দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







পঞ্চমহাযজ্ঞ ~ আর্য-মাত্রেই অবশ্যই নিত্য-কর্তব্য

সত্যান্বেষী
0

 

🔰 পঞ্চমহাযজ্ঞ ~ আর্য-মাত্রেই অবশ্যই নিত্য-কর্তব্য
 
মানবজীবনকে পশুজন্ম থেকে পৃথক করার এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উন্নতি সাধনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো ‘যজ্ঞ’। বৈদিক সনাতন ধর্মে প্রতিটি আর্য বা শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন গৃহস্থের জন্য প্রতিদিন পালনীয় পাঁচটি পরম কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ‘পঞ্চমহাযজ্ঞ’ নামে পরিচিত। এটি কোনো সাধারণ লৌকিক আচার নয়, বরং মহাজাগতিক ও সামাজিক ঋণ পরিশোধের এক অপূর্ব বিজ্ঞান। আমাদের অনিচ্ছাকৃত হিংসা ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে, পরিবেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে এবং পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করতে এই পাঁচটি যজ্ঞের কোনো বিকল্প নেই। বেদ, উপনিষদ, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, কল্পসূত্র এবং মনুস্মৃতি ও গীতার মতো প্রামাণ্য শাস্ত্রের আলোকে এই নিত্য-কর্তব্যের অমোঘ শ্রৌত ও বেদানুকূল স্মার্ত প্রমাণসমূহ এখানে সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা হলো। 
 
✅ শ্রৌতপ্রমাণ:
▶️ ব্রহ্মযজ্ঞ ও দেবযজ্ঞ:
ব্রহ্মযজ্ঞ হলো ব্রহ্মকে জানার প্রচেষ্টা। পশুজন্মের সাথে মানবজন্মের পার্থক্য কী? একটি পশু আহার করে, ঘুমায়, মৈথুন করে। একজন মানুষের জীবনও‌ যদি আহার, নিদ্রা, মৈথুনেই কেটে যায়, তাহলে পশুর সাথে তার পার্থক্য কী! ঈশ্বর আমাদের‌ শ্রেষ্ঠ মনুষ্যযোনী দিয়েছেন, বর্তমান মনুষ্য জন্মকে সার্থক তখনই করতে পারি, যদি আমরা এই দুর্লভ জন্মকে ব্রহ্ম সাধনার কাজে লাগাই।‌ তমেব বিদিত্বাতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায়। [যজুর্বেদ ৩১।১৮]। এই ব্রহ্মকে জানলেই মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়, মুক্তিলাভের আর কোনো উপায় নেই। এভাবেই আমরা‌ ক্রমান্বয়ে জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিরূপ মোক্ষের দিকে ধাবমান হতে পারব। ব্রহ্মকে জানার যেকোনো প্রচেষ্টাই ব্রহ্মযজ্ঞ। সাধারণত যোগ, প্রাণায়াম, স্বাধ্যায় [শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন], অধ্যাপনা, ঈশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা, উপাসনা এসকলই ব্রহ্মযজ্ঞের অন্তর্ভুক্ত।
উপ ত্বাগ্নে দিবেদিবে দোষাবস্তর্ধিয়া বয়ম্‌।
নমো ভরন্ত এমসি ॥
সামবেদ ১৪
= হে জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা ! আমরা ধ্যানবৃত্তি অথবা মন দ্বারা নমস্কারাদি সমর্পণের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রাতকালে ও সায়ংকালে তোমার উপাসনা করি।
ব্রহ্মযজ্ঞ হলো ঈশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা ও উপাসনার মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি করা। এই মন্ত্রটি নির্দেশ করে যে, গৃহস্থের উচিত প্রতিদিন প্রাতঃকালে (ভোরে) ও সায়ংকালে (সন্ধ্যায়) একাগ্র চিত্তে ধ্যান ও প্রণামের মাধ্যমে সেই জ্ঞানস্বরূপ পরমেশ্বরের উপাসনা করা। এটিই মানব জন্মকে সার্থক করার প্রথম ধাপ।
পরমেশ্বরের কৃপা লাভে নিত্য অগ্নিহোত্রসহ সকল যজ্ঞ, প্রাকৃতিক দেবের পরিশুদ্ধির উদ্দেশ্যে হবি অর্পণ, বিদ্বানগণের সংসর্গ লাভ ও সেবা করাই দেবযজ্ঞ। গীতায় আছে, তাই প্রতিদিন কিংবা বিশেষ তিথিতে কাষ্ঠ, নানা আহার্য শস্যদ্রব্য, ঘৃত, ঔষধি গুল্ম প্রভৃতি দিয়ে যজ্ঞ করতে হবে। নানা সুগন্ধি-ঔষধি দ্রব্য হবি দেয়ার ফলে বায়ু বিশুদ্ধ ও নিরোগ থাকে।
সমিধাগ্নিং দুবস্যত ঘৃতৈর্বোধয়তাতিথিম্।
আস্মিন্ হব্যা জুহোতন ॥
যজুর্বেদ ৩।১
= হে বিদ্বান ব্যক্তিগণ! কাঠের টুকরো ও ঘৃত দিয়ে অগ্নি প্রজ্বলিত করুন; সন্ন্যাসীর মতো শ্রদ্ধার যোগ্য সেই অগ্নিকে উদ্ভাসিত করে তুলুন। যজ্ঞের এই অগ্নিতে আহুতি প্রদান করুন।
দেবযজ্ঞের মূল ভিত্তি হলো অগ্নিহোত্র। এখানে বিদ্বান ও গৃহস্থদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা প্রতিদিন সমিধ (কাঠের টুকরো) এবং ঘৃত দিয়ে যজ্ঞের পবিত্র অগ্নি প্রজ্বলিত করেন। এটি সন্ন্যাসীর মতো নিষ্কাম ও পবিত্রভাবে করতে হবে, যা পরিবেশকে শুদ্ধ ও সুরভিত করে তোলে।
অগ্নিং দূতং পুরো দধে হব্যবাহমুপব্রুবে।
দেবাঁ২ঽআ সাদয়াদিহ ॥
যজুর্বেদ ২২।১৭
= আমাদের যান্ত্রিক কাজকর্ম সফল করার ক্ষেত্রে যে অগ্নি দূতের মতো কাজ করে, যা আমাদের আহার করার জন্য অন্ন প্রদান করে এবং এই জগতে আমাদের জন্য ভোগ-সুখ বয়ে আনে, আমি সেই অগ্নিকে সম্মুখে স্থাপন করছি; আমি বিদ্বানদের এর পূর্ণ ব্যবহার করার নির্দেশ দিচ্ছি।
অগ্নি হলো প্রকৃতির এক মহান দূত এবং শক্তির আধার। এই যজ্ঞাগ্নি আমাদের আন্ন ও নানাবিধ জাগতিক সুখ প্রদান করে। মন্ত্রটিতে সমাজ ও প্রকৃতির কল্যাণে অগ্নিবিজ্ঞানের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের জন্য বিজ্ঞানী ও বিদ্বানদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সায়ংসায়ং গৃহপতির্নো অগ্নিঃ প্রাতঃপ্রাতঃ সৌমনসস্য দাতা।
বসোর্বসোর্বসুদান এধি বয়ং ত্বেন্ধানাস্তন্বং পুষেম॥
অথর্ববেদ ১৯।৫৫।৩
= প্রতিনিয়ত সায়াহ্নে [দিনের শেষে] এবং প্রাতঃকালে [ভোরবেলায় ব্রাহ্মমুহূর্তে] আমাদের গৃহের রক্ষক তেজস্বী পরমেশ্বর! তুমি উত্তম চিত্ত, উত্তম সংকল্পযুক্ত মন এবং সুখের দাতা হও। তোমার অনন্ত গুণসমূহ প্রকাশিত করে, আমরা নিজেদের শরীরকে পুষ্ট করি।
▶️পিতৃযজ্ঞ:
আমাদের প্রপিতামহ-প্রপিতামহী, পিতামহ-পিতামহী, মাতা-পিতা, স্বগোত্রীয় কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরু বা আচার্য তথা অন্য যেকোনো বিদ্বান্ বা শিক্ষিত ব্যক্তি যাঁরা অনুভবপ্রবীণ, জ্ঞানপ্রবীণ ও মান-সম্মান পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে ‘পিতর’ বলা হয়। তাদের যথাযথভাবে সন্মান প্রদর্শন, তাঁদের সাথে ভালো আচরণ ও তাঁদের শ্রদ্ধা করাই পিতৃযজ্ঞ।
ঊর্জং বহন্তীরমৃতং ঘৃতং পয়ঃ কীলালং পরিস্রুতম্।
স্বধা স্থ তর্পয়ত মে পিতৄন্ ॥
যজুর্বেদ ২।৩৪
= আপনারা নিজেদের ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার স্বামী হোন এবং ন্যায়পরায়ণতা ও পুণ্যকর্মের সাথে তা ভালোভাবে পরিচালনা করুন। সমাজের প্রবীণ হিতৈষী, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের ভালোবাসার সাথে এবং পরম শ্রদ্ধায় উদার আতিথেয়তা প্রদান করুন। তাঁদের সন্তুষ্টির জন্য সুস্বাদু পানীয় জল ও পুষ্টিকর রস, স্বাস্থ্যকর দুধ ও ঘৃত (ঘি), বৈভবশালী (প্রচুর) খাদ্য এবং মধুর মতো মিষ্টি ফল অর্পণ করুন।
আ যন্তু নঃ পিতরঃ সোম্যাসোঽগ্নিষ্বাত্তাঃ পথিভির্দেবয়ানৈঃ।
অস্মিন্ যজ্ঞে স্বধয়া মদন্তোঽধি ব্রুবন্তু তেঽবন্ত্বস্মান্ ॥
যজুর্বেদ ১৯।৫৮
= মানসিক শান্তি, শান্তভাব ও আত্মসংযমের অধিকারী এবং অগ্নিবিজ্ঞানের জ্ঞাতা আমাদের সেই পিতৃপুরুষগণ যেন দিব্য পথের মাধ্যমে আগমন করেন; এই যজ্ঞে নিজেদের অন্ন উপভোগ করে তাঁরা যেন আমাদের শিক্ষা ও নির্দেশ প্রদান করেন এবং আমাদের সুরক্ষা দান করেন।
অত্র পিতরো মাদয়ধ্বং যথাভাগমাবৃষায়ধ্বম্।
অমীমদন্ত পিতরো যথাভাগমাবৃষায়িষত ॥
যজুর্বেদ ২।৩১
= এই জগতে, প্রজ্ঞাবান ও বিদ্বান ব্যক্তিগণ যেন আনন্দ উপভোগ করেন, তাঁরা যেন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তিশালী, সুস্থ ও সন্তুষ্ট থাকেন। তাঁরা যেন নিজেদের সংস্থান বা সম্পদ অনুযায়ী সুখী, নীরোগ ও প্রফুল্ল থাকেন।
নমো বঃ পিতরো রসায় নমো বঃ পিতরঃ শোষায় নমো বঃ পিতরো জীবায় নমো বঃ পিতরঃ স্বধায়ৈ নমো বঃ পিতরো ঘোরায় নমো বঃ পিতরো মন্যবে নমো বঃ পিতরঃ পিতরো নমো বো গৃহান্নঃ পিতরো দত্ত সতো বঃ পিতরো দেষ্মৈতদ্বঃ পিতরো বাসঃ ॥
যজুর্বেদ ২।৩২
= হে পিতৃপুরুষগণ, সুখ ও জ্ঞান অর্জনের জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, দুঃখ-কষ্ট ও শত্রু দমনের জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, দীর্ঘায়ুর জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচার প্রদর্শনের জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, নানাবিধ দুর্যোগের অবসানের জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, ধর্মের রক্ষার্থে ন্যায্য ক্রোধের জন্য আপনাদের প্রতি প্রণাম। হে পিতৃপুরুষগণ, জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের এই আকাঙ্ক্ষাকে জানুন। হে পিতৃপুরুষগণ, জানুন যে আপনাদের প্রতি আমাদের এই বিনম্র ভক্তি কেবল আপনাদের সম্মানের জন্য। হে পিতৃপুরুষগণ, প্রতিদিন আমাদের গৃহে আগমন করুন এবং আমাদের উপদেশ দান করুন। হে পিতৃপুরুষগণ, আমাদের যা কিছু আছে তা সর্বদা আপনাদের উদ্দেশ্যে অর্পণ করি। আমরা আপনাদের এই বস্ত্রসমূহ দান করছি, অনুগ্রহ করে এগুলি গ্রহণ করুন।
এই মন্ত্রটি পিতৃপুরুষদের প্রতি বিনম্র ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দীর্ঘায়ু, জ্ঞান, সুখ ও ধর্ম রক্ষার জন্য তাঁদের প্রণাম জানানো হয়েছে। প্রতিদিন তাঁদের সেবা করা এবং তাঁদেরকে উপযুক্ত বস্ত্র ও আসন দান করার মাধ্যমে এই যজ্ঞ সফল হয়।
আধত্ত পিতরো গর্ভং কুমারং পুষ্করস্রজম্।
যথেহ পুরুষোঽসৎ ॥
যজুর্বেদ ২।৩৩
= হে আচার্য! জ্ঞান অর্জনে উৎসুক, হস্তে পুষ্পমাল্য ধারণকারী এই যুবককে আপনার শিষ্যত্বের গর্ভে গ্রহণ করুন, যাতে সে পূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করতে পারে। [ঠিক যেভাবে একজন মা সন্তানকে তাঁর গর্ভে ধারণ করেন এবং উপযুক্ত আহার ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার শরীরের বিকাশ ঘটান; তেমনই একজন শিক্ষক, যিনি কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের শিষ্যত্বে গ্রহণ করেন, তিনি মাতার মতো ভূমিকা পালন করে তাঁর শিক্ষার দ্বারা সেই শিক্ষার্থীর শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটান।]
▶️বলিবৈশ্বদেবযজ্ঞ:
বলিবৈশ্বদেবযজ্ঞ বা ভূতযজ্ঞ হলো জগতের সকল মানুষ ও পশুপাখির কল্যাণ কামনা ও তাদের সর্বদাই যথাসাধ্য সাহায্য করা [ঋগ্বেদ ২।১৩।৪]। “দ্বিপাদব চতুষ্পাৎ পাহি” [যজুর্বেদ ১৪।৮] দ্বিপাদ ও চতুষ্পাদ প্রাণীদের সংরক্ষণ করো। “ঊর্জম্ নো ধেহি দ্বিপদে চতুষ্পদে” [যজুর্বেদ ১১।৮৩] সকল দ্বিপদী ও চতুষ্পদী বৃদ্ধি ও পুষ্টিপ্রাপ্ত হোক- এভাবেই পবিত্র বেদে সকল প্রাণীর সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। মানব ও পশুর প্রতি আমাদের সর্বদাই উত্তম আচরণ করা উচিত। আমরা অসুস্থ মানবের সেবা করতে পারি, দুঃস্থদের সাহায্য করতে পারি, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিতে পারি, অবলা প্রাণীর জন্যও আহার, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারি। এসবই ভূতযজ্ঞ। শুনাং চ পতিতানাং চ শ্বপচাং পাপরোগিণাম্। বয়সানাং কৃমীণাং চ শনকৈর্নির্বপেদ্ ভুবি॥ [মনু ৩।৯২] কুকুরাদি পশু, পতিত ব্যক্তি, অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তি, কুষ্ঠাদি ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী, কাক আদি পক্ষী ও পিঁপড়া আদি কীটের জন্যে খাদ্যদ্রব্যের ছয় ভাগ আলাদাভাবে ভাগ করে দেওয়া ও তাদেরকে সদা প্রসন্ন রাখা উচিত।
▶️অতিথিযজ্ঞ: বেদোক্ত নিত্যকর্ম পঞ্চমহাযজ্ঞের একটি হলো নৃযজ্ঞ বা অতিথিযজ্ঞ। প্রত্যেক গৃহস্থের কর্তব্য হচ্ছে অতিথিকে যথাসামর্থ্য সৎকার করা। যদি অতিথির সৎকার না করা হয় তার ফল সস্পর্কে বেদ বলছে—
ইষ্টং চ বা এষ পূর্তং চ গৃহাণামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
পয়শ্চ বা এষ রসং চ গৃহাণামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
ঊর্জাং চ বা এষ স্ফাতিং চ গৃহাণামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
প্রজাং চ বা এষ পশুংশ্চ গৃহাণামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
কীর্তিং চ বা এষ য়শশ্চ গৃহাণামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
শ্রিয়ং চ বা এষ সংবিদং চ গৃহামশ্নাতি য়ঃ পূর্বোঽতিথেরশ্নাতি॥
এষ বা অতিথির্য়চ্ছ্রোত্রিয়স্তস্মাৎ পূর্বো নাশ্নীয়াৎ॥
অশিতাবত্যতিথাবশ্নীয়াদ্ য়জ্ঞস্য সাত্মত্বায় য়জ্ঞস্যবিচ্ছেদায় তদ্ ব্রতম্॥
অথর্ববেদ ৯।৬। পর্যায় ৩।১-৮
= যে গৃহস্থ অতিথির পূর্বে ভোজন করেন, তিনি গৃহের ইষ্টসুখ, পূর্ণতা, দুগ্ধ, রস, পরাক্রম, বৃদ্ধি, সন্তান, পশু, কীর্তি, যশ, শ্রী এবং জ্ঞান বিনষ্ট করেন। যিনি বেদজ্ঞ, তিনিই অতিথি। সুতরাং অতিথির পূর্বে গৃহস্বামী ভোজন করবেন না। অতিথির ভোজনের পর গৃহস্থ ভোজন করবেন। শুভ কর্মময় জীবনের জন্য এবং তা নিরন্তর চালাবার জন্য এই নিয়ম।
যিনি পূর্ণ বিদ্বান, পরোপকারী, জিতেন্দ্রিয়, ধার্মিক, সত্যবাদী, ছল-কপট-রহিত, নিত্য ভ্রমণকারী মানুষ, তিনিই ‘অতিথি’।কারো ঘরে যখন‌ এসব গুণযুক্ত, সেবা করার যোগ্য অতিথি আসেন; তখন তাঁকে গৃহস্থ দাঁড়িয়ে নমস্কার করে, উত্তম আসনে বসাবেন। পরে গৃহস্থ তাঁকে জিজ্ঞাসা করবেন, “আপনার জল, খাদ্য বা অন্য কোনো বস্তুর ইচ্ছা হয় সেটা বলুন। হে অতিথি! যেভাবে আপনার কামনা পূর্ণ হয়, আমরা সেভাবেই আপনার সেবা করবো।” 
 
✅ স্মার্তপ্রমাণ:  
ঋষিযজ্ঞং দেবযজ্ঞং ভূতযজ্ঞং চ সর্বদা ।
নৃযজ্ঞং পিতৃযজ্ঞং চ যথাশক্তি ন হাপয়েৎ ॥ মনু০ [৪।২১]
অধ্যাপনং ব্রহ্মযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞস্তু তর্পণম্ ।
হোমো দৈবো বলির্ভৌতো নৃযজ্ঞোঽতিথিপূজনম্ ॥ মনু০ [৩।৭০]
স্বাধ্যায়েনার্চয়েতর্ষীন্ হোমৈর্দেবান্যথাবিধি ।
পিতৄন্‌ শ্রাদ্ধৈশ্চ নৄনন্নৈর্ভূতানি বলিকর্মণা ॥মনু০ [৩।৮১]
ব্রহ্মচর্য বিষয়ে দুইটি যজ্ঞের কথা লেখা হয়েছে অর্থাৎ প্রথমটি ‘ঋষিযজ্ঞ=ব্রহ্মযজ্ঞ’ - বেদাদি শাস্ত্রের পঠন-পাঠন, [মনু০ ৩।৭০] সন্ধ্যোপাসনা, যােগাভ্যাস। দ্বিতীয়টি ‘দেবযজ্ঞ’ - বিদ্বান্ ব্যক্তিদের সঙ্গ, সেবা, পবিত্রতা, দিব্যগুণধারণ, দাতৃত্ব, বিদ্যার উন্নতি ও অগ্নিহোত্র করা। এই দুই যজ্ঞ সন্ধ্যা এবং প্রাতঃকালে করতে হয়। তৃতীয় ‘পিতৃযজ্ঞ’ অর্থাৎ যাঁরা দেব = বিদ্বান্, ঋষি= যাঁরা পড়েন-পড়ান এবং পিতর= মাতা, পিতা আদি বৃদ্ধ জ্ঞানীগণ এবং পরম যােগীদের সেবা করা। পিতৃযজ্ঞ ২ প্রকার প্রথম ‘শ্রাদ্ধ’ দ্বিতীয় ‘তর্পণ’। শ্রাদ্ধ অর্থাৎ ‘শ্রৎ’ সত্যের নাম, ‘শ্ৰৎসত্যং দধাতি যয়া ক্রিয়য়া সা শ্রদ্ধা, শ্ৰদ্ধয়া যৎক্রিয়তে তচ্ছ্রাদ্ধম্‌’ = যে ক্রিয়া দ্বারা সত্য গ্রহণ করা যায় তাকে শ্রদ্ধা’ বলে এবং শ্রদ্ধা পূর্বক যে কর্ম অনুষ্ঠিত হয় তার নাম ‘শ্রাদ্ধ’। ‘তৃপ্যন্তি তৰ্পয়ন্তি যেন পিতৃণ তত্তৰ্পণম্‌’= যে যে কর্মের দ্বারা বিদ্যমান মাতা-পিতা প্রভৃতি পিতরগণ তৃপ্ত অর্থাৎ প্রসন্ন হন এবং যেসব কর্ম দ্বারা তাদের প্রসন্ন করা যায় তার নাম ‘তর্পণ। কিন্তু এই কর্ম জীবিতদের জন্য, মৃতদের জন্য নয়।
মনুস্মৃতির দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১০১–১০২ নম্বর শ্লোকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—
পূর্বাং সন্ধ্যাং জপংস্তিষ্ঠেৎ সাবিত্রীমার্কদর্শনাৎ।
পশ্চিমাং তু সমাসীনঃ সম্যগৃক্ষবিভাবনাৎ॥
= প্রাতঃসন্ধ্যাকালে সূর্যোদয় দর্শন পর্যন্ত সাবিত্রী [গায়ত্রী] জপ করতে করতে আসনে স্থিত হবে এবং সূর্যাস্তের পর যে পর্যন্ত নক্ষত্রমণ্ডলের দর্শন না হয়, ততক্ষণ আসনে সমাসীন হয়ে সায়ংসন্ধ্যার উপাসনা করবে।
পূর্বাং সন্ধ্যাং জপংস্তিষ্ঠন্নৈশমেনো ব্যপোহতি।
পশ্চিমাং তু সমাসীনো মলং হন্তি দিবাকৃতম্॥
= প্রাতঃসন্ধ্যাকালে আসনে বসে গায়ত্রী জপ করলে রাত্রিকালীন মানসিক মলিনতা বা দোষসমূহ দূর হয় এবং আসনে সমাসীন হয়ে সায়ংসন্ধ্যাকালে গায়ত্রী জপ করলে দিনের বেলায় সঞ্চিত মানসিক মলিনতা বা দোষসমূহ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
বৈবাহিকেঽগ্নৌ কুর্বীত গৃহ্যং কর্ম যথাবিধি ।
পঞ্চয়জ্ঞবিধানং চ পক্তিং চান্বাহিকীং গৃহী ॥
পঞ্চ সূনা গৃহস্থস্য চুল্লী পেষণ্যুপস্করঃ ।
কণ্ডনী চোদকুম্ভশ্চ বধ্যতে যাস্তু বাহয়ন্ ॥
তাসাং ক্রমেণ সর্বাসাং নিষ্কৃত্যর্থং মহর্ষিভিঃ ।
পঞ্চ ক্ল্প্তা মহায়জ্ঞাঃ প্রত্যহং গৃহমেধিনাম্ ॥
পঞ্চৈতান্যো মহাঅয়জ্ঞান্ন হাপয়তি শক্তিতঃ ।
স গৃহেঽপি বসন্নিত্যং সূনাদোষৈর্ন লিপ্যতে ॥
দেবতাতিথিভৃত্যানাং পিতৄণাং আত্মনশ্চ যঃ ।
ন নির্বপতি পঞ্চানাং উচ্ছ্বসন্ন স জীবতি ॥
মনুস্মৃতি ৩।৬৭-৬৯,৭১-৭২
= বৈবাহিক অগ্নিতে বিধিপূর্বক গৃহ্যকর্ম সম্পাদন করবে এবং গৃহস্থ ব্যক্তি প্রতিদিন পঞ্চমহাযজ্ঞের বিধান ও নিত্য পাকযজ্ঞও সম্পন্ন করবে। গৃহস্থের পাঁচটি সূনা (অনিচ্ছাকৃত প্রাণিহিংসার স্থান) আছে— চুল্লি, পেষণী, উপস্কর (ঝাঁটা বা পরিচ্ছন্নতার উপকরণ), কণ্ডনী (উখল-মুসল বা ধান কোটার উপকরণ) এবং জলপাত্র। এগুলির ব্যবহার করতে গিয়ে জীবহিংসা সংঘটিত হয়। এই সকল সূনার ক্রমানুসারে প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ মহর্ষিগণ গৃহস্থদের জন্য প্রতিদিন পালনীয় পাঁচটি মহাযজ্ঞ নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদিন এই পঞ্চমহাযজ্ঞ ত্যাগ করে না, সে গৃহে অবস্থান করেও সূনাজনিত দোষে লিপ্ত হয় না। আর যে ব্যক্তি দেব, অতিথি, ভৃত্য, পিতৃগণ এবং নিজের আত্মার জন্য এই পাঁচ প্রকার কর্তব্য সম্পাদন করে না, সে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করলেও প্রকৃত অর্থে জীবিত নয়।
কুর্যাদহরহঃ শ্রাদ্ধং অন্নাদ্যেনোদকেন বা ।
পয়োমূলফলৈর্বাপি পিতৃভ্যঃ প্রীতিং আবহন্ ॥
মনুস্মৃতি ৩।৮২
= প্রতিদিন পিতৃগণ অর্থাৎ পিতা-মাতা-বয়োজ্যেষ্ঠদের সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাপূর্বক সেবাকর্ম সম্পাদন করবে— অন্নাদি দ্বারা, অথবা জল দ্বারা; কিংবা দুধ, মূল ও ফল দ্বারা।
প্রতিদিন পিতা-মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রীতি ও সন্তুষ্টির জন্য অন্ন, জল, দুধ কিংবা ফলমূল দিয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের পরিচর্যা করতে হবে। জীবিতাবস্থায় এই সেবাকৰ্মই হলো প্রকৃত শ্রাদ্ধ ও তর্পণ।
বৈশ্বদেবস্য সিদ্ধস্য গৃহ্যেঽগ্নৌ বিধিপূর্বকম্ ।
আভ্যঃ কুর্যাদ্দেবতাভ্যো ব্রাহ্মণো হোমং অন্বহম্ ॥
মনুস্মৃতি ৩।৮৪
= বৈশ্বদেবের [অর্থাৎ প্রকৃতির সর্বত্র অধিষ্ঠিত পরমাত্মার জন্য] জন্য প্রস্তুত (হবিষ্য বা অন্ন) বিধিপূর্বক গার্হপত্য (গৃহ্য) অগ্নিতে ব্রাহ্মণ প্রতিদিন এই উদ্দেশ্যে হোম সম্পাদন করবে।
সম্প্রাপ্তায় ত্বতিথয়ে প্রদদ্যাদাসনোদকে ।
অন্নং চৈব যথাশক্তি সৎকৃত্য বিধিপূর্বকম্ ॥
তৃণানি ভূমিরুদকং বাক্চতুর্থী চ সূনৃতা ।
এতান্যপি সতাং গেহে নোচ্ছিদ্যন্তে কদাচন ॥
মনুস্মৃতি ৩।৯৯,১০১
= যখন কোনো অতিথি আগমন করেন, তখন তাঁকে বিধিপূর্বক যথাযোগ্য সম্মান করে আসন, জল এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্ন প্রদান করবে। তৃণ (আসনের জন্য), ভূমি (বসার স্থান), জল এবং চতুর্থত মধুর ও সত্যভাষণ—এই চারটি বস্তু সজ্জন ব্যক্তিদের গৃহে কখনও অভাব হয় না।
অনেন বিধিনা নিত্যং পঞ্চযজ্ঞান্ন হাপয়েৎ ।
দ্বিতীয়ং আয়ুষো ভাগং কৃতদারো গৃহে বসেৎ॥
মনুস্মৃতি ৫।১৬৯
= এই বিধি অনুসারে গৃহস্থ ব্যক্তি প্রতিদিন পঞ্চমহাযজ্ঞ কখনও পরিত্যাগ করবে না। বিবাহ সম্পন্ন করে সে জীবনের দ্বিতীয় ভাগ গৃহে (গৃহস্থাশ্রমে) অবস্থান করবে। 
 
✅ ব্রাহ্মণ-আরণ্যক প্রমাণ:
পঞ্চৈব মহাযজ্ঞাঃ। তান্যেব মহাসত্ত্রাণি ভূতযজ্ঞো মনুষ্যযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞো দেবযজ্ঞো ব্রহ্মযজ্ঞ ইতি। অহরহর্ভূতেভ্যো বলিং হরেৎ তথৈতং ভূতযজ্ঞং সমাপ্নোত্যহরহর্দদ্যাদোদপাত্রাত্তথৈতং মনুষ্যযজ্ঞং সমাপ্নোত্যহরহঃ স্বধাকুর্যাদোদপাত্রাত্তথৈতং পিতৃযজ্ঞং সমাপ্নোত্যহরহঃ স্বাহাকুর্যাদা কাষ্ঠাত্তথৈতং দেবযজ্ঞং সমাপ্নোতি। অথ ব্রহ্মযজ্ঞঃ। স্বাধ্যায়ো বৈ ব্রহ্মযজ্ঞঃ।
শতপথ ব্রাহ্মণ ১১।৫।৬।১-৩
= মহাযজ্ঞ ৫টি । এইগুলিই মহাসত্র— ভূতযজ্ঞ, মনুষ্যযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ এবং ব্রহ্মযজ্ঞ। প্রতিদিন সকল ভূতের (জীবজন্তু প্রভৃতির) উদ্দেশ্যে বলি (অন্নাদি) প্রদান করবে; এর দ্বারা ভূতযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন জলপাত্র থেকে (অতিথি বা মানুষের জন্য) জল প্রদান করবে; এর দ্বারা মনুষ্যযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন জলপাত্র থেকে ‘স্বধা’ উচ্চারণপূর্বক নিবেদন করবে; এর দ্বারা পিতৃযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। [এখানে জল উপলক্ষণমাত্র, তাৎপর্য সেবাযোগ্য পদার্থ] প্রতিদিন অগ্নিতে কাঠ (সমিধ) দ্বারা ‘স্বাহা’ উচ্চারণপূর্বক আহুতি প্রদান করবে; এর দ্বারা দেবযজ্ঞ সম্পন্ন হয়। এবার ব্রহ্মযজ্ঞ। স্বাধ্যায়ই ব্রহ্মযজ্ঞ।
অথাতঃ স্বাধ্যায়প্রশংসা। প্রিয়ে স্বাধ্যায়প্রবচনে ভবতো যুক্তমনা ভবত্যপরাধীনোঽহরহরর্থান্ত্সাধয়তে সুখং স্বপিতি পরমচিকিৎসক আত্মনো ভবতীন্দ্রিয়সংয়মশ্চৈকারামতা চ প্রজ্ঞাবৃদ্ধির্যশো লোকপক্তিঃ প্রজ্ঞা বর্ধমানা চতুরো ধর্মান্ব্রাহ্মণমভিনিষ্পাদয়তি ব্রাহ্মণ্যম্প্রতিরূপচর্যাং যশো লোকপক্তিং লোকঃ পচ্যমানশ্চতুর্ভির্ধর্মৈর্ব্রাহ্মণং ভুনক্ত্যর্চয়া চ দানেন চাজ্যেয়তয়া চাবধ্যতয়া চ। যদি হ বা অপ্যভ্যক্তঃ অলঙ্কৃতঃ সুহিতঃ সুখে শয়নে শয়ানঃ স্বাধ্যায়মধীত আ হৈব স নখাগ্রেভ্যস্তপ্যতে য এবং বিদ্বান্ত্স্বাধ্যায়মধীতে তস্মাৎস্বাধ্যায়োঽধ্যেতব্যঃ।
শতপথ ব্রাহ্মণ ১১।৫।৭।১,৪
= এবার স্বাধ্যায়ের প্রশংসা। হে প্রিয়! স্বাধ্যায় ও প্রবচনে (অধ্যয়ন ও অধ্যাপনে) নিয়োজিত ব্যক্তি একাগ্রচিত্ত হয়ে ওঠে। সে অন্যের অধীন থাকে না। প্রতিদিনই নিজের অভীষ্ট উদ্দেশ্যসমূহ সিদ্ধ করে। সুখে নিদ্রা যায়। সে নিজের পরম চিকিৎসক হয়ে ওঠে। তার ইন্দ্রিয়সংযম লাভ হয়, একান্তে অবস্থানেই আনন্দ অনুভব করে। তার প্রজ্ঞার বৃদ্ধি ঘটে, যশ বৃদ্ধি পায় এবং লোকসমাজে সম্মান লাভ করে। ক্রমবর্ধমান প্রজ্ঞা ব্রাহ্মণকে চারটি ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করে— ব্রাহ্মণ্য, প্রতিরূপ আচরণ, যশ এবং লোকসম্মান। আর যখন ব্রাহ্মণ এই চারটি ধর্মে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন লোকসমাজও তাঁকে চার প্রকারে সম্মান ও পালন করে— পূজার দ্বারা, দানের দ্বারা, অজেয়তার দ্বারা এবং অবধ্যতার দ্বারা। এমনকি যদি কেউ অভ্যক্ত (সুগন্ধিতে অভিষিক্ত), অলঙ্কৃত, উত্তম আহার করে, সুখকর শয্যায় শয়ন করে থেকেও স্বাধ্যায় অধ্যয়ন করে, তবুও সে নখের অগ্রভাগ পর্যন্ত তপস্যা করে। যে ব্যক্তি এইরূপ জ্ঞানসহকারে স্বাধ্যায় অধ্যয়ন করে, সেও তদ্রূপ (তপস্যার ফল) লাভ করে। অতএব, স্বাধ্যায় অবশ্যই অধ্যয়ন করা উচিত।
তস্মাদহােরাত্রস্য সংযােগে ব্রাহ্মণঃ সন্ধ্যামুপাসীত। উদ্যন্তমস্তং যান্তমাদিত্যমভিধ্যায় ॥
ষড়বিংশ ব্রাহ্মণ ৪।৫
= এই কারণে দিন ও রাত্রির সন্ধিকালে অর্থাৎ সূর্যের উদয় ও অস্তকালে পরমেশ্বরের ধ্যান এবং অগ্নিহােত্র করা অবশ্য কর্তব্য।
য এবং বিদ্বান্মেঘে বর্ষতি বিদ্যোতমানে স্তনয়ত্যবস্ফূর্জতি পবমানে বায়াবমাবাস্যায়াং স্বাধ্যায়মধীতে তপ এব তত্তপ্যতে তপো হি স্বাধ্যায় ইতি॥
তৈত্তিরীয় আরণ্যক ২।১৪।২
= বৃষ্টি, ঝড়, বজ্রঝলক, বজ্রগর্জন, অমাবস্যা ইত্যাদিতেও যে স্বাধ্যায় করে সে মূলত তপস্যাই করে। কারণ স্বাধ্যায় তপস্যাই।
য এবং বিদ্বান্মহারাত্র উষস্যুদিতে ব্রজংস্তিষ্ঠন্নাসীনঃ শয়ানোঽরণ্যে গ্রামে বা যাবত্তরসং স্বাধ্যায়মধীতে সর্বাংল্লোকাঞ্জয়তি সর্বাল্লোকাননৃণোঽনুসঞ্চরতি তদেষাঽভ্যুক্তা, ইতি॥
তৈত্তিরীয় আরণ্যক ২।১৫।৩
= যিনি বিদ্বান তিনি মহারাত্রে অর্থাত অর্ধরাত্রে, উষাকালে, অথবা সূর্যোদয়ের পর হাঁটতে হাঁটতে, দাঁড়িয়ে, বসে কিংবা শোওয়া অবস্থায়, বনে অথবা গ্রামে স্বাধ্যায় অধ্যয়ন করেন, তিনি সমস্ত লোক প্রাপ্ত হন, সমস্ত লোকে ঋণমুক্ত অবস্থায় বিচরণ করেন।
যস্তিত্যাজ সখিবিদং সখায়ং ন তস্য বাচ্যপি ভাগো অস্তি ।
যদীং শৃণোত্যলকং শৃণোতি ন হি প্রবেদং সুকৃতস্য পন্থামিতি॥
তৈত্তিরীয় আরণ্যক ২।১৫।৬
= যে ব্যক্তি মিত্রতাবিদ মিত্রকে অর্থাৎ বেদকে পরিত্যাগ করেছেন, সেই ব্যক্তির বেদেও ভাগ্য থাকে না, তিনি বিদ্বানগণের সভায় বসে অনেক শাস্ত্র শ্রবণ করলেও, তা ব্যর্থ হয়। তিনি পুণ্যকর্মানুষ্ঠানের মার্গ নিশ্চিতরূপে জানেন না।
দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম্। মাতৃদেবো ভব। পিতৃদেবো ভব। আচার্যদেবো ভব। অতিথিদেবো ভব। যান্যনবদ্যানি কর্মাণি। তানি সেবিতব্যানি। নো ইতরাণি। যান্যস্মাকং⁠ সুচরিতানি। তানি ত্বয়োপাস্যানি নো ইতরাণি॥
তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ ১।১১।২
= দেব ও পিত্রাদির সেবা কার্যে কখনো প্রমাদ করবে না। মাতাকে দেবরূপে মান্য করবে, পিতাকে দেবরূপে মান্য করবে, আচার্যকে দেবরূপে মান্য করবে, অতিথিকে দেবরূপে মান্য করবে। যে সকল অনিন্দিত কর্ম সেসবই তোমার আচরণ করা উচিত, দোষযুক্তগুলো নয়। আমাদের যেসব কর্ম বেদানুকূল সেগুলো তোমার অনুকরণ করা উচিত, অন্য সমস্ত নয়।
দীর্ঘসত্রং বা এত উপয়ন্তি। যেঽগ্নিহোত্রং জুহ্বতি। এতদ্বৈ জরামর্যং সত্রম্। যদগ্নিহোত্রম্। জরয়া বা হ্যেবাস্মান্মুচ্যন্তে মৃত্যুনা বা॥
শতপথ ব্রাহ্মণ ১২।৪।১।১
= যারা অগ্নিহোত্রে আহুতি প্রদান করেন, তারা যেন দীর্ঘসত্রই সম্পাদন করেন। কারণ, এই অগ্নিহোত্রই প্রকৃতপক্ষে জরামর্য দীর্ঘসত্র। অর্থাৎ, অগ্নিহোত্রই সেই দীর্ঘসত্র, যার দ্বারা মানুষ বার্ধক্য থেকে অথবা মৃত্যু থেকে মুক্তি লাভ করে। 
 
✅ কল্পসূত্রপ্রমাণ:
অথাতঃ পঞ্চযজ্ঞাঃ । দেবযজ্ঞো ভূতযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞো ব্রহ্মযজ্ঞো মনুষ্যযজ্ঞ ইতি। তদ্যদগ্নৌ জুহোতি স দেবয়জ্ঞো যদ্বলিং করোতি স ভূতযজ্ঞো যৎপিতৃভ্যো দদাতি স পিতৃযজ্ঞো যৎস্বাধ্যায়মধীয়তে স ব্রহ্মযজ্ঞো যন্মনুষ্যেভ্যো দদাতি স মনুষ্যযজ্ঞ ইতি। তানেতান্যজ্ঞানহরহঃ কুর্বীত।
আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র ৩।১।১-৪
= মহাযজ্ঞ ৫টি— দেবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, ব্রহ্মযজ্ঞ ও মনুষ্যযজ্ঞ। অগ্নিতে আহুতি দান ‘দেবযজ্ঞ', প্রাণীদের খাদ্যদান ‘ভূতযজ্ঞ', পিতরদের অন্নদান ‘পিতৃযজ্ঞ', স্বাধ্যায় হলো ‘ব্রহ্মযজ্ঞ'। আর যা (অতিথি) মানবকে দেওয়া হয় তা হলো ‘মনুষ্যযজ্ঞ'। এই ৫টি মহাযজ্ঞ প্রতিদিন পালন করবে।
তেষাং মহায়জ্ঞা মহাসত্ত্রাণীতি সংস্তুতিঃ ১৪ অহরহর্ভূতবলির্মনুষ্যেভ্যো যথাশক্তি দানম্ ১৫ [১২তম কণ্ডিকা] দেবেভ্যঃ স্বাহাকার আ কাষ্ঠাৎপিতৃভ্যঃ স্বধাকার ওদপাত্রাৎস্বাধ্যায় ইতি ১ [১৩তম কণ্ডিকা]।
আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ১ম প্রশ্নে ৪র্থ পটল
= মহাযজ্ঞ বা মহাসত্রে কী কী করতে হয়— প্রতিদিন প্রাণীদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি অর্পণ ও মানুষকে দান; স্বাহাকারে সমিধে দেবোদ্দেশ্যে আহুতি, পিতরদের স্বধাকার অর্থাৎ অন্ন-জল প্রদান এবং স্বাধ্যায় তথা ব্রহ্মযজ্ঞ।
অথাতঃ পঞ্চ মহাযজ্ঞাঃ।
পারস্কর গৃহ্যসূত্র ২।৯।১-১৬
= মহাযজ্ঞ ৫টি। বাকি বর্ণনা অন্যাদি গ্রন্থের মতোই। 
 
📍গৌণ-প্রমাণ:
পঞ্চযজ্ঞবিধানঞ্চ গৃহী নিত্যং ন হাপয়েৎ ।
পঞ্চযজ্ঞবিধানেন তৎপাপং তস্য নশ্যতি ॥
শঙ্খ-স্মৃতি ৫।২
= গৃহস্থ ব্যক্তি প্রতিদিন পঞ্চমহাযজ্ঞের বিধান কখনো পরিত্যাগ করবে না; কারণ এই পঞ্চমহাযজ্ঞের যথাযথ পালনের দ্বারা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত পাপরাশি বিনষ্ট হয়।
পঞ্চযজ্ঞবিধানঞ্চ কুৰ্য্যাদহরহদ্বিজঃ।
মা হাপয়েৎ ক্বচিদ্বিপ্রঃ শ্রেয়স্কামঃ কদাচন ॥
সংবর্ত-স্মৃতি ৩৬
= দ্বিজগণ প্রতিদিন পঞ্চমহাযজ্ঞ করবে। মঙ্গলার্থী বিপ্র কখনো কোনোস্থানেই সেই পঞ্চমহাযজ্ঞ ত্যাগ করবে না।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করেছেন যে, ঈশ্বর সৃষ্টির শুরুতেই যজ্ঞসহ প্রজা সৃষ্টি করেছেন। এই যজ্ঞের মাধ্যমেই মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেবতাদের (বা প্রকৃতিকে) উৎসর্গ না করে যে একা ভোগ করে, সে আসলে ‘চোর’। আর যজ্ঞাবশিষ্ট অন্ন গ্রহণ করলেই মানুষ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হতে পারে।
১. সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট্বা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ।
অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোঽস্ত্বিষ্টকামধুক্ ॥
২. দেবান্ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ।
পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্স্যথ ॥
৩. ইষ্টান্ ভোগান্ হি বো দেবা দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ।
তৈর্দত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুঙ্ক্তে স্তেন এব সঃ ॥
৪. যজ্ঞাশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ।
ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩।১০-১৩
এখানে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করেছেন। যথা-
১. ঈশ্বরই যজ্ঞের প্রণেতা: সৃষ্টির প্রথমে প্রজাপতি যজ্ঞ সহ প্রজা সৃষ্টি করে বলেছিলেন⎯ তোমরা এই যজ্ঞ দ্বারা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হও। এই যজ্ঞ তোমাদের প্রিয় হোক। [এখানে যজ্ঞ অর্থ পঞ্চমহাযজ্ঞ।]
২. যজ্ঞ দ্বারাই আমাদের সমৃদ্ধি হবে: এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা দেবতাদেরকে [পিতা-মাতা আদি পঞ্চদেবতা ও প্রাকৃতিক জড় দেব পরিবেশের বিশুদ্ধতার জন্য] সংবর্ধনা [সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে এমন] করো। সেই দেবতারা তোমাদের প্রীতি সাধন করবেন; এভাবে পরস্পর প্রীতি সম্পাদন করলে পরম মঙ্গল লাভ করবে।
৩. যজ্ঞ না করে যে খায় সে চোর: যজ্ঞ দ্বারা সংবর্দ্ধিত দেবতাগণ তোমাদের অভীষ্ট ভোগ্যবস্তু প্রদান করবেন। তাঁদের প্রদত্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের উৎসর্গ না করেই যে ভোগ করে সেই ব্যক্তি নিশ্চই চোর।
৪. যজ্ঞাবশিষ্ট অন্ন ভোজন করেই পাপপ্রবৃত্তি থেকে মুক্তি হয়: যজ্ঞে অবশিষ্ট অন্নের ভোগকারী শ্রেষ্ঠ মানুষেরা সকল পাপ থেকে মুক্ত হন। আর যে পাপী (শুধুমাত্র) নিজের শরীর পালনের জন্য পাক করে তারা তো পাপকেই ভোজন করে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরো বলেছেন যে- যজ্ঞ, দান, তপস্যা ত্যাগ করা উচিৎ নয়~
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যমেব তৎ ।
যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্ ॥ [শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮.৫]
অর্থ: যজ্ঞ, দান, তপস্যারূপ কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়, এগুলো অবশ্যই কর্তব্য। যজ্ঞ, দান এবং তপস্যা⎯এই তিনটিই মনীষীদের পবিত্রকারী হয়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাবধান করেছেন যেন আমরা তামসিক যজ্ঞ থেকে দূরে থাকি-
বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম্ ।
শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে ॥ [শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৭.১৩]
অর্থ:- শাস্ত্রবিধিহীন, অন্নদানরহিত, মন্ত্রহীন, দক্ষিণারহিত, শ্রদ্ধারহিত যজ্ঞকে তামসিক বলা হয়।
সমগ্র শ্রৌত, স্মার্ত এবং পৌরাণিক প্রমাণসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পঞ্চমহাযজ্ঞ কোনো ঐচ্ছিক বা সাময়িক আচার নয়; এটি প্রতিটি আর্য বা আদর্শ মানুষের জন্য একটি ‘নিত্য-কর্তব্য’। ব্রহ্মযজ্ঞের মাধ্যমে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, দেবযজ্ঞের মাধ্যমে ভগবৎকৃপা লাভ তথা পরিবেশের শুদ্ধতা, পিতৃযজ্ঞের মাধ্যমে প্রবীণদের প্রতি সেবা-কৃতজ্ঞতা, ভূতযজ্ঞের মাধ্যমে প্রকৃতির অবলা প্রাণীদের প্রতি দয়া এবং অতিথিযজ্ঞের মাধ্যমে সামাজিক সৌহার্দ্য রক্ষা পায়।
মনুস্মৃতি ও গীতার অমোঘ বাণী আমাদের সতর্ক করে যে, এই কর্তব্যগুলো বর্জন করে যে কেবল নিজের স্বার্থে বাঁচে ও রান্না করে, সে আসলে চোর এবং সে কেবল পাপকেই ভোজন করে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও কুতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে, মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী প্রদর্শিত বৈদিক ধারায় এই পঞ্চমহাযজ্ঞকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সংস্কার হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা উচিত। ত্যাগের মাধ্যমে বণ্টন এবং বণ্টনের পরেই ভোগের এই শাশ্বত বৈদিক আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করাই মানবজীবনের প্রকৃত পুরুষার্থ ও পরম কল্যাণের একমাত্র পথ।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)