পবিত্র বেদ অনুযায়ী মানবমাত্রে যজ্ঞে ও উপাসনায় অংশগ্রহণের অধিকার
পবিত্র বেদ মানবজাতির সর্বজনীন কল্যাণের এক অক্ষয় জ্ঞানভাণ্ডার, যেখানে কোনো সংকীর্ণতা, ভেদবুদ্ধি বা একচেটিয়া অধিকারের স্থান নেই। এখানে ধর্ম, উপাসনা ও যজ্ঞ ~ এই সকল আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কার্যাবলিকে কেবল বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়নি; বরং সমগ্র মানবসমাজের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বেদের মন্ত্রসমূহে বারংবার ‘পঞ্চ-জনাঃ’ অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে যজ্ঞীয় কর্মে অংশগ্রহণ করে এবং বিশ্বকল্যাণে আত্মনিয়োগ করে।
এই মন্ত্রগুলোরে একদিকে যেমন সর্বদিক থেকে কল্যাণময় শক্তির আহ্বান, তেমনি অন্যদিকে আছে সকল মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ডাক। এখানে ‘যজ্ঞ’ কেবল অগ্নিহোত্র বা আচারবিধি নয়, বরং সৃজনশীল কর্ম, উৎপাদন, সহযোগিতা ও নৈতিক জীবনযাপনের প্রতীক। ‘ও৩ম্’ এই শাশ্বত-ধ্বনিকে কেন্দ্র করে সমগ্র মানবজাতিকে এক সূত্রে আবদ্ধ করার যে মহৎ চিন্তা, তা বৈদিক দর্শনের মূলভিত্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ কেবল একটি জাতি, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের সদস্য নয়, সে বিশ্বমানব, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’-এর ধারক।
বিশেষত যজুর্বেদের সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র, এমনকি তথাকথিত অন্ত্যজ পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য বেদের জ্ঞান সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নির্দেশ কেবল ধর্মীয় উদারতারই নয়, বরং একটি শিক্ষিত, সাম্যভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণের আহ্বান বহন করে।
এই বেদমন্ত্রসমূহে 'পঞ্চজনাঃ' পদটি গুরুত্বপূর্ণ। মহর্ষি যাস্ক তার নিঘণ্টুতে [২।৩] ২৫টি পদের উল্লেখ করেছেন যা 'মনুষ'বাচক বা মানুষ বুঝায়। এরমধ্যে যেমন বহুল পরিচিত 'মনুষ্যাঃ', 'নরঃ' আছে তেমনি 'হরয়ঃ', 'আয়বঃ' ইত্যাদি জনসাধারণে অপরিচিত শব্দও আছে। নিরুক্তের [৩।৭] মতে, 'পঞ্চজনীনয়া বিশা' এখানে ব্যাখ্যাতে গন্ধর্ব=ব্রহ্মচারী; পিতর=বানপ্রস্থী, দেব=সন্ন্যাসী, অসুর = গৃহস্থ বা চপল, পতিত, নিন্দিত বা প্রাণবান; রাক্ষস অর্থাৎ আশ্রম চ্যূত। কিংবা ঔপমন্যবের মতে, চারবর্ণ বা নিষাদ = বর্ণাশ্রম চ্যূত বা পাপী। তবে, ব্যাখ্যা যেদিকেই হোক না কেন, মন্ত্রে তা মানবমাত্রেরই বাচক তা স্পষ্ট। নতুবা কেনই বা তা ২৫টি মানববাচকের সমার্থক শব্দ হবে, গন্ধর্বাদিও মানুষেরই প্রকারভেদ এটিও এখানে সিদ্ধ হয়। স্কন্দস্বামী তাই বলেছেন, 'সমানাধিকরণ' অর্থাৎ সবাইকেই এখানে সমদৃষ্টিতে তথা মানব হিসেবেই সমতুল্য ধরা হয়েছে। অমরকোষে [২।৬।১] 'পঞ্চভির্ভূতৈর্জাতাঃ পঞ্চজনাঃ' অর্থাৎ পঞ্চভূতে জাত বা দেহ যাদের তাদের 'পঞ্চজনাঃ' বলা হয়েছে। এই মত ক্ষীরস্বামীও অষ্টাধ্যায়ীর [২।১।৭৪] ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন।
আ পশ্চাতান্নাসত্যা পুরস্তাদাশ্বিনা যাতমধরাদুদক্তাৎ ।
আ বিশ্বতঃ পাঞ্চজন্যেন রায়া যূয়ং পাত স্বস্তিভিঃ সদা নঃ ॥
ঋগ্বেদ ৭.৭২.৫
→ হে সত্যের আলোক এবং চিরন্তন শাশ্বত মূল্যবোধের পবিত্র অগ্রদূতগণ! আপনারা আমাদের পশ্চাৎ হতে আসুন, সম্মুখ হতে আসুন, নীচ হতে এবং উপর হতে অর্থাৎ বিশ্বের সকল দিক হতে জীবনের প্রকৃত ঐশ্বর্য নিয়ে পৃথিবীর সকল মানুষের কল্যাণে আবির্ভূত হোন। হে জ্যোতির্ময় ও শ্রেষ্ঠ সম্পদের আধার! আপনারা আমাদের রক্ষা করুন এবং সকল মানুষের জন্য চিরস্থায়ী শান্তি ও মঙ্গল নিশ্চিত করে আমাদের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
তদদ্য বাচঃ প্রথমং মসীয় যেনাসুরাং অভি দেবা অসাম ।
ঊর্জাদ উত যজ্ঞিয়াসঃ পঞ্চ জনা মম হোত্রং জুষধ্বম্ ॥
ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৪
→ আমি অর্থাৎ যজমান যজ্ঞের মাধ্যমে সামষ্টিক জীবনের পরিচালক শক্তি; আমি এখন সেই আদি, সর্বোচ্চ এবং শাশ্বত শব্দ 'ও৩ম্'-কে স্মরণ ও ধ্যান করছি। এই পবিত্র ধ্বনির প্রভাবেই আমরা যাঁরা দিব্য শক্তিতে নিবেদিত প্রাণ, আমাদের সমস্ত অশুভ ও প্রতিকূল শক্তিকে জয় করতে সক্ষম হব। পৃথিবীর সেই সকল মানুষ, যাঁরা পুষ্টিকর আহার গ্রহণ করেন এবং যজ্ঞের পবিত্র ভাবে মহৎ ও সৃজনশীল কাজে ঐক্যবদ্ধ হন, এবং বিশ্বের সকল মানুষ ~ আপনারা সকলে শ্রবণ করুন এবং আমার এই যজ্ঞকর্মের আহ্বানে সাড়া দিন।
পঞ্চ জনা মম হোত্রং জুষন্তাং গোজাতা উত যে যজ্ঞিয়াসঃ ।
পৃথিবী নঃ পার্থিবাৎপাত্বংহসোঽন্তরিক্ষং দিব্যাৎপাত্বস্মান্ ॥
ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৫
→ পৃথিবীর সকল সন্তান, দিব্য বেদবাণীর অনুরাগী এবং সৃজনশীল উৎপাদন ও সম্মিলিত কর্মে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ ~ আপনারা বিশ্বের সকলে আমার এই যজ্ঞীয় কর্মের আহ্বানে সাড়া দিন। মাতা পৃথিবী যেন আমাদের পার্থিব সমস্ত পাপ ও অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করেন এবং এই অনন্ত আকাশ যেন আমাদের মহাকাশ বা ঊর্ধ্বলোক থেকে আসা সকল বিপদ হতে সুরক্ষিত রাখে।
বৈদিক সমাজ ছিল অত্যন্ত কর্মমুখী। এখানে উৎপাদন ও সৃজনশীলতাকে কেবল জাগতিক কাজ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে একটি 'যজ্ঞ' হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আবার মানুষের বিপদ দুই ধরনের হতে পারে- একটি এই পৃথিবীর (যেমন সামাজিক কলহ, পাপ বা অশুভ প্রবৃত্তি), অন্যটি মহাকাশ বা প্রকৃতির অজানা উৎস থেকে। এখানে 'Common voice' বলতে সেই শাশ্বত সত্য বা 'ও৩ম্' ধ্বনিকে বোঝানো হয়েছে যা বিশ্বের প্রতিটি কোণায় বিদ্যমান। যারা এই সুরের অনুরাগী, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক নাগরিক বা 'বসুধৈব কুটুম্বকম্'-এর ধারক।
যৎপাঞ্চজন্যয়া বিশেন্দ্রে ঘোষা অসৃক্ষত ।
অস্তৃণাদ্বর্হণা বিপো৩ঽর্যো মানস্য স ক্ষয়ঃ ॥
ঋগ্বেদ ৮.৬৩.৭
→ যখন বিশ্বের সকল মানুষ সম্মিলিত হয়ে সেই পরমেশ্বরের প্রতি তাঁদের প্রার্থনার ধ্বনি উত্থিত করেন, তখন তিনি তাঁর অমোঘ শক্তির দ্বারা তাঁদের সকল শত্রু এবং দুর্ভাগ্যকে প্রতিহত করেন। প্রজাদের সেই একই অধীশ্বর, যিনি সর্বজ্ঞ এবং পরম প্রভু—তিনিই আমার উপাসনা ও ভক্তিরও মূল কেন্দ্র।
যং ত্বা হোতারং মনসাভি সংবিদুস্ত্রয়োদশ ভৌবনাঃ পঞ্চ মানবাঃ।
বর্চোধসে যশসে সূনৃতাবতে তেভ্যো অগ্নিভ্যো হুতমস্ত্বেতৎ ॥
অথর্ববেদ ৩.২১.৫
→ হে পরমেশ্বর! যে তোমাকে দাতা ও গ্রহীতারূপে সঠিকভাবে জানে সে ত্রয়োদশ প্রকার (১২ মাস+ ১ অধিমাস) ও সর্বমানবের মধ্যে মননশীলরা মননের দ্বারা তোমাকে উপলব্ধি করে। সেই জ্ঞানীর জন্য, যে তেজস্বী, যশস্বী এবং সত্যবাণীর অধিকারী, তোমার উদ্দেশে এই আত্মাহুতি (আত্মসমর্পণ) প্রদান করা হোক।
মিত্রায় পঞ্চ যেমিরে জনা অভিষ্টিশবসে।
স দেবান্বিশ্বান্বিভর্তি॥
ঋগ্বেদ ৩.৫৯.৮
→ বিশ্বের সকল মানুষ সেই জ্যোতির্ময় প্রেম ও মৈত্রীর অধীশ্বর পরমাত্মার প্রতি তাঁদের সেবা ও আহুতি নিবেদন করেন। তিনি সেই পরম প্রভু, যিনি সমস্ত কল্যাণকর শক্তি এবং সুরক্ষার অধিকারী। সেই মৈত্রীর অধিপতি পরমাত্মাই এই প্রকৃতি এবং মানবতার সমস্ত উজ্জ্বল, উদার ও সৃজনশীল শক্তিকে ধারণ ও লালন করেন।
যথেমাং বাচং কল্যাণীমা অবদানি জনেভ্যঃ। ব্রহ্মরাজন্যাভ্যাং শূদ্রায় চার্যায় চ স্বায় চারণায় চ। প্রিয়ো দেবানাং দক্ষিণায়ৈ দাতুরিহ ভূয়াসময়ং মে কামঃ সমৃধ্যতামুপ মা দো নমতু॥
যজুর্বেদ ২৬.২
→ হে মনুষ্যগণ! আমি ঈশ্বর ~ যেমন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং তাঁদের নিজের স্ত্রী, সেবকাদি এবং উত্তম লক্ষণযুক্ত অন্ত্যজের জন্য এবং এই সকল উক্ত মনুষ্যদের জন্য, এই সংসারে প্রত্যক্ষকৃত কল্যাণকারিণী চারবেদরূপ বাণীর উপদেশ করি, সেভাবে আপনারাও উত্তম প্রকার উপদেশ করবেন।যেমন আমি দানদাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্বানদের দক্ষিণা অর্থাৎ দানাদির জন্য মনোহর প্রিয় হই এবং আমার এই কামনা উত্তমতাপূর্বক বৃদ্ধি হোক, তথা আমাকে সেই পরোক্ষ সুখ প্রাপ্ত হোক, তেমন আপনারাও হবেন এবং সেই কামনা তথা সুখ আপনিও লাভ করবেন।
মন্ত্রটি স্পষ্টভাবে ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে শূদ্র এবং অতি-শূদ্র (অন্ত্যজ) পর্যন্ত সকলের জন্য বেদের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান সূর্যের আলোর মতো সবার জন্য সমান। মন্ত্রে 'স্বায়' (নিজের লোক) এবং 'অরণায়' (যাঁরা অপরিচিত বা দূরবর্তী) উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঈশ্বর কেবল নিজে জ্ঞান দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি আমাদের আদেশ দিয়েছেন, যেন আমরাও একইভাবে সবার কাছে এই জ্ঞান পৌঁছে দিই। এটি একটি শিক্ষিত ও সংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ার ডাক। এখানে 'দান' বা 'দক্ষিণা' বলতে কেবল অর্থ বোঝানো হয়নি, বরং বিদ্যার দান এবং সদ্ব্যবহারকে বোঝানো হয়েছে। যখন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান বিতরণ করে, তখন সে বিদ্বানদের কাছে প্রিয় হয় এবং আধ্যাত্মিক সুখ লাভ করে।
উপরে উক্ত মন্ত্রসমূহের আলোচনায় সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, বেদ মানবজাতিকে এক অবিভাজ্য ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চায়। এখানে যজ্ঞ ও উপাসনা কোনো গোষ্ঠীবিশেষের একচেটিয়া অধিকার নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। যে ব্যক্তি সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে এই বৈদিক সাধনায় অংশগ্রহণের যোগ্য।
বেদের এই সার্বজনীন আহ্বান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বরপ্রদত্ত জ্ঞান সূর্যের আলোর ন্যায় যা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত। অতএব, এই জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। যখন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান বিতরণ করে, পরস্পরের কল্যাণে কাজ করে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে সৃজনশীল কর্মে নিয়োজিত হয়, তখনই প্রকৃত ‘যজ্ঞ’ সম্পন্ন হয় এবং মানবজীবন তার পূর্ণতা লাভ করে।
এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে একত্রে এগিয়ে চলি, তবে এক সত্য, ন্যায়, মৈত্রী ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বসমাজ গঠন সম্ভব। এটাই বেদের চিরন্তন আহ্বান ~ সর্বজনের জন্য জ্ঞান, সর্বজনের জন্য উপাসনা, এবং সর্বজনের জন্য কল্যাণ।
শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
