর্জন ও সেই অনুসারে জীবনযাপনের জন্য সংযম ও নিয়মের ব্রত গ্রহণ। এতে শিষ্য শুধু বই বা মন্ত্র পান না, বেদের আদর্শকে নিজের জীবনে রূপ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। জ্ঞানের উৎস (বেদ) ও তা অর্জনের জীবনচর্যা (ব্রত), এই দুইয়ের মিলনই এই দীক্ষার সার।

এর প্রধান উপাদান চারটি :

১. বেদজ্ঞ আচার্যের নির্দেশনায় দীক্ষা গ্রহণ।
২. আচার্যের কাছ থেকে একটি বেদমন্ত্রের উপদেশ পাওয়া এবং সেই মন্ত্রের শিক্ষার অনুকূলে চলার সংকল্প।
৩. ঈশ্বরের উপাসনা শুরু করা।
৪. ধীরে ধীরে বেদানুকূল জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা।

এটি কোনো সংস্কার নয়। আর্য পরম্পরায় জন্মের আগে থেকে মৃত্যুর পর পর্যন্ত ষোলোটি সংস্কার নির্ধারিত আছে, যার দশম সংস্কার উপনয়ন। বেদব্রত-দীক্ষা সেই ষোলোর বাইরের একটি সহায়ক পদক্ষেপ। এটি উপনয়নের বিকল্প নয়, আর দীক্ষা নিলেই উপনয়ন সম্পন্ন হয়ে যায় না। যাঁরা এখনও উপনয়নের জন্য প্রস্তুত নন, কিংবা কোনো কারণে উপনয়ন নিতে পারছেন না, তাঁরা যেন যথাসম্ভব শাস্ত্রীয় বিধি মেনে জীবন চালাতে পারেন, সে জন্যই এই দীক্ষা।

একটি উপমা দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। কেউ ম্যারাথন দৌড়াতে চাইলে প্রথম দিনেই বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দৌড়াতে পারেন না। আগে প্রতিদিন হাঁটেন, তারপর ধীরে দৌড়ান, তারপর দূরত্ব বাড়ান। বেদব্রত-দীক্ষা সেই প্রথম দিনের হাঁটা।

২. শাস্ত্রীয়তা : বেদ কী বলে

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ষোলো সংস্কারের তালিকায় যা নেই, তার কি বৈদিক ভিত্তি আছে? উত্তর হলো, ব্রত ও দীক্ষা বেদের নিজস্ব ধারণা, এবং বেদ বারবার এই দুইয়ের গুরুত্ব বলেছে।

ব্রত থেকে দীক্ষা, দীক্ষা থেকে সত্যপ্রাপ্তি। যজুর্বেদ (১৯।৩০) বলে :

ব্রতেন দীক্ষামাপ্নোতি দীক্ষয়াপ্নোতি দক্ষিণাম্।
দক্ষিণা শ্রদ্ধামাপ্নোতি শ্রদ্ধয়া সত্যমাপ্যতে॥

অর্থাৎ, ব্রত বা নিয়মনিষ্ঠার মাধ্যমে দীক্ষা লাভ হয়, দীক্ষার প্রভাবে সমাজে সম্মান ও সমৃদ্ধি আসে, তা থেকে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মে, আর শ্রদ্ধার মাধ্যমেই মানুষ সত্য লাভ করে। এখানে ব্রত দীক্ষার প্রথম ধাপ এবং সত্য শেষ গন্তব্য।

দীক্ষা পৃথিবীকে ধারণ করে। অথর্ববেদ (১২।১।১) বলে :

সত্যং বৃহদৃতমুগ্রং দীক্ষা তপো ব্রহ্ম যজ্ঞঃ পৃথিবীং ধারয়ন্তি।

অর্থাৎ সত্য, ঋত (সুশৃঙ্খল নিয়ম), দীক্ষা, তপ, ব্রহ্ম ও যজ্ঞ, এই ছয়টি নীতি পৃথিবীকে ধারণ করে। দীক্ষা এখানে সমাজ ও রাষ্ট্র-ধারণের একটি স্তম্ভ হিসেবে উল্লিখিত।

