দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







পরমেশ্বর ও প্রাকৃতিক ‘দেবতা' তত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা ~ কে উপাস্য আর কে নয় ?

সত্যান্বেষী
0


 

✅ পরমেশ্বর ও প্রাকৃতিক ‘দেবতা' তত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা ~ কে উপাস্য আর কে নয় ❓
▪️প্রতিটি বৈদিকের ‘পূজা-উপাসনা-সম্মান-সেবা-উপযোগ’’ সম্পর্কে জানতে অবশ্যই পড়া উচিত 
 
🔰 "যৎ পিণ্ডে তদ্ ব্রহ্মাণ্ডে" ~ যা এই মানবদেহে (পিণ্ডে) বিদ্যমান, তা-ই এই মহাবিশ্বে (ব্রহ্মাণ্ডে) বিরাজমান। আবার যা কিছু এই মহাবিশ্বে রয়েছে, তা-ই এই মানবদেহের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। সর্বপ্রথমে সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর প্রকৃতির অণু-পরমাণুসমূহের মধ্যে স্পন্দন বা আলোড়ন সৃষ্টি করলেন; অর্থাৎ, আকর্ষণ ও বিকর্ষণের নিয়মে পরমাণুসমূহ পরস্পরের সাথে যুক্ত হতে লাগল এবং বিশ্লিষ্ট বা ভেঙে যেতে লাগল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মহাবিশ্বে বহুবিধ খগোলক তথা গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি হলো।
 
যস্মাজ্জাতং ন পুরা কিং চনৈব য আবভূব ভুবনানি বিশ্বা।
প্রজাপতিঃ প্রজয়া সংররাণস্ত্রীণি জ্যোতীংষি সচতে স ষোড়শী ॥
যজুর্বেদ ৩২।৫
অর্থাৎ, তিনিই সেই পরম মহিমাময় ঈশ্বর, যাঁর পূর্বে কোনো কিছুরই জন্ম হয়নি এবং এই ব্রহ্মাণ্ডের পরবর্তী সময়ে সৃষ্টি হওয়া কোনো ভুবনই তাঁর পূর্ববর্তী নয়। তিনি নিখিল সৃষ্টির পিতা ও পালনকর্তা, যিনি নিজের সৃষ্টির মাঝে অবস্থান করে আনন্দিত হন। তিনি পূর্ণতার ষোলোটি পরম শক্তির (কলা) অধীশ্বর। তিনি পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোকের তিন প্রকার জ্যোতি~অর্থাৎ অগ্নি, বিদ্যুৎ শক্তি এবং সূর্যের আলোর মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন এবং এদের পুষ্ট করছেন।
 
→ এখানে 'ষোলো' সংখ্যাটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিখুঁত বা আদর্শ গুণের প্রতীকী রূপকে নির্দেশ করে। যেমন~ প্রশ্নোপনিষদ (৬.৪) অনুসারে, 'ষোলো কলা' বলতে বোঝায় পরম পুরুষের ষোলোটি সৃজনী শক্তি, সৃষ্টিজগতের বিবর্তনের ষোলোটি স্তর এবং মহাজাগতিক ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের ষোলোটি সদগুণ বা অনুষঙ্গ। এই ষোলোটি কলা হলো: প্রাণ (শক্তি), হিরণ্যগর্ভ (মহাজাগতিক সুবর্ণ বীজ), শ্রদ্ধা, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, অপঃ (জল), পৃথিবী, ইন্দ্রিয়, মন, অন্ন, বীর্য (উৎপাদিকা শক্তি), তপস্যা, মন্ত্র (জ্ঞান বা জীবনযাপনের কলা), কর্ম, লোক (বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল) এবং নাম (স্বতন্ত্র পরিচয়)। আবার অথর্ববেদে (১৩.৪.৪৭-৫৪) ঈশ্বরের ঐশ্বরিক গুণসমূহকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: শচীপতি (সর্বশক্তিমান), বিভু (অনন্ত), প্রভু (সর্বেশ্বর), অম্ভ (জলের ন্যায় শীতল), অম (শক্তিপ্রদাতা), মহাসহ (ধৈর্যশীল), অরুণ-রজত-রজ (জ্যোতির্ময় ও গৌরবময়), উরু-পৃথু (বিশাল), সুভূ (মহৎ), ভুব (সর্বজ্ঞ), প্রথো বর (সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ), ব্যচো লোক (সর্বব্যাপী), ভবদ্-বসু (বিশ্বজনীন সম্মানের অধিকারী), ইদদ্বসু (বিশ্বজনীন ঐশ্বর্যের অধিপতি), সংযদ্বসু (পূর্ণ আত্মসংযমী) এবং আয়ত-বসু (চির-দীপ্তিময়)। এই বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী রচিত 'সত্যার্থ প্রকাশ'-এর প্রথম সমুল্লাসের উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি ঈশ্বরের ১০০টি+ গুণবাচক নামের তালিকা দিয়েছেন। সুতরাং, এখানে 'ষোলো' সংখ্যাটি মূলত একটি আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গ রূপরেখাকে নির্দেশ করে।
 
তস্মাদ্বা এতস্মাদাত্মন আকাশঃ সম্ভূতঃ। আকাশাদ্বায়ুঃ। বায়োরগ্নিঃ। অগ্নেরাপঃ। অদ্ভ্যঃ পৃথিবী। পৃথিব্যা ওষধয়ঃ। ওষধীভ্যোঽন্নম্। অন্নাত্পুরুষঃ।
তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২।১।৩
অর্থাৎ, নিশ্চিতরূপে সেই এই পরমাত্মা থেকে আকাশ উৎপন্ন হয়েছে, আকাশ থেকে বায়ু, বায়ু থেকে অগ্নি, অগ্নি থেকে জল, জল থেকে পৃথিবী, পৃথিবী থেকে ওষধি, ওষধি থেকে অন্ন, অন্ন থেকে বীর্য এবং বীর্য থেকে এই স্থূল দেহ উৎপন্ন হয়েছে। এই বর্ণনা থেকে এটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, পরমাত্মার মাধ্যমেই জড় প্রকৃতিতে গতির সঞ্চার হয়েছিল।
 
▪️উপনিষদকার ঋষিগণ বলেন যে~ প্রজাপতি পরমেশ্বর জীবসমূহের কল্যাণসাধন এবং তাদের প্রাক্তন কর্মসমূহের ফল ভোগের নিমিত্তে স্বীয় অমোঘ ‘ঈক্ষণশক্তি’র দ্বারা কারণ-প্রকৃতির অণুসমূহের মধ্যে আলোড়ন বা স্পন্দন সৃষ্টি করেছিলেন; আর এই ইচ্ছাশক্তিই হলো সৃষ্টি-রচনার মূল প্রারম্ভ বা সূত্রপাত। ঠিক যেভাবে আমাদের শরীরে উৎপন্ন হওয়া বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ভাব, যেমন: চিন্তা, শোক, আনন্দ, ক্রোধ ইত্যাদির গভীর প্রভাব দেহের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর পড়ে এবং তার ফলে আমাদের হাত, পা ও মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে; যেভাবে আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ আমাদেরই ইচ্ছাশক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে কাজ করতে শুরু করে; ঠিক তেমনই, আদি মূল পরমেশ্বরে ঈক্ষণশক্তির সাথে সাথেই কারণ-প্রকৃতি ক্রমান্বয়ে কার্য-প্রকৃতিতে (দৃশ্যমান বা প্রকট রূপে) রূপান্তরিত হতে শুরু করে। পরমাত্মা যখন কারণ-প্রকৃতির মধ্যে গতির সঞ্চার করেন, তখন এতখানি তীব্র বেগের উৎপত্তি হয় যে, প্রাকৃতিক পরমাণুসমূহ অত্যন্ত প্রচণ্ড গতিতে গতিশীল হয়ে ওঠে।
এই গতির (আদি স্পন্দনের) প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অজ্ঞেয়বাদীরা সম্পূর্ণ নীরব। অথচ ‘কারণ ব্যতীত কার্য সম্পন্ন হয় না’— এই সর্বজনস্বীকৃত ও সর্বমান্য সিদ্ধান্তটি এই ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
অণু-পরমাণুসমূহের মধ্যে আকর্ষণ ও বিকর্ষণের এই বিপরীত শক্তিসমূহের ক্রিয়ায় মহাশূন্যে গ্রহ-নক্ষত্রের সৃষ্টি হতে শুরু করে। এর পরিণামস্বরূপ এই দাঁড়ায় যে, মহাবিশ্বে চক্রাকার আবর্তনের ফলে খগোলকগুলোতেও এক তীব্র ও প্রচণ্ড গতির সৃষ্টি হয়। সূর্য আদি জ্যোতিষ্কসমূহের এই চক্রাকার তীব্র গতির ফলে পৃথিবী গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদি বিশ্লিষ্ট বা বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাজাগতিক ক্ষেত্রে নিজ নিজ কক্ষপথে স্থির হয়ে যায়। তাদের নিজস্ব একটি ব্যক্তিগত গতি থাকে, যা তাদের নিজস্ব গাঠনিক বিন্যাসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ঋগ্বেদে উল্লিখিত হয়েছে যে~ "হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে", অর্থাৎ সর্বপ্রথমে হিরণ্যগর্ভ নামক এক পরম তেজস্বী ও বিরাট আকারের অগ্নিকুণ্ড বা গোলকের উৎপত্তি হয়েছিল। সেই সহস্র সূর্যসম তেজস্বী গোলক থেকে অসংখ্য গোলক বিচ্ছিন্ন হয়ে সহস্র সহস্র সৌরজগতের (সৌর পরিবারের) উৎপত্তি ঘটে, যার মধ্য থেকে আমাদের এই একটি সৌরজগৎ~ যার অন্তর্গত এই পৃথিবী, চন্দ্র এবং নবগ্রহ ইত্যাদি~ তার সৃষ্টি হয়েছে। এই ছায়াপথের (আকাশগঙ্গার) মধ্যেই বর্তমান সূর্যের চেয়েও সহস্র গুণ বড় বড় সূর্য বিদ্যমান এবং তাদের নিজস্ব পরিবার বা জগতও সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক।
 
এত বড় বড় সূর্যের বিশালত্ব অনুমান করা আমাদের মতো অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের জন্য অত্যন্ত কঠিন; কারণ সেই দূরবর্তী সূর্যগুলোর আলোক রশ্মি পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে কোটি কোটি বছর সময় লেগে যায়, যেখানে আমাদের সবিতা বা দৃশ্যমান সূর্যের কিরণ পৃথিবীতে আসতে সময় নেয় মাত্র ৮ মিনিট। সূর্য হলো এই সৌর পরিবারের পিতা বা জনক, তারই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আমাদের এই ভূখণ্ড বা পৃথিবী সুচারু রূপে প্রতিনিয়ত কার্যরত রয়েছে। জগতের সমস্ত পদার্থই কোনো না কোনো স্তরে দূষিত বা বিকৃত হতে পারে, কিন্তু সূর্যের মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা বদল আনা অন্তত মানুষের সাধ্যাতীত বা হাতের নাগালে নেই। মানুষ বায়ু, জল, ভূমি বা আকাশমণ্ডলের ক্ষতিসাধন করতে পারে, কিন্তু সূর্য মানুষের নাগালের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। তার মধ্যে যে পরিবর্তনই সাধিত হচ্ছে বা ভবিষ্যতে হবে, তা পরম অতুলনীয় পরমেশ্বরের অমোঘ ব্যবস্থার নিয়মেই সম্পন্ন হবে। এই কারণেই বেদে সূর্য দেবতার অনন্যসাধারণ ও অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। সূর্যকে সম্যক দর্শন ও উপলব্ধি করার জন্য ‘সূর্যসম’ বা দিব্য দৃষ্টির প্রয়োজন।
 
🔰 বৈদিক দেবতাদের স্বরূপ
 
দেবো দানদ্বা দীপনাদ্বাদ্যোতনাদ্বা দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। য়ো দেবঃ সা দেবতা।’ নিরুক্ত ৭।১৫ অর্থাৎ দেবের লক্ষণ হচ্ছে দান। সবার হিতার্থে যে দান করে, সে দেব। দেবের গুণ হচ্ছে দীপন অর্থাৎ প্রকাশ করা। দান করা, দীপ্ত হওয়া (উজ্জ্বল আলো দেওয়া) এবং দ্যোতক বা পথপ্রদর্শক হওয়া~ এগুলোই হলো দেবতার মূল লক্ষণ। দ্বিতীয়ত- "দদাতীতি দেবতা", অর্থাৎ যিনি বা যা অন্যকে প্রদান করে, তা-ই দেবতা।
 
বৈদিক সাহিত্যে দুই প্রকার দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়~ এক হলো জড় দেবতা এবং দ্বিতীয় হলো চেতন দেবতা। জড় দেবতাদের মধ্যে পৃথিবী, সূর্য, ইন্দ্র, বিদ্যুৎ, জল, বায়ু, গ্রহ, সমুদ্র এবং অগ্নি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এগুলো অন্যকে সর্বদা কিছু না কিছু প্রদান করে, অর্থাৎ অশেষ উপকার সাধন করে। এই কারণেই জড় হওয়া সত্ত্বেও এগুলো ‘দেবতা’। অবশ্য বেদে এই সকল দেবতাবাচক শব্দ পরমেশ্বরেরবাচক হিসেবেও নানাস্থানে সুপ্রসিদ্ধ। ‘ইন্দ্র’ শব্দের দ্বারা যেমন মেঘকে বোঝানো হয়েছে, তেমনই পরমাত্মার এক পরম পবিত্র নামও হলো 'ইন্দ্র'। ‘অগ্নি’ বলতে যেমন লৌকিক ভৌত অগ্নিকে বোঝায়, তেমনই পরমাত্মাকেও 'অগ্নি' বলে সম্বোধন করা হয়। যেহেতু এখানে পরিবেশ বা প্রকৃতির আলোচনা চলছে, তাই উপর্যুক্ত সমস্ত দেবতাই মূলত প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত দেবতা। সূর্য, চন্দ্র, ইন্দ্র, অগ্নি~ এরা প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এদের দ্বারাই এই ব্রহ্মাণ্ড গঠিত হয়েছে। প্রকৃতিই এদের একমাত্র আশ্রয়স্থল, অতএব এখানে জড় দেবতাদের কথাই বলা হচ্ছে। বিশেষ করে এই অচেতন বা জড় দেবতারা মানুষ ও অন্য প্রাণীদের কেবল দিতেই জানে; যদিও তারা অন্য দেবতাদের কাছ থেকেও গ্রহণ করে, তবে তা পুনরায় অন্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই গ্রহণ করে। মেঘ সমুদ্র থেকে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করে, কিন্তু তা পৃথিবীকে বর্ষণ রূপে দান করার জন্যই। প্রতিটি জড় দেবতার এই আদান-প্রদান মূলত সজীব ও নির্জীব প্রাণী ও পদার্থসমূহকে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করার জন্যই নিয়োজিত। অলৌকিক শক্তি ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই ভৌত পদার্থসমূহের মধ্যে ‘দেবত্ব’র ধারণাটি নিরূপণ করা হয়েছে। প্রাচীন ঋষিদের মনে জাগ্রত হওয়া গভীর কৌতূহল এবং দিব্য গুণাবলীর প্রত্যক্ষ অনুভূতির আলোকেই এই প্রাকৃতিক পদার্থগুলোকে ‘দেবত্ব’-এর সংজ্ঞায় ভূষিত করা হয়েছে। দেবতা এবং সৃষ্টির মধ্যে আদিমকাল থেকেই এক অটুট ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। সেই সকল প্রাকৃতিক পদার্থ~ যার মধ্যে দিব্য শক্তি নিহিত রয়েছে এবং যা মানুষের সাধারণ বৌদ্ধিক ক্ষমতার অতীত, সেগুলোকে ‘দেবত্ব’-এর শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বেদের দেবতারা চেতন ও অচেতন উভয় শ্রেণীতেই বিন্যস্ত, কিন্তু তারা সকলেই স্তুতির অর্থাৎ গুণপ্রশংসার যোগ্য; কারণ তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভাব নিয়ে দান করার এক চিরন্তন প্রবৃত্তি = বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মহান ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়েই বেদমন্ত্রসমূহে হব্য আহুতির দ্বারা দেবতাদের স্তুতি করার পরম প্রেরণা দেওয়া হয়েছে।
 
অধুনা মতেও, "ত্যজ্যমান দ্রব্যে উদ্দেশ্য বিশেষো দেবতা" (সিদ্ধান্ত কৌমুদী) যার উদ্দেশ্যে আজ্য (ঘৃত) আদি হব্যদ্রব্য উৎসর্গ বা ত্যাগ করা হয়, তাকেই দেবতা বলে। অপর একটি লক্ষণ হলো~ "মন্ত্র স্তুত্যাচ" (সিদ্ধান্ত কৌমুদী), অর্থাৎ মন্ত্রের দ্বারা যার মহিমা কীর্তন বা স্তুতি করা হয়। এখানে হব্য এবং স্তুতি সেই দেবতাদের দিব্য গুণে আকৃষ্ট হয়ে মূলত সেই পরমাত্মাকেই অর্পণ করা হচ্ছে, যিনি স্বয়ং এই দেবতাদের সমস্ত শক্তি ও সামর্থ্যের মূল উৎপাদক। দেবতাগণ এখানে মাধ্যম মাত্র এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলেন সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর। অতএব, এটি বিশেষভাবে মনে রাখা অত্যন্ত আবশ্যক যে~ উক্ত দেবতাদের পূজা-অর্চনা যেন পৌরাণিক সজীব দেবতাদের মতো পৌত্তলিক উপায়ে না করা হয়, বরং প্রাকৃতিক উপাদানসমূহের যথাযথ সদ্ব্যবহার এবং তাদের মাধ্যমে যেন একমাত্র পরমাত্মারই উপাসনা সম্পন্ন হতে পারে।
 
▪️"বিষ্লৃৃ ব্যাপ্তৌ" ~ এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দ্বারা ‘বিষ্ণু’ দেবতার বোধ বা জ্ঞান উৎপন্ন হয়। ‘বিষ্ণু’ নামটি আসলে সর্বব্যাপক পরমাত্মারই নাম। এই পৃথিবী অন্ন, গাভী আদি পশুসম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে মননশীল মানুষকে যথোপযুক্ত উপভোগ করার পরম প্রেরণা প্রদান করে।
 
ব্যস্তভ্না রোদসী বিষ্ণবেতে দাধর্থ পৃথিবীমভিতো ময়ূখৈঃ॥
ঋগ্বেদ ৭.৯৯.৩
= হে অন্ন, শক্তি, দুগ্ধ, মধু, ওষধি এবং নবযৌবনে পরিপূর্ণ দ্যুলোক ও ভূলোক! তোমরা উভয়েই মানবজাতির জন্য অন্ন, শক্তি এবং জ্ঞানের আলো প্রদানকারী দাতা। সর্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর এই দ্যুলোক ও ভূলোককে ধারণ করে আছেন এবং মহাজাগতিক শক্তির সৌর বিকিরণের দ্বারা এই পৃথিবীকে চারদিক থেকে সুস্থিত ও সুদৃঢ় রাখছেন।
 
‘অগ্নি’ নামটি পরমাত্মার অন্যতম প্রধান নাম। "অগ্রণীতি অগ্নি" ~ সর্বপ্রথমে উৎপন্ন বা বিদ্যমান হওয়ার কারণে একে অগ্নি বলা হয়; কারণ এই পৃথিবীও সৃষ্টির আদিমকালে এক জ্বলন্ত অগ্নির গোলকই ছিল। পরবর্তীতে শীতল হয়ে তা এই পৃথিবীর গোলকের রূপ ধারণ করেছে। সবিতা বা সূর্য প্রারম্ভে অগ্নির এক সুবৃহৎ গোলক ছিল এবং আজও তা-ই রয়েছে। অতএব, সর্বপ্রথমে প্রকৃতিতে অগ্নির উৎপত্তি হওয়ার কারণে এটি ‘অগ্নি দেবতা’ নামে অভিহিত হলো। ঠিক একইভাবে, পরমাত্মা অর্থেও ‘অগ্নি’ শব্দটির প্রয়োগ হয়। "অগ্রে নয়তীতি" ~ যিনি সর্বদা আমাদের উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেন, তিনিই অগ্নি; দ্যুলোকের এক মহান তত্ত্ব এবং এটি পৃথিবীর পরম পালক তথা রক্ষক।
 
অগ্নির্মূর্ধা দিবঃ ককুৎপতিঃ পৃথিব্যা অয়ম্ ।
অপাং রেতাংসি জিন্বতি ॥
যজুর্বেদ ৩।১২
অর্থাৎ, মানুষের কেবল সেই একমাত্র পরমেশ্বরেরই উপাসনা করা উচিত, যিনি মহান ও পরমেশ্বর, যিনি জ্যোতির্ময় সূর্য ও আলোকহীন পৃথিবীকে ধারণ ও প্রতিপালন করেন এবং যিনি জলের জীবনদায়ী শক্তির নিগূঢ় রহস্য ও গঠন অবগত আছেন।
 
মহর্ষি স্বামী দয়ানন্দের সুনির্দিষ্ট অভিমত এই যে, দিব্যগুণসম্পন্ন হওয়ার কারণে অগ্নি আদি দেবতাসমূহ 'পরমেশ্বরবাচক' অর্থে একমাত্র উপাস্য এবং দ্যুলোকের অগ্নি আদি পদার্থসমূহ তাঁরই পরম আলোয় প্রকাশমান বা দীপ্তিময়। অন্যদিকে, অচেতন ভৌত অগ্ন্যাদি দেবতাসমূহ সমগ্র প্রাণীকুলের কল্যাণের হেতু হওয়ার কারণে আমাদের কাছে যথোপযুক্ত উপভোগ্য বা ব্যবহারের যোগ্য।
 
"অগ্নির্দেবতা বাতো দেবতা" আদি বেদোক্ত দেবতাসমূহকে সৃষ্টির স্থাপক, নিয়ন্তা ও রক্ষক হিসেবে মান্য করা হয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা এই দেবতাদের অর্থ কেবল ভৌত পদার্থের দিকেই টেনে নিয়ে গিয়ে বিষয়টিকে একপেশে করে তুলেছেন। অধ্যাপক ম্যাকডোনেল (Prof. Macdonell) তাঁর ‘বৈদিক মাইথোলজি’ (Vedic Mythology) গ্রন্থে দাবি করেছেন যে~ বৈদিক দেবতাবাদের মূলে রয়েছে প্রাকৃতিক পদার্থসমূহের চমৎকার রূপ এবং তাদের বিলক্ষণ গুণাবলীর কারণে সেগুলোকে উপাস্য দেবতা হিসেবে গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে, স্বামী দয়ানন্দ এই জড় দেবতাদের 'পূজা = স্রষ্টা হিসেবে উপাসনা' করার পরিবর্তে তাদের যথাযথ সদ্ব্যবহার এবং সীমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উপভোগের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা সর্বতোভাবে যুক্তিযুক্ত এবং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। 'বেদের সময়কার প্রাচীন আদিম মানুষ ভয় এবং কোনো অদৃশ্য ফল লাভের আশায় জড় প্রকৃতির পূজা করত'~ পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের এই ভ্রান্ত মতবাদকে স্বামী দয়ানন্দ অত্যন্ত জোরালো যুক্তিতে খণ্ডন করেছেন।
 
অবৈদিক মতবাদে দ্যৌ, পৃথিবী, সূর্য, ঊষা আদি দেবতাদের অলৌকিক রূপ দান করে এবং তাদের ‘মানবিকীকরণ’ (Personification) করে প্রেম, ভয়, অনুরাগ তথা ফল প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে উপাস্য বা পূজনীয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে পৌরাণিকেরা সেই ভ্রান্ত পণ্ডিতদের অন্ধ অনুকরণ করে জড় দেবতাদের এক একটি মূর্তিরূপে সীমাবদ্ধ করে ফেলল এবং সেগুলোকে নিজেদের পুজো-পাঠের অনুকূল করে নিল। আর ঠিক এই প্রমাদ বা ভ্রান্তি থেকেই সমাজে বহু-ঈশ্বরবাদ, ব্রহ্মের স্থলে পৌত্তলিকতার ব্যাপক প্রচলন ও সূত্রপাত ঘটল।
 
▪️বৈদিক ৩৩ দেবতার রহস্য এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিজ্ঞান
 
স্বামী দয়ানন্দের এই তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত আজকের যুগের পরিবেশবাদী এবং আধ্যাত্মিক সাধক উভয়ের জন্যই পরম অনুকূল ও দিকনির্দেশক। জড় দেবতাদের মধ্যে পূজনীয় বা উপাস্য ভাব আরোপ করা অথবা পরব্রহ্ম পরমেশ্বরের স্থানে তাদের স্থলাভিষিক্ত করে তাদেরই পূজা-অর্চনা করা ঋষি দয়ানন্দের সুনির্দিষ্ট বিচারে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক অজ্ঞতা মাত্র। হ্যাঁ, যে যে প্রাকৃতিক দেবতার নাম পরমেশ্বরবাচক (পরমেশ্বরের গুণ প্রকাশ করে), সেই সেই নামের দ্বারা সেই পরম ব্রহ্মেরই স্তুতি, যজ্ঞে আহুতি প্রদান এবং মন্ত্রার্থের অনুধাবন করা সর্বতোভাবে উচিত ও যুক্তিযুক্ত।
 
তিনি বলেন~ "যে যে মন্ত্রে, যে যে পদার্থের প্রধানতা বা প্রাধান্য দিয়ে স্তুতি করা হয়েছে, সেগুলোকে ‘মন্ত্রময় দেবতা’ বলে জানা উচিত।" তাৎপর্য এই যে, সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থই একমাত্র পরমপিতা পরমেশ্বরের পরম আলোয় উদ্ভাসিত বা গতিশীল। অতএব, সেই সকল দেবতার নামে করা স্তুতি অন্তিমে বা চূড়ান্ত বিচারে সেই পরমাত্মারই চরণে নিবেদিত স্তুতি বলে গণ্য হয়।
 
ঋষি দয়ানন্দের এই কালজয়ী সিদ্ধান্তথেকে আজকের পরিবেশবাদীরা একটি অকাট্য ও সুদৃঢ় প্রমাণ লাভ করেছেন যে, বেদে বর্ণিত দেবতারা আসলে পুরাণের কোনো শরীরধারী বা কাল্পনিক দেবতা নন; বরং তাঁরা হলেন সমগ্র প্রকৃতি এবং প্রাণী জগৎকে ধারণকারী প্রকৃতির পরম হিতকর ও উপাদ্দেয় মাধ্যম বা সাধনসমূহ। "দেবো বঃ সবিতা প্রার্পয়তু শ্রেষ্ঠতমায় কর্মণঽআপ্যায়ধ্বম্" ইত্যাদি [যজুর্বেদ ১।১] মন্ত্রে প্রযুক্ত ‘দেব’ শব্দের প্রসঙ্গে ‘দেবো দানদ্বা দীপনাদ্বাদ্যোতনাদ্বা দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। য়ো দেবঃ সা দেবতা।’ নিরুক্ত ৭।১৫ অর্থাৎ দেবের লক্ষণ হচ্ছে দান। সবার হিতার্থে যে দান করে, সে দেব। দেবের গুণ হচ্ছে দীপন অর্থাৎ প্রকাশ করা। সূর্য,চন্দ্র, অগ্নি প্রকাশ করে বলে তাদের দেব বলা হয়। দেবের কর্ম হচ্ছে দ্যোতন অর্থাৎ সত্যোপদেশ করা। অর্থাৎ যে মানুষ সত্য মানেন, সত্য বলেন এবং সত্য উপদেশ দান করেন, তিনি দেব। দেবের বিশেষত্ব হচ্ছে দ্যুস্থান অর্থাৎ ওপরে স্থিতি লাভ। ব্রহ্মাণ্ডের ওপর স্থিতি লাভ করার জন্য সূর্যকে, সমাজের ওপর স্থিতি লাভ করার জন্য বিদ্বানকে এবং রাষ্ট্রের ওপর স্থিতি লাভ করার জন্য রাজাকে দেব বলে। 
 
যজ্ঞে দেবতাদের নামে যে আহুতি বা হোমের বিধান রয়েছে, তাও মূলত এই গভীর অর্থকেই প্রকাশ করে যে~ সৃষ্টির সেই সেই প্রাকৃতিক উপাদান বা দেবতাকে নানাবিধ ঔষধি ও বনস্পতির সুগন্ধি ধূম্র দ্বারা পুষ্ট ও বিশুদ্ধ করা হোক। বেদমন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সমাজে এই জনজাগৃতি বা সচেতনতা গড়ে তোলা হোক, যাতে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদসমূহকে কস্মিনকালেও দূষিত না করে; এবং এর ফলে অন্তরীক্ষ, পৃথিবী ও দ্যুলোকে (মহাকাশে) স্থিত প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে পরম শুদ্ধ রাখার এক মহতী প্রেরণা লাভ করা সম্ভব হয়।
 
যজ্ঞ বা অগ্নিহোত্রের দ্বারা দেবতাদের ‘প্রসন্ন’ করার প্রকৃত তাৎপর্যই হলো এই যে~ প্রকৃতির সমস্ত সাধন ও সম্পদকে সর্বদা সুসংহত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরম বিশুদ্ধ রাখা।
অগ্নিমীল়ে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্॥
ঋগ্বেদ ১।১।১
এখানে স্বামী দয়ানন্দ ‘অগ্নি’ শব্দের দুটি সমান্তরাল অর্থ করেছেন~ একটি পরমেশ্বরবাচক এবং দ্বিতীয়টি ভৌত বা লৌকিক অগ্নিবাচক। তিনি বলেন, পৃথিবী, সুবর্ণ আদি বহুমূল্য রত্নসমূহকে যিনি ধারণ করেন, যিনি সমস্ত সুখের দাতা (দেবম্) এবং সর্বপদার্থের পরম প্রকাশক, সেই পরমেশ্বরের আমরা (ঈল়ে) স্তুতি করি। আবার ভৌত বা লৌকিক দেবতার পক্ষে এর অর্থ করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, (ঋত্বিজম্) শিল্পবিদ্যা ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাধনস্বরূপ, (রত্নধাতমম্) উত্তম উত্তম সুবর্ণ আদি রত্নসমূহকে ধারণ করানোর হেতু এবং (দেবম্) যুদ্ধবিগ্রহে নানাবিধ কলাযুক্ত ও বৈজ্ঞানিক শস্ত্রের দ্বারা বিজয় এনে দিতে সমর্থ ভৌত অগ্নির আমরা (ঈল়ে) বারংবার কামনা বা ইচ্ছা করি।
 
"তদেবাগ্নিস্তদাদিত্যস্তদ্ বায়ুস্তদু চন্দ্রমাঃ"-যজুর্বেদের [৩২.১] এই পবিত্র মন্ত্রের দ্বারা ‘অগ্নি’ আদি নামের দ্বারা সর্বদা সেই সচ্চিদানন্দলক্ষণযুক্ত ব্রহ্ম বা পরমাত্মাকেই উপলব্ধি করা উচিত। যেখানে বেদমন্ত্রসমূহে এই দেবতাদের প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের প্রসঙ্গ আসে, সেখানে প্রাকৃতিক পদার্থসমূহের যথোপযুক্ত সদ্ব্যবহার এবং তাদের চিরশুদ্ধ ও চিরপুষ্ট রাখার সম্বন্ধেই প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
 
অগ্নিঃ পূর্বেভির্ঋষিভিরীড্যো নূতনৈরুত। স দেবাঁ এহ বক্ষতি॥
ঋগ্বেদ ১।১।২
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি রূপের অগ্নি সর্বদাই গভীর অনুসন্ধান এবং শিল্প ও কারুশিল্পের নানাবিধ কর্মে ব্যবহারের যোগ্য, যাতে তা সকলের জন্য ন্যায়সঙ্গত উপায়ে উপভোগ করার মতো অসংখ্য বাঞ্ছিত ও প্রয়োজনীয় বস্তুর অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে।
 
আজকের দিনে সৌরশক্তিকে (Solar Energy) জীবনের বিবিধ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য যে নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে, তা মূলত এই বৈদিক মন্ত্রের অন্তর্নিহিত ভাবকেই স্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন করে। মানবজাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক সম্পদসমূহের এই প্রকার নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ প্রাচীনকালেও হতো এবং আধুনিক কালেও নিরন্তর হয়ে চলেছে।
 
পরমপিতা পরমেশ্বর যে যে ভৌত পদার্থে যতটুকু দিব্য শক্তি বা গুণ প্রদান করেছেন, সেই দ্রব্যে ঠিক ততটুকুই ‘দেবত্ব’ বা উপযোগিতা নিহিত রয়েছে, তার চেয়ে বেশি বিন্দুমাত্র নয়। এবং কারণ-প্রকৃতির অণু-পরমাণুর যে অনুপাত বা মাত্রা নির্দিষ্ট রয়েছে, তাতে কোনো প্রকার হ্রাস-বৃদ্ধি বা কম-বেশি হতে পারে না। অতএব, মানুষের পরম কর্তব্য হলো~ সেই সমস্ত দিব্য গুণসম্পন্ন প্রাকৃতিক পদার্থকে সীমিত ও অমূল্য সম্পদ মনে করে তার যথার্থ সদ্ব্যবহার করা; নিজের হীন স্বার্থের জন্য প্রকৃতির অনাবশ্যক শোষণ (Over-exploitation) বা অপপ্রয়োগ না করা।
 
ঋগ্বেদে বহুবিধ দেবতার পরম স্তুতিগাথা পরিলক্ষিত হয়; যেমন~ অগ্নি, বরুণ, ইন্দ্র, দ্যৌ, সোম, মিত্র, বিষ্ণু, আদিত্য, সূর্য, সবিতা, পূষা, মরুৎ, অদিতি, বায়ু, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ঊষা ও পৃথিবী ইত্যাদি। মহর্ষি স্বামী দয়ানন্দ তাঁর অমর গ্রন্থ ‘ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা’-তে সুনির্দিষ্টভাবে বৈদিক ৩৩ দেবতার পুঙ্খানুপুঙ্খ উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ-
১. অষ্ট বসু (৮টি বসু) অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরীক্ষ, আদিত্য (সূর্য), দ্যৌ (আকাশ), চন্দ্রমা এবং নক্ষত্র। (এরা সমগ্র জগৎকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে বা বাস করায়)।
২. একাদশ রুদ্র (১১টি রুদ্র) মানবদেহের অভ্যন্তরে স্থিত ১০টি মুখ্য প্রাণ (প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান, সমান, নাগ, কূর্ম, কৃকল, দেবদত্ত ও ধনঞ্জয়) এবং একাদশতম হলো স্বয়ং ‘জীবাত্মা’। এই ১১টি দেবতা যখন শরীর ত্যাগ করে চলে যায়, তখন পরিজনদের ক্রন্দন করায়~ তাই এরা রুদ্র।
৩. দ্বাদশ আদিত্য (১২টি আদিত্য) বৎসরের ১২টি মাসই হলো ১২টি আদিত্য। এরা সৃষ্টির সবকিছুকে সাথে নিয়ে নিরন্তর আবর্তিত হয় এবং প্রতিটি জীবের আয়ু বা পরমায়ু সুনির্দিষ্ট করে।
৪. এক ইন্দ্র (১টি ইন্দ্র) ‘ইন্দ্র’ হলো মূলত মেঘ এবং বিদ্যুতের নাম। মেঘ থেকেই বিদ্যুতের উৎপত্তি হয়, অতএব এই দুটি মূলত এক ও অভিন্ন। ইন্দ্রের প্রধান শস্ত্র হলো ‘বজ্র’, যা আসলে মহাজাগতিক বিদ্যুৎ।
৫. এক প্রজাপতি (১টি প্রজাপতি) এটি হলো মূলত ‘যজ্ঞ’। এটিও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে এবং প্রাণী জগৎকে নিরন্তর কিছু না কিছু প্রদান করে।
 
এইভাবে দিব্য গুণাবলীতে বিভূষিত এই ৩৩টি বৈদিক দেবতা শাস্ত্রে পরম সুপ্রসিদ্ধ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩।৯।১-৬ এবং শতপথ ব্রাহ্মণ)। এখন মূল প্রশ্ন এই উপস্থিত হয় যে, এই দেবতাদের 'পূজা' কীভাবে করা উচিত? বেদ তথা স্বামী দয়ানন্দের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত এই যে~ এই দেবতাদের মধ্যে যে দিব্য গুণ এবং শক্তি পরিলক্ষিত হয়, তা আসলে স্বয়ং ঈশ্বরপ্রদত্ত। অতএব, উক্ত জড় বা প্রাকৃতিক দেবতাদের পূজা না করে কেবল একমাত্র পরমেশ্বরেরই উপাসনা করা পরম কর্তব্য। যেভাবে একটি বৃক্ষের পাতা বা ডালে জল সেচন করা সম্পূর্ণ বৃথা, কেবল তার মূল বা শিকড়ে জল দিলেই বৃক্ষটি ফল ও ফুলে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে; ঠিক তেমনই, সর্বশক্তিমান পরমাত্মাকে বর্জন করে অন্য জড় দেবতাদের পূজা করা সম্পূর্ণ অব্যবহারিক ও নিষ্ফল। এই সকল প্রাকৃতিক দেবতার যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ এবং তাদের দূষণমুক্ত বা শুদ্ধিকরণ রাখাই হলো ব্যবহারিক অর্থে তাদের প্রকৃত ‘পূজা’।
 
অতএব, যজ্ঞ (অগ্নিহোত্র), প্রার্থনা, উপাসনা, সন্ধ্যা, স্বস্তিবচন কিংবা শান্তিকরণের মাধ্যমে করা যাবতীয় পূজা, ভক্তি বা অর্চনা শেষ পর্যন্ত সেই এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের ভক্তিযোগেই সমাহৃত হয়ে যায়। "হাতির পায়ে সবার পা" ~ এই লোকপ্রসিদ্ধ ন্যায় বা প্রবাদ অনুসারে, একমাত্র পরমাত্মার উপাসনা সম্পন্ন করলেই তার মধ্যে জগতের সমস্ত প্রাকৃতিক দেবতার উপাসনা ও যত্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সমাবিষ্ট হয়ে যায়। অতএব, একনিষ্ঠভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করা এবং প্রকৃতির এই দেবতাদের ভারসাম্য রক্ষা ও সংরক্ষণ করা মানবজাতি তথা সমগ্র পরিবেশের জন্য কেবল আবশ্যকই নয়, বরং পরম অনিবার্য ও অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)