পবিত্র
বেদ মানবজীবনের প্রতিটি দিককে এক গভীর দার্শনিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টিতে
বিচার করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘শ্রম’ কেবল জীবিকা নির্বাহের উপায় নয়;
বরং এটি মানবজীবনের মর্যাদা, উন্নতি এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের প্রধান
মাধ্যম। বেদে কর্মকে ‘সুকৃত’ অর্থাৎ জ্ঞানপূর্ণ ও কল্যাণময় কর্ম হিসেবে
অভিহিত করা হয়েছে, যা মানুষের চরিত্র গঠন, সমাজ নির্মাণ এবং বিশ্বকল্যাণের
ভিত্তি স্থাপন করে।
বেদমন্ত্রসমূহে
এক সুস্পষ্ট আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে মানুষ যেন অলসতা ত্যাগ করে কর্মমুখী,
উদ্যমী ও সচেতন জীবন গ্রহণ করে। এখানে কর্ম ও জ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; জ্ঞানহীন কর্ম যেমন অন্ধ, তেমনি কর্মহীন জ্ঞান
নিষ্ফল। বেদ মানবকে শিক্ষা দেয় যে, চিন্তা, বুদ্ধি ও পরিকল্পনার সঙ্গে
যুক্ত শ্রমই প্রকৃত উন্নতির পথ। একইসঙ্গে এই মন্ত্রগুলি ঘোষণা করে যে,
শ্রমের ফল অবশ্যম্ভাবী—কৃতকর্ম কখনো বিনষ্ট হয় না, বরং যথাসময়ে তার ফল
প্রদান করে।
এই
দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা বেদে অত্যন্ত উচ্চে প্রতিষ্ঠিত।
যে ব্যক্তি কর্মঠ, উদ্যোগী, এবং কল্যাণকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে তিনিই
প্রকৃত অর্থে সম্মান ও সফলতার অধিকারী। অলসতা, কু-কর্ম এবং নিষ্ক্রিয়তা
এখানে নিন্দিত; অপরদিকে অধ্যবসায়, দ্রুততা, বুদ্ধিপ্রয়োগ এবং সৎকর্মকে
সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
১. ক্রত্বা কৃতঃ সুকৃতঃ কর্তৃভির্ভূৎ
ঋগ্বেদ ৭.৬২.১
= যা জেনেবুঝে করা হয়েছে সেটিই 'সুকৃত'।
২. ততং মে অপস্তদু তায়তে পুনঃ
ঋগ্বেদ ১.১১০.১
= আমি আমার কর্মকে বিস্তৃত করি।
৩. অপ্নস্বতীমশ্বিনা বাচমস্মে
ঋগ্বেদ ১.১১২.২৪
= আমাদের কথাকে কর্মে পরিণত করো।
৪. ন বাং জূর্যন্তি পূর্ব্যা কৃতানি
ঋগ্বেদ ১.১১৭.৪
= হে স্ত্রী-পুরুষ! তোমাদের কৃত কর্মের ফল ভোগ না করে ক্ষয় হবে না।
৫. স ঈং মমাদ মহি কর্ম কর্তবে
ঋগ্বেদ ২.২২.১
= পরমাত্মা মানুষকে মহৎকর্মের জন্য আনন্দিত করেছেন।
৬. মা তন্তুশ্ছেদি বয়তো ধিয়ং মে
ঋগ্বেদ ২.২৮.৫
= কর্ম ও জ্ঞানের সম্পর্ক-সূত্র ছিন্ন না হোক।
৭. মা মাত্রা শার্যপসঃ পুর ঋতোঃ
ঋগ্বেদ ২.২৮.৫
= সময়ের আগেই আমাদের কর্মের সীমা শেষ না হোক।
৮. তূর্ণী রথঃ সদা নবঃ
ঋগ্বেদ ৩.১১.৫
= ক্রিয়াশীল দেহই নবীন থাকে।
৯. বহূনি মে অকৃতা কর্ত্বানি
ঋগ্বেদ ৪.১৮.২
= অনেক কাজ রয়েছে যা করা হয়েছে ও আমাকে করতে হবে।
১০. বয়ং দেবেষু সুকৃতঃ স্যাম
ঋগ্বেদ ৫.৪.৮
= আমরা বিদ্বানদের মধ্যে শুভকর্মকর্তা যেন হই।
১১. অনু ক্রামেম ধীতিভিঃ
ঋগ্বেদ ৫.৫৩.১১
= আমরা কর্মের মাধ্যমে অগ্রগতি লাভ করব।
১২. মা তৎকর্ম বসবো যচ্চয়ধ্বে
ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭
= আমরা সেই কর্ম যেন না করি, যার নিষেধ করা হয়েছে।
১৩. সাধন্তামুগ্র নো ধিয়ঃ
ঋগ্বেদ ৬.৫৩.৪
= হে প্রভু! আমাদের কর্ম সফল হোক।
১৪. অপি ক্রতুং সুচেতসং বতেম
ঋগ্বেদ ৭.৩.১০
= আমরা শুভ জ্ঞানের সঙ্গে কর্ম করতে থাকব।
১৫. তরণিরিজ্জয়তি
ঋগ্বেদ ৭.৩২.৯
= যে ব্যক্তি দ্রুত কাজ করে সে-ই বিজয় লাভ করে।
১৬. ন দেবাসঃ কবত্নবে
ঋগ্বেদ ৭.৩২.৯
= কুৎসিত কর্মকর্তাকে বিদ্বানগণ সহযোগিতা করে না।
১৭. তরণিরিৎসিষাসতি বাজং পুরন্ধ্যা যুজা
ঋগ্বেদ ৭.৩২.২০
= যে ব্যক্তি বুদ্ধি প্রয়োগ করে দ্রুত কাজ করে সে-ই ঐশ্বর্য লাভ করে।
১৮. অয়ন্নর্থানি কৃণবন্নপাংসি
ঋগ্বেদ ৭.৬৩.৪
= যে কর্ম করে সে-ই লক্ষ্য অর্জন করে।
১৯. সখায়ঃ ক্রতুমিচ্ছত
ঋগ্বেদ ৮.৭০.১৩
= হে বন্ধু! কর্ম করতে ইচ্ছা পোষণ করো।
২০.সুকৃত্তমা মধুনো ভক্ষমাশত
ঋগ্বেদ ৯.৮৩.৪
= শুভ কর্মের ফল মধুর হয়।
২১. শিশীহি মা শিশয়ং ত্বা শৃণোমি
ঋগ্বেদ ১০.৪২.৩
= হে প্রভু! তুমি আমাকে কর্মঠ করো।
২২. অপ্নস্বতী মম ধীরস্তু শক্র
ঋগ্বেদ ১০.৪২.৩
= হে প্রভু! আমার বুদ্ধি কর্মময় হোক।
২৩. বিশ্বশম্ভূরবসে সাধুকর্মা
ঋগ্বেদ ১০.৮১.৭
= যে ভালো কাজ করে সে বিশ্বের কল্যাণ করে ও নিজেকেও সুরক্ষিত রাখে।
২৪. অশ্রমণা অশৃথিতা অমৃত্যবঃ
ঋগ্বেদ ১০.৯৪.১১
= যে ক্লান্ত হয় না, শিথিল হয় না - তাকে মৃত্যু আবদ্ধ করে না।
২৫. ন ঋতে শ্রান্তস্য সখ্যায় দেবাঃ
ঋগ্বেদ ৪.৩৩.১১
= পরিশ্রম ছাড়া দৈবীতত্ত্বও সহায়ক হয় না।
উপরিউক্ত
বেদমন্ত্রগুলোর সমষ্টিগত ভাবার্থ আমাদের এক সুস্পষ্ট জীবনদর্শনের দিকে
পরিচালিত করে, যেখানে শ্রমই উন্নতির মূলমন্ত্র এবং কর্মই জীবনের প্রকৃত
সাধনা। যে ব্যক্তি নিরলস পরিশ্রম করে, জ্ঞানকে কাজে রূপান্তরিত করে এবং
কল্যাণকর কর্মে নিজেকে নিবেদিত রাখে, সে-ই প্রকৃত অর্থে সফল ও সমৃদ্ধ জীবন
লাভ করে। বেদ এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে যে, পরিশ্রম ব্যতীত কোনো প্রকার
উন্নতি বা দৈব সহায়তাও লাভ করা যায় না।
শ্রমজীবী
মানুষের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে এক গভীর মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা
করে, যেখানে প্রতিটি কর্মই সম্মানজনক, প্রতিটি শ্রমই পবিত্র। যে ব্যক্তি
কর্মের মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য অর্জন করে, সে কেবল নিজের উন্নতি সাধন করে না;
বরং সমগ্র সমাজের কল্যাণে অবদান রাখে। এইভাবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের
উন্নতির সেতুবন্ধন ঘটে।
অতএব,
বেদের আহ্বান স্পষ্ট—মানুষ যেন কর্মবিমুখ না হয়ে কর্মনিষ্ঠ হয়, অলসতা
ত্যাগ করে উদ্যমী হয়, এবং সৎ ও সৃজনশীল শ্রমের মাধ্যমে নিজের ও বিশ্বের
মঙ্গল সাধন করে। এই আদর্শকে জীবনে ধারণ করলেই মানবজীবন সত্যিকার অর্থে
সুন্দর, সমৃদ্ধ ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
