দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







মহাভারতের শান্তিপর্বের অন্তর্গত “পুত্র-গীতা”

সত্যান্বেষী
0

 

🔰 মহাভারতের শান্তিপর্বের অন্তর্গত “পুত্র-গীতা”

▪️ পুত্রের দ্বারা পিতাকে ধর্মের উপদেশ প্রদান


📚 মহাভারতের শান্তিপর্বের অন্তর্গত মোক্ষধর্মপর্বে ১৭৫তম অধ্যায়ে [হ.সি. ১৬৯ অধ্যায়] 'পুত্র-গীতা' রয়েছে। ভীষ্ম-যুধিষ্ঠির সংবাদ-এর অন্তর্গত পুত্রগীতার রূপে একটি প্রাচীন আখ্যান আসে, যাতে সর্বদা বেদ-শাস্ত্রের অধ্যয়নে তৎপর থাকা এক ব্রাহ্মণকে তাঁর মেধাবী নামক তত্ত্বদর্শী পুত্র দ্বারাই খুব মর্মস্পর্শী উপদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবন ক্ষণভঙ্গুর, মৃত্যু কখনই পূর্বসূচনা ছাড়া আসতে পারে, অতএব প্রত্যেক অবস্থায় সংসারের আসক্তি থেকে বেঁচে থেকে ধর্মাচরণ তথা সত্যব্রতের পালন করতে থাকা উচিত, এটিই পরমসাধন এটিই এই পুত্রগীতায় জানানো হয়েছে। অত্যন্ত প্রভাবশালীরূপে সতর্কবার্তা প্রদানকারী এই ‘পুত্র-গীতা’ এখানে অনুবাদসহ প্রস্তুত করা হচ্ছে।


যুধিষ্ঠির উবাচ

অতিক্রামতি কালেঽস্মিন্ সর্বভূতক্ষয়াবহে ।

কিং শ্রেয়ঃ প্রতিপদ্যেত তন্মে ব্রূহি পিতামহ ॥১॥

→ যুধিষ্ঠির বললেন, “হে পিতামহ! এই সর্বভূতক্ষয়কারী কাল অতি দ্রুত চলে যাচ্ছে, সুতরাং মানুষ কীভাবে কল্যাণ লাভ করবে, আপনি তা বর্ণনা করুন।”

 

ভীষ্ম উবাচ

অত্রাপ্যুদাহরন্তীমমিতিহাসং পুরাতনম্ ।

পিতুঃ পুত্রেণ সংবাদং তং নিবোধ যুধিষ্ঠির ॥২॥

→ ভীষ্ম বললেন, “আমি এই প্রসঙ্গে পিতাপুত্র-সংবাদরূপ মনস্বীদের উল্লেখিত এক প্রাচীন ইতিহাস বর্ণনা করছি, শোনো।

 

দ্বিজাতেঃ কস্যচিৎপার্থ স্বাধ্যায়নিরতস্য বৈ ।

বভূব পুত্রো মেধাবী মেধাবী নাম নামতঃ ॥৩॥

→ হে পার্থ! পূর্বকালে কোনো স্বাধ্যায়নিরত ব্রাহ্মণের মেধাবী নামে এক বুদ্ধিমান পুত্র ছিলেন।

 

সোঽব্রবীৎ পিতরং পুত্রঃ স্বাধ্যায়করণে রতম্ ।

মোক্ষধর্মার্থকুশলো লোকতন্ত্রবিচক্ষণঃ ॥৪॥

→ একদা সেই মোক্ষধর্মার্থকুশল [মুক্তিধর্মে নিরত] লোকতত্ত্ববিশারদ [জীবলোকতত্ত্বজ্ঞ] মেধাবী তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন।


পুত্র উবাচ

ধীরঃ কিংস্বিৎ তাত কুর্যাৎ প্রজানন্

ক্ষিপ্রং হ্যায়ুর্ভ্রশ্যতে মানবানাম্ ।

পিতস্তদাচক্ষ্ব যথার্থযোগং

মমানুপূর্ব্যা যেন ধর্মং চরেয়ম্ ॥৫॥

→ পুত্র পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পিতা! মানুষের পরমায়ু অতি দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে, ধীরস্বভাবসম্পন্ন ব্যক্তি এটি সম্যক উপলব্ধি করে কী কী কাজ করবেন, আপনি তা যথার্থরূপে আনুপূর্বিক বর্ণনা করুন। যাতে আমি ধর্মানুষ্ঠান করতে পারি।’


পিতোবাচ

বেদানধীত্য ব্রহ্মচর্যেণ পুত্র

পুত্রানিচ্ছেৎ পাবনার্থং পিতৃৃণাম্ ।

অগ্নীনাধায় বিধিবচ্চেষ্টযজ্ঞো

বনং প্রবিশ্যাথ মুনির্বুভূষেৎ ॥৬॥

→ পিতা বললেন, ‘পুত্র! মানুষ সবার আগে ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে বেদাধ্যয়ন এবং তারপর পিতৃগণের প্রীতির জন্য পুত্র উৎপাদনের ইচ্ছা করবে। তারপর বিধিপূর্বক অগ্নিস্থাপন করে যজ্ঞানুষ্ঠান করবে এবং তারপর বনে প্রবেশ করে [বানপ্রস্থ আশ্রম আবলম্বনপূর্বক] মুনি হবে।’


পুত্র উবাচ

এবমভ্যাহতে লোকে সমন্তাৎ পরিবারিতে ।

অমোঘাসু পতন্তীষু কিং ধীর ইব ভাষসে ॥৭॥

→ পুত্র বললেন, ‘পিতা! মানুষ নিরন্তর অভিভূত ও আক্রান্ত হচ্ছে এবং এতে অমোঘ বিষয়সমূহ অব্যর্থভাবে উপস্থিত হচ্ছে, সুতরাং আপনি কীভাবে আমাকে ওই রকম উপদেশ দিয়ে নিজে কাজ না করে নিশ্চিন্ত হয়ে আছেন?’

পিতোবাচ

কথমভ্যাহতো লোকঃ কেন বা পরিবারিতঃ ।

অমোঘাঃ কাঃ পতন্তীহ কিং নু ভীষয়সীব মাম্ ॥৮॥

→ পিতা বললেন, ‘পুত্র! তুমি আমাকে কী জন্য এমন ভয় দেখাচ্ছ? মানুষ কোন বস্তু দ্বারা অভিভূত ও কোন বস্তু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এতে কী ধরনের অমোঘ বিষয়গুলোই বা নিরন্তর যাতায়াত করছে?’


পুত্র উবাচ

মৃত্যুনাভ্যাহতো লোকো জরয়া পরিবারিতঃ ।

অহোরাত্রাঃ পতন্ত্যেতে ননু কস্মান্ন বুধ্যসে ॥৯॥

→ পুত্র বললেন, ‘দেখুন, এই সমগ্র জগৎ মৃত্যুর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। বার্ধক্য একে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে এবং দিন-রাত্রিই সেই শক্তি, যারা জীবের আয়ু হরণ করার কাজটি অবিরামভাবে সম্পন্ন করে চলেছে। এই বিষয়টি আপনি বুঝতে পারছেন না কেন?


অমোঘা রাত্রয়শ্চাপি নিত্যমায়ান্তি যান্তি চ ।

যদাহমেতজ্জানামি ন মৃত্যুস্তিষ্ঠতীতি হ ।

সোঽহং কথং প্রতীক্ষিষ্যে জালেনেবাবৃতশ্চরন্ ॥১০॥

→ এই অমোঘ রাত্রিগুলো প্রতিদিন আসে এবং চলে যায়। যখন আমি জানি যে মৃত্যু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না এবং আমি তার জালের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে চলছি, তখন আমি কীভাবে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারি?


রাত্র্যাংরাত্র্যাং ব্যতীতায়ামায়ুরল্পতরং যদা ।

গাধোদকে মৎস্য ইব সুখং বিন্দেত কস্তদা ॥১১॥

→ যখন এক-একটি রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ু ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, তখন অগভীর জলে বসবাসকারী মাছের মতো মানুষই বা কীভাবে সুখ লাভ করতে পারে?


(যস্যাং রাত্র্যাং ব্যতীতায়াং ন কিঞ্চিচ্ছুভমাচরেৎ।)

তদৈব বন্ধ্যং দিবসমিতি বিদ্যাদ্ বিচক্ষণঃ।

অনবাপ্তেষু কামেষু মৃত্যুরভ্যেতি মানবম্ ॥১২॥

→ রাত চলে আসার পরেও মানুষ যদি সারাদিনে কোনো শুভকর্ম না করে তবে তার সারা দিনই ‘ব্যর্থ' এমনটাই বিদ্বান গণ্য করেন। মানুষের কামনা পূরণ হওয়ার আগেই মৃত্যু তার নিকট উপস্থিত হয়।

শষ্পাণীব বিচিন্বন্তমন্যত্রগতমানসম্ ।

বৃকীবোরণমাসাদ্য মৃত্যুরাদায় গচ্ছতি ॥১৩॥

→ যেমন ঘাস খেতে থাকা ভেড়ার কাছে হঠাৎ বাঘিনী এসে তাকে ধরে নিয়ে চলে যায়, তেমনই মানুষের মন যখন অন্য কোনো বিষয়ে আসক্ত হয়ে থাকে, ঠিক সেই সময় হঠাৎ মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে চলে যায়।


অদ্যৈব কুরু যচ্ছ্রেয়ো মা ত্বাং কালোঽত্যগাদয়ম্ ।

অকৃতেষ্বেব কার্যেষু মৃত্যুর্বৈ সম্প্রকর্ষতি ॥ ১৪॥

→ অতএব যা আপনার কল্যাণকর, তা আজই করা কর্তব্য। সে বিষয়ে সময়ের অপেক্ষা করা নিতান্ত অনুচিত। মানুষের কাজ শেষ না হতে হতেই মৃত্যু তাকে টেনে নিয়ে যায়;

শ্বঃ কার্যমদ্য কুর্বীত পূর্বাহ্ণে চাপরাহ্ণিকম্ ।

ন হি প্রতীক্ষতে মৃত্যুঃ কৃতমস্য ন বা কৃতম্ ॥১৫॥

→ যা পরের দিনের কাজ, তা আজই করা কর্তব্য এবং যা বিকেলে করতে হবে, তা সকালেই সম্পন্ন করা ভালো। মানুষের কাজ শেষ হোক বা না হোক, মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করে না।

[ অতিরিক্ত পাঠ:

কো হি জানাতি কস্যাদ্য মৃত্যুকালো ভবিষ্যতি।

(ন মৃত্যুরামন্ত্রয়তে হর্তুকামো জগত্প্রভুঃ।

অবুদ্ধ এবাক্রমতে মীনান্ মীনগ্রহো যথা॥)

→ কে জানে, কার মৃত্যুকাল আজই উপস্থিত হবে? সমগ্র জগতের উপর কর্তৃত্বশীল মৃত্যু যখন কাউকে হরণ করে নিয়ে যেতে চায়, তখন সে আগে থেকে কোনো নিমন্ত্রণ পাঠায় না। যেমন মৎস্যগ্রাহী মৎস্যশিকারি নিঃশব্দে এসে মাছ ধরে নিয়ে যায়, তেমনই মৃত্যুও অজ্ঞাতসারেই এসে আক্রমণ করে।]


যুবৈব ধর্মশীলঃ স্যাদনিত্যং খলু জীবিতম্ ।

কৃতে ধর্মে ভবেৎ কীর্তিরিহ প্রেত্য চ বৈ সুখম্ ॥১৬॥

→ কোন দিন যে মৃত্যু হবে, তাও কেউ নিশ্চিত করতে পারে না। মানুষের জীবন অনিত্য, অতএব যৌবনাবস্থাতেই ধর্মানুশীলন করা আবশ্যক। ধর্ম পালন করলে ইহলোকে কীর্তি ও পরলোকে সুখলাভ হয়ে থাকে।

মোহেন হি সমাবিষ্টঃ পুত্রদারার্থমুদ্যতঃ ।

কৃত্বা কার্যমকার্যং বা পুষ্টিমেষাং প্রয়চ্ছতি ॥১৭॥

→ মানুষ মোহের বশে পুত্র-স্ত্রীর কাজ সাধনে উদ্যত হয়ে কর্তব্যের প্রতি দৃষ্টিপাত না করেই যে-কোনো উপায়ে হোক, তাদের ভরণপোষণ করে।


তং পুত্রপশুসম্পন্নং ব্যাসক্তমনসং নরম্ ।

সুপ্তং ব্যাঘ্রো মৃগমিব মৃত্যুরাদায় গচ্ছতি ॥১৮॥

→ যেমন ঘুমন্ত হরিণকে বাঘ তুলে নিয়ে যায়, তেমনই পুত্র ও পশুসম্পদে পরিপূর্ণ এবং তাদের প্রতিই যার মন আসক্ত, এমন মানুষকেও একদিন মৃত্যু এসে তুলে নিয়ে যায়।

সঞ্চিন্বানকমেবৈনং কামানামবিতৃপ্তকম্ ।

ব্যাঘ্রঃ পশুমিবাদায় মৃত্যুরাদায় গচ্ছতি ॥১৯॥

→ যতক্ষণ মানুষ ভোগবিলাসে তৃপ্ত হয় না, ততক্ষণ সে শুধু সঞ্চয় করতেই থাকে। সেই অবস্থাতেই মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে যায়—ঠিক যেমন বাঘ কোনো পশুকে তুলে নিয়ে যায়।

ইদং কৃতমিদং কার্যমিদমন্যৎকৃতাকৃতম্ ।

এবমীহাসুখাসক্তং কৃতান্তঃ কুরুতে বশে ॥২০॥

→ মানুষ ভাবে—এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, এটি এখনও করতে হবে, আর ওটি অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। এভাবে নানা কাজের চেষ্টাজনিত সুখে আসক্ত মানুষকে কাল বা মৃত্যু নিজের বশীভূত করে।

কৃতানাং ফলমপ্রাপ্তং কর্মণাং কর্মসংজ্ঞিতম্ ।

ক্ষেত্রাপণগৃহাসক্তং মৃত্যুরাদায় গচ্ছতি ॥২১॥

→ মানুষ নিজের খেত, ব্যবসা ও গৃহকর্মেই এমনভাবে আটকে থাকে যে, তার করা কর্মগুলোর ফল পাওয়ার আগেই মৃত্যু এসে সেই কর্মাসক্ত মানুষকে গ্রাস করে।


দুর্বলং বলবন্তং চ শূরং ভীরুং জডং কবিম্ ।

অপ্রাপ্তং সর্বকামার্থান্মৃত্যুরাদায় গচ্ছতি ॥২২॥

→ কেউ দুর্বল হোক বা শক্তিশালী, বীর হোক বা ভীরু, মূর্খ হোক বা বিদ্বান—মৃত্যু তার সমস্ত কামনা পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে গ্রাস করে।


মৃত্যুর্জরা চ ব্যাধিশ্চ দুঃখং চানেককারণম্ ।

অনুষক্তং যদা দেহে কিং স্বস্থ ইব তিষ্ঠসি ॥২৩॥

→ হে পিতা! যখন এই শরীরে মৃত্যু, বার্ধক্য, রোগ এবং নানা কারণে সৃষ্ট দুঃখ সর্বদাই লেগে রয়েছে, তখন আপনি সুস্থ তথা নিশ্চিন্তের মতো বসে আছেন কেন?


জাতমেবান্তকোঽন্তায় জরা চান্বেতি দেহিনম্ ।

অনুষক্তা দ্বয়েনৈতে ভাবাঃ স্থাবরজঙ্গমাঃ ॥২৪॥

→ জীব জন্মগ্রহণ করার সাথে সাথেই জরা ও মৃত্যু তার বিনাশ করার জন্য তাকে আক্রমণ করে থাকে। এই জরা ও মৃত্যু দ্বারা স্থাবর-জঙ্গম (জড় ও চেতন) সব পদার্থই আক্রান্ত ও অভিভূত রয়েছে।

মৃত্যোর্বা মুখমেতদ্ বৈ যা গ্রামে বসতো রতিঃ ।

বানামেষ বৈ গোষ্ঠো যদরণ্যমিতি শ্রুতিঃ ॥২৫॥

→ গ্রাম বা নগরে বাস করে স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতির প্রতি যে অতিরিক্ত আসক্তি সৃষ্টি হয়, তা আসলে মৃত্যুর মুখস্বরূপ। আর যে ব্যক্তি অরণ্যের আশ্রয় গ্রহণ করে, তা ইন্দ্রিয়রূপ গাভীগুলিকে সংযত রাখার গোশালার মতো—এমনই শ্রুতির বক্তব্য।


নিবন্ধনী রজ্জুরেষা যা গ্রামে বসতো রতিঃ ।

ছিত্ত্বৈতাং সুকৃতো যান্তি নৈনাং ছিন্দন্তি দুষ্কৃতঃ ॥২৬॥

→ গ্রামে বাস করে স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি যে আসক্তি জন্মায়, তা জীবকে আবদ্ধ করে রাখা দড়ির মতো। পুণ্যবান ব্যক্তিরাই সেই বন্ধন ছিন্ন করে মুক্ত হতে পারেন; পাপাচারীরা তা ছিন্ন করতে পারেন না।


ন হিংসয়তি যো জন্তূন্মনোবাক্কায়হেতুভিঃ ।

জীবিতার্থাপনয়নৈঃ প্রাণিভির্ন স হিংস্যতে ॥২৭॥

→ যে ব্যক্তি মন, বাক্য ও শরীরের দ্বারা কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করে না, জীবন ও সম্পদের বিনাশকারী হিংস্র প্রাণীরাও তার প্রতি হিংসা করে না।


ন মৃত্যুসেনামায়ান্তীং জাতু কশ্চিৎ প্রবাধতে ।

ঋতে সত্যমসৎ ত্যাজ্যং সত্যে হ্যমৃতমাশ্রিতম্ ॥২৮॥

→ সত্যকে অবলম্বন না করে কোনো মানুষই সম্মুখে আগত মৃত্যুর সেনাকে প্রতিহত করতে পারে না। অতএব অসত্যকে পরিত্যাগ করতে হবে; কারণ অমৃতত্ব সত্যের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।

তস্মাৎ সত্যব্রতাচারঃ সত্যযোগপরায়ণঃ ।

সত্যাগমঃ সদা দান্তঃ সত্যেনৈবান্তকং জয়েৎ ॥২৯॥

→ অতএব মানুষের সত্যব্রত পালন করা উচিত। সত্যের সাধনায় একনিষ্ঠ থাকতে হবে, শাস্ত্রসম্মত সত্যকে গ্রহণ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে সর্বদা মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখতে হবে। এইভাবে সত্যের দ্বারাই মানুষ মৃত্যুকে জয় করতে পারে।


অমৃতং চৈব মৃত্যুশ্চ দ্বয়ং দেহে প্রতিষ্ঠিতম্ ।

মৃত্যুরাপদ্যতে মোহাৎ সত্যেনাপদ্যতেঽমৃতম্ ॥৩০॥

→ অমৃত ও মৃত্যু—উভয়ই এই শরীরের মধ্যেই অবস্থান করে। মানুষ মোহের কারণে মৃত্যুকে লাভ করে এবং সত্যের মাধ্যমে অমৃতত্ব লাভ করে।

সোঽহং হ্যহিংস্রঃ সত্যার্থী কামক্রোধবহিষ্কৃতঃ।

সমদুঃখসুখঃ ক্ষেমী মৃত্যুং হাস্যাম্যমর্ত্যবৎ॥৩১॥

→অতএব আমি এখন থেকে হিংসা থেকে দূরে থেকে সত্যের অনুসন্ধান করব, কাম ও ক্রোধকে হৃদয় থেকে দূর করব, সুখ ও দুঃখে সমভাব বজায় রাখব এবং সকলের কল্যাণে নিয়োজিত থাকব। এইভাবে অমৃতস্বরূপের মতো মৃত্যুভয়কে অতিক্রম করব।


শান্তিযজ্ঞরতো দান্তো ব্রহ্মযজ্ঞে স্থিতো মুনিঃ ।

বাঙ্মনঃকর্মযজ্ঞশ্চ ভবিষ্যাম্যুদগায়নে ॥৩২॥

→ আমি নিবৃত্তিপরায়ণ হয়ে শান্তিময় যজ্ঞে তৎপর থাকব, মন এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে রেখে ব্রহ্মযজ্ঞে (বেদ-শাস্ত্রের স্বাধ্যায়ে) নিযুক্ত বব এবং মুনিবৃত্তিতে থাকব। উত্তরায়ণের মার্গ দিয়ে যাওয়ার জন্য আমি জপ ও স্বাধ্যায়রূপ বাগ্‌যজ্ঞ, ধ্যানরূপ মনযজ্ঞ এবং অগ্নিহোত্র ও গুরুশুশ্রূষাদিরূপ কর্মযজ্ঞের অনুষ্ঠান করব।


পশুযজ্ঞৈঃ কথং হিংস্রৈর্মাদৃশো যষ্টুমর্হতি ।

অন্তবদ্ভিরিব প্রাজ্ঞঃ ক্ষেত্রযজ্ঞৈঃ পিশাচবৎ ॥৩৩॥

→ আমার মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি কখনোই হিংসামূলক পশুযজ্ঞ এবং পিশাচবৎ [মাংসভক্ষী] অনিত্যফলযুক্ত দেহযজ্ঞ কীভাবে কর‍তে পারে?

যস্য বাঙ্মনসী স্যাতাং সম্যক্ প্রণিহিতে সদা।


তপস্ত্যাগশ্চ সত্যং চ স বৈ সর্বমবাপ্নুয়াৎ ॥৩৪॥

→ যাঁরা বাক্য ও মন পরব্রহ্মে একাগ্র এবং তপস্যা, ত্যাগ ও সত্যব্রহ্মে নিষ্ঠাবান, তাঁরা নিশ্চয়ই পরম গতি লাভ করে থাকেন।

নাস্তি বিদ্যাসমং চক্ষুর্নাস্তি সত্যসমং তপঃ ।

নাস্তি রাগসমং দুঃখং নাস্তি ত্যাগসমং সুখম্ ॥৩৫॥

→ বিদ্যার মতো চোখন নেই, সত্যের মতো তপস্যা নেই, বিষয়াসক্তির মতো দুঃখ নেই এবং ত্যাগের মতো সুখ আর কিছুই নেই।

আত্মন্যেবাত্মনা জাত আত্মনিষ্ঠোঽপ্রজোঽপি বা ।

আত্মন্যেব ভবিষ্যামি ন মাং তারয়তি প্রজা ॥৩৬॥

→ আমি পরমাত্মা কর্তৃক পরব্রহ্মেই উৎপন্ন [ব্রহ্মনিষ্ঠ] হয়েছি, ব্রহ্মনিষ্ঠ আছি, নিঃসন্তান [অর্থাৎ সন্তানের সহায় ইচ্ছা ব্যতীত ব্রহ্মনিষ্ঠই—] থাকব। ভবিষ্যতেও পরমাত্মাকেই প্রাপ্ত হব। সন্তান আমাকে (সংসারসাগর) পার করাবে না।


নৈতাদৃশং ব্রাহ্মণস্যাস্তি বিত্তং

যথৈকতা সমতা সত্যতা চ ।

শীলং স্থিতির্দণ্ডনিধানমার্জবং

ততস্ততশ্চোপরমঃ ক্রিয়াভ্যঃ ॥৩৭॥

→ পরমাত্ম সান্নিধ্যে একাকীত্ব, সমদর্শিতা, সত্যপরায়ণতা, সচ্চরিত্রতা, ব্রহ্মনিষ্ঠা, প্রায়শ্চিত্তরূপ দণ্ডবিধান/ অহিংসা, সরলতা ও অসদ্‌-ক্রিয়াকলাপ থেকে নিবৃত্তিই ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম।


কিং তে ধনৈর্বান্ধবৈর্বাপি কিং তে

কিং তে দারৈর্ব্রাহ্মণ যো মরিষ্যসি ।

আত্মানমন্বিচ্ছ গুহাং প্রবিষ্টং

পিতামহাস্তে ক্ব গতাঃ পিতা চ ॥৩৮॥

→ ব্রাহ্মণদেব পিতা! যখন আপনি একদিন মারাই যাবেন, তখন আপনার এই ধনসম্পদ দিয়ে কী হবে অথবা ভাই-বন্ধুদের দিয়েই বা আপনার কী কাজ, আর স্ত্রী আদির দ্বারাই বা আপনার কোন প্রয়োজন সিদ্ধ হতে চলেছে? আপনি আপনার হৃদয়রূপী গুহায় অবস্থিত পরমাত্মাকে অনুসন্ধান করুন। একটু ভেবে তো দেখুন, আপনার পিতা এবং পিতামহ কোথায় চলে গেছেন?’ ”


ভীষ্ম উবাচ

পুত্রস্যৈতদ্বচঃ শ্রুত্বা যথাঽকার্ষীৎপিতা নৃপ ।

তথা ত্বমপি বর্তস্ব সত্যধর্মপরায়ণঃ ॥৩৯॥

→ ভীষ্ম বললেন, হে নরেশ্বর (যুধিষ্ঠির)! পুত্রের এমন কথা শুনে পিতা যেমন সত্য-ধর্মানুষ্ঠান করেছিলেন, তুমিও ধর্মপরায়ণ হয়ে তেমন কাজ করো।”

॥ইতি শ্রীমন্মহাভারতে শান্তিপর্বণি মোক্ষধর্মপর্বণি পঞ্চসপ্তত্যধিকশততমোঽধ্যায়ঃ॥


🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ

ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ

শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)