পরমেশ্বর নিরাকার ও সর্বব্যাপী, অথচ সাধারণ মন প্রায়শই প্রশ্ন তোলে—যাঁর আমাদের মতো প্রাকৃত কান বা চোখের মতো কোনো ইন্দ্রিয় নেই, তিনি কীভাবে আমাদের স্তুতি ও ব্যাকুল প্রার্থনা শুনবেন? বৈদিক দর্শন ও উপনিষদ এই জিজ্ঞাসার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রামাণিক সমাধান দেয়। বেদ ও উপনিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈশ্বরের কার্যসম্পাদনের জন্য মানবদেহের মতো স্থূল জ্ঞানেন্দ্রিয় বা কর্মেন্দ্রিয়ের প্রয়োজন পড়ে না; তিনি তাঁর অসীম সামর্থ্য ও স্বভাবসিদ্ধ শক্তির দ্বারাই বিশ্বের যাবতীয় কর্ম সমাধান করেন। তিনি জীবের হৃদয়গুহায় অন্তর্যামীরূপে বিরাজমান থাকায় মানুষের প্রতিটি সৎ চিন্তা, স্তুতি ও আকুল প্রার্থনা সরাসরি তাঁর চেতনায় ধরা পড়ে। নিম্নে বৈদিক ও উপনিষদিক মন্ত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো, কীভাবে ইন্দ্রিয়হীন হয়েও পরমাত্মা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ রূপে আমাদের প্রার্থনা শ্রবণ ও গ্রহণ করেন।
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ॥
যজুর্বেদ ১৭।১৯; ঋগ্বেদ ১০।৮১।৩; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।৩
সরলার্থ: যিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্ববক্তা, সর্বধারক ও সর্বগত, তিনি অদ্বিতীয় পরমাত্মদেব। তিনিই প্রকৃতির ত্রিগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি প্রকাশমান লোকসমূহ ও পৃথিবীকে যথার্থরূপে উৎপন্ন করে, স্বীয় অনন্ত বল (সামর্থ্য) দ্বারা সম্পূর্ণ জগৎকে চালনা করছেন।
বর্তমান শ্রুতিবাক্যে জগৎকারণ পরমাত্মার সর্বশক্তিমত্তা সিদ্ধ করে বলা হয়েছে— তিনি ‘বিশ্বতচক্ষুঃ’ = সর্বত্র নেত্রযুক্ত অর্থাৎ সমস্ত সংসারের দ্রষ্টা, ‘বিশ্বতোমুখঃ’ = সর্বত্র মুখযুক্ত অর্থাৎ সবার অন্তর্যামীরূপে উপদেষ্টা, ‘বিশ্বতোবাহুঃ’ = সর্বত্র বাহুযুক্ত অর্থাৎ সর্বপ্রকার বলযুক্ত, অনন্ত পরাক্রমশালী এবং ‘বিশ্বতস্পাৎ’ = সর্বত্র চরণযুক্ত অর্থাৎ সকল স্থানে সর্বদা উপস্থিত। সেই পরমাত্মা অদ্বিতীয়, এই বিশ্বজগতে এমন কোনো স্থান রিক্ত নেই, যেখানে তিনি বিদ্যমান নেই। তিনি ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত স্থাবর-জঙ্গম পদার্থের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপ্ত হয়ে পূর্ণরূপে বিদ্যমান। তিনিই প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ, তমোগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি নক্ষত্রসমূহ ও পৃথিবীকে উৎপন্ন করেছেন এবং নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা লোকলোকান্তরকে সঞ্চালন করছেন। পরমাত্মার এরূপ মহান শক্তি-সামর্থ্য দেখে, সংসার-সমুদ্র পার হওয়ার অভিলাষী হয়ে আমাদের উচিত একমাত্র তাঁরই শরণাগত হওয়া
সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ।
সর্বব্যাপী স ভগবাংস্তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১১
সরলার্থ: যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর মুখ, মস্তক ও গ্রীবা অবস্থিত, যিনি সকল প্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় শয়নকারী, তিনিই সর্বব্যাপী ভগবান। সেই কারণে তিনি সর্বত্র উপস্থিত এবং কল্যাণকারী।
সর্বাধার পরমাত্মার মধ্যেই সম্পূর্ণ জগৎ সমাহিত হয়ে আছে। প্রতিটি বস্তুকণা, সমস্ত প্রাণিকুল এবং তাদের মুখ, মস্তক, গ্রীবা সেই পরমাত্মার মধ্যেই অবস্থিত। এমন কিছু নেই, যা পরমাত্মার ব্যাপ্তি থেকে পৃথক আছে। তিনি সকল প্রাণীর হৃদয়দেশে অন্তর্যামীরূপে স্থিত। সকল শোভা, কীর্তি, পরাক্রম, জ্ঞানাদি গুণযুক্ত = পরম ঐশ্বর্যবান হয়ে জগতের সর্বত্র বিরাজমান। সেই কারণে তিনি কল্যাণকারী অর্থাৎ নিজের উপাসকের সার্বিক কল্যাণ করেন। তিনি সর্বগত অর্থাৎ উপাসক যে স্থানেই তাঁর নিকট প্রার্থনা করুন না কেন, তিনি সেই স্থানেই বিদ্যমান।
সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাঽত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্॥
ঋগ্বেদ ১০।৯০।১; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৪
সরলার্থ:যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর অসংখ্য মস্তক, চক্ষু ও চরণ স্থিত, অথবা যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বগত— সেই পূর্ণ পরমাত্মা সমগ্র জগতের সর্বদিকে ব্যাপ্ত হয়ে দশাঙ্গুল (পঞ্চ-স্থূলভূত ও পঞ্চ-সূক্ষ্মভূত সম্পন্ন জগৎকে) উল্লঙ্ঘন করে স্থিত।
সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্।
সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৬; গীতা ১৩।১৪
সরলার্থ:সেই পরমাত্মা সর্বত্র হস্ত ও চরণ বিশিষ্ট অর্থাৎ অনন্ত বলবান এবং সর্বগত; সর্বত্র চক্ষু, মস্তক ও মুখ বিশিষ্ট অর্থাৎ সর্বদ্রষ্টা (সবার কর্মের সাক্ষী), সর্বজ্ঞ (অনন্ত জ্ঞানবান), সর্ববক্তা (অন্তর্যামীরূপে সবার উপদেষ্টা) এবং সর্বত্র শ্রুতিযুক্ত (সর্বদিকে শ্রবণশক্তি সম্পন্ন)। তিনি জগতে সবকিছু আবৃত করে অর্থাৎ সবার মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে অবস্থিত রয়েছে।
পরমাত্মার মহিমা জগতের সর্বত্র বিস্তৃত। তাঁর হস্ত সর্বত্র বিদ্যমান, ‘হস্ত’ বলের প্রতীক অর্থাৎ তিনি অনন্ত বলবান ও সকল পদার্থের ধারণকারী। তিনি সর্বত্র চরণযুক্ত, ‘চরণ’ গমন বা গতিশক্তির প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বগত, আমরা যে স্থানেই চিন্তা করি না কেন পরমাত্মা সেখানে পূর্ব থেকেই উপস্থিত আছেন। তাঁর চক্ষু সর্বত্র, ‘চক্ষু’ দর্শনের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বদ্রষ্টা, সকলের শুভ-অশুভ কর্মের সাক্ষী, এমন কোনো পদার্থ বা স্থান নেই যা তাঁর দৃষ্টিশক্তির অগোচরে। সেই পরমাত্মার মস্তক সর্বত্র, ‘মস্তক’ জ্ঞানের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্বজ্ঞ, অনন্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি সর্বত্র মুখবিশিষ্ট, ‘মুখ’ জ্ঞানোপদেশের প্রতীক অর্থাৎ তিনি সর্ববক্তা, যে উপাসক হৃদয়দেশে তাঁর ধ্যান করেন, তার হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে জ্ঞানের উপদেশ (কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্ণয় করার বিবেক-বুদ্ধি) প্রদান করেন। তিনি সর্বত্র শ্রুতিযুক্ত বা কর্ণযুক্ত, ‘কর্ণ’ শ্রবণের প্রতীক অর্থাৎ সকল ভক্তের স্তুতি ও প্রার্থনা তিনি শ্রবণ করেন। হস্ত, পদ, চক্ষু, কর্ণ প্রাকৃত অথবা অপ্রাকৃত কোনোটিই পরমাত্মার নয়, এসব হচ্ছে তাঁর বিবিধ কার্য সম্পাদনের ও আশ্চর্য সামর্থ্যের আলংকারিক বর্ণনা মাত্র।
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং বৃহৎ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৭
সরলার্থ:সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহের প্রকাশক হয়েও স্বয়ং সকল ইন্দ্রিয়-বর্জিত। তিনি সবার প্রভু, নিয়ন্তা এবং সবার মহান আশ্রয়।
মানুষ যেমন চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সংযোগে কর্ম করে থাকে, তেমনই পরমাত্মার কর্ম করার জন্য কোনো ইন্দ্রিয় বা করণের প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ইন্দ্রিয়-বর্জিত, কিন্তু সকল ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক অর্থাৎ জীবগণের ইন্দ্রিয়সমূহে যে দর্শন, শ্রবণ, আঘ্রাণ, স্পর্শন, চিন্তন, মনন ও বিবেচন করার ভিন্ন-ভিন্ন শক্তি আছে, সেগুলো পরমাত্মার অনন্ত শক্তি থেকেই প্রাপ্ত। তিনিই সমস্ত জড়-চেতন জগতের স্বামী ও নিয়ামক। একমাত্র তিনিই সবার পরম আশ্রয়স্থল, কেননা জীবজগৎ তাঁর আশ্রয়েই বর্ধিত হচ্ছে।
অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ।
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৯
সরলার্থ:সেই পরমাত্মার হাত নেই, তবুও নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা তিনি সবকিছু গ্রহণ অর্থাৎ ধারণ করেন। তাঁর পা নেই, তবুও তিনি সর্বব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাধিক বেগবান। তাঁর চক্ষু নেই, তবুও তিনি সবকিছু দর্শন করেন। তাঁর কর্ণ নেই, তবুও তিনি সবই শ্রবণ করেন। তিনি সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় জানেন, অথচ তাঁকে কেউ সম্পূর্ণরূপে জানে না। এজন্য জ্ঞানিগণ তাঁকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন। .
এই শ্রুতিবাক্যে স্পষ্টভাবে পরমাত্মার ইন্দ্রিয়ের প্রতিষেধ করা হয়েছে। পরমেশ্বর চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়াই গ্রহণ, দর্শন, শ্রবণাদি কার্য সিদ্ধ করতে পারেন, আর এটিই তাঁর সর্বশক্তিমত্তা। সংসার সাগরে নিমজ্জিত অল্পজ্ঞ মানব সেই সর্বজ্ঞ ব্রহ্মকে জানতে পারে না। কিন্তু বৈরাগ্য-প্রাপ্ত, শ্রদ্ধাবান, ধার্মিক মনুষ্যগণ ব্রহ্মবিদ্যার চর্চা ও ধ্যানাদি যোগাভ্যাস দ্বারা তাঁকে জানতে সমর্থ হন। কিন্তু সেই বাক্যমনাতীত ব্রহ্মকে কেউ পূর্ণরূপে জানতে পারে না (কেন০ ২।৩ দ্রষ্টব্য)। তাই বর্তমান শ্রুতিতে বলা হয়েছে, তাঁর জ্ঞাতা কেউই নেই। এজন্য জ্ঞানিগণ সেই জগদীশ্বরকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন।
এই শ্রুতির ব্যাখ্যায় মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন— “পরমেশ্বরের হস্ত নেই, কিন্তু তিনি নিজের শক্তিরূপ হস্ত দ্বারা সমস্ত রচনা এবং গ্রহণ করেন। তাঁর চরণ নেই, কিন্তু তিনি ব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাপেক্ষা অধিক বেগবান। তাঁর চক্ষুগোলক নেই, কিন্তু তিনি সমস্ত যথাবৎ দর্শন করেন। তাঁর শ্রোত্র নেই, তবুও তিনি সকলের কথা শ্রবণ করেন। তাঁর অন্তঃকরণ নেই, কিন্তু তিনি সমস্ত জগৎকে জানেন। তাঁকে সম্পূর্ণরূপে জানতে পারে, এমন কেউ নেই। সনাতন, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বত্র পূর্ণ হওয়ার কারণে তাঁকে ‘পুরুষ’ বলা হয়। তিনি ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ ব্যতীত সব কর্ম নিজের অনন্ত সামর্থ্য দ্বারা করেন। (সত্যার্থ প্রকাশ, ৭ম সমুল্লাস)”।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
