সরস্বতী পূজা আর শ্রী সতীন সেনের সাহস
সতীন
সেন, পূর্ণ নাম সতীন্দ্রনাথ সেন, জন্মগ্রহণ করেন ১৫ই এপ্রিল ১৮৯৪ সালে এবং
মৃত্যুবরণ করেন ২৫শে মার্চ ১৯৫৫ সালে। তিনি বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলের
হিন্দু সমাজের কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং ধর্মীয় অধিকার,
আত্মমর্যাদা ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন। বিশেষ করে ১৯২৫ থেকে ১৯২৮
সালের মধ্যবর্তী সময়ে বরিশাল ও পটুয়াখালীতে যখন সরস্বতী পূজা, জন্মাষ্টমী,
দোলযাত্রা ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মীয় শোভাযাত্রার উপর পরিকল্পিতভাবে বাধা
আরোপ করা হচ্ছিল, তখন সতীন সেনই একমাত্র সংগঠিত কণ্ঠে এর বিরোধিতা করেন।
১৯২৫
সালে বরিশাল কলেজে সরস্বতী পূজার উপর আপত্তি ওঠে এবং পূজা কলেজ প্রাঙ্গণে
না করে ছাত্রদের হোস্টেলে সম্পন্ন করতে বাধ্য করা হয়। সতীন সেন এই ঘটনাকে
হিন্দুদের ধর্মীয় অধিকারের উপর আঘাত বলে দেখেন এবং ছাত্রদের সাহস জোগান।
পূজা শেষ হওয়ার পরেও শান্তিভঙ্গের অভিযোগে উল্টো হিন্দু ছাত্রদের গ্রেপ্তার
করা হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলেও
সমাজকে নিজের অধিকার রক্ষা করতে হবে।
এরপর
১৯২৬ সালে পটুয়াখালীতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়। পটুয়াখালী মিউনিসিপ্যাল
স্কুলে সরস্বতী পূজার বিরোধিতা করা হয়, পূজার পরে মূর্তির সামনে কাটা গরুর
মাথা ফেলে ধর্মীয় অবমাননা করা হয় এবং বিসর্জন শোভাযাত্রা বন্ধ করার চেষ্টা
হয়। যুক্তি দেওয়া হয় যে, শোভাযাত্রার পথে একটি মসজিদ আছে, তাই শোভাযাত্রা
চলতে দেওয়া যাবে না। সতীন সেন স্পষ্টভাবে বলেন, সরকারি রাস্তা সর্বসাধারণের
জন্য, সেখানে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা যায় না। তিনি এমনকি
মসজিদের সামনে বাদ্যযন্ত্র না বাজানোর আশ্বাস দিয়েও প্রশাসনের কাছ থেকে
অনুমতি আদায় করতে পারেননি। এখান থেকেই ১৯২৬ সালেই শুরু হয় ঐতিহাসিক
পটুয়াখালী সত্যাগ্রহ।
এই
সত্যাগ্রহ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী। সতীনের অনুগামীরা প্রতিদিন
নিষিদ্ধ এলাকা দিয়ে শোভাযাত্রা করতেন, গ্রেপ্তার দিতেন এবং মুক্তি পেয়ে
আবার আন্দোলনে নামতেন। এইভাবে দিনের পর দিন আইন অমান্য চলতে থাকে। ১৯২৭
সালের মধ্যে এই আন্দোলন সারা ভারতে আলোড়ন তোলে। মদন মোহন মালব্য, লালা
লাজপৎ রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসু প্রমুখ নেতারা এই আন্দোলনের
প্রতি সমর্থন জানান। পটুয়াখালী সত্যাগ্রহ প্রমাণ করে দেয় যে ধর্মীয় অধিকার
রক্ষার লড়াই আসলে স্বাধীনতার লড়াইয়েরই একটি অংশ।
১৯২৭
সালের শিবরাত্রির সময় বরিশালের পোনাবালিয়ায় শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে আবারও
সংঘাত তৈরি হয়। শোভাযাত্রা বন্ধের চেষ্টা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে
গুলিবর্ষণে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর দায়ও একতরফাভাবে হিন্দুদের উপর
চাপানো হয়। সতীন সেন তখনও আপস করেননি এবং হিন্দু সমাজের পাশে দাঁড়িয়ে
প্রশাসনিক অন্যায়ের প্রতিবাদ চালিয়ে যান।
১৯২৮
সালে লাকুটিয়ায় দোলযাত্রা বন্ধ করার চেষ্টা হলে তিনি আবার গ্রামবাসীদের
পাশে দাঁড়ান। তাঁকে ফৌজদারি আইনের ১০৭ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৫০ হাজার
টাকা জামিন ধার্য করা হয়, যাতে তিনি মুক্ত হতে না পারেন। পরে আদালত এই
অবিচার সংশোধন করতে বাধ্য হয়।
এই
সব ঘটনাই প্রমাণ করে যে সতীন সেনের সংগ্রাম ছিল ধারাবাহিক, সুপরিকল্পিত
এবং নীতিগত। তিনি বিশ্বাস করতেন, হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের অধিকার
কোনও করুণা নয়, এটি একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। ভয় দেখিয়ে, প্রশাসনিক চাপ
দিয়ে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
দেশভাগের
পরে, ১৯৪৭ সালের পর, যখন অধিকাংশ হিন্দু নেতা ভারত চলে যান, সতীন সেন তখন
বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানে যতদিন একজনও হিন্দু থাকবে, ততদিন আমি এই দেশ
ছাড়ব না।” এই আদর্শ থেকেই তিনি থেকে যান। কিন্তু এর ফল ছিল ভয়াবহ। ১৯৫০
সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানে যখন পরিকল্পিতভাবে হিন্দু নিধন শুরু
হয়, তখন সতীন সেন সত্য গোপন করতে অস্বীকার করেন। বরিশালে শান্তি বিরাজ করছে
বলে মিথ্যা বিবৃতিতে সই করতে অস্বীকার করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর
তিনি পাকিস্তানি কারাগারে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। অস্বাস্থ্যকর সেল,
অখাদ্য খাবার, চিকিৎসার অভাব, যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত অবস্থায়ও তাঁকে জেলে
আটকে রাখা হয়। শেষপর্যন্ত ১৯৫৫ সালের ১৩ই মার্চ তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ
হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কাগজে কলমে তাঁকে “মুক্ত” দেখানো হয়েছিল, কিন্তু
বাস্তবে তিনি তখনও বন্দীর মতো অবস্থায় ছিলেন।
২৫শে
মার্চ ১৯৫৫, ঢাকায়, সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায়, চিকিৎসার অভাবে,
কারাবন্দিত্বজনিত অসুস্থতায় সতীন সেন মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর
বুকের উপর একটি তথাকথিত “রিলিজ অর্ডার” রাখা ছিল, যা ব্যাকডেটেড ছিল।
হাসপাতালের মৃত্যুসনদে তাঁকে এখনও “Security Prisoner” বলা হয়েছিল। অর্থাৎ
তিনি কার্যত বন্দী অবস্থাতেই মারা যান।
এইভাবেই
শেষ হয় সেই মানুষটির জীবন, যিনি ১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে বরিশাল ও
পটুয়াখালীতে সরস্বতী পূজা ও হিন্দু ধর্মীয় শোভাযাত্রার অধিকার রক্ষায় যে
সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তা ছিল আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। সতীন সেন কেবল
ইতিহাসের চরিত্র নন, তিনি প্রমাণ যে ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা মানে ঘৃণা
ছড়ানো নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করা।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক
