বেদের শিক্ষা কি বহু-ঈশ্বরবাদ (Polytheism), অদ্বয়বাদ (Monism), হেনোথিজম (Henotheism) নাকি একেশ্বরবাদ (Monotheism) এই নিয়ে পণ্ডিত মহলে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কে প্রবেশের আগে শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ বুঝে নেওয়া প্রয়োজন:
আমরা কিন্তু ক্লেটন বা অন্যান্য পণ্ডিতদের এই "কাব্যিক স্বাধীনতা"র তত্ত্বের সাথে একমত নই। বেদে একেশ্বরবাদের এত অকাট্য এবং বিপুল প্রমাণ রয়েছে যে, সেখানে এমন কোনো আলঙ্কারিক অতিরঞ্জনের সুযোগ নেই। বেদ অত্যন্ত বিশুদ্ধভাবে একেশ্বরবাদ বা এক ঈশ্বরের উপাসনা শিক্ষা দেয়। বেদের শিক্ষা অনুযায়ী, ঈশ্বর এই মহাবিশ্বের-
সর্বব্যাপী (Omnipresent): তিনি কণা কণা এবং সর্বত্র বিদ্যমান।
সর্বজ্ঞ (Omniscient): তিনি ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের সবকিছু জানেন।
সর্বশক্তিমান (Omnipotent): জগতের সকল শক্তির উৎস তিনিই।
নিরাকার ও পূর্ণ (Formless and Perfect): তাঁর কোনো শারীরিক অবয়ব নেই এবং তিনি সকল দোষমুক্ত ও পরম পূর্ণ সত্তা।
ন দ্বিতীয়ো ন তৃতীয়শ্চতুর্থো নাপ্যুচ্যতে। য এতং দেবমেকবৃতং বেদ॥
ন পঞ্চমো ন ষষ্ঠঃ সপ্তমো নাপ্যুচ্যতে। য এতং দেবমেকবৃতং বেদ॥
নাষ্টমো ন নবমো দশমো নাপ্যুচ্যতে। য এতং দেবমেকবৃতং বেদ॥
স সর্বস্মৈ বি পশ্যতি যচ্চ প্রাণতি যচ্চ ন। য এতং দেবমেকবৃতং বেদ॥
অথর্ববেদ ১৩.৪[২].১৫-২১
ভাবানুবাদ: যশ, মান ও গৌরব; বীরত্ব ও তেজ; অলঙ্ঘনীয় স্বরূপ ও ব্রহ্মতেজ; অন্ন ও সমৃদ্ধি; এবং সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ রক্ষার সামর্থ্য - এই সমস্তই সেই পরমেশ্বরের। যিনি এই সৃষ্টিকর্তা পরমাত্মাকে একমাত্র সর্ব-কেন্দ্রীভূত সত্তা হিসেবে জানেন, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানবান।
তাঁকে কখনও দ্বিতীয় বলা হয় না, তৃতীয় বলা হয় না, এমনকি চতুর্থও বলা হয় না। যিনি পরমাত্মাকে এক হিসেবে জানেন, তিনিই প্রকৃত সত্য জানেন।
তাঁকে না পঞ্চম, না ষষ্ঠ, এমনকি না সপ্তম বলা হয়। যিনি পরমাত্মাকে এক হিসেবে জানেন, তিনিই প্রকৃতপক্ষে জানেন।
তাঁকে না অষ্টম, না নবম, এমনকি না দশম বলা হয়। যিনি পরমাত্মাকে এমনভাবে জানেন ‘পরমাত্মা এক এবং কেবল এক’, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী।
তিনি সবার কল্যাণের জন্য এই বিশ্বের সমস্ত চরাচর [যাদের প্রাণ আছে এবং যারা প্রাণহীন] সম্পূর্ণ ও ব্যাপকভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেন। যিনি পরমাত্মাকে এমনভাবে জানেন যে, ‘পরমাত্মা যিনি এক এবং কেবল এক’, তিনিই প্রকৃতপক্ষে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন।
য এক ইত্তমু ষ্টুহি কৃষ্টীনাং বিচর্ষণিঃ।
পতির্জজ্ঞে বৃষক্রতুঃ ॥
ঋগ্বেদ ৬.৪৫.১৬
ভাবানুবাদ: হে মানব! তুমি কেবল সেই একজনেরই আবাহন করো, তাঁরই প্রশংসা করো এবং তাঁকে ঘিরেই উৎসব করো যিনি স্বীয় মহিমায় অদ্বিতীয় এবং স্বয়ংসিদ্ধ; যিনি জনগণের সদা জাগ্রত রক্ষক ও অভিভাবক; যিনি মহান কর্মের সম্পাদক এবং নিজ কর্মের আনন্দময় ফল বর্ষণকারী এবং যিনি নিখিল বিশ্বের রক্ষাকর্তা ও অধিপতি হিসেবে প্রকটিত ও উদিত হন।
সমেত বিশ্বা ওজসা পতিং দিবো য এক ইদ্ভূরতিথির্জনানাম্ ।
স পূর্ব্যো নূতনমাজিগীষন্ তং বর্ত্তনীরনু বাবৃত এক ইৎ ॥
সামবেদ ৩৭২
ভাবানুবাদ: হে প্রজাজন ! তোমরা সকলে তেজ ও বলের সাথে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, নীহারিকা প্রভৃতি সহ সকল কিছুর অধিপতি জগদীশ্বরকে প্রাপ্ত করো, যিনি এক ও সব স্ত্রী-পুরুষের নিকট অতিথিবৎ পূজনীয় হন। তিনি পুরাতন হয়েও নতুন উৎপন্ন জড় ও চেতন জগৎকে জয় করেন, কারণ সেই পুরাণপুরুষ সর্বাধিক মহিমাযুক্ত৷ সেই জগদীশ্বরের নিকট একটিই পথ তা হলো অধ্যাত্মপথ, ভোগের পথ নয়। সেই পথে চলেই তাঁকে পাওয়া যেতে পারে।
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্দেব একঃ॥
ঋগ্বেদ ১০.৮১.৩
ভাবানুবাদ: যিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্ববক্তা, সর্বধারক ও সর্বগত, তিনি এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মদেব। তিনিই প্রকৃতির ত্রিগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি প্রকাশমান লোকসমূহ ও পৃথিবীকে যথার্থরূপে উৎপন্ন করে, স্বীয় অনন্ত সামর্থ্য দ্বারা সম্পূর্ণ জগৎকে চালনা করছেন।
ন যস্য দ্যাবাপৃথিবী অনু ব্যচো ন সিন্ধবো রজসো অন্তমানশুঃ।
নোত স্ববৃষ্টিং মদে অস্য যুধ্যত একো অন্যচ্চকৃষে বিশ্বমানুষক্ ॥
ঋগ্বেদ ১.৫২.১৪
ভাবানুবাদ: হে পরম পরাক্রমশালী ঈশ্বর! আপনিই সমস্ত উচ্চ ও নীচ ঐশ্বর্যের একমাত্র অধিপতি। আপনার সত্তার ব্যাপকতা পরিমাপ করার সাধ্য কারো নেই। সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহগণ, দ্যুলোক, এই পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী ক্ষুদ্রতম জ্যোতিষ্কসমূহও আপনার অসীম সত্তার অন্ত খুঁজে পায় না; কারণ আপনি আপনার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নিয়ে সমস্ত কিছুর ভেতরে এবং বাইরে ওতপ্রোতভাবে বিরাজ করছেন।
হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ ।
স দাধার পৃথিবীং দ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥
ঋগ্বেদ ১০.১২১.১
ভাবানুবাদ: সৃষ্টির প্রারম্ভে এবং তিনি সর্বদা যেমন আছেন সেই জ্যোতির্ময় লোকসমূহের একমাত্র অধিপতি এবং সূর্যতূল্য তেজস্বী পদার্থসমূহের (একঃ+পতিঃ, আসীৎ) অদ্বিতীয় স্রষ্টা বিদ্যমান ছিলেন। তিনিই একমাত্র উৎপন্ন সমস্ত চরাচর জগতের স্বামী ও ধারক ছিলেন এবং আছেন। তিনি এই পৃথিবী ও দ্যুলোককে ধারণ করে আছেন এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে স্থিতি প্রদান করেন। আমরা সেই এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর উপাসনা করি এবং সুগন্ধিত ও পবিত্র দ্রব্যের আহুতির মাধ্যমে তাঁকে ভক্তিপূর্ণ শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
য আত্মদা বলদা যস্য বিশ্ব উপাসতে প্রশিষং যস্য দেবাঃ ।
যস্য ছায়ামৃতং যস্য মৃত্যুঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥
ঋগ্বেদ ১০.১২১.২
ভাবানুবাদ: যিনি আত্মজ্ঞান প্রদানকারী এবং শরীরের শক্তি ও সামর্থ্যের দাতা; যাঁর শাসন বা অনুশাসন এই বিশ্বের বিদ্বান ও প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ সানন্দে মেনে চলে; যাঁর শরণাপন্ন হওয়া বা যাঁর ছায়াতলে থাকাই হলো অমরত্ব তথা মোক্ষ, আর যাঁকে ভুলে যাওয়া বা যাঁর থেকে বিচ্যুত হওয়াই হলো মৃত্যু; আমরা সেই (মহিঽত্বা-একঃ) আনন্দময় অদ্বিতীয় প্রভুকেই আমাদের স্তুতিগান এবং যজ্ঞীয় হবির মাধ্যমে পূজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
যঃ প্রাণতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব ।
য ঈশে অস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥
ঋগ্বেদ ১০.১২১.৩
ভাবানুবাদ: যিনি স্বীয় মহিমা ও সামর্থ্যে এই প্রাণবান ও দর্শনশীল তথা জাগরূক জগতের (মহিঽত্বা-একঃ) একমাত্র অধিপতি ও রাজা হয়েছেন; যিনি এই দ্বিপদ ও চতুষ্পদ সকল প্রাণীর ওপর শাসন করেন; সেই আনন্দময় ও ঐশ্বর্যশালী সার্বভৌম প্রভুকে আমরা কায়মনোবাক্যে এবং যজ্ঞীয় হবির মাধ্যমে পূজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
আপো হ যদ্বৃহতীর্বিশ্বমায়ন্গর্ভং দধানা জনয়ন্তীরগ্নিম্ ।
ততো দেবানাং সমবর্ততাসুরেকঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥
ঋগ্বেদ ১০.১২১.৭
ভাবানুবাদ: যখন বিশ্বের সেই নীল নকশা বীজরূপে ধারণ করে গতিশক্তির আধানযুক্ত কণা বা বিশাল মহাজাগতিক রসতত্ত্ব অস্তিত্বে এল এবং অস্তিত্বের তাপীয় মাধ্যম বা অগ্নিকে প্রজ্জ্বলিত করল, তখন সমস্ত মহাজাগতিক রূপ প্রকটিত হওয়ার পূর্বেই সেই দিব্য গুণাবলীর আধার, স্বয়ং প্রাণস্বরূপ অদ্বিতীয় (সম্+অবর্তত+অসুঃ+একঃ) পরমাত্মা প্রকটিত হলেন। সেই সর্বব্যাপী আনন্দময় পরমেশ্বর ছাড়া আর কার আমরা হবির দ্বারা আরাধনা করব? তিনিই হিরণ্যগর্ভ।
দিবি স্পৃষ্টো যজতঃ সূর্যত্বগবয়াতা হরসো দৈব্যস্য।
মৃডাদ্গন্ধর্বো ভুবনস্য যস্পতিরেক এব নমস্যঃ সুশেবাঃ ॥
অথর্ববেদ ২.২.২
ভাবানুবাদ: যিনি প্রতি কর্মে প্রাপ্ত ও উপলব্ধ, যিনি চেতনার অন্তরে এবং এই মহাবিশ্বের বাইরেও পরিব্যাপ্ত; সেই পূজনীয় প্রভু, যিনি সহস্র সূর্যের প্রকাশক ও স্বয়ং-প্রকাশিত এবং যাঁর মহিমা মহাকাশের নক্ষত্ররাজির আলো ও শক্তিকেও ম্লান করে দেয়। যিনি পৃথিবীর আধার ও ধারক, সূর্যাদির আলোকদাতা এবং বৈদবাণীর অধিপতি—আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের প্রতি দয়ালু ও প্রসন্ন হন। তিনিই পিতা এবং রক্ষক রূপে এই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের স্বামী; এবং সেই পরমেশ্বরকেই বন্দনা, প্রার্থনা এবং যজ্ঞীয় সেবার মাধ্যমে আরাধনা করা একমাত্র কর্তব্য।
১] ন ত্বাবাঁ অন্যো দিব্যো ন পার্থিবো ন জাতো ন জনিষ্যতে [ঋগ্বেদ ৭।৩২।২৩] অর্থাৎ, হে ঈশ্বর! দিব্য শক্তিসম্পন্ন তোমার মতো আর কোনো সত্তা বা পদার্থ নেই। এমন কোনো সত্তা বা পদার্থ এই পৃথিবীতে কখনো জন্মগ্রহণ করে নি, আর কখনো জন্মগ্রহণ করবেও না।
২] প্রজাপতে ন ত্বদেতান্যন্যো বিশ্বা জাতানি পরি তা বভূব [ঋগ্বেদ ১০।১২১।১০] অর্থাৎ, সকল প্রজার বা মানবজাতির অধিপতি ঈশ্বর! তুমি ছাড়া আর কেউ না অর্থাৎ,একমাত্র তুমিই পালন ও নিয়ন্ত্রণ করছ এই সমগ্র উৎপন্ন মহাবিশ্বকে।
৩] স নো বন্ধুর্জনিতা স বিধাতা ধামানি বেদ ভূবনানি বিশ্বা [যজুর্বেদ ৩২।১০] অর্থাৎ, তিনি একাই অর্থাৎ একমাত্র ঈশ্বর আমাদের নিকটতম মিত্র একমাত্র তিনিই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, ধারণকর্তা। মহাবিশ্বের সকল পদার্থ সম্বন্ধেই তিনি অবগত আছেন। ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য ও গুণ অনন্ত।
৪] বিশ্বমাপ্রা অন্তরিক্ষং মহিত্বা সত্যমদ্ধা নকিরন্যস্ত্বাবান্ [ঋগ্বেদ ১।৫২।১৩] অর্থাৎ,পরমেশ্বর এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি লোকে, সর্বদিকে এবং সমস্ত কিছুর মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তিনি চতুর্বেদে প্রকাশিত ও প্রতিপাদিত এবং মহাকাশের অসীমতা ও অন্তরীক্ষের স্থিরতা তাঁরই অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। তিনি সর্বব্যাপী এবং পরম পূর্ণ সত্তা। সেই কারণেই, হে প্রভু! আপনার তুল্য দ্বিতীয় আর কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
