বুদ্ধিম্ তু সারথিম্ বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেবচ।।
- কঠোপনিষদ্ ১/৩/৩
পদার্থঃ হে নচিকেতা। (আত্মানম্) জীবাত্মাকে (রথিনম্) রথী বলে (বিদ্ধি) জানবে (তু) এবং (শরীরম্) শরীরকে (এব) নিশ্চিতরূপে (রথম্) রথ বলে জানবে (তু) এবং (বুদ্ধি) বুদ্ধিকে (সারথি) সারথি বলে (বিদ্ধি) জানবে (চ) এবং (এব) নিশ্চিতরূপে (মনঃ) মনকে (প্রগ্রহম্) লাগাম বলে জানবে।
সরলার্থঃ হে নচিকেতা। জীবাত্মাকে রথী এবং শরীরকে নিশ্চিতরূপে রথ বলে জানবে, বুদ্ধিকে সারথি এবং মনকে লাগাম বলে জানবে।
[ এই শ্রুতিতে যমাচার্য নচিকেতাকে বোঝাচ্ছেন যে, শরীরের সাথে জীবাত্মার কী সম্বদ্ধ এবং জীবাত্মা শরীর দ্বারা কী কার্য গ্রহণ করে, এই কথাকে একটি আলঙ্কারিক অর্থের বোঝানো হয়েছে। যেমন রথের দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট ভাবে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানো যায়, তদ্রূপ জীবাত্মা এই শরীরের দ্বারা লৌকিক সুখ ভোগ করে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ পুরুষার্থ চতুষ্টয় সিদ্ধি করে। শরীরকে রথ বলার অভিপ্রায় হচ্ছে, শরীর ভোগায়তন অর্থাৎ ভোগের স্থান। শরীর ছাড়া জীবাত্মা সুখের ভোগ করতে পারে না। আর রথের উপমা দ্বারা এটিও স্পষ্ট যে, এই শরীর রমণশীল অর্থাৎ সাংসারিক সুখ ভোগের সাধন। জীবাত্মা প্রথমে বুদ্ধি দ্বারা মনকে প্রেরিত করে এবং মনের সাথে সম্বন্ধ হওয়ার পর বাহ্যেন্দ্রিয় কার্য করে। কারণ মনের সম্বন্ধ ছাড়া আমাদের সর্ব কার্যই বিফল। অতএব জীবাত্মার বুদ্ধি সারণি ও মন প্রগ্রহ তথা লাগামের ন্যায় বলা যায়, যার উপমা উপরে দেয়া হয়েছে। ]
আত্মেন্দ্রিয়মনোয়োক্তম্ ভোক্তেত্যাহুর্মনীষিনঃ।।
- কঠোপনিষদ্ ১/৩/৪
পদার্থঃ (মনীষিণঃ) মননশীল পুরুষ এই শরীররূপী রথের (ইন্দ্রিয়াণি) কর্ণ-নেত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহকে (হয়ান) অশ্ব (আহুঃ) বলেন এবং (তেষু) সেই ইন্দ্রিয়সমূহের (বিষয়ান) শব্দ স্পর্শাদি বিষয়কে (গোচরান্) বিচরণ স্থান বলে থাকেন, (আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তম্) শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন দ্বারা যুক্ত জীবাত্মাকে (ভোক্তা) ভোক্তা (ইতি, আহুঃ) বলে থাকেন।
সরলার্থঃ মননশীল পুরুষ কর্ণ-নেত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহকে অশ্ব এবং সেই ইন্দ্রিয়সমূহের শব্দ স্পর্শাদি বিষয়কে বিচরণ স্থান বলে থাকেন। তাঁরা শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন দ্বারা যুক্ত জীবাত্মাকে ভোক্তা বলে থাকেন।
[ এখানে আলঙ্কারিক ভাষাতে বলা হয়েছে যে, এই শরীররূপী রথের অশ্ব হচ্ছে ইন্দ্রিয় এবং শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ এই পাঁচ সেই রথের চারণভূমি। আর জীবাত্মা শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনের সাথে যুক্ত হয়েই সুখ দুঃখ ভোগ করেন। এখানে জীবাত্মাকে স্পষ্টভাবে ভোক্তা বলা হয়েছে। যে সকল বিদ্বানগণ জীবাত্মাকে ভোক্তা না মনে করে বুদ্ধিকে ভোক্তা মনে করেন, তাদের মত এই শ্রুতিতে খণ্ডিত হয়ে যায়। ]
তস্যেন্দ্রিয়াণ্যবশ্যানি দুষ্টাশ্বা ইব সারথেঃ ॥
- কঠোপনিষদ্ ১/৩/৫
পদার্থঃ (য়ঃ তু) আর যে পুরুষ (অবিজ্ঞানবান্) আত্মজ্ঞানহীন এবং (অয়ুক্তেন মনসা) অসংযত মনের সাথে (সদা) সদা বর্তমান (ভবতি) থাকে, (তস্য) তার (ইন্দ্রয়াণি) ইন্দ্রিয়সকল (সারথেঃ) সারথির (দুষ্টাশ্বাঃ ইব) দুষ্ট অশ্বের ন্যায় (অবশ্যানি) বশ হয় না।
সরলার্থঃ আর যে পুরুষ আত্মজ্ঞানহীন এবং অসংযত মনের সাথে সদা বর্তমান থাকে, তার ইন্দ্রিয়সকল সারথির দুষ্ট অশ্বের ন্যায় বশ হয় না।
