ব্রতা দেবানামুপ নু প্রভূষন্মহদ্দেবানামসুরত্বমেকম্
যস্য ত্রয়স্ত্রিংশদ্দেবা অঙ্গে সর্বে সমাহিতাঃ।
স্কম্ভং তং ব্রূহি কতমঃ স্বিদেব সঃ ॥
অথর্ববেদ ১০।৭।১৩
= যাঁকে কেন্দ্র করে এবং যাঁর উপস্থিতিতে সমস্ত তেত্রিশটি ঐশ্বরিক শক্তি পুঞ্জীভূত ও সুসংহত হয়ে বিরাজ করে, সেই স্কম্ভ (সর্বাধার বা পরম সত্তা) সম্পর্কে আমাকে বলুন—তিনি কে? বলুন যে তিনিই স্কম্ভ, যিনি অস্তিত্বের পরম কেন্দ্র এবং এই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র পরিধি।
এখানে এই তেত্রিশটি দেব বা ঐশ্বরিক শক্তি হলো: আটটি বসু, এগারোটি রুদ্র, বারোটি আদিত্য, শক্তি বা ইন্দ্র, এবং জীবনের স্থায়িত্ব বিধানকারী প্রাকৃতিক নিয়মস্বরূপ যজ্ঞ। প্রকৃতপক্ষে ‘তেত্রিশ দেব’ বলতে কোনো স্বতন্ত্র ঈশ্বরকে বোঝায় না, বরং ঈশ্বর-সৃষ্ট তেত্রিশটি উপাদানকে বোঝায়। এই প্রাকৃতিক ও জীবাত্মাসহ ৩৩টি উপাদান পরমাত্মারই অমোঘ নিয়মের অধীনে পরিচালিত। রূপক অর্থে এগুলো পরমাত্মার বিরাট বিশ্ব-শরীরের বিভিন্ন অংশের মতো অবস্থান করছে।
যস্য ত্রয়স্ত্রিংশদ্দেবা অঙ্গে গাত্রা বিভেজিরে।
তান্বৈ ত্রয়স্ত্রিংশদ্দেবানেকে ব্রহ্মবিদো বিদুঃ ॥
অথর্ববেদ ১০।৭।২৭
= সৃষ্টির বিবর্তন প্রক্রিয়ায় স্কম্ভের (পরম সত্তার) যে এক ঐশ্বরিক পক্ষ বা অংশ বিদ্যমান, যার মধ্যে তেত্রিশটি দেব বা ঐশ্বরিক শক্তি নিজেদের নির্দিষ্ট রূপ ও রূপায়ণ গ্রহণ করে—ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিগণ এই তেত্রিশটি দেবশক্তিকেও তাদের নিজ নিজ রূপ ও কার্যাবলীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা অনুধাবন করেন।
তথা -
যস্য ভূমিঃ প্রমান্তরিক্ষমুতোদরম্।
দিবং যশ্চক্রে মূর্ধানং তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ ॥
যস্য সূর্যশ্চক্ষুশ্চন্দ্রমাশ্চ পুনর্ণবঃ।
অগ্নিং যশ্চক্র আস্যং তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ ॥
যস্য বাতঃ প্রাণাপানৌ চক্ষুরঙ্গিরসোঽভবন্।
দিশো যশ্চক্রে প্রজ্ঞানীস্তস্মৈ জ্যেষ্ঠায় ব্রহ্মণে নমঃ ॥
অথর্ববেদ ১০।৭।৩২-৩৪
= পৃথিবী যাঁর চরণতুল্য আধার, মহাকাশ বা অন্তরীক্ষ যাঁর উদরস্বরূপ, এবং উজ্জ্বল দ্যুলোক যাঁর মস্তকতুল্য—সেই পরম ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে আমাদের সমর্পণ ও বন্দনা। সূর্য ও নিত্য-পরিবর্তনশীল চন্দ্র যাঁর চক্ষুর মতো দৃষ্টিদানকারী আলোকের উৎস, অগ্নি যাঁর মুখতুল্য তেজ, বায়ু যাঁর নিয়মে প্রবাহিত হয়ে প্রাণশক্তির মতো সমস্ত সৃষ্টিকে ধারণ করে আছে এবং দিকসমূহ যাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রসার ঘটাচ্ছে—সেই এক পরব্রহ্মেই আমাদের আত্মনিবেদন।
পরমাত্মা নিরাকার ও অশরীরী। সাধারণ মানবমনকে ব্রহ্মাণ্ডের সাথে পরমেশ্বরের নিবিড় সম্বন্ধ বোঝানোর জন্য বেদান্তে এই অলংকারিক ও প্রতীকী (Anthromorphic/Symbolic) রূপকের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূল যে তত্ত্বগুলো প্রকাশ পায়:
১. পরমাত্মাই একমাত্র শক্তিমান কেন্দ্র: সূর্য, চন্দ্র, বায়ু বা পৃথিবীর নিজস্ব কোনো স্বাধীন চৈতন্য বা শক্তি নেই। পরমেশ্বর এই মহাজাগতিক রূপক শরীরে এদের বিভিন্ন অঙ্গের মতো সাজিয়েছেন, অর্থাৎ এরা পরমেশ্বরের দেওয়া নিয়ম ও শক্তিতেই আবর্তিত হচ্ছে।
২. ব্রহ্মজ্ঞানীদের দৃষ্টি: সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে হয়তো স্বতন্ত্র কিছু মনে করতে পারে, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানী বা ব্রহ্মবিদগণ জানেন যে বায়ু, সূর্যরশ্মি ও দিকসমূহ—সবই একক পরমেশ্বরের নিয়ম ও ব্যাপ্তির প্রকাশ মাত্র।
৩. অনন্তের ধারণা: রূপক অর্থে ভূমি যদি পরমেশ্বরের চরণ হয়, অন্তরীক্ষ যদি উদর হয় এবং দ্যুলোক যদি মস্তক হয়, তবে তা পরমাত্মার অনন্ত ব্যাপ্তি ও সর্বব্যাপী প্রকৃতিরই নির্দেশ দেয়। তিনি এই বস্তু জগতকে সৃষ্টি করে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিজের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৪. জীবনের শিক্ষণীয় দিক: সূর্য যেভাবে বৈষম্যহীনভাবে আলো দেয়, বায়ু যেভাবে বিরতিহীনভাবে প্রাণশক্তি জোগায়—তা পরমাত্মার নির্দেশেই করে। আমাদের চোখের মাধ্যমে দেখা (সূর্য-চন্দ্র রূপক), মুখ দিয়ে সত্যবাণী ও তেজ প্রকাশ করা (অগ্নি রূপক), এবং সর্বদিকে সত্যজ্ঞান প্রসারিত করার (দিক রূপক) অভ্যাস গড়ে তোলাই হলো বেদময় জীবন গঠনের মূল শিক্ষা।
আমরা কোনো জড় প্রাকৃতিক শক্তিকে পরমেশ্বর জ্ঞান করব না, বরং তাদের মধ্যকার অমোঘ নিয়ম দেখে সেই নিয়মদাতা পরমাত্মাকেই নমস্কার ও আত্মনিবেদন করব। উপনিষদে বলা হয়েছে-
য়দিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম্।
মহদ্ভয়ং বজ্রমুদ্যতং য় এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি॥
কঠোপনিষদ্ ২.৩.২
সরলার্থঃ যা কিছু গতিশীল জগৎ রয়েছে, তা প্রাণপ্রদ পরমাত্মার আশ্রয়ে ক্রিয়া করে এবং তাঁর থেকে উৎপন্ন হয়। সেই পরমাত্মা দুরাচারী পুরুষের জন্য হস্তে ধারণকৃত বজ্রের ন্যায় অত্যন্ত ভয়প্রদ। যাঁরা এই ব্রহ্মকে জানেন, তাঁরা মৃত্যুরহিত হন।
এই সমস্ত গতিশীল সংসার নিমিত্তকারণ পরমব্রহ্ম থেকে উৎপন্ন হয়ে তাঁরই সত্তা ও শক্তি দ্বারা ক্রিয়াশীল এবং তাঁরই নির্ধারিত নিয়মানুসারে সূর্য, চন্দ্রমাদি সকল পদার্থ নিজ-নিজ কার্য করে থাকে। কেউ তাঁর সৃষ্টিবিধান ও মর্যাদাকে, যা তিনি সৃষ্টির আদিতে তৈরি করেছেন, তার উল্লঙ্ঘন করতে পারে না। অর্থাৎ পরমাত্মা সবার প্রাণরূপ; এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ডকে চেষ্টা ও গতি দান করার কারণে অথবা প্রাণের সমান প্রিয় হওয়ার কারণে তিনি প্রাণরূপ। এই প্রাণরূপ পরমাত্মার আশ্রয়েই এই চরাচর জগৎ ক্রিয়া করে। এইভাবে পরমাত্মাকে সর্বাধাররূপে বর্ণনা করে তাঁর অনুশাসনের গাম্ভীর্য প্রকাশ করা হয়েছে যে, সেই পরমাত্মা নিয়মভঙ্গকারীদের জন্য প্রাণঘাতক বজ্রের ন্যায় ভয়প্রদ—অর্থাৎ তাঁর নিয়ম বা প্রাকৃতিক বিধান উল্লঙ্ঘন করার কারণে পুরুষকে অত্যন্ত দুঃখ প্রাপ্ত হতে হয়। আর যে সকল অনুষ্ঠানকারী পুরুষ পরমাত্মার এই নিয়ম উল্লঙ্ঘন করেন না, তাঁরা মুক্তি লাভ করেন।
আমরা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি; প্রতীকী অর্থে ভাবুন, আমরা পরমাত্মার আশ্রয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছি, কারণ এই বিস্তৃত পৃথিবীই তাঁর চরণের মতো আধার। সূর্য তাঁর এক চক্ষু এবং চন্দ্রমা পরমেশ্বরের দ্বিতীয় চক্ষুস্বরূপ। সারাদিন সেই প্রভুর সূর্যরূপী চক্ষু বা মহাজাগতিক আলোকপ্রবাহ আমাদের কাজকর্ম লক্ষ্য করছে এবং রাতের বেলা তাঁর দ্বিতীয় চক্ষু অর্থাৎ চন্দ্রের আলোক পর্যবেক্ষণ করছে। রূপক অর্থে প্রভুর এই দুই চক্ষু দিন-রাত বিশ্বের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আচরণ নির্দোষ নাকি আমাদের আচরণে কোনো দোষ ঘটেছে—পরমেশ্বরের প্রতিষ্ঠিত এই অমোঘ বিশ্ব-নিয়ম তা পরখ করবে, এবং ঈশ্বরের এই প্রাকৃতিক বিধানের হাত থেকে আমাদের কে বাঁচাতে পারে? পরমেশ্বরের নিয়ম ও বিধান দিন-রাত আমাদের ওপর নজর রাখছে—এই সত্যটি মানুষ অনুধাবন করুক এবং যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে নিজের আচরণ যেন সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
অগ্নি হলো সেই প্রভুর মুখস্বরূপ। আমরা যে যজ্ঞে আহুতির দ্রব্য অর্পণ করি, তা কেবল জড় আগুনে ফেলছি—এমনটা না ভেবে আমরা পরমেশ্বরের সৃষ্টিব্যবস্থার উদ্দেশ্যে আহুতি দিচ্ছি, এমনটা অনুধাবন করলে সর্বব্যাপী পরমেশ্বরের মহাজাগতিক বিধান আমাদের আহুতি বা নিবেদন গ্রহণ করছে বলে অনুভূত হবে এবং সাক্ষাৎ পরমেশ্বরের সাথে আমাদের আত্মিক সম্বন্ধ গড়ে উঠবে।
বায়ু পরমাত্মার প্রাণ এবং অপান শক্তিপ্রবাহের রূপক প্রকাশ। সেই পরমাত্মার দেওয়া প্রাণশক্তিতেই আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করছি। আমরা যে প্রাণবায়ু গ্রহণ করি, তা দিয়ে পরমাত্মারই সঞ্চালিত জীবনশক্তিকে আমরা নিজেদের ভেতরে নিচ্ছি। পরমেশ্বরের এই প্রাণশক্তি আমাদের ভেতরে গিয়ে আমাদের জীবিত রাখছে—আমরা যদি এমনটা বিশ্বাস ও অনুধাবন করি, তবে প্রতিটি শ্বাসের সাথে পরমাত্মার জীবনশক্তি আমাদের ভেতরে প্রবেশ করছে এবং আমাদের শরীরের জীবন সেই পরমাত্মার শক্তি দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে—এই বিষয়টি ধ্যানে এলে আমরা সর্বত্র পরমাত্মারই উপস্থিতি সাক্ষাৎকার লাভ করব।
সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান বা দেবগণ পরমাত্মার এই বিশ্ব-শরীরে রূপক অর্থে বাস করেন; পুরো বিশ্ব পরমাত্মার প্রকট শরীরস্বরূপ, সর্বত্র পরমেশ্বর পূর্ণ হয়ে আছেন, কোনো স্থান তাঁর থেকে খালি নেই। আমরা যেখানে বিচরণ করছি, ভাবলে দেখা যায় আমরা সবাই পরমাত্মার উদরে বা তাঁর সৃষ্টিরাজ্যের ভেতরেই বিচরণ করছি—পরমাত্মার এই সর্বব্যাপী ব্যাপ্তির বাইরে আমাদের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমরা জল পান করে নিজেদের তৃষ্ণা নিবারণ করি; সেই জল মূলত পরমপিতা পরমাত্মারই প্রদত্ত জীবনরস। জলীয় শক্তি বা জল উপাদানকে আমরা পান করি এবং সেই উপাদান আমাদের শরীরের অঙ্গ হয়ে অবস্থান করে। বায়ুর গতিশীলতা পরমাত্মার প্রাণ ও অপানের বিধান। শ্বাসের মাধ্যমে পরমাত্মার পরম শক্তিকেই নিজেদের ভেতরে গ্রহণ করি এবং তার দ্বারা আমরা জীবিত থাকি।
যে অন্ন আমরা খাই, সেই অন্ন হলো ঈশ্বরের পরম কৃপার দান বা ঐশ্বরিক উপাদান; সেই অন্ন উপাদানকে আমরা আহার করছি এবং তা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে শরীরের অংশ হয়ে ওঠে ও আমাদের শরীরের বল বৃদ্ধি করে। অগ্নি হলো এমন এক নিয়মভিত্তিক উপাদান, যা আমাদের অন্ন পাক করে এবং আমাদের সর্বপ্রকার সাহায্য করে। ওষধি ও বনস্পতিসমূহ হলো ঈশ্বরীয় গুণসম্পন্ন প্রাকৃতিক উপাদান। সেগুলোকে আমরা গ্রহণ করি এবং সেগুলো আমাদের শরীরের মল বা দূষিত পদার্থ ধুয়ে ফেলে তা নষ্ট করে; সেগুলোর মাধ্যমে আমাদের শরীর নির্দোষ হয় এবং আরোগ্য সম্পন্ন থাকতে সাহায্য করে।
সূর্য এবং চন্দ্রমা—এরা সবাই পরমাত্মার সুনির্দিষ্ট নিয়ম পালনের কারণে ঐশ্বরিক বা প্রাকৃতি উপাদান। এরা নিজেদের আলোক-রশ্মি দ্বারা আমাদের সত্যতা ও সুস্পষ্টতা দেয়। 'সূর্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ'—সূর্য স্থাবর ও জঙ্গমের শক্তি বা আত্মা। সূর্য থেকে আমরা বাহ্যিক জীবনশক্তি পাই এবং চন্দ্রমা থেকে ওষধিসমূহের পুষ্টি ও বৃদ্ধি ঘটে। এই ওষধিসমূহ সেবন করে আমরা পুষ্ট হই।
চিত্রং দেবানামুদগাদনীকং চক্ষুর্মিত্রস্য বরুণস্যাগ্নেঃ।
আপ্রাদ্দ্যাবাপৃথিবী অন্তরিক্ষং সূর্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ ॥
অথর্ববেদ ১৩.২.৩৫
= এই বিস্ময়কর সূর্য ধারক শক্তি। এটি বায়ু, জল এবং অগ্নির প্রকাশক। এটি নিজের আলোর মাধ্যমে দ্যুলোক, ভূলোক এবং অন্তরীক্ষকে পরিব্যাপ্ত করে রাখে। এটিই জঙ্গম ও স্থাবর বস্তুর সর্বাধিক শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
অধ্যাত্মে ঈশ্বর পরম বিস্ময়কর, প্রকৃতির সকল শক্তি ও বিদ্বান ব্যক্তিদের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। তিনি বায়ু, জল ও অগ্নির প্রকাশকর্তা। তিনি সূর্য, পৃথিবী ও বায়ুমণ্ডলের রক্ষক। তিনি স্বপ্রভ, ভাস্বর এবং স্থাবর ও জঙ্গম (গতিশীল ও স্থবির) সমস্ত কিছুর আত্মা।
আমাদের চার পাশে পৃথিবী, অপ্ (জল), তেজ (অগ্নি), বায়ু এবং আকাশ—এরা সবাই পরমেশ্বরের নিয়মে চালিত প্রাকৃতিক শক্তি বা উপাদান, এবং আমাদের এই শরীরও এই উপাদানগুলোর দ্বারাই গঠিত। চার দিক থেকে, আমাদের সর্বদিক থেকে পরমেশ্বরের এই প্রাকৃতিক নিয়ম ও শক্তিগুলো আমাদের ঘিরে রেখেছে; আমাদের ভেতরে এবং বাইরে ঈশ্বরের এই অমোঘ শক্তিগুলো পূর্ণ হয়ে আছে। পরমেশ্বরের নিবাস এমনই এক স্থান। ভেতরে এবং বাইরে, চার দিকে, আমাদের সব পাশে এই শক্তিগুলো অনুগত রয়েছে। এই উপাদানগুলোকে আমরা আহার করি, এগুলোকে আমরা পান করি, এগুলো দিয়ে আমরা নিজেদের কাজ করাই এবং সর্বতোভাবে এদের ঘ্রাণ নিই। প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে আমরা নিজেদের কাজ সম্পন্ন করি এবং সর্বতোভাবে এদের মাঝে বিচরণ করি।
এই উপাদান বা দেবতারা পরমাত্মার অনুগত দূত বা নিয়মের রূপক মাত্র। সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, ওষধি, জল, পৃথিবী দিন-রাত পরমেশ্বরের বিধানে আমাদের সাহায্য করে চলেছে। এমন কোনো মুহূর্ত নেই যে মুহূর্তে আমরা পরমেশ্বরের বিধানভুক্ত এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো থেকে পৃথক থাকতে পারি।
এই সব জড় উপাদান বা দেবতারা সম্পূর্ণরূপে পরমাত্মারই শক্তিতে শক্তিমান, তাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন শক্তি বা চৈতন্য নেই। এই কারণেই বেদে বলা হয়েছে—
তদেবাগ্নিস্তদাদিত্যস্তদ্বায়ুস্তদু চন্দ্রমাঃ ।
তদেব শুক্রং তদ্ব্রহ্ম তাঽআপঃ স প্রজাপতিঃ ॥
যজুর্বেদ ৩২।৬
= ঈশ্বরই 'অগ্নি', কারণ তিনি স্বয়ং-প্রকাশিত; তিনিই 'আদিত্য', কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রলয়কালে তিনি সবকিছুকে নিজের মধ্যে গ্রাস করেন; তিনি 'বায়ু', কারণ তিনি সর্বশক্তিমান; তিনি 'চন্দ্রমা', কারণ তিনি আনন্দে পরিপূর্ণ এবং আনন্দের দাতা; তিনি 'শুক্র', কারণ তিনি পবিত্র ও দ্রুত কর্মশীল; তিনি 'ব্রহ্ম', কারণ তিনি পরম মহান; তিনি 'অপঃ' (জল), কারণ তিনি সর্বব্যাপী; এবং তিনিই 'প্রজাপতি', কারণ তিনি নিজের সৃষ্টিরাজির রক্ষক ও অভিভাবক।
এর দ্বারা এটিই প্রমাণিত হলো যে, পরমাত্মার আধারশক্তি পৃথিবীর রূপে আমাদের ভিত্তি বা আধার প্রদান করছে। পৃথিবীকে দেখে এটি পরমাত্মারই অটল আধারশক্তি—এমনটা বুঝে আমরা পৃথিবীতে পরমাত্মার ধারণক্ষমতার সাক্ষাৎকার লাভ করি; জলে পরমাত্মার শান্তি ও তৃপ্তিদায়ক বিধান বিদ্যমান রয়েছে—এমনটা অনুভব করে জলে পরমাত্মার শান্তিরূপী জীবনশক্তিকে দর্শন করি। বায়ুতে প্রবহমান প্রাণনশক্তি পরমাত্মারই নির্দেশিত—এমনটা দেখে সেই পরমাত্মার জীবন ও প্রাণনশক্তি বায়ুরূপে আমাদের প্রাপ্ত হচ্ছে, এমন অনুভব করে বায়ুর স্পর্শে আমরা পরমাত্মার প্রত্যক্ষ অনুভূতির সাক্ষাৎকার লাভ করি।
ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি ভয়াৎ তপতি সূর্য়ঃ।
ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ॥
কঠোপনিষদ্ ২.৩.৩
= এই ব্রহ্মের অটল নিয়ম ব্যবস্থা দ্বারাই অগ্নি ও সূর্য তাপ প্রদান করে এবং তাঁর নিয়মেই বিদ্যুৎ ও বায়ু চেষ্টা করে এবং পঞ্চম কাল, ব্রহ্মের নিয়মেই ধাবমান হয়।
স্বামী অথবা গুরুজনের হাতে দণ্ড দেখে যেমন ভৃত্য অথবা শিষ্য ভয়ভীত বা অনুগত হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে, তেমনি পরমেশ্বরের পরম অনুশাসন বা যে অটল ন্যায়ব্যবস্থা—তাতে কৃত পাপকর্ম বা নিয়মভঙ্গের কোনো ব্যত্যয় বা অন্যায় ক্ষমা নেই এবং কেউ তাঁর এই মহাজাগতিক ব্যবস্থার উল্লঙ্ঘন করতে পারে না। তাঁর নিয়ম ব্যবস্থা দেখে এটা স্পষ্ট যে, সূর্যাদি সহ এই মহাবিশ্বের সকল জড়বস্তু পরমেশ্বরের অনুশাসনেই সুনির্দিষ্টভাবে চলছে। শুধু তাই নয়, তাঁর সূক্ষ্ম বিধানানুসারেই মৃত্যু প্রাণিদের দিকে ধাবিত হয়—অর্থাৎ মানুষের কৃত কর্মের ফলে তারা কালরূপ মৃত্যুর গ্রাসে পরিণত হয়। আবার এই মৃত্যুর অভিপ্রায় কোনো স্বতন্ত্র পৌরাণিক যমদূতাদি নয়, কারণ পরমেশ্বরকে নিজের সৃষ্টিব্যবস্থা চালানোর জন্য অন্য কোনো সহায়ক বা মধ্যস্থতাকারীর আবশ্যকতা নেই; তাঁর অমোঘ নিয়মই স্বয়ংক্লিয়ভাবে কার্যকর।
এইভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানে যে যে বিশেষ গুণ বিদ্যমান, সেই সব গুণ মূলত পরমাত্মারই মহিমা এবং পরমাত্মার শক্তিতেই সেগুলোতে অবস্থান করছে—এমনটা বুঝে আমরা সর্বত্র পরমাত্মার মহাশান্তিকে বিবিধ রূপে অনুভব করি। এইভাবে পরমপিতা পরমাত্মা ভেতরে-বাইরে ও চার পাশে তাঁর বিধান দিয়ে আমাদের সাহায্য করছেন, তাঁর পরম সহায়তায় আমরা জীবিত আছি, পুষ্ট হচ্ছি এবং বৃদ্ধি পাচ্ছি—এমনটা অনুভব করে জীবিত ও জাগ্রত পরমাত্মাকে নিজেদের ভেতরে-বাইরে, নিচে-উপরে তথা চার পাশে প্রত্যক্ষ করে আমরা পরম আনন্দ লাভ করি।
সদা-সর্বদা পরমাত্মাকে চার পাশে এইভাবে অনুভূতির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে এবং এতে সফলতা প্রাপ্ত হলে যে আত্মিক আনন্দ মেলে, তা অসীম ও শাশ্বত আনন্দ।
পাঠকগণ পরমাত্মার এই সর্বব্যাপী নিয়ম অনুধাবন করে অসীম আনন্দ প্রাপ্ত করার এই সাধনা সম্পন্ন করুন, পরমেশ্বরের সান্নিধ্যে প্রসন্নতার জীবন যাপন করুন এবং সর্বকালের জন্য আত্মিক দুঃখকে দূর করুন।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
