✅ধর্ম ও অধর্ম❌
🎙️শাস্ত্রার্থ মহারথী পণ্ডিত রামচন্দ্র দেহলভি
🔰ধর্মের লক্ষণ
▪️ধর্ম: যার স্বরূপ ঈশ্বরের আজ্ঞা যথাবৎ পালন এবং পক্ষপাতহীন ন্যায়ের মাধ্যমে সর্বহিত সাধন করা; যা প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের দ্বারা সুপরীক্ষিত এবং বেদোক্ত হওয়ার কারণে সকল মানুষের জন্য একমাত্র গ্রহণীয়, তাকেই ধর্ম বলা হয়।
আসুন, আমরা ধর্ম ও অধর্মের স্বরূপ বিবেচনা করি এবং সর্বদা ধর্মাচরণের সংকল্প গ্রহণ করি। শ্রী স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী মহারাজ ধর্মের লক্ষণ নিরূপণ করতে গিয়ে সর্বাগ্রে ঈশ্বরের আজ্ঞা যথাযথ পালন করাকে আবশ্যক গণ্য করেছেন, যার মাধ্যমে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ হয়। সেই ঈশ্বরকে যে স্বীকার করে না, এই লক্ষণ অনুযায়ী তাকে ‘ধর্মাত্মা’ গণ্য করা যায় না।
জগতে প্রায়ই এমন মানুষের দেখা মেলে, যাদের ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই কিন্তু তারা সৃষ্টির নিয়মাবলি মেনে চলেন। এমন ব্যক্তিদের পূর্ণ ধর্মাত্মা বলা যায় না; কারণ তারা নিয়ন্তার সেই আবশ্যক অঙ্গটিকেই অস্বীকার করেছেন, যাঁকে ব্যতীত কোনো নিয়মের সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব।
🔰অনুমান ও নিয়ন্তার আবশ্যকতা
অনুমান-প্রমাণ বিশেষভাবে মানুষের জন্যই, যে কারণ থেকে কার্য এবং কার্য থেকে কারণের অনুমান করে নিজের অভীষ্ট সিদ্ধ করে। কার্য ও কারণ উভয়কে যে সর্বদা একসাথেই দৃশ্যমান হতে হবে, এমন নয়। যদি জগতে এমন নিয়ম থাকত যে উভয়ই যুগপৎ উপস্থিত থাকে, তবে অনুমান-প্রমাণের প্রয়োজনই হতো না।
যেমন মেঘ দেখে সম্ভাব্য বৃষ্টির এবং বৃষ্টি দেখে তার কারণস্বরূপ মেঘের অনুমান করা হয়, ঠিক তেমনি দুঃখ দেখে পাপকর্মের এবং পাপকর্ম দেখে ভাবী দুঃখের অনুমান করা হয়। যদি কেউ দুঃখ দেখে পাপকর্মের বা সন্তান দেখে পিতামাতার অস্তিত্ব অনুমান করতে অসমর্থ হয়, তবে তাকে পূর্ণ জ্ঞানী বলা যায় না। একইভাবে, যদি কেউ সৃষ্টির নিয়মাবলি দেখে ও স্বীকার করেও তার নিয়ন্তাকে (ঈশ্বরকে) অস্বীকার করে, তবে সে-ও পূর্ণ জ্ঞানী নয়। আর যে পূর্ণ জ্ঞানী নয়, সে পূর্ণ ধর্মাত্মা হয় কীভাবে? কারণ ধর্মাত্মার নিকট জ্ঞানপূর্বক কর্মেরই প্রাধান্য।
🔰 ঈশ্বরের কর্তৃত্ব ও প্রকৃতি
যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ঈশ্বর তো নিয়ম বানিয়ে দিয়েছেন, এখন তাঁর আর কিছু করার প্রয়োজন নেই; প্রতিটি কাজ সেই নিয়মেই চলছে এবং চলবে, এতে ক্ষতি কী? এর উত্তর হলো, আইন নিজে কিছু করতে পারে না যতক্ষণ না কোনো চেতন কর্তা তা প্রয়োগ করেন। যেমন দণ্ডবিধি (Indian Penal Code) কোনো অপরাধীর কিছু করতে পারে না যতক্ষণ না পুলিশ তাকে ধরে বিচারকের সামনে পেশ করে এবং বিচারক অপরাধ অনুযায়ী দণ্ড দেন। একইভাবে, ঈশ্বরের বিধানও তাঁর প্রয়োগ ব্যতীত কার্যকরী হতে পারে না।
যাঁরা ঈশ্বরকে বিধান-প্রণেতা মানেন কিন্তু পরিচালক মানেন না, তাঁদের ভাবা উচিত যে প্রজ্ঞা নিয়ম নির্মাণ করেছে, সেই প্রজ্ঞাই তা পরিচালনা করতে পারে। প্রকৃতি ‘জড়’ হওয়ার কারণে স্বয়ং কোনো নিয়ম বানাতে পারে না এবং অন্যের বানানো নিয়মে স্বতন্ত্রভাবে চলতেও পারে না। জীবাত্মাও ‘অল্পজ্ঞ’ হওয়ার কারণে ঈশ্বরের সাহায্য (শরীর ও জ্ঞান) ব্যতীত কোনো নিয়ম তৈরি বা পরিচালনা করতে পারে না। জীবাত্মা স্বীয় শরীর ও ইন্দ্রিয়ের ওপরও পূর্ণ অধিকার রাখে না; যেমন অনিচ্ছাসত্ত্বেও হোঁচট খাওয়া বা আহারকালে জিহ্বায় দন্তঘাত হওয়া। পক্ষান্তরে, পরমাত্মা সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান হওয়ার কারণে একাই সকল নিয়ম নির্মাণ করেন ও পরিচালনা করেন, এটাই ঈশ্বর ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য।
🔰 প্রকৃত ঈশ্বরীয় আজ্ঞা ও পক্ষপাতহীন ন্যায়
প্রশ্ন ওঠে, কোনটিকে ঈশ্বরের আজ্ঞা বলে মানবো? বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থকে ঈশ্বরের বাণী বলেন। কিন্তু এই গ্রন্থসমূহের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ থাকায় সব কটিকে ঈশ্বরের আজ্ঞা বলা অসম্ভব। ঈশ্বরের আজ্ঞা সেটিই হতে পারে যা ঈশ্বরের ন্যায় ‘সার্বভৌম’, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়, এবং যা দয়া ও ন্যায়ের ন্যায় ঈশ্বরীয় গুণের বিরুদ্ধ নয় অর্থাৎ যা বেদানুকূল।
▪️পক্ষপাতহীন ন্যায়: মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন হওয়া কঠিন, কারণ অল্পজ্ঞ হওয়ার ফলে মোহ, ভয় বা লোভ তাকে প্রভাবিত করে। ঈশ্বর এই ত্রুটিমুক্ত, তাই তাঁর ন্যায় পক্ষপাতহীন। যে ব্যক্তি ঈশ্বরীয় গুণের আদর্শে নিজের জীবন অতিবাহিত করে, সে-ই প্রকৃত ন্যায়বিচারক হতে পারে। যজুর্বেদের [৪০.৬] মন্ত্রানুসারে, ধর্মাত্মা নিজেকে সকল প্রাণীতে এবং সকল প্রাণীকে নিজের মধ্যে অনুভব করেন অর্থাৎ তিনি ‘সর্বপ্রিয়’ ও ‘সর্বহিতকারী’ হয়ে ওঠেন।
🔰সর্বহিত ও স্বার্থপরতা
যে ন্যায়ে কারো অহিত হয় না, তাকেই সর্বহিত বলে। ঈশ্বর প্রতিটি জীবের হিতের কথা ভেবে একজনের পাপ অন্যের কাছে প্রকাশ করেন না। ধর্মাত্মারও ‘সর্বহিতকারী’ হওয়া উচিত। অথচ মানুষ একে অপরের নিন্দায় মত্ত থাকে, যা বৈরিতা বৃদ্ধি করে। স্বার্থপর ব্যক্তি কখনো পূর্ণ ন্যায় করতে পারে না। অনেক মতপ্রবর্তক নিজেদের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য স্বীয় সীমাবদ্ধতাকে ধর্মের নিয়ম বানিয়ে দিয়েছেন (যেমন বাল্যবিবাহের সমর্থন), যা সমাজের প্রগতির অন্তরায়। কিন্তু ঋষিরা ঈশ্বরীয় ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বহিতের লক্ষ্যে যা করেছেন, তা মানবেতর ত্রুটিমুক্ত।
🔰প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ ও বেদ
যেকোনো কাজ করার পূর্বে তা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। যদি কোনো কর্ম পরীক্ষায় যথার্থ প্রমাণিত হয় তবে তা ধর্ম, নতুবা তা অধর্ম। চালককে যেমন সিগন্যাল দেখে গাড়ি চালাতে হয়, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।
‘বেদ’ শব্দটি জ্ঞান, সত্তা, বিচার ও লাভের বোধক। বেদের মাধ্যমেই আমরা বস্তুর সত্তা ও গুণের জ্ঞান লাভ করি এবং সেই জ্ঞানানুযায়ী কর্ম করে ফল প্রাপ্ত হই। মহর্ষি মনু বলেছেন, “বেদোঽখিলো ধর্মমূলম্” (সমগ্র বেদ ধর্মের মূল)। অতএব, বেদোক্ত কর্মানুষ্ঠানই প্রকৃত ধর্ম।
🔰অধর্ম
▪️অধর্ম: যার স্বরূপ ঈশ্বরের আজ্ঞা পরিত্যাগ করা, পক্ষপাতদুষ্ট ও অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে কেবল নিজের হিত সাধন করা; যা অবিদ্যা, হঠকারিতা, অভিমান ও ক্রূরতা দোষে যুক্ত হওয়ার কারণে বেদবিদ্যার বিরুদ্ধ এবং সকল মানুষের বর্জনীয়, তাকেই অধর্ম বলা হয়।
ধর্মকে বুঝলে অধর্ম বোঝা সহজ ~ ধর্মের বিপরীত যা, তা-ই অধর্ম। ঋষি দয়ানন্দ এই কষ্টিপাথরেই বিভিন্ন মতবাদকে যাচাই করেছেন। অনেক মতবাদে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই (নাস্তিক্য), আবার কোথাও পক্ষপাত ও ঘৃণা বিদ্যমান। যেখানে ঈশ্বরের নামে পশুহত্যা বা মূর্তিপূজার ন্যায় অবিদ্যা প্রকাশ পায়, ঋষি সেগুলোকে ‘ধর্ম’ নয় বরং কেবল ‘মজহাব’ বা ‘মতান্তর’ বলেছেন। এগুলি সর্বজনীন নয়, বরং সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির পথ। অতএব, বিচক্ষণ মানুষের উচিত এই প্রকার মতবাদ পরিত্যাগ করে প্রকৃত ধর্মপথে চলা, যাতে জীবন ব্যর্থ না হয়।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Nomoskar
ReplyDeleteNomoskar
Delete