ঋষিদের পথও এটাই। অথর্ববেদ (১৯।৪১।১) বলে :

ভদ্রমিচ্ছন্ত ঋষয়ঃ স্বর্বিদস্তপো দীক্ষামুপনিষেদুরগ্রে।
ততো রাষ্ট্রং বলমোজশ্চ জাতং তদস্মৈ দেবা উপসংনমন্তু॥

অর্থাৎ, কল্যাণকামী জ্ঞানী ঋষিরা সর্বপ্রথমে তপ ও দীক্ষা অবলম্বন করেছিলেন, আর তার ফলেই রাষ্ট্র, বল ও ওজস্বিতা সিদ্ধ হয়েছিল।

এই মন্ত্রগুলো থেকে তিনটি শিক্ষা পাওয়া যায়। ব্রত মনকে সত্যের নিয়মে বাঁধার দৃঢ় সংকল্প। দীক্ষা আত্মশুদ্ধি ও বিদ্যাগ্রহণের শুভ সূচনা। আর তপ জীবনকে সংযমের আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করে তোলার প্রক্রিয়া। এই তিনটি কোনো অন্ধবিশ্বাস নয়, চরিত্র গড়ার এক সুস্পষ্ট পদ্ধতি।

বেদোক্ত দীক্ষার অর্থ ব্রত-সংকল্প ধারণ, তাই আচার্য-প্রদত্ত বিধি, নির্দেশ ও উপদেশ আপ্তপ্রমাণ হিসেবে স্বীকার করে পালন করা দীক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। আর "বেদবাক্যের মাধ্যমে শিষ্যত্ব গ্রহণ" বলতে বোঝায়, এই সম্পর্ক ব্যক্তিগত খেয়ালে নয়, বেদবাণীকে সাক্ষী রেখে গড়ে ওঠে। আচার্য এখানে নিজের কথা নয়, বেদের শিক্ষা বলেন; শিষ্য আচার্যের ব্যক্তিগত মত নয়, বেদের নির্দেশ গ্রহণ করেন।

৩. বর্তমান সমাজে কেন জরুরি

আজকের জীবনযাত্রা বৈদিক আদর্শ থেকে অনেক দূরে। আমাদের আহারে মাংস, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, অতিরিক্ত মশলা ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রাধান্য। দিন শুরু হয় মোবাইলের পর্দায়, শেষ হয় টেলিভিশনের পর্দায়। সন্ধ্যায় কী করতে হয় বা অগ্নিহোত্র কী, তা অনেকের কাছে অপরিচিত। এই পরিস্থিতিতে কাউকে যদি হঠাৎ বলা হয়, "কাল থেকে পূর্ণ বৈদিক জীবন যাপন করো", তিনি ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসবেন। এটা মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব।

কারণটা বোঝা কঠিন নয়। যে মানুষ বহু বছর রাত দুটোয় ঘুমিয়ে বেলা এগারোটায় ওঠেন, তাঁকে যদি এক রাতে বলা হয় "দশটায় ঘুমাও, চারটায় ওঠো", দু-তিন দিনেই তিনি পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাবেন। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে আধঘণ্টা করে এগোলে একদিন তিনি সত্যিই ভোরে উঠতে পারবেন। বেদব্রত-দীক্ষা ঠিক এই ধাপে ধাপে পরিবর্তনের পদ্ধতি।

এর আরও তিনটি কারণ আছে :

  • সংকল্পের শক্তি। মনে মনে করা সংকল্প ("কাল থেকে নিয়ম মানব") অধিকাংশ সময় কয়েকদিনেই ভুলে যাওয়া হয়, কারণ তার কোনো সাক্ষী বা দায়বদ্ধতা নেই। আচার্যের সামনে, ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে নেওয়া সংকল্প একটি জীবন্ত অঙ্গীকার হয়ে ওঠে। ওজন কমানোর ইচ্ছায় একজন যদি মনে মনে ভাবেন "কম খাব", আর অন্যজন প্রশিক্ষকের অধীনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেন, দ্বিতীয়জনের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখানে আচার্য সেই প্রশিক্ষক আর বেদমন্ত্র জীবনের পরিকল্পনা।
  • ভুল পথ থেকে সুরক্ষা। ভুল পদ্ধতিতে উপাসনা বা মন্ত্রোচ্চারণ কল্যাণের বদলে বিভ্রান্তি আনে। বই পড়ে সাঁতার শেখা যায় না, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের হাত ধরে জলে নামতে হয়।
  • উপনয়নের জন্য প্রস্তুতি। প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ উপনয়ন নিলে তার মর্যাদা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। যিনি সাত্ত্বিক আহারে অভ্যস্ত নন, পঞ্চমহাযজ্ঞের ধারণাই রাখেন না, তিনি উপনয়নের পরও নিয়ম পালন করতে পারবেন না।

৪. পূর্বপ্রস্তুতি

দীক্ষার আগে কিছু মানসিক ও ব্যবহারিক প্রস্তুতি নিতে হয়।

মানসিক প্রস্তুতি

  • দীক্ষাকে যাত্রার সূচনা বলে বুঝতে হবে, গন্তব্য নয়।
  • সংকল্প সাময়িক আবেগের বিষয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।
  • বিনয় ও শেখার আগ্রহ নিয়ে আচার্যের কাছে যেতে হবে। শ্রদ্ধার অর্থ বিচারবুদ্ধি ছেড়ে দেওয়া নয়, সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিনয়ের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ।

ব্যবহারিক প্রস্তুতি

  • একজন বেদজ্ঞ আচার্য নির্ধারণ করা।
  • নিজের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম-জাগরণ ও আচরণের কোন অভ্যাস বেদানুকূল জীবনের পথে বাধা, তা চিহ্নিত করা।
  • সাত্ত্বিক আহার, বেদপাঠ ও উপাসনার জন্য নির্দিষ্ট দিন ও সময় ঠিক করে রাখা।
  • আচার্যের কাছ থেকে সন্ধ্যোপাসনার পদ্ধতি, যজ্ঞের মন্ত্র ও নিত্যকর্মের নিয়ম শেখা।
  • আচার্য যে মন্ত্রের উপদেশ দেবেন, তার অর্থ বোঝার জন্য মনকে প্রস্তুত রাখা।

৫. দীক্ষার পরে পালনীয় কর্তব্য

দীক্ষার পর অনুশীলনের যাত্রা শুরু হয়। এই পর্বের মূল বিধিগুলো নিচে দেওয়া হলো।

ক. আহার ও সংযম

১. সপ্তাহে অন্তত দুইদিন নিয়ম করে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করতে হবে। ওই দিন মাংস, মাছ, ডিম, পেঁয়াজ ও রসুন বর্জন করে দুধ, ঘি, ফলমূল, শাকসবজি, ডাল ও শস্য খেতে হবে।
২. আহার, আচরণ ও দৈনন্দিন কাজে সচেতন থেকে আত্মসংযমের অনুশীলন করতে হবে।

খ. পঞ্চমহাযজ্ঞ-পালন

পঞ্চমহাযজ্ঞ নিজ অধিকার অনুযায়ী পালনের জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে।

  • ব্রহ্মযজ্ঞ (অধ্যয়ন) : প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র পাঠ, অর্থ বোঝার চেষ্টা এবং আচার্যের নির্দেশিত মন্ত্রের অনুশীলন।
  • ব্রহ্মযজ্ঞ (উপাসনা) : আচার্যের শেখানো বৈদিক পদ্ধতিতে প্রাতঃ ও সায়ং সন্ধ্যোপাসনা ও যোগাভ্যাস।
  • দেবযজ্ঞ : অগ্নিহোত্রে অংশগ্রহণ ও আর্যসঙ্গ। দীক্ষার্থী যজ্ঞে যজমানের ভূমিকা নেবেন। তিনি যজ্ঞে উপস্থিত থাকবেন, সামগ্রী প্রস্তুত করবেন, পুরোহিতের নির্দেশমতো মন্ত্রপাঠ ও আহুতি দেবেন।
  • পিতৃযজ্ঞ : প্রতিদিন গুরুজন, মাতা-পিতা ও আচার্যের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সেবা।
  • বলিবৈশ্বদেব ও অতিথিযজ্ঞ : সামর্থ্য অনুযায়ী প্রাণীর পরিচর্যা ও অতিথির সৎকার।

উপনয়ন না হওয়ায় সীমা কোথায়? অনুপনীত দীক্ষার্থী ঋত্বিকের পদ গ্রহণ করবেন না এবং পৌরহিত্যও করবেন না। কিন্তু এটি বঞ্চনা নয়, ধাপে ধাপে অধিকার। যজ্ঞের ফল ও কল্যাণ যজমানের, আর যজমানের আসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতৃযজ্ঞ, বলিবৈশ্বদেব ও অতিথিযজ্ঞে অধিকারের কোনো সীমাই নেই। উপনয়নের পর ঋত্বিকত্বের পথ খুলে যায়, আজকের নিষ্ঠা সেই পথেরই পাথেয়।

গ. সামাজিক ও নৈতিক আচরণ

  • আর্য, গুরুজন ও শিক্ষকদের সম্মান করা এবং বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের কাছ থেকে শেখা।
  • অন্য জীবের প্রতি সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হওয়া।
  • অতিথির সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করা।
  • সত্য কথা বলা, আচরণ শুদ্ধ রাখা ও কর্তব্য যথাযথ পালন করা।

ঘ. আর্যসঙ্গ ও সতীর্থ-লাভ

আচার্য-অনুশাসিত ঊর্ধ্বতন উপনীত আর্যদের সঙ্গ নিয়মিত লাভ করতে হবে। তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে, পঞ্চমহাযজ্ঞে অংশ নিতে হবে, নিজ গৃহে সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক আর্যসঙ্গ করতে হবে, কিংবা যেখানে তা আয়োজিত হয়, সেখানে যোগ দিতে হবে। এই সঙ্গ ঐচ্ছিক নয়, দীক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ। বেদ নিজেই বলে, "সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বম্" (ঋগ্বেদ ১০।১৯১।২), অর্থাৎ একসঙ্গে চলো, একসঙ্গে বলো। একটি কাঠ একা থাকলে তার আগুন নিভে যায়, কিন্তু অনেকগুলো কাঠ একসঙ্গে সাজালে একটির উত্তাপ অন্যটিকে জ্বালিয়ে রাখে।

ঙ. নিয়মিততা ও আত্মমূল্যায়ন

  • আর্যদের মাধ্যমে নিজের অগ্রগতি যাচাই করাতে হবে : উপাসনা কতটা নিয়মিত হচ্ছে, বেদপাঠে কতটা মন বসছে, ব্রত কতটা পালিত হচ্ছে।
  • আর্যের অধ্যক্ষতায় দৈনিক জীবনাচরণ তালিকায় কাজগুলি লিখে রাখতে হবে।
  • নির্ধারিত দিনের অনুশীলনকে শেষ সীমা না ভেবে ধীরে ধীরে অন্যান্য দিনেও সাত্ত্বিক আহার ও নিত্যকর্মের অভ্যাস বাড়াতে হবে। এই দিনগুলো সর্বনিম্ন মেঝে, ছাদ নয়।

চ. ব্রত-ভঙ্গ ও প্রায়শ্চিত্ত

মানুষের ত্রুটি স্বাভাবিক। ব্রত ভঙ্গ হলে বা কোনো আদেশ-উপদেশ পালনে অসমর্থ হলে তা গোপন করা চলবে না। ক্রমান্বয়ে সতীর্থ, আর্য ও আচার্যের কাছে প্রায়শ্চিত্তের বিধান জেনে তা বিনীত চিত্তে পালন করতে হবে এবং আবার ব্রত ধারণ করতে হবে। পতন লজ্জার নয়, ফিরে না আসাই ক্ষতির।

ছ. আচার্যের আদেশ ও দুটি ভুল এড়ানো

আচার্য-প্রদত্ত বিধি-নির্দেশ-উপদেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে পালন করতে হবে। দীক্ষার্থীর দুটি ভুলের সম্ভাবনা থাকে :

  • দীক্ষাকে তুচ্ছ ভাবা : "এটা তো সংস্কার নয়, সরাসরি উপনয়ন নিই।" এ ভুল, কারণ প্রস্তুতি ছাড়া সংস্কারের মর্যাদা রক্ষা করা যায় না।
  • দীক্ষাতেই থেমে যাওয়া : "আমি তো দীক্ষা নিয়েছি, আর কী দরকার?" এ-ও ভুল। দীক্ষা যাত্রার প্রথম ধাপ। ভর্তি হলেই যেমন ডিগ্রি মেলে না, দীক্ষা নিলেই বৈদিক জীবন পূর্ণ হয় না।

৬. দীক্ষার পরের পথ : দীক্ষা থেকে মোক্ষ

বৈদিক জীবনের লক্ষ্য বহুস্তরীয় :

১. বেদব্রত-দীক্ষা : সাত্ত্বিক আহার ও পঞ্চমহাযজ্ঞের নিয়ম শুরু।
২. অভ্যাসের বৃদ্ধি : দুই দিন থেকে অন্য দিনেও, ধীরে ধীরে প্রতিদিনের জীবনচর্যায়।
৩. উপনয়ন সংস্কার : যজ্ঞোপবীত ধারণ, গায়ত্রী মন্ত্রের উপদেশ ও বেদাধ্যয়নের অধিকার লাভ।
৪. চতুরাশ্রম : ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস, এই চার আশ্রম অনুসারে জীবনযাপন।
৫. মোক্ষ : জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি ও পরমাত্মার সান্নিধ্যে পরমানন্দ।

বেদব্রত-দীক্ষা ভোরের আভার মতো। আভা সূর্য নয়, কিন্তু আভাই চোখকে ধীরে ধীরে আলোর জন্য প্রস্তুত করে, যাতে পূর্ণ সূর্যোদয়ের তীব্র আলোয় চোখ না ধাঁধায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসে ওঠা চট্টগ্রাম নয়, কিন্তু ওই পদক্ষেপ ছাড়া চট্টগ্রামে পৌঁছানো অসম্ভব।

বেদব্রত-দীক্ষা মানুষের ওপর অসহনীয় বোঝা চাপায় না, বরং একটি বাস্তব ও সহনীয় পথ দেখায়। এর মূল কথা হলো : বেদজ্ঞ আচার্যের নির্দেশে একটি বেদমন্ত্রের উপদেশ নেওয়া, সেই মন্ত্রের অনুকূলে চলার ব্রত গ্রহণ করা, ঈশ্বরের উপাসনা শুরু করা এবং আর্যসঙ্গে থেকে ধীরে ধীরে বেদানুকূল জীবনের অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রয়োজন কেবল বেদের প্রতি নিষ্ঠা, আচার্যের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়মিত অনুশীলন। সেই নিষ্ঠার সঙ্গে চললে এই ছোট্ট সূচনাই একদিন উপনয়ন, পূর্ণ বৈদিক জীবন ও পরম লক্ষ্য মোক্ষের পথে পৌঁছে দেয়।

ও৩ম্
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)