[ যে অজ্ঞানী পুরুষের চিত্তবৃত্তি বিষয়ে আবদ্ধ এবং যার মন অযুক্ত অর্থাৎ যার মন অসংযত ও বুদ্ধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে কামনা-বাসনা দ্বারা পরিচালিত, তার ইন্দ্রিয় চঞ্চল দুষ্ট অশ্বের ন্যায় তাকে বিষয়ের শিকার বানায়। অর্থাৎ যেরূপ দুষ্ট অশ্বের রথের সারথি নাশ প্রাপ্ত হয়, তদ্রূপ যিনি শমদমাদি সাধনরহিত ও অজ্ঞানী, তিনি বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যান। তাৎপর্য এই যে, যেরূপ অশিক্ষিত ও কুমার্গে গমনকারী দুষ্ট ঘোড়া দ্বারা সারথি অভীষ্ট স্থানে কখনোই পৌঁছাতে পারে না, তদ্রূপ আত্মজ্ঞানহীন জীব চিত্তবৃত্তির নিরোধ ছাড়া ইন্দ্রিয়রূপী ঘোড়াকে বশে আনতে পারে না, কারণ বিষয়োম্মুখ ইন্দ্রিয়ের নিরোধ করা সম্ভব নয়। যেরূপ ঘটে একটি ছিদ্র যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ জল পূর্ণ করা সম্ভব নয়; তদ্রূপ একটি ইন্দ্রিয়ও বিষয়ের দিকে যতক্ষণ ধাবমান হবে ততক্ষণ মনের বৃত্তির নিরোধ করা সম্ভব নয়। এইজন্য পুরুষকে সর্বদা শমদমাদি সাধন সম্পন্ন হওয়া উচিত যেন তার ইন্দ্রিয় বশীভূত থাকে। ]
১. শমঃ
মানসিক শান্তি অর্থাৎ মনের চঞ্চলতা বা অস্থিরতা দূর করা।
২. দমঃ
ইন্দ্রিয় সংযম বা ইন্দ্রিয়সমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা।
৩. উপরতিঃ
জাগতিক মোহগ্রস্ত বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা বা বৈরাগ্য।
৪. তিতিক্ষাঃ
প্রতিকূল পরিস্থিতি বা কষ্টের মধ্যেও সহিষ্ণু মনোভাব রাখা।
৫. সমাধানঃ
একাগ্রতা সহকারে কোন বিষয়ে সংশোধন এর বিকল্প চিন্তা করা।
৬. শ্রদ্ধাঃ
ঈশ্বর ও গুরুজনদের প্রতি অনুগত থাকা। |||°
তস্যেন্দ্রিয়াণি বশ্যানি সদশ্বা ইব সারথেঃ॥
- কঠোপনিষদ্ ১/৩/৬
পদার্থঃ (য়ঃ তু) আর যে পুরুষ (বিজ্ঞানবান্) আত্মজ্ঞানযুক্ত এবং (য়ুক্তেন মনসা) অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা নিরুদ্ধ মনে (সদা) সদা যুক্ত (ভবতি) থাকেন, (তস্য) তার (ইন্দ্রিয়াণি) ইন্দ্রিয় (সারথেঃ) সারথির (সদশ্বাঃ ইব) প্রশিক্ষিত ঘোড়ার ন্যায় (বশ্যানি) বশে আসে ॥৬॥
সরলার্থঃ আর যে পুরুষ আত্মজ্ঞানযুক্ত এবং অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা নিরুদ্ধ মনে সদা যুক্ত থাকেন, তার ইন্দ্রিয় সারথির প্রশিক্ষিত ঘোড়ার ন্যায় বশে আসে।
[ উক্ত শ্রুতিতে ইন্দ্রিয়সমূহকে বশ করার দুটি সাধন বলা হয়েছে যা বিজ্ঞান ও মনের বৃত্তি রোধ। শমদমাদি সম্পন্ন হওয়ার কারণে যার মন সবকিছু থেকে সরে গিয়ে পরমার্থে যুক্ত হয়েছে, তার ইন্দ্রিয়সকল প্রশিক্ষিত ঘোড়ার ন্যায় তাকে আপন লক্ষ্যস্থানে নিয়ে যায়। অর্থাৎ জ্ঞানী পুরুষ প্রশিক্ষিত অশ্বের সারথির ন্যায় নিজের ইন্দ্রিয়সমূহকে সর্বদা বশীভূত রাখার কারণে কোনো অনর্থ প্রাপ্ত হন না। ]
- উপনিষদ সংগ্রহ
বিশো য়েন গচ্ছথো দেবয়ন্তীঃ কুত্রা চিদ্যামমশ্বিনা দধানা॥
- ঋগ্বেদ ৭।৬৯।২
পদার্থঃ
(সঃ) ওই দেহরূপী রথ যা (পপ্রথানঃ) বিস্তৃত (পঞ্চ, ভূমা, অভি, যুক্তঃ) ভূমি
আদি পঞ্চভুত দ্বারা নির্মিত এবং (ত্রিবন্ধুরঃ) ত্রিগুনের বন্ধনে আবদ্ধ,
(যেন) যার দ্বারা (বিশঃ) মানুষ্যগণ যাত্রা করে (দেবযন্তীঃ, গচ্ছয়ঃ) দিব্য
জ্যোতিস্বরূপ নিকটবর্তী হয়। (অশ্বিনা) হে রাজপুরুষ! (য়ামং) ওই দিব্য রথকে
(মনসা, দধানা) মন দ্বারা ধারণ করে (কুত্রচিৎ) সর্বত্র বিচরণ করো ।
অর্থাৎ,
হে
রাজপুরুষ! এই শরীররূপী রথ ভূমি, জল, অগ্নি, আকাশ তথা বায়ু এই পঞ্চ তত্ত্ব
দ্বারা নির্মিত এবং সত্ত্ব, রজ এবং তম এই তিন গুণের বন্ধনে আবদ্ধ। এই
শরীররূপী রথের দ্বারা যাত্রা করে মানুষ জ্যোতিস্বরূপ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয়
যা মনুষ্যজীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য।
পিবন্তো মদিরং মধু তত্র শ্রবাংসি কৃণ্বতে॥
- সামবেদ ৩৫৬
পদার্থঃ
(য়দি) যখন (রথেষু) দেহরূপ রথে (ভ্রাজমানাঃ) তেজ দ্বারা দীপ্যমান (আশবঃ)
শীঘ্রগামী মন, বুদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয় রূপ শীর্ষস্থ প্রাণ
['বায়ুর্বাংআশুস্ত্রিবৃৎ স এষু ত্রিষু লোকেষু বর্ততে' শত০ ৮।৪।১।৯]
(মদিরম্) আনন্দদায়ক [মদী হর্ষে ধাতোঃ 'ইষিমদিমুদিখিদি০ উ০ ১।৫১' ইতি কিরচ্
প্রত্যয়ঃ] (মধু) নিজ নিজ বিষয় সংকল্প, অধ্যবসায়, রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শের
মধুর রস (পিবন্তঃ) পান করিয়ে (আ বহস্তি) রথী জীবাত্মাকে জীবন-যাত্রা করায়;
(তত্র) সেই সময় (শ্রবাংসি) যশ (কৃণ্বতে) উৎপন্ন হয়। এই অর্থ ঋগ্বেদে উক্ত
হয়েছে-য় ঈং বহন্ত আশুভিঃ পিবন্তো মদিরং মধু। অত্র শ্রবাংসি দধিরে । (ঋক০
৫।৬১।১১)।
অর্থাৎ,
যখন
দেহরূপ রথে তেজ দ্বারা দীপ্যমান শীঘ্রগামী মন, বুদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয় রূপ
শীর্ষস্থ প্রাণ আনন্দদায়ক নিজ নিজ বিষয় সংকল্প, অধ্যবসায়,
রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শের মধুর রস পান করে রথী জীবাত্মাকে জীবন-যাত্রা
করায়; সেই সময় যশ উৎপন্ন হয়।
স্তোতা বামশ্বিনাবৃশি স্তোমেভির্ভূষতি প্রতি মাধ্বী মম শ্রুতং হবম্॥
- সামবেদ ৪১৮
পদার্থঃ
হে (অশ্বিনৌ) পরমাত্মা আর জীবাত্মা! (প্রিয়তমম্) সর্বাধিক প্রিয়, (বৃষণম্)
বলবান, (বসুবাহনম্) বাহক ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা বহনকৃত (রথম্) শরীররূপ রথকে
(প্রতি) লক্ষ্য করে (স্তোতা) স্তবকারী (ঋষিঃ) তত্ত্বার্থদ্রষ্টা বিদ্বান্
(স্তোমেভিঃ) তোমার স্তোত্রগানের সাথে (বাম্) তোমায় (প্রতিভূষতি) প্রার্থনা
করছে, অর্থাৎ আমি প্রার্থনা করছি। হে (মাধ্বী) মধুর পরমাত্মা আর জীবাত্মা!
তুমি (মম) আমার (হবম্) আহ্বান (প্রতিশ্রুতম) শোনো। ['শ্রুবঃ শৃ চ' অষ্টা০
৩।১।৭৪] এই মন্ত্রে ভাব হলো, আমি আগামী জন্মে মানবশরীরই প্রাপ্ত হই, পশু,
পক্ষী, জন্তু, স্থাবর ইত্যাদির শরীর প্রাপ্ত না হই।
অর্থাৎ,
হে
পরমাত্মা আর জীবাত্মা! সর্বাধিক প্রিয়, বলবান, বাহক ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা
বহনকৃত শরীররূপ রথকে লক্ষ্য করে স্তবকারী তত্ত্বার্থদ্রষ্টা বিদ্বান তোমার
স্তোত্রগানের সাথে তোমায় প্রার্থনা করছে, অর্থাৎ আমি প্রার্থনা করছি। হে
মধুর পরমাত্মা আর জীবাত্মা! তুমি আমার আহ্বান শোনো। এই মন্ত্রে ভাব হলো,
আমি আগামী জন্মে মানবশরীরই প্রাপ্ত হই, পশু, পক্ষী, জন্তু, স্থাবর ইত্যাদির
শরীর প্রাপ্ত না হই।
য়ঃ পাত্রং হারিয়োজনং পূর্ণমিন্দ্রা চিকেততি য়োজা ম্বিন্দ্র তে হরী॥
- সামবেদ ৪২৪
পদার্থঃ
হে (ইন্দ্র) আমার অন্তরাত্মা! (স ঘ) সেই মানব ['ঋচি তুনুঘ০' অষ্টা০
৬।৩।১৩৩] (তম) সেই শ্রেষ্ঠ, (বৃষণম্) বলবান (গোবিদম) ইন্দ্রিয়রূপ বৃষের
সাথে যুক্ত (রথম্) মানব-শরীর-রূপ রথের (অধিতিষ্ঠাতি) অধিষ্ঠাতা হন, (য়ঃ)
যিনি (হারিয়োজনম্) প্রাণযুক্ত মানব-শরীর প্রদান করতে সমর্থ (পাত্রম্)
সৎকর্মের কোষ (পূর্ণম্) পূর্ণ হয়েছে (চিকেততি) জেনে নেন। এজন্য, হে
(ইন্দ্র) আমার অন্তরাত্মা! তুমি (তে হরী) নিজের জ্ঞানেন্দ্রিয় আর
কর্মেন্দ্রিয় রূপ অশ্বকে (নু) শীঘ্রই (য়োজ) নিযুক্ত করো, অর্থাৎ পুনর্জন্মে
মানব-শরীর প্রাপ্ত করার জন্য জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা সত্য জ্ঞান প্রাপ্ত করো
আর কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা উৎকৃষ্ট কর্ম করো।
অর্থাৎ,
হে
আমার অন্তরাত্মা! সেই মানব সেই শ্রেষ্ঠ, বলবান ইন্দ্রিয়রূপ বৃষের সাথে
যুক্ত মানব-শরীর-রূপ রথের অধিষ্ঠাতা হন, যিনি প্রাণযুক্ত মানব-শরীর প্রদান
করতে সমর্থ সৎকর্মের কোষ পূর্ণ হয়েছে জেনে নেন। এজন্য, হে আমার অন্তরাত্মা।
তুমি নিজের জ্ঞানেন্দ্রিয় আর কর্মেন্দ্রিয় রূপ অশ্বকে শীঘ্রই নিযুক্ত করো,
অর্থাৎ পুনর্জন্মে মানব-শরীর প্রাপ্ত করার জন্য জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা সত্য
জ্ঞান প্রাপ্ত করো আর কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা উৎকৃষ্ট কর্ম করো।
বৈষ্ণবীয় পরম্পরানুসারে যে (যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীবলরাম ও দেবী
সুভদ্রার) রথযাত্রার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় সেখানে উক্ত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র
করে পুরাণ সমূহের উপর ভিক্তিক বেশ কিছু ভ্রান্ত মতবাদ পরিলক্ষিত হয় তার
মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে রথ দর্শন করলে অথবা রথের দড়ি স্পর্শ করলে বা
টানলে তাতে শত জন্মের পাপ বিনষ্ট হয় এবং মোক্ষলাভ হয় ...... মোক্ষের
আস্বাদনের উপায় কি এতোই সহজ.... 
উত্তর:
না। কারণ পাপ ক্ষমা করিলে, তাঁহার ন্যায় নষ্ট হইয়া যায়। তাহাতে মনুষ্যগণও
মহাপাপী হইয়া যাইবে। কেননা ক্ষমার কথা শুনিয়াই তাহারা পাপকর্মে নির্ভীক ও
উৎসাহী হইয়া উঠে। রাজা অপরাধীদিগকে ক্ষমা করিলে তাহারা উৎসাহের সহিত আরও
গুরুতর পাপ করিতে থাকিবে। কারণ রাজা তাহাদের অপরাধ ক্ষমা করিলে তাহাদের এই
ভরসা যে, রাজার সম্মুখে হাত জোড় করিয়া দাঁড়াইলে রাজা তাহাদের অপরাধ ক্ষমা
করিবেন। ফলে যাহারা অপরাধ করেনা, তাহারাও নির্ভয়ে পাপকর্মে প্রবৃত্ত হইবে।
সুতরাং, সকল কর্মের যথোচিত ফল প্রদান করাই ঈশ্বরের কার্য, ক্ষমা করা নহে।
- সত্যার্থ প্রকাশ ৭ম সমূল্লাস।
হন্তা য়ো বৃত্রং সনিতোত বাজং দাতা মঘানি মঘবা সুরাধাঃ॥
- সামবেদ ৩৩৫
পদার্থঃ
আমরা (সত্রাহণম্) সত্য দ্বারা অসত্যের খণ্ডনকারী, ['সত্রা ইতি সত্যনাম'
নিঘ০ ৩।১০] (দাধৃষিম) পাপপ্রবৃত্তি ও কর্মফল দান করে পাপীদের অতিশয়
বিনষ্টকারী, ['কিকিনাবুৎসর্গশ্ছন্দসি সদাদিভ্যো দর্শনাৎ' অষ্টা০ ৩।২।১৭১]
(তুম্রম্) শুভ কর্মের প্রেরণাদাতা, (মহাম্) মহান, (অপারম্) অপার অর্থাৎ
অনন্ত বিদ্যাযুক্ত, (বৃষম্) সুখের বর্ষণকারী, (সুবজ্রম্) উৎকৃষ্ট
দণ্ডশক্তিধারী, (ইন্দ্রম্) অধর্ম, অবিদ্যা প্রভৃতির বিদারক সেই পরমাত্মাকে
উপাসনা করি, (মঘবা) ঐশ্বর্যবান (সুরাধাঃ) উৎকৃষ্ট ন্যায় ও ধর্মরূপ
ঐশ্বর্যযুক্ত (য়ঃ) যে পরমাত্মা (বৃত্রম্) বিঘ্নভূত শত্রুদের (হন্তা)
বিনাশক (উত) এবং (বাজম) অন্ন, বল, বিজ্ঞান প্রভৃতির (সনিতা) বণ্টন করে
(মঘানি) ঐশ্বর্য (দাতা) দান করেন ['ন লোকাব্যযনিষ্ঠাখলর্থতৃনাম্' অষ্টা০
২।৩।৬৯]।
অর্থাৎ,
ঐশ্বর্যবান
উৎকৃষ্ট ন্যায় ও ধর্মরূপ ঐশ্বর্যযুক্ত যে পরমাত্মা বিঘ্নভূত শত্রুদের
বিনাশক এবং অন্ন, বল, বিজ্ঞান প্রভৃতির বণ্টন করে ঐশ্বর্য দান করেন, সেই
সত্য দ্বারা অসত্যের খণ্ডনকারী, পাপ এবং পাপীদের অতিশয় বিনষ্টকারী, শুভ
কর্মের প্রেরণাদাতা, মহান, অপার অর্থাৎ অনন্ত বিদ্যাযুক্ত, সুখের
বর্ষণকারী, উৎকৃষ্ট দণ্ডশক্তিধারী, অধর্ম, অবিদ্যা প্রভৃতির বিদারক
পরমাত্মাকে আমরা উপাসনা করি।
শাস্ত্রে মোক্ষলাভের বিষয়ে কি উল্লেখিত রয়েছে
যথা চিন্নো অবোধয়ঃ সত্যশ্রবসি বায়্যে সুজাতে অশ্বসচনৃতে॥
- সামবেদ ৪২১
পদার্থঃ
হে (উষঃ) প্রাকৃতিক ঊষার মতো আমার আত্মলোকে উদিত আধ্যাত্মপ্রভা!
(দিবিত্মতী) বিবেককে প্রদীপ্তকারী গুণযুক্ত তুমি (নঃ) আমাদের (অদ্য) আজ
(মহে রায়ে) মোক্ষ রূপ মহান ঐশ্বর্যের জন্য (বোধয়) বোধ প্রদান করো, (য়থা)
যেভাবে (সুজাতে) শুভ জন্মযুক্ত, (অশ্বসূনৃতে) ব্যাপক প্রিয় দিব্য বাণীযুক্ত
ঊষা! তুমি (সত্যশ্রবসি) সত্য যশযুক্ত ['শ্রবঃ শ্রবণীয়ং য়শঃ' নিরু০ ১১।৯]
(বায়্যে) বিস্তার যোগ্য জীবনে, আমাদের (অবোধয়ঃ) বোধ প্রদান করছ।
অর্থাৎ,
হে
প্রাকৃতিক ঊষার মতো আমার আত্মলোকে উদিত আধ্যাত্মপ্রভা! বিবেককে
প্রদীপ্তকারী গুণযুক্ত তুমি আমাদের আজ মোক্ষ রূপ মহান ঐশ্বর্যের জন্য বোধ
প্রদান করো, যেভাবে শুভ জন্মযুক্ত, ব্যাপক প্রিয় দিব্য বাণীযুক্ত ঊষা! তুমি
সত্য যশযুক্ত বিস্তার যোগ্য জীবনে, আমাদের বোধ প্রদান করছো।
রোচন্তে রোচনা দিবি।।
- ঋগ্বেদ ১|৬|১
পদার্থঃ
(যুঞ্জন্তি)যুক্ত করেন, (ব্রধ্নম) মহান, (অরুষম্) অহিংসক, (চরন্তম্)
সর্ব্বজ্ঞ, (পরি) সর্বত্র, (তস্থুসঃ) স্থিত, (রোচন্তে)জ্যোতির্ম্ময় হন,
(রোচনা) অবিদ্যা অন্ধকার হইতে মুক্ত হইয়া, (দিবি) পরমাত্মার জ্যোতিতে।
অর্থাৎ,
বিদ্বানেরা
ব্রহ্মযজ্ঞ(জ্ঞান সাধনা) বা উপাসনা যোগদ্বারা স্বীয় আত্মাকে মহান,
হিংসারহিত, সর্ব্বজ্ঞ, সর্ব্বব্যাপী পরমাত্মার সহিত যুক্ত করেন। তাহাদের
আত্মা অবিদ্যা অন্ধকার হইতে মুক্ত হইয়া জ্যোতির্ম্ময় পরমাত্মার জ্যোতিতে
উদ্ভাসিত হয়।
হিরণ্যপক্ষং বরুণস্য দূতং য়মস্য য়োনৌ শকুনং ভুরণ্যুম্॥
- সামবেদ ৩২০
অর্থাৎ,
হে
পরমাত্মা। আত্মলোকে গমনকারী, মোক্ষপদ জ্যোতির্ময় পক্ষবিশিষ্ট,
পাপপ্রবৃত্তি নিবারক মনের প্রেরক, শরীরে অবস্থিত ইন্দ্রিয়ের নিয়ামক
জীবাত্মার হৃদয়রূপ গৃহে উদিত, শক্তিশালী, ধারক ও পোষক, মঙ্গলময় পালন
গুণযুক্ত তোমাকে যখন স্তোতাগণ কামনা করেন; তখন তাঁরা অন্তর দিয়ে তোমাকে
সাক্ষাৎ করে থাকেন
স তু তৎ পদমাপ্নোতি য়স্মাদ্ভূয়ো ন জায়তে॥
- কঠোপনিষদ্ ১|৩|৮
পদার্থঃ
(য়ঃ তু) আর যিনি (বিজ্ঞানবান্) আত্মজ্ঞানযুক্ত, (সমনষ্কঃ) সংযমী এবং
(সদা) সর্বদা (শুচিঃ) পবিত্র অন্তঃকরণযুক্ত (ভবতি) হন; (সঃ তু) তিনি (তৎ
পদম্) সেই পরম পদ অর্থাৎ মোক্ষ (আপ্নোতি) লাভ করেন (য়স্মাৎ) যে পদ থেকে
তিনি (ভূয়ঃ) পুনরায় (ন, জায়তে) সংসারে জন্মগ্রহণ করেন না।
অর্থাৎ,
যিনি আত্মজ্ঞানযুক্ত, সংযমী এবং সর্বদা পবিত্র অন্তঃকরণযুক্ত হন, তিনি সেই
পরম পদ অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করেন; যে পদ থেকে তিনি পুনরায় সংসারে জন্মগ্রহণ
করেন না।
এতৈরুপায়ৈয়ততে য়স্ত বিদ্বাংস্তস্যৈষ আত্মা বিশতে ব্রহ্মধাম॥
- মুণ্ডকোপনিষদ্ ৩|২|৪
পদার্থঃ
(অয়ম্, আত্মা) এই পরমাত্মা (বলহীনেন) আত্মিক বলহীন মনুষ্যের দ্বারা (ন,
লভ্যঃ) লভ্য নন (চ) এবং (প্রমাদাৎ) বিষয়াসক্তিরূপ প্রমাদ দ্বারা (বা) অথবা
(অলিঙ্গাৎ) ত্যাগ-রহিত (তপসঃ, অপি) তপস্যা দ্বারাও (ন) [লভ্য] নন (তু)
কিন্তু (য়ঃ, বিদ্বান) যে বিবেকী পুরুষ (এতৈঃ, উপায়ৈঃ) আত্মিক বল, অপ্রমাদ ও
ত্যাগ-সহিত তপস্যা- এই সকল উপায় [সাধন] অবলম্বনে (য়ততে) প্রযত্ন করেন
(তস্য) তাঁর (এষঃ, আত্মা) এই আত্মা (ব্রহ্মধাম, বিশতে) সর্বাশ্রয় ব্রহ্মে
প্রবেশ করে।
অর্থাৎ,
এই
পরমাত্মা আত্মিক বলহীন মনুষ্যের দ্বারা লভ্য নন এবং বিষয়াসক্তিরূপ প্রমাদ
দ্বারা অথবা ত্যাগ-রহিত তপস্যা দ্বারাও লভ্য নন। কিন্তু যে বিবেকী পুরুষ
আত্মিক বল, অপ্রমাদ ও ত্যাগ-সহিত তপস্যা- এই সকল উপায় (সাধন) অবলম্বনে
প্রযত্ন করেন, তাঁরই আত্মা সর্বাশ্রয় ব্রহ্মে প্রবেশ করে।
ভূতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি॥
- কেনোপনিষদ্ ২|৫
পদার্থঃ
(চেৎ) যদি (ইহ) এই মানব-জীবনে (অবেদীৎ) ব্রহ্মকে জানা যায় (অথ) তবে
(সত্যম্ অস্তি) মানব-জন্ম সার্থক হয়। (চেৎ) যদি (ইহ) এই জন্মে (ন অবেদীৎ)
ব্রহ্মকে না জানা যায়, তবে (মহতী বিনষ্টিঃ) অনেক বড় বিপর্যয় হয় [পশু,
পক্ষী, কীট-পতঙ্গ, বৃক্ষাদি নিম্নযোনিতে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে নিরন্তর ঘুরতে
থাকার ফলে উত্তম সুখের বিনাশ হয়] এজন্য (ধীরাঃ) ধ্যানশীল যোগিগণ
(ভূতেষু-ভূতেষু) সমস্ত চরাচর জগতে (বিচিত্য) ব্রহ্মের চিন্তন করে ও তাঁকে
উপলব্ধি করে (অস্মাৎ লোকাৎ) এই প্রত্যক্ষ সংসার থেকে (প্রেত্য) প্রয়াণ করে,
দেহত্যাগ করে (অমৃতাঃ) জন্ম-মৃত্যুরূপ দুঃখ থেকে মুক্ত (ভবন্তি) হন।
অর্থাৎ,
যদি
এই মানব-জীবনে ব্রহ্মকে জানা যায় তবেই মানব-জন্ম সার্থক হয়। যদি এই জন্মে
ব্রহ্মকে না জানা যায়, তবে অত্যন্ত দুর্গতি হয়। এজন্য ধ্যানশীল যোগিগণ
সমস্ত চরাচর জগতে ব্রহ্মের চিন্তন করে এবং তাঁকে উপলব্ধি করে এই প্রত্যক্ষ
সংসার থেকে প্রয়াণ (দেহত্যাগ) করে জন্ম-মৃত্যুরূপ দুঃখ থেকে মুক্ত হন
অর্থাৎ মোক্ষলাভ করেন।
- প্রশ্নোপনিষদ্ ৩|৬
পদার্থঃ
(হি) নিশ্চিতরূপে (হৃদি) হৃদয়ে (এষঃ) এই (আত্মা) জীবাত্মা বিদ্যমান (অত্র)
হৃদয়ে (এতৎ) এই (নাডীনাম্) মূল নাড়ির (একশতম্) একশত এক সমুদয় (তাসাম্)
তাদের মধ্যে (একৈকস্যাম্) এক একটি নাড়িতে (শতম্ শতম্) একশত করে শাখা আছে
(দ্বাসপ্ততিঃ দ্বাসপ্ততিঃ প্রতিশাখানাডী সহস্রাণি) প্রত্যেক শাখারূপ নাড়ির
বাহাত্তর হাজার করে ভেদ (ভবন্তি) হয় [এবং] (আসু) এদের মধ্যে (ব্যানঃ)
ব্যান-বায়ু (চরতি) বিচরণ করে।
অর্থাৎ,
সকল
ইন্দ্রিয়ের স্বামী জীবাত্মা হৃদয়পদ্মে বিরাজমান। এই হৃদয় থেকে ১০১টি মূল
নাড়ি বের হয়ে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে আছে, আবার তার প্রত্যেকটি থেকে একশত করে
শাখা বের হয়ে 'দশ হাজার একশো' (১০১০০) শাখা হয়েছে। আবার সেখানের প্রত্যেকটি
থেকে ‘বাহাত্তর হাজার’ (৭২০০০) শাখা বের হয়ে পুরো শরীরে বিস্তৃত হয়েছে। এই
সমস্ত নাড়ির মধ্যে রক্ত সঞ্চালন করে ব্যান-বায়ু বিচরণ করে অর্থাৎ সমস্ত
শরীরে ব্যাপ্ত বায়ুর নাম ব্যান। এরূপ সূক্ষ্ম নাড়ির অতিসূক্ষ্ম রন্ধ্রে
ব্যান-বায়ু থাকে। যদিও সাধারণত শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ব্যান-বায়ু
বিচরণ করে, তবুও সন্ধি ও মর্মস্থানে এর বিশেষরূপে স্থিতি মানা হয়েছে। কারণ
সেখান থেকে রক্ত শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিস্তার লাভ করে। এত সূক্ষ্ম
মর্মস্থানী প্রাণবিদ্যা সম্বন্ধে যিনি জানেন, তিনিই প্রাণকে রক্ষা করে
আনন্দ লাভ করেন, অন্যেরা নয়।
মনুষ্যলোকম্॥
- প্রশ্নোপনিষদ্ ৩|৭
পদার্থঃ
(অথ) এবং (একয়া) একশত একটি নাড়ির মধ্যে আরেকটি নাড়ি [সুষুম্না] দ্বারা
(ঊর্ধ্বঃ) ঊর্ধ্বগামী (উদানঃ) উদান-বায়ুই [জীবকে] (পুণ্যেন) পুণ্যকর্মের
ফলে (পুণ্যম্ লোকম্) পবিত্র দেব-যোনিতে (পাপেন পাপম্) পাপকর্মের ফলে
পাপ-যোনিতে এবং (উভাভ্যাম্ এব) পাপ ও পুণ্য উভয়বিধ কর্মের দ্বারা
(মনুষ্যলোকম্) মনুষ্য-যোনিতে (নয়তি) নিয়ে যায় ॥৭॥
অর্থাৎ ,
উপরোক্ত
একশত এক (১০১) নাড়ির মধ্যে 'সুষুম্না' নামক একটি নাড়ি আছে যেটি ঊর্দ্ধগামী
হয়ে চরণ থেকে মস্তক পর্যন্ত গিয়েছে। তার মধ্যে বিচরণশীল উদান-বায়ু
বিশেষরূপে কণ্ঠ প্রদেশ থাকে, যা ভুক্ত ও পীত অন্ন-পানাদিকে কণ্ঠের নিচে
নিক্ষেপ করে পাকস্থলীতে পৌঁছায়, যার ফলে পুষ্ট হয়ে পুরুষ কর্ম করতে সমর্থ
হয়। উদান-বায়ুই শুভ কর্মশীল জীবদের পবিত্র 'দেব' যোনিতে অর্থাৎ বিদ্বানদের
কুলে বা উত্তম মনুষ্য যোনিতে, অশুভ কর্মশীল জীবদের পশু-পক্ষী আদি তির্যক্
যোনিতে এবং সমভাবে শুভ-অশুভ মিশ্রিত কর্মশীল জীবদের সাধারণ মনুষ্য যোনিতে
নিয়ে যায়।
তয়োর্ধ্বমায়ন্নমৃতত্বমেতি বিষ্বঙ্ঙন্যা উৎক্রমণে ভবন্তি ॥
- কঠোপনিষদ্ ২|৩|১৬
পদার্থঃ
(হৃদয়স্য) মানুষের হৃদয়ের (শতম্, চ, একা) একশত এক (নাড্যঃ) নাড়ী আছে,
(তাসাম্) তার মধ্যে থেকে (একা) একটি 'সুষুম্না' নামক নাড়ী (মূর্দ্ধানম্)
ব্রহ্মরন্ধে গিয়ে (অভিনিঃসৃতা) বের হয়েছে। (তয়া) সেই সুষুম্না নাড়ী
অবলম্বনে (ঊর্ধ্বম) উর্ধ্বদেশস্থ ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে (আয়ন) গমন করে জীবাত্মা
(অমৃতত্বম্) অমৃত পদ (এতি) লাভ করে (চ) এবং (অন্যাঃ) অন্য শত নাড়ী
(উৎক্রমণে) জীবাত্মার উৎক্রান্তিতে (বিষ্বঙ্) নানাবিধ যোনির কারণ (ভবন্তি)
হয়।
অর্থাৎ,
জীবাত্মার
শরীর থেকে উৎক্রান্তি (নির্গমন) শরীরস্থ ছিদ্র (নেত্রাদি) দ্বারাই হয়।
মৃত শরীরে আমরা এটি স্পষ্ট দেখতে পাই যে, কারো মুখ খোলা থাকে বা কারো
চক্ষু। কিন্তু এই সমস্ত মৃত্যু নিকৃষ্ট। জীবাত্মা এই শরীরের হৃদয় দেশে
থাকে। আর হৃদয়ে একশত একটি নাড়ী আছে। তার মধ্যে জীবন্মুক্ত পুরুষের আত্মার
উৎক্রমণ 'সুষুম্না' নামক নাড়ী দ্বারা হয়, যেটি হৃদয় থেকে শিরস্থ
ব্রহ্মরন্ধ্রে গিয়ে যুক্ত হয়েছে। এই নাড়ী অবলম্বনে জীবাত্মার শরীর থেকে
উৎক্রমণ মোক্ষদায়ক হয়। আর অন্য শত নাড়ী দ্বারা যাদের উৎক্রমণ হয়, তা সাধারণ
মৃত্যু। তারা মরণোত্তর কর্মানুসারে বিভিন্ন যোনী লাভ করে। এজন্য
মোক্ষার্থী জীবের অবশ্যই যোগাভ্যাস করা উচিত। কারণ যোগের বিধি দ্বারাই
শরীরস্থ সকল নাড়ীর সূক্ষ্ম জ্ঞান লাভ হয়, আর প্রাণায়ামাদি দ্বারা জীবাত্মা
ঊর্ধ্বগতি করতে সমর্থ হয়ে মোক্ষের অধিকারী হয়। যিনি যোগী নন, তিনি নিজের
শরীরস্থ শক্তি অথবা সাধনকে নিজের অধীনে রাখতে পারেন না। অতএব মৃত্যুর সময়
দৈবাধীন হয়ে যে পথে তার গতি হয় সেদিক দিয়ে আত্মা নিষ্ক্রমণ করে।
- তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ ১|৬|১
পদার্থঃ
(অন্তর্হৃদয়ে) হৃদয়ের মধ্যে (য়ঃ) যে (আকাশঃ) আকাশ রয়েছে (তস্মিন্) সেখানে
(সঃ অয়ম) সেই এই প্রসিদ্ধ (মনোময়ঃ) জ্ঞানস্বরূপ (হিরণ্যময়ঃ) প্রকাশময়
(অমৃতঃ) মৃত্যুরহিত (পুরুষঃ) পরম পুরুষ বাস করেন। (অন্তরেণ তালুকে) তালুর
মধ্যে (য়ঃ এষঃ) এই কণ্ঠে যে (স্তন ইব) স্তনসদৃশ মাংস খণ্ড (অবলম্বতে) ঝুলে
থাকে এবং (য়ত্র) যেখানে (কেশান্তঃ) কেশের মূল (বিবর্ততে) বিভক্ত হয়েছে;
সেটি [ব্রহ্মরন্ধ্র] (ব্যপোহ্য) ভেদ করে (শীর্ষকপালে) মস্তকের কপাল দিয়ে
সুষুম্না নাড়ি নির্গত হয়েছে। (সাঃ) সেটিই (ইন্দ্রযোনিঃ) ব্রহ্মজ্ঞানী
জীবাত্মার মুক্তির দ্বার। [এই পথে উৎক্রান্তের পর জীবের] (ভূঃ ইতি) শরীরস্থ
প্রাণ অথবা অগ্নি তত্ত্ব (অগ্নৌ প্রতিতিষ্ঠতি) কারণরূপ অগ্নিতত্ত্বে বিলীন
হয়, (ভুবঃ ইতি) শরীররস্থ অপান বায়ু (বায়ৌ) কারণরূপ বায়ুতত্ত্বে।
অর্থাৎ,
এই
শরীরের মধ্যে হৃদয়াকাশে জ্ঞানস্বরূপ, মৃত্যুরহিত তথা জ্যোতিঃস্বরূপ
পরমাত্মা স্থিত, তাঁর উপাসনাকারী জীব মুক্তির অবস্থা প্রাপ্ত হন। তালুর
নিচে কণ্ঠে যে ছোট মাংসের খণ্ড ঝুলে থাকে, তার পাশে যে সুষুম্না নামক নাড়ি
মস্তকের কপালকে ভেদ করে ঊর্ধ্বদেশে নির্গত হয়েছে, এর দ্বারা উক্ত উপাসক নিজ
প্রাণের উৎক্রমণ করেন এবং সবাইকে প্রাণনশক্তি দানকারী পরমাত্মার উপাসনা
দ্বারা তাঁর জ্ঞান গুণ লাভ করে মুক্ত পুরুষে প্রতিষ্ঠিত হন। এখানে স্মরণ
রাখা উচিত যে, উপলব্ধির অভিপ্রায়ে পরমাত্মাকে জীবের হৃদয়দেশে বর্ণনা করা
হয়েছে। বস্তুত তিনি সর্বব্যাপক, পরমাত্মার উক্ত উপাসক সুষুম্না নাড়ি দ্বারা
এই শরীর থেকে উৎক্রমণ করেন; সাধারণ পুরুষের ন্যায় অন্য ইন্দ্রিয়ের ছিদ্র
দ্বারা নয়। এই শ্রুতিতে ব্রহ্মজ্ঞানীকে অন্য জীবদের চেয়ে উৎকৃষ্ট বোধন করা
হয়েছে এই কারণে যে, ব্রহ্মজ্ঞানীর উৎক্রান্তি অন্য জীবদের মতো হয় না।
[
সুতরাং
রথ দর্শন করলে বা রথের দড়ি ধরে টান দিলে সমস্ত পাপ মোচন হয়ে মোক্ষলাভ
হয় এই ধরণের কুসংস্কারাচ্ছন্ন অভিলাষ থেকে নিজেকে বিরত রেখে সঠিক
শাস্ত্রীয় জ্ঞান অর্জন করুন এবং মোক্ষ আস্বাদনের অভিলাষী হলে প্রকৃত অর্থে
রথের তাৎপর্য নিজ জীবনে ধারণ করুন।]
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
বাংলাদেশ অগ্নিবীর, নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা
