দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







ঈশ্বর ইন্দ্রিয়হীন হলে আমাদের প্রার্থনা কীভাবে শুনবেন ?

সত্যান্বেষী
0

 
✅ ঈশ্বর ইন্দ্রিয়হীন হলে আমাদের প্রার্থনা কীভাবে শুনবেন ?
 
পরমেশ্বর নিরাকার ও সর্বব্যাপী, অথচ সাধারণ মন প্রায়শই প্রশ্ন তোলে—যাঁর আমাদের মতো প্রাকৃত কান বা চোখের মতো কোনো ইন্দ্রিয় নেই, তিনি কীভাবে আমাদের স্তুতি ও ব্যাকুল প্রার্থনা শুনবেন? বৈদিক দর্শন ও উপনিষদ এই জিজ্ঞাসার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রামাণিক সমাধান দেয়। বেদ ও উপনিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈশ্বরের কার্যসম্পাদনের জন্য মানবদেহের মতো স্থূল জ্ঞানেন্দ্রিয় বা কর্মেন্দ্রিয়ের প্রয়োজন পড়ে না; তিনি তাঁর অসীম সামর্থ্য ও স্বভাবসিদ্ধ শক্তির দ্বারাই বিশ্বের যাবতীয় কর্ম সমাধান করেন। তিনি জীবের হৃদয়গুহায় অন্তর্যামীরূপে বিরাজমান থাকায় মানুষের প্রতিটি সৎ চিন্তা, স্তুতি ও আকুল প্রার্থনা সরাসরি তাঁর চেতনায় ধরা পড়ে। নিম্নে বৈদিক ও উপনিষদিক মন্ত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো, কীভাবে ইন্দ্রিয়হীন হয়েও পরমাত্মা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ রূপে আমাদের প্রার্থনা শ্রবণ ও গ্রহণ করেন।
▪️প্রথম মন্ত্রে পরমাত্মাকে ‘বিশ্বতচক্ষুঃ’ ও ‘বিশ্বতোমুখঃ’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হলেও তা ঈশ্বরের কোনো ভৌত অঙ্গ নির্দেশ করে না। এর প্রকৃত অর্থ হলো—তিনি সর্বদ্রষ্টা ও সর্বব্যাপী হওয়ার কারণে বিশ্বের কোথাও এমন কোনো স্থান নেই, যা তাঁর দৃষ্টির অগোচরে। তিনি তাঁর অনন্ত সামর্থ্য দিয়ে বিশ্বকে ধারণ করছেন এবং সর্বান্তর্যামী রূপে মানবহৃদয়ে সত্যের আলো উদ্ভাসিত করছেন। মন্ত্রটি হলো-
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ॥
যজুর্বেদ ১৭।১৯; ঋগ্বেদ ১০।৮১।৩; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।৩
সরলার্থ: যিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্ববক্তা, সর্বধারক ও সর্বগত, তিনি অদ্বিতীয় পরমাত্মদেব। তিনিই প্রকৃতির ত্রিগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি প্রকাশমান লোকসমূহ ও পৃথিবীকে যথার্থরূপে উৎপন্ন করে, স্বীয় অনন্ত বল (সামর্থ্য) দ্বারা সম্পূর্ণ জগৎকে চালনা করছেন।
বর্তমান শ্রুতিবাক্যে জগৎকারণ পরমাত্মার সর্বশক্তিমত্তা সিদ্ধ করে বলা হয়েছে— তিনি ‘বিশ্বতচক্ষুঃ’ = সর্বত্র নেত্রযুক্ত অর্থাৎ সমস্ত সংসারের দ্রষ্টা, ‘বিশ্বতোমুখঃ’ = সর্বত্র মুখযুক্ত অর্থাৎ সবার অন্তর্যামীরূপে উপদেষ্টা, ‘বিশ্বতোবাহুঃ’ = সর্বত্র বাহুযুক্ত অর্থাৎ সর্বপ্রকার বলযুক্ত, অনন্ত পরাক্রমশালী এবং ‘বিশ্বতস্পাৎ’ = সর্বত্র চরণযুক্ত অর্থাৎ সকল স্থানে সর্বদা উপস্থিত। সেই পরমাত্মা অদ্বিতীয়, এই বিশ্বজগতে এমন কোনো স্থান রিক্ত নেই, যেখানে তিনি বিদ্যমান নেই। তিনি ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত স্থাবর-জঙ্গম পদার্থের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপ্ত হয়ে পূর্ণরূপে বিদ্যমান। তিনিই প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ, তমোগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি নক্ষত্রসমূহ ও পৃথিবীকে উৎপন্ন করেছেন এবং নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা লোকলোকান্তরকে সঞ্চালন করছেন। পরমাত্মার এরূপ মহান শক্তি-সামর্থ্য দেখে, সংসার-সমুদ্র পার হওয়ার অভিলাষী হয়ে আমাদের উচিত একমাত্র তাঁরই শরণাগত হওয়া
🔹ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী আকাশে সীমাবদ্ধ নন, বরং প্রতিটি প্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় তিনি স্বয়ং বিরাজমান। পরমাত্মা সকল প্রাণীর অন্তর্যামীরূপে অবস্থান করায় উপাসক যে স্থানেই বা যে অবস্থাতেই তাঁর নিকটে প্রার্থনা জানান না কেন, তিনি সেই স্থানেই তা প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করেন এবং ভক্তের সার্বিক কল্যাণ সাধন করেন। যথা-
সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ।
সর্বব্যাপী স ভগবাংস্তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১১
সরলার্থ: যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর মুখ, মস্তক ও গ্রীবা অবস্থিত, যিনি সকল প্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় শয়নকারী, তিনিই সর্বব্যাপী ভগবান। সেই কারণে তিনি সর্বত্র উপস্থিত এবং কল্যাণকারী।
সর্বাধার পরমাত্মার মধ্যেই সম্পূর্ণ জগৎ সমাহিত হয়ে আছে। প্রতিটি বস্তুকণা, সমস্ত প্রাণিকুল এবং তাদের মুখ, মস্তক, গ্রীবা সেই পরমাত্মার মধ্যেই অবস্থিত। এমন কিছু নেই, যা পরমাত্মার ব্যাপ্তি থেকে পৃথক আছে। তিনি সকল প্রাণীর হৃদয়দেশে অন্তর্যামীরূপে স্থিত। সকল শোভা, কীর্তি, পরাক্রম, জ্ঞানাদি গুণযুক্ত = পরম ঐশ্বর্যবান হয়ে জগতের সর্বত্র বিরাজমান। সেই কারণে তিনি কল্যাণকারী অর্থাৎ নিজের উপাসকের সার্বিক কল্যাণ করেন। তিনি সর্বগত অর্থাৎ উপাসক যে স্থানেই তাঁর নিকট প্রার্থনা করুন না কেন, তিনি সেই স্থানেই বিদ্যমান।
▪️ঈশ্বরের হাজার হাজার মস্তক, চক্ষু বা চরণ থাকা—তাঁর কোনো শারীরিক রূপ বা অবয়ব নয়, বরং এটি তাঁর অসীম ব্যাপ্তি ও সর্বজ্ঞতার এক চমৎকার আলংকারিক বর্ণনা। তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম জগতকে অতিক্রম করে সর্বত্র বিদ্যমান, যার ফলে জীবের প্রতিটি গোপন চিন্তাও তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। যেমন-
সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাঽত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্॥
ঋগ্বেদ ১০।৯০।১; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৪
সরলার্থ:যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর অসংখ্য মস্তক, চক্ষু ও চরণ স্থিত, অথবা যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বগত— সেই পূর্ণ পরমাত্মা সমগ্র জগতের সর্বদিকে ব্যাপ্ত হয়ে দশাঙ্গুল (পঞ্চ-স্থূলভূত ও পঞ্চ-সূক্ষ্মভূত সম্পন্ন জগৎকে) উল্লঙ্ঘন করে স্থিত।
🔹আবার আরেকটি শ্রুতিতে হস্ত, পদ, চক্ষু ও কর্ণকে ঈশ্বরের অসীম শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। 'হস্ত' তাঁর ধারণক্ষমতা ও বলের প্রতীক, 'চরণ' তাঁর সর্বগত গতির প্রতীক এবং 'কর্ণ' তাঁর সর্বশ্রোতা হওয়ার প্রতীক। তিনি বিশ্বের সবকিছুকে আবৃত করে আছেন বলেই প্রাকৃত কর্ণের সাহায্য ছাড়াই সবার প্রার্থনা ব্যাকুলভাবে শ্রবণ করেন। শ্রুতিটি হলো-
সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্।
সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৬; গীতা ১৩।১৪
সরলার্থ:সেই পরমাত্মা সর্বত্র হস্ত ও চরণ বিশিষ্ট অর্থাৎ অনন্ত বলবান এবং‌ সর্বগত; সর্বত্র চক্ষু, মস্তক ও মুখ বিশিষ্ট অর্থাৎ সর্বদ্রষ্টা (সবার কর্মের সাক্ষী), সর্বজ্ঞ (অনন্ত জ্ঞানবান), সর্ববক্তা (অন্তর্যামীরূপে সবার উপদেষ্টা) এবং সর্বত্র শ্রুতিযুক্ত (সর্বদিকে শ্রবণশক্তি সম্পন্ন)। তিনি জগতে সবকিছু আবৃত করে অর্থাৎ সবার মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে অবস্থিত রয়েছে।
পরমাত্মার মহিমা জগতের সর্বত্র বিস্তৃত। তাঁর হস্ত সর্বত্র বিদ্যমান, ‘হস্ত’ বলের প্রতীক অর্থাৎ তিনি অনন্ত বলবান ও সকল পদার্থের ধারণকারী। তিনি সর্বত্র চরণযুক্ত, ‘চরণ’ গমন বা গতিশক্তির প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বগত, আমরা যে স্থানেই চিন্তা করি না কেন পরমাত্মা সেখানে পূর্ব থেকেই উপস্থিত আছেন। তাঁর চক্ষু সর্বত্র, ‘চক্ষু’ দর্শনের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বদ্রষ্টা, সকলের শুভ-অশুভ কর্মের সাক্ষী, এমন কোনো পদার্থ বা স্থান নেই যা তাঁর দৃষ্টিশক্তির অগোচরে। সেই পরমাত্মার মস্তক সর্বত্র, ‘মস্তক’ জ্ঞানের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বজ্ঞ, অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি সর্বত্র মুখবিশিষ্ট, ‘মুখ’ জ্ঞানোপদেশের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্ববক্তা, যে উপাসক হৃদয়দেশে তাঁর ধ্যান করেন, তার হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে জ্ঞানের উপদেশ (কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্ণয় করার বিবেক-বুদ্ধি) প্রদান করেন। তিনি সর্বত্র শ্রুতিযুক্ত বা কর্ণযুক্ত, ‘কর্ণ’ শ্রবণের প্রতীক অর্থাৎ সকল ভক্তের স্তুতি ও প্রার্থনা তিনি শ্রবণ করেন। হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণ প্রাকৃত অথবা অপ্রাকৃত কোনোটিই পরমাত্মার নয়, এসব হচ্ছে তাঁর বিবিধ কার্য সম্পাদনের ও আশ্চর্য সামর্থ্যের আলংকারিক বর্ণনা মাত্র।
▪️মানুষ যেমন চোখ, কান বা হাত-পায়ের সাহায্যে কাজ করে, পরমেশ্বরকে তেমন কোনো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না। তিনি স্বয়ং সর্ব-ইন্দ্রিয়বর্জিত হলেও জীবগণের ইন্দ্রিয়সমূহে শক্তি দানকারী পরম উৎস। তাই বাহ্যিক শ্রবণেন্দ্রিয় না থাকলেও তিনি বিশ্বচরাচরের পরম আশ্রয় ও নিয়ন্তা হিসেবে সবকিছু অবলীলায় জানতে ও শুনতে পান। যথা-
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং বৃহৎ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৭
সরলার্থ:সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহের প্রকাশক হয়েও স্বয়ং সকল ইন্দ্রিয়-বর্জিত। তিনি সবার প্রভু, নিয়ন্তা এবং সবার মহান আশ্রয়।
মানুষ যেমন চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সংযোগে কর্ম করে থাকে, তেমনই পরমাত্মার কর্ম করার জন্য কোনো ইন্দ্রিয় বা করণের প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ইন্দ্রিয়-বর্জিত, কিন্তু সকল ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক অর্থাৎ জীবগণের ইন্দ্রিয়সমূহে যে দর্শন, শ্রবণ, আঘ্রাণ, স্পর্শন, চিন্তন, মনন ও বিবেচন করার ভিন্ন-ভিন্ন শক্তি আছে, সেগুলো পরমাত্মার অনন্ত শক্তি থেকেই প্রাপ্ত। তিনিই সমস্ত জড়-চেতন জগতের স্বামী ও নিয়ামক। একমাত্র তিনিই সবার পরম আশ্রয়স্থল, কেননা জীবজগৎ তাঁর আশ্রয়েই বর্ধিত হচ্ছে।
🔹পরমাত্মার প্রাকৃত হাত, পা, চোখ বা কান নেই; তবুও তিনি গ্রহণ করেন, সর্বাপেক্ষা দ্রুত গমন করেন, দর্শন করেন এবং শ্রবণ করেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর ব্যাখ্যা অনুসারে, ঈশ্বর কোনো স্থূল গোলক বা ইন্দ্রিয় ছাড়াই নিজের স্বাভাবিক ও অনন্ত সামর্থ্যের দ্বারা সকল কার্য সিদ্ধ করেন। তিনি মনেরও অগম্য এবং অতীন্দ্রিয় হওয়ায় কোনো প্রাকৃত অঙ্গ ছাড়াই আমাদের প্রতিটি অন্তরের আকুতি ও প্রার্থনা সরাসরি শ্রবণ করতে সক্ষম। এখন পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়-রহিত হয়েও কীভাবে কার্য করেন, সেই বিষয়ে শ্রুতি বলছেন—
অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ।
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৯
সরলার্থ:সেই পরমাত্মার হাত নেই, তবুও নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা তিনি সবকিছু গ্রহণ অর্থাৎ ধারণ করেন। তাঁর পা নেই, তবুও তিনি সর্বব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাধিক বেগবান। তাঁর চক্ষু নেই, তবুও তিনি সবকিছু দর্শন করেন। তাঁর কর্ণ নেই, তবুও তিনি সবই শ্রবণ করেন। তিনি সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় জানেন, অথচ তাঁকে কেউ সম্পূর্ণরূপে জানে না। এজন্য জ্ঞানিগণ তাঁকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন। .
এই শ্রুতিবাক্যে স্পষ্টভাবে পরমাত্মার ইন্দ্রিয়ের প্রতিষেধ করা হয়েছে। পরমেশ্বর চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়াই গ্রহণ, দর্শন, শ্রবণাদি কার্য সিদ্ধ করতে পারেন, আর এটিই তাঁর সর্বশক্তিমত্তা। সংসার সাগরে নিমজ্জিত অল্পজ্ঞ মানব সেই সর্বজ্ঞ ব্রহ্মকে জানতে পারে না। কিন্তু বৈরাগ্য-প্রাপ্ত, শ্রদ্ধাবান, ধার্মিক মনুষ্যগণ ব্রহ্মবিদ্যার চর্চা ও ধ্যানাদি যোগাভ্যাস দ্বারা তাঁকে জানতে সমর্থ হন। কিন্তু সেই বাক্যমনাতীত ব্রহ্মকে কেউ পূর্ণরূপে জানতে পারে না (কেন০ ২।৩ দ্রষ্টব্য)। তাই বর্তমান শ্রুতিতে বলা হয়েছে, তাঁর জ্ঞাতা কেউই নেই। এজন্য জ্ঞানিগণ সেই জগদীশ্বরকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন।
এই শ্রুতির ব্যাখ্যায় মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন— “পরমেশ্বরের হস্ত নেই, কিন্তু তিনি নিজের শক্তিরূপ হস্ত দ্বারা সমস্ত রচনা এবং গ্রহণ করেন। তাঁর চরণ নেই, কিন্তু তিনি ব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাপেক্ষা অধিক বেগবান। তাঁর চক্ষুগোলক নেই, কিন্তু তিনি সমস্ত যথাবৎ দর্শন করেন। তাঁর শ্রোত্র নেই, তবুও তিনি সকলের কথা শ্রবণ করেন। তাঁর অন্তঃকরণ নেই, কিন্তু তিনি সমস্ত জগৎকে জানেন। তাঁকে সম্পূর্ণরূপে জানতে পারে, এমন কেউ নেই। সনাতন, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বত্র পূর্ণ হওয়ার কারণে তাঁকে ‘পুরুষ’ বলা হয়। তিনি ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ ব্যতীত সব কর্ম নিজের অনন্ত সামর্থ্য দ্বারা করেন। (সত্যার্থ প্রকাশ, ৭ম সমুল্লাস)”।
🔰পরমাত্মা ঈশ্বরপ্রণিধান ও উপাসনার পরম লক্ষ্য, যাঁর মহিমা আমাদের প্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের সীমানায় আবদ্ধ নয়। বৈদিক ঋষিগণ ও উপনিষদের সিদ্ধান্ত আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বরকে আমাদের স্তুতি বা প্রার্থনা শোনানোর জন্য চিৎকার বা শারীরিক মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ে না। যেহেতু তিনি সর্বব্যাপী এবং আমাদের হৃদয়ের পরম গুহায় শয়নকারী অন্তর্যামী, তাই আমাদের প্রতিটি সংকল্প, প্রার্থনা ও আকুতি পরমাত্মার চৈতন্যেই স্পন্দিত হয়। তিনি ইন্দ্রিয়হীন হয়েও স্বভাবজাত অসীম শক্তির দ্বারা বিশ্ব পরিচালনা করেন এবং ভক্তের নিঃশব্দ প্রার্থনারও সাড়া দেন। সুতরাং, বাহ্যিক প্রাকৃত অঙ্গের অভাব ঈশ্বরের সর্বশ্রোতা হওয়ার পথে বাধা নয়, বরং তা-ই তাঁর অসীম ও সর্বশক্তিমান রূপের পরম প্রমাণ। পরমেশ্বরের এই সর্বব্যাপী ও কল্যাণময় স্বরূপ উপলব্ধি করে আত্মশুদ্ধি ও একাগ্র চিত্তে তাঁরই শরণাগত হওয়াই মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য। 

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)