শ্রীমতী নেলী সেনগুপ্তাঃ যে মেমসাহেব পূর্ব বাংলার হিন্দুদের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন
নেলী
সেনগুপ্তা—যাঁর জন্মসূত্রে পরিচয় ছিল একজন ইংরেজ নারী হিসেবে, অথচ কর্ম ও
আত্মত্যাগের মাধ্যমে যিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নিজেকে
স্থাপন করেছিলেন এক অনন্য মহিমায়। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ
করে, দেশপ্রেম রক্তে নয়, চেতনায় জন্ম নেয়। তিনি কেবল একজন বিপ্লবীর
স্ত্রী ছিলেন না; তিনি নিজেই ছিলেন এক বিপ্লবী সত্তা, এক রাজনৈতিক কর্মী,
এক সমাজসংস্কারক, এক মাতৃমূর্তি, যিনি জীবনভর বহন করেছেন “বহুজন হিতায়,
বহুজন সুখায়” আদর্শকে।
এডিথ
এলেন গ্রে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৬ সালের ১২ জানুয়ারি, ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ
শহরে। পিতা ফ্রেডারিক গ্রে ও মাতা এডিথ হেনরিয়েটা গ্রে ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও
রক্ষণশীল পরিবারভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বসবাস করার সুবাদে তাঁদের
বাড়িতে বহু ভারতীয় ছাত্র পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন। সেই পরিবেশেই নেলীর
পরিচয় হয় চট্টগ্রামের সন্তান, কেমব্রিজে অধ্যয়নরত মেধাবী ছাত্র
যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সঙ্গে। পারিবারিক প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি এই
বাঙালি যুবককে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। এই বিয়ে শুধু দুই মানুষের
মিলন ছিল না, ছিল দুই সংস্কৃতি ও দুই ইতিহাসের এক সাহসী সংযোগ।
এই বাক্যেই নিহিত ছিল তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ।
১৯০৯
সালে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। বরমা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর বরণ ছিল
একেবারে বাঙালি রীতিতে—শাঁখা, সিঁদুর, শাড়ি পরিধান করে তিনি শ্বশুরের
পায়ে প্রণাম করেন। সেই দৃশ্য চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ছিল বিস্ময় ও
মুগ্ধতার। বিদেশিনী হয়েও তিনি নিজেকে মুহূর্তেই বাঙালি সমাজের অন্তর্গত
করে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম তাঁর কাছে কেবল স্বামীর জন্মভূমি ছিল না, হয়ে
উঠেছিল তাঁর নিজের দেশ।
যতীন্দ্রমোহন
সেনগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন বিশিষ্ট নেতা, কলকাতা
কর্পোরেশনের তিনবারের মেয়র, এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিক আন্দোলনের
অন্যতম সংগঠক। তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে নেলী ছিলেন সহযোদ্ধা।
১৯১০ সাল থেকে তিনি কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। অসহযোগ আন্দোলনের
সময় তিনি খাদি শাড়ি পরিধান করে বাড়ি বাড়ি খাদি বিক্রি করেছেন, বিদেশি
পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং এই অপরাধে তাঁকেও গ্রেফতার হতে হয়েছে।
১৯২১
সালে গান্ধীজীর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি দেখিয়ে দেন যে
স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল পুরুষদের ক্ষেত্র নয়। যতীন্দ্রমোহন গ্রেফতার হলে
আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন নেলী নিজেই। তাঁর গয়না বিক্রি
করে আন্দোলনের তহবিলে অর্থ দিয়েছেন। বিলাসিতা, স্বাচ্ছন্দ্য, ইউরোপীয়
জীবনের সমস্ত প্রলোভন তিনি ত্যাগ করেছিলেন এক মুক্ত দেশের স্বপ্নে।
এক
অসামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় “বাওলা হত্যা মামলা”
সংক্রান্ত ঘটনায়। যতীন্দ্রমোহনকে বোম্বে হাইকোর্টে মামলা লড়ার প্রস্তাব
দেওয়া হয় বিপুল পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। কিন্তু সেই সময় আইনসভায় তাঁর
উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেলী দৃঢ়ভাবে বলেন,
অর্থকষ্ট থাকলেও তিনি বোম্বে যাবেন না। দেশ আগে, অর্থ পরে। তাঁর এই দৃঢ়তাই
স্বামীকে সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে সাহায্য করে, এবং সেই সিদ্ধান্তই
ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
১৯৩৩
সালে যতীন্দ্রমোহনের মৃত্যু নেলীর জীবনে এক গভীর শোকের অধ্যায় হলেও তিনি
ভেঙে পড়েননি। বরং আন্দোলনে আরও সক্রিয় হন। সেই বছরই তিনি সর্বভারতীয়
কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অ্যানি বেসান্তের পর তিনিই ছিলেন
দ্বিতীয় বিদেশিনী, যিনি এই ঐতিহাসিক পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি কলকাতা
কর্পোরেশনের অল্ডারম্যানও নির্বাচিত হন।
দিল্লির
কুইন্স পার্কে ১৪৪ ধারা ভেঙে অনুষ্ঠিত সভায় তাঁর বজ্রকণ্ঠ আহ্বান আজও
ইতিহাসে স্মরণীয়। অরুণা আসফ আলীর সঙ্গে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয় এবং চার
মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দিল্লির সেন্ট্রাল জেলে যখন অন্যান্য ভারতীয়
বন্দিনীদের মাঝে এক ‘গোরি আওরত’কে দেখা গিয়েছিল, তখন ব্রিটিশ প্রশাসন
নিজেই বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর নির্দেশ ছিল—তিনি সাধারণ বন্দিনী
হিসেবেই থাকবেন।
১৯৪৩
ও ১৯৪৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
দ্বিতীয়বার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিপ্লবী কল্পনা দত্ত। জওহরলাল নেহরু
স্বয়ং চিঠি লিখে চট্টগ্রামবাসীকে নেলীর পক্ষে ভোট দিতে অনুরোধ করেছিলেন।
সাধারণ নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত একমাত্র নারী ছিলেন তিনি।
দেশভাগের
পর তিনি স্বামীর পৈতৃক ভিটা চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। তখন এটি পূর্ব
পাকিস্তান। ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী
হিসেবে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংখ্যালঘু হিন্দুদের
অধিকার রক্ষায় তিনি ছিলেন আপসহীন কণ্ঠস্বর। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে
বহুবার নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন। বহুবার হয়েছেন অপমানিত। যেমন ১৯৫৫ সালে
তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি পাঞ্জাবি আইসিএস অফিসার আজিজ
আহমদ নেলী সেনগুপ্তাকে টেবিল চাপড়ে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, আমি জানি পাকিস্তান
থেকে হিন্দুদের কীভাবে নিশ্চিহ্ন করতে হয় (আই নো হাউ টু এলিমিনেট হিন্দুজ
ফ্রম পাকিস্তান)।
১৯৫২
সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠ। ঢাকা মেডিকেল কলেজে
গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে তিনি ছুটে যান এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ
জানান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা থেকে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে
যোগাযোগ রেখে তিনি বাংলাদেশ আন্দোলনকে পরামর্শ ও নৈতিক সমর্থন দেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা।
১৯৭৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে “পদ্মবিভূষণ” সম্মানে ভূষিত করে। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন,
“এই সম্মান তো আসলে আমার স্বামীরই প্রাপ্য ছিল।”
“এই সম্মান তো আসলে আমার স্বামীরই প্রাপ্য ছিল।”
প্রবর্তক
সংঘ, প্রবর্তক অনাথ আশ্রম, মৈত্রেয়ী ভবন, অর্পণাচরণ স্কুল—চট্টগ্রামের এই
সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম আজও জড়িয়ে আছে। বিনোদ চৌধুরী, আবুল ফজল,
যোগেশ সিংহের মতো মনীষীরা তাঁর ব্যক্তিত্বের মহিমা স্মরণ করে গেছেন গভীর
শ্রদ্ধায়।
২৩ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
আবুল ফজল লিখেছিলেন,
“নেলী সেনগুপ্তা অসাধারণের মধ্যেও অসাধারণ, আত্মনিবেদনের এমন দৃষ্টান্ত বিরল।”
যোগেশ সিংহ লিখেছিলেন,
“তাঁর সান্নিধ্যে মানুষ অনুভব করত এক আশ্চর্য আন্তরিক ঐশ্বর্য।”
নেলী সেনগুপ্তা প্রমাণ করে গেছেন—
“তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ।”
“তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ।”
তিনি কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি আত্মনিবেদনের এক জীবন্ত দর্শন, যিনি বিদেশিনী হয়েও ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-চেতনায় নিজেকে স্থাপন করেছেন চিরকালের জন্য।
আজ
চট্টগ্রাম ও বাংলার বহু মানুষ তাঁর নাম জানে না। এই বিস্মরণ আমাদের
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দারিদ্র্যের পরিচয়। নেলী সেনগুপ্তাকে স্মরণ করা
মানে কেবল একজন নারীকে স্মরণ করা নয়, স্মরণ করা মানবতার সেই শক্তিকে, যা
জাতি, ভাষা ও জন্মভূমির সীমানা অতিক্রম করে।
তথ্যসূত্র
- রীতা দত্ত, “নেলী সেনগুপ্তা: তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ”, দৈনিক আজাদী, ২৩ অক্টোবর ২০২০।
https://dainikazadi.net - স্বপন সেন, “অনন্য এক মানুষ নেলী সেনগুপ্তা, সেলাম মেমসাহেব”, উইমেননিউজ২৪, ২৭ অক্টোবর ২০২১।
ড. রজত দাশগুপ্ত© বাংলাদেশ অগ্নিবীরসত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক
