✅বিবাহ সংস্কারে বধূ বরের কোন পাশে বসবে ?
সনাতন ধর্মে বিবাহ কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পরম পবিত্র ও আধ্যাত্মিক বৈদিক সংস্কার। এই শুভ সংস্কার সম্পাদনের সময় যজ্ঞবেদীর সামনে বর ও বধূর বসার নির্দিষ্ট দিক বা অবস্থান নিয়ে বর্তমান সমাজে নানাবিধ ধারণা ও লৌকিক বিভ্রান্তি প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, স্ত্রী যেহেতু স্বামীর ‘বামাঙ্গী’, তাই বিবাহ সংস্কারের সময়ও বধূকে বরের বাম পাশে বা বাঁদিকে বসতে হবে। তবে লোকআচার বা মনগড়া লৌকিক ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা সনাতন ধর্মের পরম প্রমাণ বেদ, শ্রুতি, প্রাচীন কল্পসূত্র (গৃহ্যসূত্র) এবং স্মৃতিশাস্ত্রের বিধানসমূহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও অকাট্য সত্য উন্মোচিত হয়।
ঋগ্বেদের সুপ্রাচীন শ্রৌতপ্রমাণ থেকে শুরু করে গোভিল, খাদির, আপস্তম্ব, বৌধায়ন, হিরণ্যকেশী ও জৈমিনি গৃহ্যসূত্রের মতো প্রামাণিক শাস্ত্রসমূহ এবং ব্যাঘ্রপাদ উপস্মৃতির মতো স্মার্ত গ্রন্থসমূহ সমস্বরে ঘোষণা করে যে—বিবাহ, হবন, দেবপূজা এবং অন্যান্য সমস্ত প্রধান মাঙ্গলিক বা ধর্মকার্যে পত্নীকে অবশ্যই পতির ডান পাশে (দক্ষিণ ভাগে) বসাতে হবে। এমনকি উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বৈদিক পণ্ডিত ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীও তাঁর ‘সংস্কারবিধি’ গ্রন্থে বৈদিক সিদ্ধান্তের আলোকে বধূকে বরের দক্ষিণভাগে বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই নিবন্ধে আমরা শাস্ত্রীয় সূত্রসমূহের অকাট্য প্রমাণসহ আলোচনা করব—কেন বিবাহ সংস্কারে বধূ বরের ডান পাশেই বসবেন এবং কেন লৌকিক সাহিত্যের ‘বামাঙ্গী’ বা ‘বাম’ শব্দের প্রচলিত অর্থকে বিয়ের আসনের ক্ষেত্রে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়।
- 📚 শ্রৌতপ্রমাণ:
পৃথূ রথো দক্ষিণায়া অয়োজ্যৈনং দেবাসো অমৃতাসো অস্থুঃ ।
কৃষ্ণাদুদস্থাদর্যা বিহায়াশ্চিকিৎসন্তী মানুষায় ক্ষয়ায় ॥
ঋগ্বেদ ১।১২৩।১
= যজ্ঞে ডান দিকে অবস্থানকারিণী বধূর বিশাল রথটি যুক্ত (প্রস্তুত) করা হোক এবং তাতে কখনো নাশ না হওয়া প্রকাশমান, দীপ্তিময় রত্নসমূহ খচিত করা হোক। গৃহের স্বামিনী নববধূ যেন বিয়োগ-ব্যথায় শোকার্ত পিতৃগৃহ থেকে নিজের পতিগৃহের উদ্দেশ্যে গমন করার মনোরথ নিয়ে, বিশেষ আদরের সাথে সেই রথের ওপর আরোহণ করেন।
[ভাষ্যকার: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা মীমাংসাতীর্থ]
📚 কল্পসূত্র-প্রমাণ:
১। পূর্বে কটান্তে দক্ষিণতঃ পাণিগ্রাহস্যোপবিশতি
[গোভিল গৃহ্যসূত্র ২।১।২৩]
= পদচালিত হয়ে চাটাইয়ের পূর্বপ্রান্তে বিবাহে প্রবৃত্ত পতির দক্ষিণে (অর্থাৎ ডানে) বধূ বসবে।
২। হুত্বোপোত্তিষ্ঠতঃ। অনুপৃষ্ঠং পতিঃ পরিক্রম্য দক্ষিণত উদঙ্মুখোঽবতিষ্ঠতে বধ্বঞ্জলিং গৃহীত্বা।
[গোভিল গৃহ্যসূত্র ২।২।১-২]
= উত্থানকালে বরের বাম হাত কনের পিঠের উপর দিয়ে বাম কাঁধে এবং কনের ডান হাত বরের পিঠের উপর দিয়ে ডান কাঁধে থাকবে। পতি বধূর পিছন দিক দিয়ে তার ডান দিক দিয়ে গিয়ে অঞ্জলিগ্রহণ করে উত্তরাভিমুখ হয়ে বসবে।
৩। পাণিগ্রাহস্য দক্ষিণত উপবেশয়েৎ
[খাদির গৃহ্যসূত্র ১।৩।৭]
= বিবাহে বধূ পাণিগ্রহীতা পতির ডানে বসবে।
৪। অথৈনামুত্তরয়া দক্ষিণে হস্তে গৃহীত্বাগ্নিমভ্যানীয়াপরেণাগ্নিমুদগগ্রং কটমাস্তীর্য তস্মিন্নুপবিশত উত্তরো বরঃ
[আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র ২।৪।৯]
= বিবাহে বধূ পাণিগ্রহীতা পতির ডানে বসবে, বর বধূর বামে বসবে।
৫। অপরেণাগ্নিমুদীচীনপ্রতিষেবণামেরকাং সাধিবাসামাস্তীর্য তস্যাং প্রাঞ্চাবুপবিশত উত্তরতঃ পতির্দক্ষিণা পত্নী
[বৌধায়ন গৃহ্যসূত্র ১।৩।২০]
= অগ্নির পশ্চিম ভাগে উত্তর দিকে বিস্তৃত একটি আসন—যা বস্ত্রাবৃত বা কম্বলযুক্ত —তা বিছিয়ে, তার ওপর বর ও বধূ উভয়ে পূর্বমুখী হয়ে উপবেশন করবেন। সেখানে পতি (স্বামী) উত্তরে (বাম পাশে) এবং পত্নী (স্ত্রী) দক্ষিণে (ডান পাশে) বসবেন।
৬। দক্ষিণতঃ পতিং ভার্যোপবিশতি
[হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র ৩য় পটল (১৯.৫)]
= পতির দক্ষিণে (ডান) ভার্যা বসবেন।
৭। ‘দক্ষিণতঃ পুমান্ভবতি’ [কাঠক গৃহ্যসূত্র ২৫।১০/৩।১।১০] ~ আদিত্যদর্শনের 'বিবরণ' নামক টীকায় সূত্রকারের অন্যাদি সূত্রবিরোধী বচনের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘'অনেন জ্ঞায়তে দক্ষিণযুগতর্দ্মনি কন্যা আসীত’।
৮। ‘পশ্চাদগ্নেস্তেজনীং কটং বা দক্ষিণপাদেন প্রবৃত্ত্যোপবিশতি’ [পারস্কর গৃহ্যসূত্র ১।৫।২] ~ সূত্রে বধূর উপবেশনের দিকের উল্লেখ না থাকলেও টীকাকাররা বলেছেন—
(১) হরিহর: প্রাঙ্মুখ উপবিশতি দক্ষিণতো বরস্য বধূঃ।
(২) গদাধর: ততো বরোঽগ্নেঃ পশ্চাৎস্থাপিতাং তেজনীং কটং বা দক্ষিণপাদেন প্রবৃত্য আক্রম্য উল্লঙ্ঘয়াগ্নেঃ পশ্চাদুপবিশতি। তেজনী তৃণপূলিকোচ্যতে, কটঃ প্রসিদ্ধঃ। অত্র পশ্চাদুপবেশনং বচনাৎ, বচনাভাবে তু সর্বত্রোত্তরত উপচারো যজ্ঞ ইত্যনেন উপবেশনম্। স্মৃত্যন্তরাদ্বরস্য দক্ষিণতঃ কন্যা উপবিশতি।
৯। দক্ষিণত এরকায়াং ভার্যামুপবেশ্যোত্তরতঃ পতিঃ।
[জৈমিনি গৃহ্যসূত্র ২০।১]
= পতির ডানে ভার্যা (পত্মী) বসবে আর ভার্যার বামে পতি বসবে।
- 📚 স্মার্তপৌরাণিক-প্রমাণ:
১০। শ্রাদ্ধকালে যদা পত্নী বামে বারিপ্রদাপয়েৎ।
পিতরস্তস্য গৃহ্নীয়াৎ যাবদ্বর্ষশতং সমাঃ ॥
কন্যাদানে বিবাহে চ প্রতিষ্ঠাযজ্ঞকর্মণি।
সর্বেষু ধর্মকার্যেষু পত্নী দক্ষিণতঃ স্মৃতা ॥
দক্ষিণে বসতি পত্নী হবনে দেবার্চনে।
শুশ্রূষা রতিকালে চ বামভাগে প্রশস্যতে ॥
জাতকর্মাধি কম্ভেণাং কর্মকতুশ্চদক্ষিণে।
তিষ্ঠেদ্বর্য বামে চ বিপ্রাশীৰ্বচনং যথা ॥
ত্রিষু স্থানেষু সা পত্নী বামভাগে প্রশস্যতে।
পাদশৌচে পিতৃণাং চ রথারোহে ঋতৌ তথা ॥
শ্রাদ্ধে পত্নী চ বামাঙ্গে পাদপ্রক্ষালনে তথা।
নান্দীশ্রাদ্ধে চ সোমে চ মধুপর্কে চ দক্ষিণে ॥
ব্যাঘ্রপাদ উপস্মৃতি ৮৩-৮৮
→ শ্রাদ্ধের সময় স্ত্রী যখন স্বামীর বাম পাশে (বাম হস্ত দ্বারা) জল দান করেন, তখন পিতৃপুরুষগণ সেই জল একশত বছর পর্যন্ত গ্রহণ করেন (অর্থাৎ তৃপ্ত থাকেন)। কন্যাদান, বিবাহ, দেব-প্রতিষ্ঠা, যজ্ঞ এবং অন্যান্য সমস্ত প্রধান ধর্মীয় বা মাঙ্গলিক কার্যে স্ত্রীকে স্বামীর ডান পাশে (দক্ষিণ ভাগে) রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে। হোম (হবন) এবং দেবপূজার সময় স্ত্রী ডান পাশে উপবেশন করবেন। তবে স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা এবং রতিকালের সময় স্ত্রীর বাম পাশে অবস্থান করাই প্রশস্ত বা উত্তম। জাতকর্ম ইত্যাদি সংস্কারের সময় এবং কলস স্থাপনাদি কার্যে কর্তার (স্বামীর) ডান পাশে স্ত্রী থাকবেন। কিন্তু বর (স্বামী) যখন ব্রাহ্মণদের আশীর্বাদ গ্রহণ করবেন, তখন স্ত্রী বরের বাম পাশে অবস্থান করবেন। (বিশেষভাবে) এই তিনটি স্থানে স্ত্রীর বাম ভাগে অবস্থান প্রশস্ত: পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে বা মাঙ্গলিক কার্যে পা ধোওয়ার সময়, রথে (বা যানবাহনে) আরোহণের সময় এবং ঋতুকালে (শয়নকালে)। সাধারণ শ্রাদ্ধকর্মের সময় এবং পা ধোওয়ার সময় স্ত্রী বাম অঙ্গে (বাম পাশে) থাকবেন। কিন্তু নান্দীশ্রাদ্ধ (বৃদ্ধি শ্রাদ্ধ), সোমযজ্ঞ এবং মধুপর্ক (বরণ বা সৎকার) গ্রহণের সময় স্ত্রী ডান পাশে (দক্ষিণ ভাগে) অবস্থান করবেন।
১১। দম্পতী তু ব্রজেয়াতাং হোমার্থঞ্চৈব বেদিকাম্।
বরস্য দক্ষিণে ভাগে তাং বধূমুপবেশয়েৎ॥
লঘু-আশ্বলায়ন স্মৃতি ১৫।৩৬
= অতঃপর দম্পতী (পতি ও পত্নী) হোম করার জন্য বেদীতে গমন করবে। বরের দক্ষিণভাগে (ডানে) বধূকে বসাবে।
১২। সংস্কারগণপতি
বামে সিন্দূর দানে চ বামে চৈব দ্বিরাগমনে ।
বামে শয়নৈকস্যায়াং-ভবেজ্জায়া প্রিয়ার্থিনী ॥
আর্শীবাদে অভিষেকে চ পাদপ্রক্ষালেন তথা।
শয়নে ভোজনে চৈব পত্নী তূত্তরতো ভবেৎ ॥
সর্বেষু ধর্মকার্যেষু পত্নী দক্ষিণতো ভবেৎ ।
অভিষেকে বিপ্রপাদপ্রক্ষালনে বামতঃ সদা ॥
▪️ ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ~ সংস্কারবিধিঃ, বিবাহপ্রকরণম্
“তৎপরে বর ও বন্ধু উভয়ে যজ্ঞকুণ্ড প্রদক্ষিণ করে কুণ্ডের পশ্চিমভাগে পূর্বস্থাপিত আসনে বধূ বরের দক্ষিণভাগে এবং বর বধূর বামভাগে উপবেশন করলে…”
→ কিছু বিদ্বানের ধারণা যে যখন স্ত্রীকে দক্ষিণে বসানোরই বিধান রয়েছে, তখন শাস্ত্রসমূহে তাঁকে 'বামাঙ্গী' কেন বলা হয়েছে? স্ত্রীর 'বামাঙ্গী' নাম এইজন্য নয় যে তাঁকে বাম ভাগেই রাখা হোক। এই শব্দটি কোনো যজ্ঞের সংজ্ঞার নয়। এই শব্দটি লৌকিক সাহিত্যের। লৌকিক সাহিত্যে 'বাম' শব্দের অর্থ প্রিয়, সুন্দর এবং মনোহরও হয়ে থাকে। বস্তুত 'বাম' শব্দের মূল অর্থ সুন্দরই ছিল। কালক্রমে মূল অর্থ গৌণ হয়ে গেছে। যেমন বেদে-
অস্য বামস্য পলিতস্য হোতুস্তস্য ভ্রাতা মধ্যমো অস্ত্যশ্নঃ ।
তৃতীয়ো ভ্রাতা ঘৃতপৃষ্ঠো অস্যাত্রাপশ্যং বিশ্পতিং সপ্তপুত্রম্ ॥
ঋগ্বেদ ১.১৬৪.১
= মর্ত্য ও অন্তরীক্ষের জলরাশি এবং রসসমূহ গ্রহণকারী ও আলো-শক্তির দাতা—এই দীপ্তিময় ও প্রাচীন যাজক সূর্যের দ্বিতীয়, কনিষ্ঠ ও মধ্যম ভ্রাতা হলেন বায়ু (বাতাস ও বিদ্যুৎ); যিনি অন্তরীক্ষের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করেন, এবং এই শক্তি অত্যন্ত প্রলয়ঙ্কর (সর্বগ্রাসী) ও সর্বত্র বিদ্যমান। তাঁর তৃতীয় ও সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা হলেন অগ্নি, যাকে যজ্ঞে জল ও ঘৃত (ঘি) দ্বারা সিঞ্চিত করা হয়। এটি জীবকুলের প্রতিপালক এবং এটি সাতটি সন্তানে ধন্য, অর্থাৎ বর্ণালীর (spectrum) সাতটি আলোক রশ্মিসম্পন্ন। আমি যদি জীবনের এই প্রাচীন, দীপ্তিময় ও পালনকর্তা শক্তি এবং বন্ধুকে জানতে পারতাম!
‘বাম’ অর্থ যে সুন্দর, চারু, মনোজ্ঞ তা অভিধানেও দৃষ্ট হয়- যথা বঙ্গীয় শব্দকোষের ২য় খণ্ডে ‘বাম’ শব্দ নির্ণয়। 'বাম'-এর অর্থ যদি উল্টো বা বাঁদিকেরই হয়, তবে তো 'বামলোচনা' শব্দের অর্থ হবে- ট্যারা চোখ বা যাঁর ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, অথচ যেখানে 'বামলোচনা' শব্দের অর্থ হলো- সুন্দর নেত্রযুক্তা (সুন্দর চোখের অধিকারী)। একইভাবে বামাঙ্গী-র অর্থ হলো ‘সুন্দর অঙ্গবিশিষ্টা’। কিছু বিদ্বান এই তর্ক দিয়ে পত্নীকে বাম অঙ্গে (বাঁদিকে) বসান যে শরীরে হৃদয় বাঁদিকে থাকে। অতএব স্ত্রীকে বাম অঙ্গে বসিয়ে বর এটি সূচিত করে যে আমি 'গৃহস্থে' পত্নীকে সেই স্থানই দেব, যা শরীরে হৃদয়ের রয়েছে। এই প্রকারের মনগড়া ব্যাখ্যাসমূহ শুনতে এবং পড়তে বড়ই আকর্ষণীয় লাগে, কিন্তু শাস্ত্রের সাথে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।
সমগ্র আলোচনা ও শাস্ত্রীয় প্রমাণসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করলে এটি সুষ্পষ্ট ও প্রমাণিত হয় যে, বিবাহ সংস্কার এবং যাবতীয় প্রধান মাঙ্গলিক কর্মে বধূ বা পত্নীকে বরের ডান পাশে বসানোই একমাত্র শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্ত। ঋগ্বেদের সেই আদি আখ্যান, যেখানে যজ্ঞে ডান দিকে অবস্থানকারিণী বধূর রথের বর্ণনা রয়েছে, তা থেকে শুরু করে পরবর্তী গৃহ্যসূত্রসমূহের বহুবিধ স্পষ্ট বচন—যেমন ‘পতির দক্ষিণে ভার্যা বসবেন’—প্রমাণ করে যে সনাতন ধর্মে ধর্মকার্যের সময় স্ত্রীর আসন স্বামীর ডান দিকেই সুনির্দিষ্ট।
শাস্ত্রের এই অমোঘ বিধান থাকা সত্ত্বেও সমাজে যে স্ত্রীকে বাম পাশে বসানোর এক অন্ধ অনুকরণ দেখা যায়, তা মূলত ‘বাম’ শব্দের প্রকৃত বৈদিক ও আভিধানিক অর্থ না জানার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে। বেদের মন্ত্র এবং অভিধান সাক্ষ্য দেয় যে, ‘বাম’ শব্দের আদি ও মূল অর্থ হলো প্রিয়, সুন্দর, চারু বা মনোহর; কোনোভাবেই তা কেবল ‘বাঁদিক’ বা ‘উল্টো’ বোঝায় না। যেভাবে ‘বামলোচনা’ মানে ট্যারা চোখ নয়, বরং সুন্দর চোখের অধিকারী নারী, ঠিক একইভাবে ‘বামাঙ্গী’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো ‘সুন্দর অঙ্গবিশিষ্টা প্রিয়া’—স্বামীর বাঁদিকে বসা স্ত্রী নয়। শরীরে হৃদয় বাঁদিকে থাকে বিধায় স্ত্রীকে বাম পাশে বসাতে হবে—এমন আকর্ষণীয় ও মনগড়া লৌকিক ব্যাখ্যার সাথে সনাতন শাস্ত্রের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রচলিত স্মার্তশাস্ত্রে কেবল নির্দিষ্ট কিছু লৌকিক বা বিশেষ ক্ষণিক কর্মে (যেমন সেবা-শুশ্রূষা, রতিকাল, শয়ন কিংবা পা ধোয়ানোর সময়) স্ত্রীকে বাম পাশে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বিবাহ ও যজ্ঞের মতো পরম ধর্মকার্যে স্ত্রীর স্থান সর্বদা দক্ষিণ ভাগেই। অতএব, লৌকিক ভ্রান্তি ও মনগড়া যুক্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে, প্রকৃত বৈদিক সিদ্ধান্ত ও শাস্ত্রীয় অনুশাসনকে মর্যাদা দিয়ে বিবাহ সংস্কারে বধূকে বরের ডান পাশে বসানোই সনাতন সংস্কৃতির প্রকৃত ও শুদ্ধ আচরণ।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর














