ওঙ্কার উপাসনা
ঈশ্বর সাধনায় উপায়
‘‘অবতেষ্টিলোপশ্চ॥ (উণাদিসূত্র ১।১৪২)’’ অনুসারে ‘অব রক্ষণে’ ধাতুর সঙ্গে ‘মন্’ প্রত্যয় যোগে এবং প্রত্যয়ের ‘টি’ ভাগ লোপ হয়ে “ও৩ম্” শব্দটি সিদ্ধ হয়। ওঙ্কার শব্দের এই গঠনটি ব্যাকরণ অনুসারে। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে এর গঠন অন্যভাবে নিরূপণ করা হয়েছে। গোপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, “কো ধাতুরিতি আপৃধাতুঃ, অবতিমপ্যেকে। রূপসামান্যাদর্থসামান্যং নেদীয়ঃ তস্মাদপি ওঙ্কারঃ, সর্বমাপ্নোতীত্যর্থঃ॥ (গোপথ০ পূর্ব০ প্রপা০ ০১ ক০ ২৬)” ওঙ্কারের ধাতু কী? √আপৃ ধাতু। কেউ বলেন √অব্ ধাতু। রূপগত সাদৃশ্যের চেয়ে অর্থগত সাদৃশ্য পদের অধিক নিকটবর্তী। সেহেতু ‘আপ্’ ধাতু থেকে ‘ওঙ্কার’ গঠিত হয়ে সকলকে গ্রহণ করেন অর্থাৎ যিনি সর্বত্র ব্যাপক, তিনিই ওঙ্কার। এ ছাড়াও ওঙ্কার শব্দের গঠন মন্বাদি স্মৃতিকার বর্ণনা ভিন্নভাবে করেছেন। তাঁদের বক্তব্য যে, অ-কার, উ-কার ও ম-কার মিলে “ও৩ম্” গঠিত হয়। যথা—“অকারঞ্চাপ্যুকারঞ্চ মকারঞ্চ প্রজাপতিঃ (মনু০ ২।৭৬)।”
‘‘ওমভ্যাদানে॥ (অষ্টা০ ৮।২।৮৭)” এর নিয়ম অনুসারে, যজ্ঞে মন্ত্রের উচ্চারণ করার সময়, ও৩ম্ শব্দ মন্ত্রের প্রারম্ভে যুক্ত করা হয় এবং ‘‘প্রণবষ্টেঃ॥ (অষ্টা০ ৮।২।৮৯)” এর নিয়ম অনুসারে মন্ত্রের ‘টি’ এর জায়গায় প্রণব অর্থাৎ “ও৩ম্” এর আদেশ হয়। “অচোঽন্ত্যাদি টি॥ (অষ্টা০ ১।১।৬৪)” এর নিয়ম অনুসারে কোনো বাক্যের ভেতর উপস্থিত অচ্ এর ভেতর যেটি অন্তিম অচ্ হয়, তা যে শব্দের মধ্যে থাকে, সেই শব্দেরই ‘টি’ সংজ্ঞা হয়। যেমন বেদের এই মন্ত্রে “অপাং রেতাংসি জিন্বতি (ঋ০ ৮।৪৪।১৬)” এর জায়গায় “অপাং রেতাংসি জিন্বতোম্” হয়। এভাবে আদি ও অন্তে ও৩ম্ এর বৃদ্ধির কারণে ঋগ্বেদের প্রথম ঋক্ এরূপ পঠিত হয়— “ও৩ম্ অগ্নিমীড়ে পুরোহিতং য়জ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্। হোতারং রত্নধাতমোম্॥”
বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ও৩ম্ ক্রতো স্মর ক্লিবে স্মর কৃতং স্মর॥
[যজুর্বেদ ৪০.১৫]
সরলার্থঃ হে কর্মশীল জীব! তুমি শরীর ত্যাগ করার সময় ‘ও৩ম্’ – এই নামবাচ্য ঈশ্বরকে স্মরণ করো, নিজের সামর্থ্য প্রাপ্তির জন্য পরমাত্মা ও নিজের স্বরূপকে স্মরণ করো, নিজের কৃতকর্মকে স্মরণ করো। এখানে (এই শরীরে) বিদ্যমান ধনঞ্জয়াদিরূপ বায়ু কারণরূপ বায়ুকে, আর কারণরূপ বায়ু অবিনাশী কারণকে (প্রকৃতিকে) ধারণ করে। অতঃপর এই নশ্বর শরীর অন্তে ভস্মে পরিণত হয়— এরূপ জানবে।
হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্।
য়োঽসাবাদিত্যে পুরুষঃ সোঽসাবহম্। ও৩ম্ খং ব্রহ্ম॥
[যজুর্বেদ ৪০.১৭]
সরলার্থঃ হে মনুষ্যগণ! জ্যোতির্ময়, সবার রক্ষক আমার দ্বারা অবিনাশী সৎরূপ কারণের (প্রকৃতির) আচ্ছাদিত মুখের তুল্য উত্তম অঙ্গ প্রকাশিত হয়। যিনি ওই প্রাণ বা সূর্যমণ্ডলে পূর্ণ পরমাত্মা, সেই তিনি পরোক্ষরূপে আমিই। আমি আকাশতুল্য ব্যাপক এবং গুণ, কর্ম ও স্বরূপের দৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা মহান। আমি সমস্ত জগতের রক্ষক ‘ও৩ম্’ — এরূপ জানবে।
মনো জূতির্জুষতামাজ্যস্য বৃহস্পতির্যজ্ঞমিমং তনোত্বরিষ্টং যজ্ঞং সমিমন্দধাতু।
বিশ্বে দেবাসঽইহ মাদয়ন্তামো৩ম্প্রতিষ্ঠ॥
[যজুর্বেদ ২.১৩]
সরলার্থঃ মন অত্যন্ত দ্রুতগামী এবং মুহূর্তের মধ্যে সর্বত্র বিচরণশীল। আমার এই মন যেন যজ্ঞের পবিত্র আহুতি ও শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়। এই বিশাল বিশ্বের অধিপতি হে বৃহস্পতি! আপনি আমাদের এই অস্তিত্বের যজ্ঞকে (জীবন-যজ্ঞ) আরও প্রসারিত ও মহিমান্বিত করুন। ঈশ্বর যেন আমাদের এই যজ্ঞকে হিংসামুক্ত রেখে প্রেম ও শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাখেন। প্রকৃতির শক্তিসমূহ যেন সর্বদা সজীব ও নবীন থাকে এবং যজ্ঞের মাধ্যমে সকল সৎ মানুষ যেন সর্বদা আনন্দিত হন। অস্তিত্বের আদি ধ্বনি, সেই শাশ্বত শব্দ এবং ঈশ্বরের নিজ নাম—‘ও৩ম্’-এর শক্তিতে অটল ও স্থির হোন। ‘ও৩ম্’ এবং 'যজ্ঞ'ই হোক আমাদের পরম আশ্রয়। আমাদের হৃদয়ে এই সত্য সদা জাগ্রত থাকুক।
ধনুর্গৃহীত্বৌপনিষদং মহাস্ত্রং শরং হ্যুপাসানিশিতং সন্ধয়ীত।
আয়ম্য তদ্ভাবগতেন চেতসা লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি ॥
মুণ্ডক উপনিষদ ২।২।৩
সরলার্থঃ হে প্রিয় শিষ্য! উপনিষদে প্রতিপাদিত মহাস্ত্র ধনু গ্রহণ করে তার ওপর উপাসনা দ্বারা তীক্ষ্ণ বাণ সন্ধান করো। ধনুকে আকর্ষণ করে ব্রহ্মগত ভাবপূর্ণ (অক্ষর ব্রহ্মের ধ্যানে লীন) চিত্তে সেই অক্ষররূপ লক্ষ্যকে বিদ্ধ করো।
অর্থাৎ, যে মনুষ্য ব্রহ্মরূপ অতি সূক্ষ্ম লক্ষ্যকে বিদ্ধ করতে চায়, সে প্রথমে উপনিষদে প্রসিদ্ধ প্রণবরূপ ধনু গ্রহণ করবে। এরপর তাতে উপাসনার (নিরন্তর ধ্যানের) দ্বারা তীক্ষ্ণ আত্মরূপ বাণকে সংযুক্ত করবে। তারপর নিজের চিত্তের বৃত্তিকে তদ্ভিন্ন পদার্থসমূহ থেকে নিরোধ করে ব্রহ্মরূপ লক্ষ্যে প্রবিষ্ট করবে। এরূপ করলে নিঃসন্দেহে নিজের লক্ষ্যকে ভেদ করতে পারবে অর্থাৎ ব্রহ্মকে জেনে অভীষ্ট সিদ্ধ করবে। তাৎপর্য এই যে, প্রণব (ওঙ্কার) অবলম্বনে উপাসনা দ্বারাই পরমাত্মার সাক্ষাৎকার হয়।
প্রণবো ধনুঃ শরো হ্যাত্মা ব্রহ্ম তল্লক্ষ্যমুচ্যতে।
অপ্রমত্তেন বেদ্ধব্যং শরবত্তন্ময়ো ভবেৎ ॥
মুণ্ডক উপনিষদ ২।২।৪
সরলার্থঃ ওঙ্কারই ধনু, জীবাত্মাই বাণ এবং ব্রহ্মই উক্ত বাণের লক্ষ্য। প্রমাদরহিত চিত্ত দ্বারা সেই লক্ষ্যকে বিদ্ধ করতে হবে। অতঃপর বাণের ন্যায় তন্ময় (লক্ষ্যে লীন) হবে।
মুক্তিকামী পুরুষের উচিত প্রথমে ওঙ্কাররূপ ধনুকে আত্মরূপ বাণ আরোপণ করা অর্থাৎ ওঙ্কারের নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানের অভ্যাস দ্বারা নিজের আত্মাকে বলিষ্ঠ করা। তারপর তিনি সংস্কৃত মনের দ্বারা বিষয়রূপ প্রমাদ থেকে মুক্ত এবং একাগ্রচিত্ত হয়ে বাচকের (প্রণবের) সহায়তা দ্বারা বাচ্যরূপ লক্ষ্যকে (ব্রহ্মকে) আত্মরূপ বাণ দ্বারা বিদ্ধ করবেন। যেরূপ বাণ লক্ষ্যে পৌঁছে তন্ময় হয়ে যায়, তদ্রূপ জীবাত্মাও ব্রহ্মাকার-বৃত্তি দ্বারা নিজেকে তন্ময় করবে। অর্থাৎ এইপ্রকারে নিদিধ্যাসন করবে যেন তাঁর মনোবৃত্তি বিজাতীয় প্রত্যয়রহিত হয়ে ব্রহ্মাকার হয়ে যায়। তখনই জীব মোক্ষের অধিকারী হতে পারবে।
অরা ইব রথনাভৌ সংহতা য়ত্র নাড্যঃ স এষোঽন্তশ্চরতে বহুধা জায়মানঃ।
ওমিত্যেবং ধ্যায়থ আত্মানং স্বস্তি বঃ পারায় তমসঃ পরস্তাৎ॥
মুণ্ডক উপনিষদ ২।২।৬
সরলার্থঃ যেরূপ রথচক্রের নাভিতে চক্রশলাকা প্রবিষ্ট থাকে, তদ্রূপ যে হৃদয়ে নাড়িসমূহ সম্প্রবিষ্ট আছে, সেই হৃদয়ে বহু প্রকারে প্রকাশমান হয়ে এই পরমাত্মা অন্তরে বিচরণ করেন। 'ওম্' এই বাচক শব্দ অবলম্বন করে সেই পরমাত্মার ধ্যান করো। হে শিষ্যগণ! সংসার-সাগর থেকে উত্তরণের জন্য ওই পরমাত্মার আশ্রয় গ্রহণ করো, যিনি অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের অতীত। তোমাদের কল্যাণ হোক।
শরীরের মধ্যে হৃদয় সেই স্থান, যেখানে রথের চাকার কেন্দ্রস্থ শলাকার ন্যায় সমস্ত নাড়ি একত্রে স্থিত। এই স্থানে জীব নিবাস করে এবং ব্রহ্মও নিজের ব্যাপকত্ব দ্বারা বিদ্যমান। এই স্থানেই জীবাত্মা পরমাত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করতে পারে। হৃদয়ে পরমাত্মার বিদ্যমানতা সম্বন্ধে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন-
"ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি। (গীতা ১৮।৬১)” অর্থাৎ হে অর্জুন! ঈশ্বর সকল প্রাণীর হৃদয়দেশে অবস্থিত। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে-
“অথ য়দিমস্মিন্ ব্রহ্মপুরে দহরং পুণ্ডরীকং বেশ্ম দহরোহস্মিন্নন্তরাকাশস্তস্মিন্ য়দন্তস্তদন্বেষ্টব্যং তদ্বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যমিতি৷৷”
(ছান্দো০ উপ০ ৮।১।১)
অর্থাৎ “ব্রহ্মপুর নামক এই শরীরে যে সূক্ষ্ম হৃদয়পদ্মরূপ গৃহ আছে, তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম আকাশ রয়েছে। সেই আকাশের অন্তর্বর্তী স্থানে যে ব্রহ্ম আছেন, তিনিই অন্বেষণ করার যোগ্য এবং তিনিই বিশেষরূপে জ্ঞাতব্য।” এই স্থানের কথা উল্লেখ করেই উপনিষৎকার ঋষি বলেছেন, পরমাত্মা সকলের হৃদয়াভ্যন্তরে বিরাজ করেন এবং এটিও নির্দেশ দিয়েছেন যে, সেখানে প্রণব অবলম্বন করে তাঁর (ব্রহ্মের) ধ্যান করা উচিত। এই ধ্যানের দ্বারা ধ্যাতার পরম মঙ্গল সাধিত হয়, এর দ্বারা তিনি অজ্ঞান-অন্ধকার অতিক্রম করে সংসার-সাগর পার হয়ে যান। যদি সংসার-সাগর থেকে পরিত্রাণ পেতে চাও, তবে ওঙ্কারের জপ দ্বারা হৃৎপুণ্ডরীকে ব্যাপ্ত ব্রহ্মের ধ্যান করো, এটিই তোমাদের কল্যাণের মার্গ।
ছান্দোগ্যোপনিষদের ঋষি বলেন,
ওমিত্যেতদক্ষরমুদ্গীথমুপাসীৎ
[ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ১.৪.১]
অর্থাৎ, মানুষ 'ও৩ম্' এই অক্ষরকে উদ্গীথ জ্ঞান করে উপাসনা করবে।"
এই 'ও৩ম্' উপাসনার গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে ঋষি মৃত্যুভীত দেবতাদের প্রসঙ্গে লিখেছেন যে—যখন দেবতারা আত্মরক্ষার জন্য আর কোনো স্থান খুঁজে পেলেন না, তখন শেষ পর্যন্ত তাঁরা 'স্বরে' (ওঙ্কারে) প্রবিষ্ট হলেন। এই যে 'ও৩ম্' অক্ষর, এটাই হলো প্রকৃত 'স্বর' এবং এই 'ওঁ'-ই মৃত্যু থেকে রক্ষাকারী ও অভয় প্রদানকারী। তখন দেবতারা 'ও৩ম্' স্বরে প্রবিষ্ট হয়ে অমৃতত্ব লাভ করলেন।
এটি বলার পর ঋষি পুনরায় বলেন,
স য এতদেবং বিদ্বানক্ষরং প্রণৌত্যেতদেবাক্ষরং স্বরমমৃতমভয়ং প্রবিশতি তৎপ্রবিশ্য যদমৃতা দেবাস্তদমৃতো ভবতি ॥
[ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ১.৪.৫]
অর্থাৎ, যে মানুষ এই রহস্য জেনে 'ও৩ম্' অক্ষরের স্তুতি ও উপাসনা করে, সে এই অমৃত, অভয় এবং অবিনাশী স্বরে প্রবেশ করে। যেভাবে দেবতারা অমৃত হয়েছিলেন, সেভাবেই সেই উপাসকও অমৃতত্ব লাভ করে।
ও৩ম্ এবং উদ্গীথ পর্যায়বাচক শব্দ। ছান্দোগ্যোপনিষদে বলা হয়েছ— “য় উদ্গীথঃ স প্রণবো য়ঃ প্রণবঃ স উদ্গীথঃ (ছান্দো০ উপ০ ১।৫।১)” অর্থাৎ যা উদ্গীথ, তা-ই প্রণব (ও৩ম্) এবং যা প্রণব, তা-ই উদ্গীথ। ছান্দোগ্যোপনিষদের শুরুতেই বলা হয়েছে যে— “এষাং ভূতানাং পৃথিবী রসঃ। পৃথিব্যা আপো রসঃ। আপোমোষধয়ো রসঃ। ওষধীনাং পুরুষো রসঃ। পুরুষস্য বাক্ রসঃ। বাচ ঋক্ রসঃ। ঋচঃ সাম রসঃ। সাম্ন উদ্গীথো রসঃ॥ (ছান্দো০ উপ০ ১।১।২)” অর্থাৎ এই পঞ্চভূতের রস পৃথিবী (অন্য চার ভূতের গুণ শব্দ, স্পর্শ, রূপ এবং রসও পৃথিবীর গুণ ‘গন্ধ’ এর সমান, এজন্য পৃথিবীকে এই সমস্ত ভূতের রস বলা হয়েছে), পৃথিবীর রস জল, জলের রস ঔষধি, ঔষধির রস পুরুষ, পুরুষের রস বাক্য। বাক্যের রস ঋক্, ঋকের রস সাম এবং সামের রস উদ্গীথ (ও৩ম্)।
ওমিতি ব্রহ্ম। ওমিতীদংসর্বম্। ওমিত্যেতদনুকৃতির্হ স্ম বা অপ্যো শ্রাবয়েত্যাশ্রাবয়ন্তি। ওমিতি সামানি গায়ন্তি। ওংশোমিতি শস্ত্রাণি শংসন্তি। ওমিত্যধ্বর্য়ুঃ প্রতিগরং প্রতিগৃণাতি। ওমিতি ব্রহ্মা প্রসৌতি। ওমিত্যগ্নিহোত্রমনুজানাতি। ওমিতি ব্রাহ্মণঃ প্রবক্ষ্যন্নাহ ব্রহ্মোপাপ্নবানীতি। ব্রহ্মৈবোপাপ্নোতি॥
তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ ১.৮.১
সরলার্থঃ ‘ওম্’-ই ব্রহ্ম, এই সমস্ত ওঙ্কারই। ‘ওম্’ এটি অনুজ্ঞা (অনুমতি সূচক)। এছাড়া এটি প্রসিদ্ধ যে, “হে আচার্য আমাকে শ্রবণ করান” শিষ্যের এরূপ বলার পর ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বক আচার্য শিষ্যকে উপদেশ দিয়ে থাকেন। ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বক উদ্গাতা সামবেদের গান করেন এবং ‘ওম্ শম্’ বলেই গীতরহিত ঋচাসমূহের উচ্চারণ করেন। ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বক যজুর্বেদী ঋত্বিক যজুর্বেদের প্রোৎসাহক মন্ত্রের পাঠ করেন। ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বকই সমস্ত ঋত্বিকগণের শিরোমণি ব্রহ্মা বৈদিক কর্মের অনুমতি প্রদান করেন এবং ‘ওম্’ উচ্চারণ করেই অগ্নিহোত্র করার আজ্ঞা দেন। ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বক ব্রাহ্মণ বেদাধ্যয়ন করে “আমরা যেন ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হই” এরূপ বলেন এবং তিনি ব্রহ্মকেই প্রাপ্ত হন।
ওমিত্যেতদক্ষরমিদং সর্বং তস্যোপব্যাখ্যানং ভূতং ভবদ্ ভবিষ্যদিতি সর্বমোঙ্কার এব। য়চ্চান্যৎ ত্রিকালাতীতং তদপ্যোঙ্কার এব॥
মাণ্ডূক্যোপনিষদ্ ১
সরলার্থঃ ‘ওম্’ এই অবিনাশী ব্রহ্ম, এই সম্পূর্ণ জগৎ তাঁর নিকটতম মহিমার বোধক। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই সবকিছু ওঙ্কারই এবং ত্রিকালের ঊর্ধ্বে অন্য যা কিছু আছে, তাও ওঙ্কারই।
তস্মৈ স হোবাচ। এতদ্বৈ সত্যকাম পরং চাপরং চ ব্রহ্ম য়দোঙ্কারঃ। তস্মাদ্বিদ্বানেতেনৈবায়তনেনৈকতরমন্বেতি॥
প্রশ্নোপনিষদ্ ৫.২
সরলার্থঃ সেই ঋষিপুত্রকে প্রসিদ্ধ ঋষি (পিপ্পলাদ) স্পষ্টভাবে বললেন, “হে সত্যকাম! যে পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্ম আছেন— এই উভয় ওঙ্কারস্বরূপ। এজন্য বিবেকী পুরুষ ওঙ্কার অবলম্বনেই পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্মের মধ্যে যে-কোনো একটিকে প্রাপ্ত হন”।
সত্যকামের প্রশ্নের উত্তরে পিপ্পলাদ ঋষি বললেন— “হে সত্যকাম! পর ও অপর-রূপে ব্রহ্ম দুই প্রকার অর্থাৎ বাচকরূপে অপরব্রহ্ম এবং বাচ্যরূপে পরব্রহ্ম। এই উভয় প্রকার ব্রহ্ম ওঙ্কারই।” যিনি এই ওঙ্কারের উপাসনা করেন, তিনি অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়স এই উভয় ফলের মধ্যে যেটি লাভ করতে চায়, সেটিই লাভ করতে পারেন। ওঙ্কার অবলম্বনে পুরুষের মনুষ্য জন্মের ফল-চতুষ্টয়ের প্রাপ্তি হয় এবং ওঙ্কারই মোক্ষলাভের একমাত্র সাধন। এই ভাবকে কঠ উপনিষদেও বর্ণনা করা হয়েছে, “এতদালম্বনং শ্রেষ্ঠমেতদালম্বনং পরম্। এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে॥ (কঠ০ ১।২।১৭)” = ওঙ্কাররূপ অবলম্বনই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিনিই সর্বোত্তম, এঁকে জেনেই মনুষ্য ব্রহ্মকে লাভ করে সকলের পূজনীয় হন।
যম নচিকেতাকে ব্রহ্মের উপদেশ দিচ্ছেন,
সর্বে বেদা য়ৎ পদমামনন্তি তপাংসি সর্বাণি চ য়দ্ বদন্তি।
য়দিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য়ং চরন্তি তৎ তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীম্যোমিত্যেতৎ॥
কঠোপনিষদ্ ১.২.১৫
সরলার্থঃ ঋগাদি চতুর্বেদ যে পরমপদের প্রতিপাদন করে এবং সকল তপস্যা যাঁর বর্ণনা করে, যাঁকে পাবার ইচ্ছায় সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের ব্রত পালন করেন, সেই পদ তোমাকে সংক্ষেপে বলছি— এই ‘ও৩ম্’ সেই পদ।
যমাচার্য নচিকেতাকে ব্রহ্মের উপদেশ দিয়ে বললেন— সেই ব্রহ্মের মুখ্য নাম ‘ওম্’। ঋগাদি চার বেদে ব্রহ্ম ও ব্রহ্মপ্রাপ্তির সাধনেরই বিশেষ বর্ণনা করা হয়েছে। বেদ অধ্যয়ন করে যদি ব্রহ্মের জ্ঞান না হয়, তাহলে তো “য়স্তন্ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি (ঋ০ ১।১৬৪।৩৯)” বেদপাঠ নিরর্থক। ব্রহ্ম-প্রাপ্তির সাধন কেবল জ্ঞানই নয়, বরং সত্যাচরণাদি তপ দ্বারা অন্তঃকরণ শুদ্ধ করাও আবশ্যক। মানুষের ব্রহ্মচর্যাদি চতুরাশ্রমে অবস্থানুসারে যে ধর্ম নির্ধারিত হয়েছে, সেটিও ব্রহ্মপ্রাপ্তির অবস্থানুযায়ী সাধন। এইপ্রকার চার বেদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় এবং যোগাঙ্গানুষ্ঠানরূপ তপ ও আশ্রমের পরম লক্ষ্য ব্রহ্ম প্রাপ্তিই। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এই শ্রুতির ব্যাখ্যায় লিখেছেন— “পরমপদ অর্থাৎ যাকে মোক্ষ বলা হয় এবং যেটি প্রাপ্ত হলে পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয়ে সদা পরম সুখে অবস্থান করতে পারা যায়, সেই পরব্রহ্ম সকল প্রকার আনন্দযুক্ত, সর্বদুঃখরহিত ও সর্বশক্তিমান। এই পরমাত্মার ওঙ্কারাদি অনেক নাম আছে। এতেই বেদের সমস্ত মুখ্য তাৎপর্য নিহিত আছে।....এই ব্রহ্মপ্রাপ্তি করানোর জন্যই সমস্ত বেদ প্রবৃত্ত রয়েছে। এই ব্রহ্মপ্রাপ্তি অপেক্ষা অন্য কোনো পদার্থই শ্রেষ্ঠ নেই। যেহেতু জগতের বর্ণন, দৃষ্টান্ত ও উপযোগাদি ক্রিয়া সেই পরব্রহ্মকেই (পরব্রহ্মের মহিমাকেই) প্রকাশ করে থাকে। এইরূপ সত্যধর্মের অনুষ্ঠান, যাকে তপস্যা বলা হয়, সেটিও পরমেশ্বর প্রাপ্তির জন্যই হয়ে থাকে। ব্রহ্মচর্য, গার্হ্যস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এই চতুরাশ্রমের সত্যাচরণরূপ যে সমস্ত বিহিত কর্মের আদেশ আছে, সেটিও ব্রহ্মপ্রাপ্তির জন্যই নির্দিষ্ট হয়েছে (ঋ০ ভা০ ভূ০, বেদবিষয় বিচার)।”
এতদ্ধ্যেবাক্ষরং ব্রহ্ম এতদ্ধ্যেবাক্ষরং পরং
এতদ্ধ্যেবাক্ষরং জ্ঞাত্বা য়ো য়দিচ্ছতি তস্য তৎ॥
কঠোপনিষদ্ ১.২.১৬
সরলার্থঃ এই ওঙ্কারই অবিনাশী ব্রহ্ম, এই ওঙ্কারই পরম সূক্ষ্ম এবং ব্যাপক। এইজন্যই এই অবিনাশী ব্রহ্মকে জেনে যে মনুষ্য যা ইচ্ছা করেন, তাঁর সেটিই প্রাপ্তি হয়।
মানব জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সাংসারিক সুখ এবং মুক্তিসুখ লাভ করা। কিন্তু এই দুটির মধ্যে পরম লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তিসুখ লাভ করা। এই উভয়বিধ সুখের প্রাপ্তি পরব্রহ্মের জ্ঞান এবং তাঁর মুখ্য নাম ‘ওম্’ এর সার্থক জপের দ্বারাই হয়। এই শ্রুতিতে পরব্রহ্মের দুটি মুখ্য বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা করা হয়েছে—
(১) এই ব্রহ্ম অক্ষর— অবিনাশী। তাঁর বিনাশ প্রলয়কালেও হয় না। যেমন বেদে বলা হয়েছে— “হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে” (যজু০ ৩২।১)। সেই ব্রহ্ম সৃষ্টির পূর্বে প্রলয়ের সময়ও বিদ্যমান ছিলেন এবং এখনও আছেন। তিনি সমগ্র জগৎ রচনা করেছেন, তিনিই এই সংসারের পালক ও সংহারক।
(২) শ্রুতিতে উল্লিখিত ব্রহ্মের প্রথম বৈশিষ্ট্য জীবাত্মার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কারণ জীবাত্মাও অনাদি। এজন্য ব্রহ্মের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, তিনি পরম্ অক্ষর= অতিসূক্ষ্ম। তিনি সূক্ষ্ম হওয়ার কারণে প্রকৃতি ও জীবাত্মার মধ্যেও ব্যাপ্ত। আর সর্বব্যাপী হওয়ার কারণে ব্রহ্ম জগতের একমাত্র নিয়ন্তা। মোক্ষাদি সুখ প্রাপ্তির জন্য ওইরূপ জগৎ নিয়ন্তা, সনাতন, সর্বব্যাপক ব্রহ্মকে জানা অতি আবশ্যক। ঈশ্বরের মুখ্য নাম ‘ওম্’ এর বিষয়ে ব্যাসমুনি লিখেছেন— “কিমস্য সঙ্কেতকৃতং বাচ্যবাচকত্বমথ প্রদীপপ্রকাশবদবস্থিতমিতি? স্থিতোঽস্য বাচকেন সহ সম্বন্ধঃ। ….য়থাবস্থিতঃ পিতাপুত্রয়োঃ সম্বন্ধঃ….॥ (যোগ০ ১।২৭ ব্যাসভাষ্য)” অর্থাৎ ঈশ্বরের বাচকরূপ ওঙ্কারের সাথে সঙ্কেতরূপ সম্বন্ধ না কি নিত্য সম্বন্ধ? বাচ্য ঈশ্বর এবং বাচক ওম্ এর নিত্য সম্বন্ধ। যেমন পিতা পুত্রের নিত্য সম্বন্ধ। এজন্য ওঙ্কারের শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন দ্বারাই মনুষ্য ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষকে প্রাপ্ত করে। কারণ পরমাত্মার বাচক চতুর্বেদের মূলভূত ওঙ্কারকে জেনেই বেদের তত্ত্বজ্ঞান হতে পারে, অন্যথা নয়। ওঙ্কারের জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান তথা আত্মজ্ঞান।
শ্রুতিতে উল্লেখিত “অক্ষরম্” পদের দুই অর্থ— (১) বিনাশ—রহিত (২) ব্যাপক। “অক্ষরং নক্ষরং বিদ্যাদ্ অশনোতের্বা সরোহক্ষরম্।” (মহাভাষ্যে, নবাহ্ণিকে) অর্থাৎ ‘অক্ষরের” প্রথম অর্থ— ন ক্ষরতীতি = অক্ষরম্। যিনি কখনো নাশ প্রাপ্ত হন না। দ্বিতীয় অর্থ— ব্যাপক। ‘অশুঙ্ ব্যাপ্তৌ’ ধাতুর সাথে ঔণাদিক ‘সরন্’ প্রত্যয়যোগে ‘অক্ষর’ শব্দ সিদ্ধ হয়— অশ্নুত ইত্যক্ষরম্। যিনি অতি সূক্ষ্ম হওয়ার কারণে প্রত্যেক পদার্থে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন, সেই ব্রহ্মই অক্ষর-পদবাচ্য।
উক্ত ‘ওম্’-কে উপাস্যভাব দ্বারা সর্বোপরি অবলম্বন বলছেন—
এতদালম্বনꣳ শ্রেষ্ঠমেতদালম্বনং পরম্।
এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে॥১৭॥
কঠোপনিষদ্ ১.২.১৭
সরলার্থঃ ব্রহ্মের প্রাপ্তি এবং ব্রহ্মজ্ঞানের সমস্ত সাধনের মধ্যে এই ব্রহ্মের মুখ্যনাম ওঙ্কারকে উপসানার সময় জপ-রূপে আশ্রয় করা অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ এবং এই সাধন সর্বোপরি। এই ওঙ্কারের জপ এবং তদর্থভাবনারূপ সাধনকে জেনেই সাধক ব্রহ্মের সান্নিধ্য দ্বারা হওয়া মোক্ষসুখ লাভ করে মহিমান্বিত হন।
গোপথ ব্রাহ্মণের পূর্বভাগের প্রথম প্রপাঠকের ২২তম কণ্ডিকায় 'ও৩ম্' উপাসনা ও জপের আরও একটি রহস্য বর্ণনা করা হয়েছে,
অক্ষরং ব্রাহ্মণো যং কামম্ ইচ্ছেৎ ত্রিরাত্রোপোষিতঃ প্রাঙ্মুখো বাগ্যতো বর্হিষ্য্ উপবিশ্য সহস্রকৃত্ব আবর্তয়েৎ সিধ্যন্ত্যঅস্যার্থাঃ সর্বকর্মাণি চেতি ব্রাহ্মণম্ ॥
[গোপথ ব্রাহ্মণ ১.১.২২]
অর্থাৎ, যদি কোনো ব্রহ্মজিজ্ঞাসুর কোনো বিশেষ ইচ্ছা থাকে, তবে তিনি তিন রাত উপবাস করবেন এবং পূর্ব দিকে মুখ করে মৌন থেকে কুশাসনে বসে সহস্র (১০০০) বার 'ও৩ম্' জপ করবেন। এতে তাঁর সমস্ত মনোরম সংকল্প ও কর্ম সিদ্ধ হয়।
ওঙ্কারের মহিমা প্রকাশ করে গোপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, “য়ো হ বা এতমোঙ্কারং ন বেদাবশঃ স্যাদিতি। অথ য় এবং বেদ ব্রহ্মবশঃ স্যাদিতি। তস্মাদোঙ্কার ঋচি ঋগ্ ভবতি। য়জুষি য়জুঃ। সাম্নি সাম। সূত্রে সূত্রম্। ব্রাহ্মণে ব্রাহ্মণং। শ্লোকে শ্লোকঃ। প্রণবে প্রণব ইতি ব্রাহ্মণম্॥ (গোপথ০ পূর্ব০ প্র০ ০১ কা০ ২৩)” অর্থাৎ যিনি ওঙ্কারকে জানেন না, তিনি ব্রহ্মের বশ হন না, অপরদিকে যিনি ওঙ্কারকে জানেন, তিনি ব্রহ্মের বশ হন = ব্রহ্মজ্ঞ হন। এজন্য ওঙ্কার ঋগ্বেদে ঋকরূপ হয়, যজুর্বেদে যজুরূপ, সামবেদে সামরূপ, সূত্রে সূত্ররূপ, ব্রাহ্মণগ্রন্থে ব্রাহ্মণরূপ, শ্লোকে শ্লোকরূপ, প্রণবে প্রণবরূপ হয়— এ কথাই ব্রাহ্মণগ্রন্থে বলা হয়েছে।
' ও৩ম্' স্মরণ ও জপই মুক্তির পথ
যদক্ষরং বেদবিদো বদন্তি বিশন্তি যদ্ যতয়ো বীতরাগাঃ।
যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্যং চরন্তি তৎ তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্যে ॥
৮।১১
অর্থ: বেদবিদগণ যে সচ্চিদানন্দঘন রূপ পরমপদকে অক্ষর নামে অভিহিত করেন, আনাসক্ত যত্নশীল মানুষেরা যাতে প্রবেশ করেন আর যে পরমপদকে পাওয়ার ইচ্ছা করে ব্রহ্মচর্যের আচরণ করেন⎯সেই পরমপদ তোমাকে সংক্ষেপে বলছি। কঠ উপনিষদে (১।২।১৬) বলা হয়েছে – ‘এই অক্ষরই ব্রহ্ম।’ মাণ্ডুক্য উপনিষদের ১ম শ্লোকে বলা হয়েছে – ‘এই সমস্ত জগতেই ‘ওম্’ এই অক্ষরস্বরূপ। এই ব্যাপারে গীতায় আরো বলা হয়েছে,
সর্বদ্বারাণি সংযম্য মনো হৃদি নিরুধ্য চ।
মুর্ধ্ন্যাধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতো যোগধারণাম্ ॥
ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্ মামনুস্মরন্।
যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৮।১২-১৩
অর্থ: যে মানুষ সকল ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করে, মনকে হৃদয়ে নিরুদ্ধ করে ও প্রাণকে মস্তকে স্থাপন করে যোগে স্থিত হয়ে ‘ও৩ম্’⎯এই এক অক্ষররূপ ব্রহ্মকে উচ্চারণ পূর্বক আমাকে স্বরণ করে দেহকে ত্যাগ করে যায়, সেই মানুষ পরম গতিকে প্রাপ্ত করে।
ও৩ম্ উচ্চারণ করেই কাজ করতে হবে
ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরাঃ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৭।২৩
অর্থ: ওম্ তৎ সৎ⎯এইরূপ তিন প্রকারে ব্রহ্মের নাম বলা হয়েছে। তাঁর দ্বারা সৃষ্টির শুরুতে ব্রাহ্মণ, বেদ এবং যজ্ঞসমূহ নির্মিত হয়েছে।
তস্মাদোমিত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ ।
প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৭।২৪
অর্থ: সেইজন্য বেদমন্ত্র উচ্চারণকারী মানুষেরা সর্বদা “ও৩ম্” উচ্চারণ করে শাস্ত্রবিধি অনুসারে যজ্ঞ, দান ও তপস্যা আরম্ভ করেন।
যোগদর্শনে [১.২৪] যেখানে নির্জীব সমাধির সাধন হিসেবে পূর্ণ বৈরাগ্যের কথা বলা হয়েছে, সেখানে এর সহজ উপায় হিসেবে 'ঈশ্বর-প্রণিধান'-এর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ঈশ্বর কে? তিনি কেমন? এটি স্পষ্ট করতে গিয়ে বলা হয়েছে,
ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ ॥ [১.২৪]
অর্থাৎ, ক্লেশ,কর্ম,বিপাক ও আশয়, এই চারটির সঙ্গে যাঁর কোনো সম্বন্ধ নেই, যিনি সমস্ত পুরুষের মধ্যে উত্তম, তিনিই ঈশ্বর।
কেবল তাই নয়, সেই ঈশ্বর গুরুদেরও গুরু এবং তাঁর নাম হলো 'ও৩ম্'। যোগদর্শনে 'ও৩্ম্' নাম জপ করা এবং তার অর্থ চিন্তা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই জপের মাধ্যমেই মুক্তি লাভ সম্ভব বলে জানানো হয়েছে। এর সাথে এই অভিজ্ঞতাও প্রকাশ করা হয়েছে যে, সাধনা করার সময় সাধকের পথে যেসব বিঘ্ন বা বাধা এসে দাঁড়ায়, তা দূর করার উপায় কী।
যোগদর্শন যে উপায়টি দিয়েছে তা হলো,
তৎপ্রতিষেধার্থং একতত্ত্বাভ্যাসঃ ॥ [১.৩২]
অর্থাৎ, সেই সমস্ত বিক্ষেপ ও বিঘ্ন দূর করার জন্য একতত্ত্বের (অর্থাৎ ওঙ্কারের) অভ্যাস করা উচিত।
পরমাত্মার সর্বোত্তম নাম "ও৩ম্”। এর দ্বারা ধ্যানের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মহর্ষি পতঞ্জলি যোগদর্শনে বলেছেন- “তস্য বাচকঃ প্রণবঃ॥", "তজ্জপস্তদর্থভাবনম্॥” (যোগ০ ১।২৭-২৮) অর্থাৎ সেই ঈশ্বরের বাচক বা মুখ্য নাম 'ও৩ম্'। সেই ‘ও৩ম্’ নামের জপ এবং তার (ওঙ্কারের) অর্থস্বরূপ পরমাত্মার চিন্তন করা উচিত। এই প্রমুখ সাধনের আশ্রয় দ্বারা মনুষ্য ব্রহ্মানন্দ লাভ করে সর্বপূজ্য হন। তাৎপর্য এই যে, এই শ্রুতিতে ব্রহ্মজ্ঞানের সাধনাতে ওঙ্কারকে সর্বোপরি সাধন বলা হয়েছে কারণ ওঙ্কারের সাধনা দ্বারাই এর বাচ্য ব্রহ্মের অনুভব হয়। যদি ‘ওম্’ দ্বারা শুধুমাত্র অ-উ-ম্ এই ত্রয়াত্মক অক্ষরের অবয়বেরই গ্রহণ অভিপ্রায় হতো, তাহলে একে সর্বোপরি সাধন বলা হতো না। অনেক টীকাকারের মত যে, এই শ্রুতিতে ওঙ্কারকে ব্রহ্মের প্রতীকরূপে উপাসনার কথা বলা আছে। তাহলে বলতে হবে, যত প্রকারের লিপিসমূহ (বর্ণমালা) প্রতিটি দেশে প্রচলিত আছে, ঠিক তত প্রকার ওঙ্কারের ধ্যান হয়ে যাবে। এমনকি উপনিষদের কোথাও ওঙ্কারের কোনো রূপ বর্ণিত হয়নি। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, অক্ষরের কোনো আকার হয় না। শুধুমাত্র বালকদের বোধের জন্য মনুষ্য বিবিধ লিপি কল্পিত করেছে। যদি লিপির অনুসারে ওঙ্কারের তত্তৎ রূপের ধ্যান করা হয়, তবে সেই ধ্যানও কল্পিত মাত্র হবে। যদি বলেন, “যেভাবে কল্পিত অক্ষরের দ্বারা সত্য জ্ঞান প্রাপ্ত হয়, সেভাবেই কল্পিত আকারের দ্বারাও সত্য ব্রহ্মকেও জানতে পারবে।” এই কথাও ঠিক নয়। কারণ অদৃশ্য বস্তুকে জানার জন্য শব্দ মধ্যস্থ (মাধ্যম) হয়, প্রতীক নয়। উদাহরণস্বরূপ রামচন্দ্রের চরিত্রের বর্ণনা বাল্মীকি মুনি শব্দের দ্বারা করেছেন, প্রতীকের দ্বারা নয়। যখন কেউ বাল্মীকি রামায়ণের শব্দ পাঠ করে তখন তার মন প্রসন্ন হয়ে যায় এবং রামচন্দ্রের সম্পূর্ণ চরিত্র তার মানসপটে ভেসে ওঠে। মানুষ শব্দকেই পড়ে, আর সেটিই বিচার করে। যদি অক্ষরের আকার দেখার মাধ্যমে কারো বোধ হতো, তবে এক মহামূর্খেরও বোধ হওয়া উচিত ছিল। কেননা, সে তো চক্ষু দ্বারা অক্ষরের আকারকে দেখছে, কিন্তু সেই অজ্ঞানী কোনো কিছুই জানতে পারে না। তাছাড়া কোনো ব্যক্তি আজীবন অক্ষরের রূপ ধ্যান করতে থাকলেও তার একটি শব্দেরও বোধ হবে না। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অক্ষর শব্দকে জানার জন্য একটি সংকেত মাত্র৷ শব্দই পদার্থ সম্পর্কে প্রাপ্ত জ্ঞানের মুখ্য কারণ। যদি শব্দ না থাকে, তবে আমরা কিছুই জানতে পারব না। পুস্তকে অক্ষর থাকে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত বাণীর দ্বারা না বলা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এর বোধ হবে না। অক্ষর জানার পরও পদের অর্থ জানতে হয়। এর দ্বারাও ওই পদ-সম্বন্ধী পদার্থের বোধ হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সেই পদার্থকে নিজের চোখে না দেখে অথবা অনুমান আদি প্রমাণের দ্বারা না জেনে নেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বস্তুর বোধ হয় না। এজন্য (আমাদের পদার্থ সম্পর্কিত) বোধের কারণ ‘অক্ষর’ নয়। একজন অন্ধ বালকের কথা চিন্তা করুন, তাকে অক্ষর ব্যতীত কেবল পড়ানোর মাধ্যমেই তার সবকিছুর বোধ হয়ে যায়। তবে হ্যাঁ, চোখ ছাড়া রূপের বোধ হয় না। কিন্তু সে শব্দ পড়ার মাধ্যমেই সম্পূর্ণ রামায়ণ বলতে পারে। মনে করুন, আপনি ইংরেজি অক্ষর জানেন না, আপনার সামনে কেউ ইংরেজি অক্ষরে কিছু লিখে রেখেছে। কিন্তু আপনাকে এ কথা কেউ বলে দেয়নি যে, এটি ‘A’ আর এটি ‘B’। এখন নিজেই বিচার করুন, অক্ষরের আকার (রূপ) সম্পর্কে বোধ হওয়ার পরও আপনার যথার্থভাবে A, B, C, D এর বোধ হলো না। এজন্য ‘অক্ষর’ বোধের কারণ নয়। কোনো বস্তু সম্পর্কে যথার্থ বোধ কিছু শব্দের দ্বারাই হয়। কিন্তু যথার্থভাবে প্রত্যক্ষ অনুভবের দ্বারাই বস্তুর যথার্থ বোধ হয়। এজন্য ঈশ্বর ভিন্ন-ভিন্ন বস্তুর জ্ঞান করার জন্য ভিন্ন-ভিন্ন ইন্দ্রিয় দিয়েছেন; আর সেগুলোর মাধ্যমেই (কোনো পদার্থ সম্বন্ধে) যথার্থ জ্ঞান হয়ে থাকে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
