বাল্মীকি রামায়ণ কেবল একটি ঐতিহাসিক ধর্মাশ্রিত কাব্য নয়; এটি প্রাচীন ভারতীয় সমাজ, নৈতিকতা, রাষ্ট্রনীতি ও দণ্ডবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিন্তু আধুনিক কালে এই মহাকাব্যের বহু ঘটনা বর্তমান মানবাধিকার ও নারীবাদী চিন্তাধারার আলোকে পুনর্বিচার করতে গিয়ে প্রায়ই প্রেক্ষাপটচ্যুত ব্যাখ্যার শিকার হয়। শূর্পণখার নাক ও কান কর্তনের ঘটনা তার অন্যতম উদাহরণ। এই ঘটনাকে অনেকেই সরলভাবে “নারী নির্যাতন” বলে অভিহিত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সিদ্ধান্ত কি শাস্ত্র, ঘটনা ও নৈতিকতার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের ফল, না কি আধুনিক আবেগনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন?
যখন রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ দণ্ডকারণ্যের পঞ্চবটীতে (বর্তমান নাসিক), গোদাবরী নদীর তীরে নির্মিত একটি পর্ণশালায় (খড়ের কুটিরে) বসবাস করছিলেন, তখন শূর্পণখা কামনাবশত রামের নিকট উপস্থিত হয়। রাম তাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে তাঁর ভাই তরুণ ও অবিবাহিত, এবং ইঙ্গিতপূর্ণভাবে (রসিকতার ছলে) তাকে লক্ষ্মণকে আকর্ষণ করার পরামর্শ দেন।
ত্বয়া সহ চরিষ্যামি নিঃসপত্না যথাসুখম্॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.১৬
অর্থাৎ, “আজ আমি তোমার চোখের সামনেই এই মানবী নারীকে ভক্ষণ করব, তারপর সহপত্নীর ঝামেলা ছাড়াই তোমার সঙ্গে সুখে বিচরণ করব”, এই কথা শূর্পণখা রামকে বলল।
বিগৃহ্য রামঃ কুপিতস্ততো লক্ষ্মণমব্রবীৎ॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.১৮
অর্থাৎ, সীতার দিকে মৃত্যুর ফাঁসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত সেই শূর্পণখাকে প্রতিহত করে, মহাবলশালী ও তেজস্বী রাম ক্রুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মণকে বললেন।
ন কার্যঃ পশ্য বৈদেহীং কথঞ্চিৎ সৌম্য জীবতীম্॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.১৯
অর্থাৎ, “হে সৌমিত্র! এই নিষ্ঠুর ও অনার্যদের সঙ্গে কোনো প্রকার রসিকতা করা উচিত নয়। দেখো বৈদেহী কোনোভাবে এখনও জীবিত আছে।”
রাক্ষসীং পুরুষব্যাঘ্র বিরূপয়িতুমর্হসি॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.২০
অর্থাৎ, “এই বিকৃত, চরিত্রহীন, উন্মত্ত ও বৃহদুদরা রাক্ষসীকে বিকৃত করাই তোমার পক্ষে সমুচিত হবে, হে ব্যাঘ্রপুরুষ।” এইভাবে রাম লক্ষ্মণকে নির্দেশ দিলেন।
উদ্ধৃত্য খড্গং চিচ্ছেদ কর্ণনাসে মহাবলঃ॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.২১
অর্থাৎ, রামের এই কথা শুনে, তাঁর সামনেই ক্রুদ্ধ লক্ষ্মণ তরবারি উত্তোলন করে সেই শূর্পণখার নাক ও কান কেটে ফেললেন।
যথাগতং প্রদুদ্রাব ঘোরা শূর্পণখা বনম্॥
বাল্মীকি রামায়ণ ৩.১৮.২২
অর্থাৎ, নাক ও কান কর্তিত হয়ে শূর্পণখা ভয়ঙ্করভাবে উচ্চস্বরে চিৎকার করতে করতে, যেভাবে সে এসেছিল, সেভাবেই দ্রুত বনমুখে পালিয়ে গেল।
১. লিঙ্গের কারণে সহিংসতা,
২. অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও শাস্তি, অথবা
৩. ক্ষমতার অপব্যবহার।
কিন্তু শূর্পণখার ক্ষেত্রে এই তিনটির কোনোটিই পূর্ণরূপে প্রযোজ্য নয়। তিনি নারী ছিলেন বটে, কিন্তু তার দণ্ডের কারণ ছিল তার লিঙ্গ নয়; তার কর্ম। তিনি ছিলেন আগ্রাসী, তিনি হত্যার হুমকি দেন এবং বাস্তব আক্রমণের চেষ্টা করেন। ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে, অপরাধীর লিঙ্গ কখনোই তাকে দায়মুক্ত করতে পারে না।
শাস্ত্রীয় দণ্ডনীতির দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রে দণ্ডের উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ নয়; বরং সংশোধন, প্রতিরোধ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা।
উত হন্তি পূর্বাসিনং প্রত্যাদায়াপর ইষ্বা।
উত পূর্বস্য নিঘ্নতো নি হন্ত্যপরঃ প্রতি ॥
অথর্ববেদ ১০।১।২৭
অনুবাদঃ অতি শ্রেষ্ঠ মানবই প্রথমে আঘাতকারীকে বাণ দ্বারা প্রত্যাঘাত করে । অতি শ্রেষ্ঠ মানবই প্রথমে আঘাতকারীকে নিরন্তর হনন করে ।
গুরুং বা বালবৃদ্ধৌ বা ব্রাহ্মণং বা বহুশ্রুতম্ ।
আততায়িনমায়ান্তং হন্যাদেবাবিচারয়ন্ ॥ ৩৫০ ॥
নাততায়িবধে দোষো হন্তুর্ভবতি কশ্চন ।
প্রকাশং বাঽপ্রকাশং বা মন্যুস্তন্মন্যুমৃচ্ছতি ॥ ৩৫১ ॥
মনুস্মৃতি ৮ম অধ্যায়
গুরু হোক বা পুত্রাদি বালক, পিতা প্রভৃতি বৃদ্ধ, ব্রাহ্মণ অথবা বহুশ্রুত বিদ্বান, যে কেউ হোক না কেন, যিনি ধর্ম পরিত্যাগ করে অধর্মচারী হবেন এবং বিনা অপরাধে অপরকে হত্যা করবেন তাকে বিনা বিচারে বধ করবেন অর্থাৎ বধ করার পর বিচার করবেন । দুবৃর্ত্তদের প্রকাশ্যে বধ করলে হন্তার পাপ হয় না। কারণ, ক্রুদ্ধকে ক্রোধ দ্বারা বধ করাকে ক্রোধের সাথে ক্রোধের যুদ্ধ মনে করতে হবে ।
১. দণ্ডবিধি আইনের ৯৯ ধারায় আরোপিত নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে নিজের জানমাল, অপরের জানমাল, কিংবা সরকারী সম্পত্তির যে কোন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য আক্রমণকারীর উপর যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় তাকে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার বলা হয়। দণ্ডবিধি আইনের ৯৬ ও ৯৭ ধারা।
২. দণ্ডবিধি আইনের ৯৯ ধারায় উল্লেখিত ব্যতিক্রমসমূহ ছাড়া আক্রমনকারীর প্রতি আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগ করে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো যায়।
দেহের ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেঃ
(১) এমন আঘাত বা আক্রমণ যা প্রতিহত না করলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুই হবে অনুরূপ আক্রমণের পরিণতি।
(২) এমন আঘাত বা আক্রমণ যা প্রতিহত না করলে গুরুতর জখমের আশংকা অনিবার্য।
(৩) ধর্ষণের অভিপ্রায়ে আক্রমণ।
(৪) অস্বাভাবিক বা অপ্রাকৃত কাম লালসা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে আক্রমণ।
(৫) মনুষ্যহরণ বা অপহরণের অভিপ্রায়ে আক্রমণ।
(৬) এমনভাবে আটক রাখার উদ্দেশ্যে আক্রমণ যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি সরকারী কর্তৃপক্ষসমূহের সাহায্য নিতে না পারে।
চুরি, দস্যুতা, ডাকাতি কিংবা অনধিকার প্রবেশ করে সম্পত্তি হরণের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করলে যা ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার প্রয়োগ না করলে মৃত্যু বা গুরুতর জখমই হবে উক্ত আক্রমণের পরিণতি।
কোন তাবু, জলযান, বাসগৃহ বা সম্পত্তি রক্ষার জন্য ব্যবহৃত স্থানে অগ্নি সংযোগ করে সম্পত্তি লাভের জন্য আক্রমণ করলে দণ্ডবিধি আইনের ১০৩ ধারা।
ইহা ছাড়া কোন নিরাপরাধ ব্যক্তির প্রতি ক্ষতি সাধিত হবার সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও মারাত্মক আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা অধিকার প্রয়োগ করে মৃত্যু ঘটালেও কোন অপরাধ হবে না। দণ্ডবিধি আইনের ১০৬ ধারা ।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
