দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







বেদে মানবশরীরের মাহাত্ম্য ~ এই দেহ কী ও কে ?

সত্যান্বেষী
0

 
📚 বেদে মানবশরীরের মাহাত্ম্য ~ এই দেহ কী ও কেন❓
🔰 সত্যিই মানব-শরীরের গঠন এবং ক্রিয়াশক্তি অত্যন্ত অদ্ভুত। তাই অথর্ববেদে ব্রহ্ম ঋষিদের জ্ঞানলাভের অনুপ্রেরণা দানে স্বয়ং 'কেন সূক্ত'-এ প্রশ্ন আকারে বলেছেন-
কেন পার্ষ্ণী আভৃতে পূরুষস্য কেন মাংসং সম্ভৃতং কেন গুল্ফৌ ।
কেনাঙ্গুলীঃ পেশনীঃ কেন খানি কেনোচ্ছ্লঙ্খৌ মধ্যতঃ কঃ প্রতিষ্ঠাম্ ॥১॥
কস্মান্ নু গুল্ফাবধরাবকৃণ্বন্ন্ অষ্ঠীবন্তাবুত্তরৌ পূরুষস্য ।
জঙ্ঘে নির্ঋত্য ন্যদধুঃ ক্ব স্বিজ্জানুনোঃ সন্ধী ক উ তচ্চিকেত ॥২॥
কো অস্য বাহূ সমভরদ্বীর্যাং করবাদিতি ।
অংসৌ কো অস্য তদ্দেবঃ কুসিন্ধে অধ্যা দধৌ ॥৫॥
কো অস্মিন্ প্রাণমবয়ৎকো অপানং ব্যানমু ।
সমানমস্মিন্ কো দেবোঽধি শিশ্রায় পূরুষে ॥১৩॥
[অথর্ববেদ ১০ম কাণ্ডে ২য় সুক্ত]
= কোন কারিগর এই মানবদেহের গোড়ালি নির্মাণ করেছেন? কে মাংস পূর্ণ করেছেন? কে গোড়ালি ও পায়ের সংযোগস্থল নির্মাণ করেছেন? কে পর্বে বিভক্ত আঙুলগুলো বানিয়েছেন? কে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ছিদ্রসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং দেহের মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন? কে মানবদেহের গোড়ালিদ্বয় নিচে এবং অস্থিযুক্ত ঊর্ধ্ব অঙ্গদ্বয় উপরে স্থাপন করেছেন? কে জঙ্ঘাদ্বয় যথাস্থানে স্থাপন করেছেন? হাঁটুর সন্ধিদ্বয় কোথায় এবং কে তা জানেন? কে মানবদেহের দুই বাহু শক্তিসম্পন্ন করে সংযুক্ত করেছেন? কোন দেবতা এর দুই অংস বা কাঁধকে যথাস্থানে স্থাপন করেছেন? কে এই মানবদেহে প্রাণ, অপান ও ব্যান স্থাপন করেছেন? কোন দেব এই মানবদেহে সমানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন? 
 
▪️মানব-শরীরের অদ্ভুত সৃষ্টির ওপর এমন উদগার সহসা প্রত্যেকের মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। মানুষ ব্যক্ত বাণীর দ্বারা নিজের চিন্তাভাবনা অন্যদের কাছে প্রকাশ করতে পারে। মন দিয়ে চিন্তন করতে পারে, বুদ্ধি দিয়ে বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে। এসব বিষয় অন্য শরীরের তুলনায় মানব-শরীরে অনুপম, যার কারণে এটি শ্রেষ্ঠত্বের পদ লাভ করেছে।
 
✅ এই শরীর দেবপুরী—
এই মানব-শরীরকে দেবগণের পুরী (নগরী) বলা হয়েছে। ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত দেব এই শরীরের ভেতরে প্রবিষ্ট হয়ে নিজ নিজ স্থান তৈরি করে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। অথর্ববেদ ১১.৮.২৬ অনুসারে, শরীরের হাড়গুলোকে সমিধা (যজ্ঞের কাঠ) করে, রস, রক্ত ইত্যাদিকে জল করে, রেতঃ-কে ঘৃত করে সমস্ত দেব পুরুষ শরীরে প্রবিষ্ট হয়েছেন এবং যজ্ঞ রচনা করছেন। এই শরীরে সমস্ত জল, সমস্ত দেবতা, সমগ্র বিরাট জগৎ প্রবিষ্ট। প্রজাপতি ব্রহ্মও এর ভেতরে আছেন। সূর্য চক্ষু রূপে শরীরে বিদ্যমান। বায়ু প্রাণ রূপে, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ অগ্নি পেয়েছে। যিনি বিদ্বান, তিনি এই মানব শরীরকে সাক্ষাৎ দেবপুরী বা ব্রহ্মপুরী মনে করেন; কারণ যেমন গাভী গোশালায় থাকে, তেমনই সমস্ত দেব শরীরে এসে বাস করছেন। ঐতরেয় উপনিষদ [১.২.৪] অনুসারে,
অগ্নির্বাগ্‌ভূত্বা মুখং প্রাবিশদ্বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশদাদিত্যশ্চক্ষুর্ভূত্বাক্ষিণী প্রাবিশাদ্দিশঃ শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণৌ প্রাবিশন্নোষধিবনস্পতয়ো লোমানি ভূত্বা ত্বচং প্রাবিশংশ্চন্দ্রমা মনো ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশন্মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশদাপো রেতো ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশন্॥
=অগ্নি বাণী হয়ে মুখে প্রবেশ করলেন, বায়ু প্রাণ হয়ে নাসিকাছিদ্রে প্রবেশ করলেন, সূর্য চক্ষু হয়ে অক্ষিগোলকে প্রবেশ করলেন, দিকসমূহ শ্রোত্র হয়ে উভয় কর্ণে প্রবেশ করলেন, ওষধি ও বনস্পতি লোম হয়ে ত্বকে প্রবেশ করলেন, চন্দ্র মন হয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, মৃত্যু অপানবায়ু হয়ে নাভিতে প্রবেশ করলেন এবং জল বীর্য হয়ে জননেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করলেন।
মহাবিশ্বে বিদ্যমান বিভিন দৈবী-শক্তি ও প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ ক্ষুদ্র অংশ বা বীজরূপে মানবদেহে প্রবিষ্ট হয়ে এই শরীর গঠন করেছে। ব্রহ্মাণ্ড ও দেহের এই যোগসূত্রগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. অগ্নি (বাক্/মুখ): বাণীর তেজস্বিতা ও ভোজন পরিপাকের জঠরাগ্নি মূলত অগ্নিরই রূপ।
২. বায়ু (প্রাণ/নাসিকা): বায়ুর সাহায্যেই নাসিকা দ্বারা ঘ্রাণশক্তি বা গন্ধ গ্রহণ সম্ভব হয়।
৩. আদিত্য/সূর্য (চক্ষু): সূর্যের আলোর মাধ্যমেই চক্ষু দর্শনশক্তি লাভ করে।
৪. দিশা (শ্রোত্র/কর্ণ): কান যেমন শব্দ গ্রহণ করে, তেমনই কানের ভেতরের অংশ (Semicircular canals) মস্তিষ্কে দিক নির্ণয়ের সিগন্যাল পাঠায়।
৫. ওষধি ও বনস্পতি (লোম/ত্বক): ওষধি-বনস্পতি সেবনে ত্বক পরিপুষ্ট হয়; আবার পৃথিবী ভেদ করে গাছ গজানোর সাথে ত্বক ভেদ করে লোম গজানোর সাদৃশ্য রয়েছে।
৬. চন্দ্রমা (মন/হৃদয়): চাঁদের স্নিগ্ধ আলো যেমন হৃদয়ে শান্তি আনে, তেমনই সূর্যালোকে চাঁদ আলোকিত হওয়ার সাথে আত্মার আলোয় হৃদয় আলোকিত হওয়ার সাদৃশ্য বিদ্যমান।
৭. মৃত্যু (অপান/নাভি): নাভি ও অপান বায়ু শরীরের পুষ্টি ও বর্জ্য নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ করে, যা জীবন ও মৃত্যুর মূল ভিত্তি।
৮. জল (রেত/শিশ্ন): বীর্যের প্রধান উপাদান জলীয় রস, যা জননেন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত।
মহাবিশ্ব যদি হয় 'ব্রহ্মাণ্ড', তবে মানবদেহ হলো তার ক্ষুদ্র রূপ বা 'পিণ্ড'। যেমন অগ্নি ও তার ফুলকি একই উপাদানে তৈরি, তেমনি ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত দৈবী-শক্তি ও ভৌতিক উপাদান ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ আকারে আমাদের এই স্থূল-শরীরে বিদ্যমান।
 
অথর্ববেদ অনুসারে-
অষ্টাচক্রা নবদ্বারা দেবানাং পূরয়োধ্যা।
তস্যাং হিরণ্যযঃ কোশঃ স্বর্গো জ্যোতিষাবৃতঃ ॥
অথর্ববেদ ১০.২.৩১,৩৩
= আটটি চক্র (শরীরের গঠনকারী আটটি মৌলিক উপাদান—ত্বক, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা, শুক্র ও তেজ/ওজঃ) এবং নয়টি দুর্ধর্ষ দ্বার বা প্রবেশপথ (মস্তকের সাতটি দ্বার—২টি চোখ, ২টি কান, ২টি নাসারন্ধ্র, ১টি মুখ এবং শরীরের নিম্নভাগের ২টি দ্বার) দ্বারা বেষ্টিত এই দেহ হলো আলোকিত বা প্রজ্ঞাবান পুরুষদের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। এর ভেতরেই অবস্থান করছে সুবর্ণ কোষ (হৃদয়-গুহা), যা ভাস্বর জ্যোতিতে পরিবেষ্টিত এবং পরম আনন্দের জগতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ।
সেই হিরণ্ময় নগরী—পরাজয়হীন ও দুর্ভেদ্য অযোধ্যা—যা মহিমায় সমাবৃত, অপরাজেয় এবং বাইরের কোনো শত্রু দ্বারা আক্রমণ করা অসম্ভব; পরম ব্রহ্ম স্বয়ং সেখানে প্রবেশ করেছেন এবং যাঁরা প্রজ্ঞাবান ও দর্শন করতে সক্ষম, তাঁদের জন্য সেখানেই অবস্থান করেন।
এই সূক্তের শেষ তিনটি মন্ত্রে বর্ণিত হিরণ্ময় হৃদয়-গুহা হলো ব্রহ্ম, জীব ও প্রকৃতির মধ্যকার মহাজাগতিক ত্রিমূর্তির (ত্রিত্ব) এক ক্ষুদ্র রূপ—যা একমাত্র জ্ঞানী ও দূরদর্শী ব্যক্তিরাই উপলব্ধি করতে পারেন। এই ত্রিত্বের কোষাগারটি চাকার মতো গতিশীল, যার রয়েছে তিনটি অরি বা স্পোক (প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ); এবং এটি তিনটি স্তম্ভের (প্রকৃতি, জীব ও ব্রহ্ম) ওপর নির্মিত গম্বুজের মতো সুদৃঢ়। এই প্রসঙ্গে শ্বেতাশ্বেতরোপনিষদের ১.৩-৭ এবং ৪.৫-৭ মন্ত্র, এবং ৩২ নম্বর মন্ত্রে বর্ণিত রহস্যময় যক্ষের ক্ষেত্রে কেনোপনিষদের ৩য় খণ্ড ও ৪.১-৩ অংশ দ্রষ্টব্য।
এইভাবে মানব-শরীরের সম্পর্কে বৈদিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো যে এটি একটি দেবপুরী। চোখ, কান, নাক ইত্যাদি সমস্ত অবয়ব এক-একজন দেবতার প্রতিনিধি। বৈদিক চিন্তাধারা অনুসারে এই শরীর মল-মূত্রের থলি বা ত্যাগের যোগ্য বস্তু নয়। মানব আত্মার এটিকে নিজের সৌভাগ্য মনে করা উচিত যে দেবতাদের এই পুরী তাকে থাকার জন্য দেওয়া হয়েছে।
 
✅এই শরীর যজ্ঞস্থল—
এই শরীরের বিষয়ে বৈদিক সাহিত্যে এই চিন্তাধারাও পাওয়া যায় যে এটি একটি যজ্ঞস্থল। এই শরীরকে আমাদের কেবল বিষয়-ভোগের সাধন না ভেবে একটি পবিত্র যজ্ঞগৃহ ভাবা উচিত। অথর্ববেদ-১০.২.১৪-
কো অস্মিন্যজ্ঞমদধাদেকো দেবোঽধি পূরুষে।
কো অস্মিন্ত্সত্যং কোঽনৃতং কুতো মৃত্যুঃ কুতোঽমৃতম্ ॥
= কে সেই পরম এক ঈশ্বর, যিনি মানুষের মধ্যে যজ্ঞ ও আত্মত্যাগের চেতনা সঞ্চার করেন? কে সত্য এবং অসত্য প্রতিষ্ঠা করেন? মৃত্যুর উৎস কোথায়? অমৃতত্ব বা অমরত্বের উৎসই বা কোথায়? — এ কথা বলে মানব শরীরের যজ্ঞময়তাকে প্রকাশ করে। অথর্ববেদ ১১.৮.২৬-
অস্থি কৃত্বা সমিধং তদষ্টাপো অসাদয়ন্।
রেতঃ কৃত্বাজ্যং দেবাঃ পুরুষমাবিশন্ ॥
= অস্থিসমূহকে বা হাড্ডিকে অগ্নির সমিধ করে, ঐশ্বরিক শক্তিসমূহ মানবদেহে আট প্রকার জলীয় উপাদান স্থাপন করে; এবং জীবনরসকে সেই অগ্নির ঘৃত হিসেবে নিয়ে, সৃজনশীল অস্তিত্বের মানবিক যজ্ঞের মাধ্যমে আত্ম-পূর্ণতা লাভের উদ্দেশ্যে ইন্দ্রিয়রূপ দেবগণ মানবদেহে প্রবেশ করেছে।
এই মন্ত্র শরীরের যজ্ঞময়তাকে বুঝিয়ে বলে যে শরীরের হাড়গুলোই সমিধা, রক্ত, বস্তি ইত্যাদি এই আট প্রকার জলই যজ্ঞীয় জল এবং রেতঃ-ই ঘৃত। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেও হাড়কে সমিধা, রেতঃ-কে ঘৃত বলা হয়েছে। যজুর্বেদ ৩৪.৪-এ মনের মহিমা বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে এই মনের দ্বারাই সপ্তহোতা যজ্ঞ এগিয়ে চলে~
যেনেদম্ভূতম্ভুবনম্ভবিষ্যৎপরিগৃহীতমমৃতেন সর্বম্।
যেন যজ্ঞস্তায়তে সপ্তহোতা তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু॥
= যার মাধ্যমে, অবিনশ্বর পরমেশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—এই ত্রিকাল পরিজ্ঞাত ও অনুধাবিত হয়; যার দ্বারা সপ্ত হোতার মাধ্যমে যজ্ঞ বিস্তৃত ও সম্পন্ন হয়—আমার সেই মন যেন মোক্ষ বা আত্মকল্যাণের দিকে পরিচালিত হয়।
সপ্ত হোতা—মস্তকের সাতটি অঙ্গ (দুটি চোখ, দুটি কান, দুটি নাসারন্ধ্র এবং মুখ)। এই শারীরবৃত্তীয় যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপ সম্পাদনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সপ্ত হোতা বলতে পঞ্চপ্রাণ, আত্মা এবং প্রকৃতিকেও (প্রাথমিক পদার্থ) বোঝানো যেতে পারে।
গোপথ ব্রাহ্মণ পূর্বব্রাহ্মণ ১.২.১১–১৪-এ মানবদেহ ও যজ্ঞের মধ্যে প্রতীকী সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—বাক্‌ই হোতা, কারণ বাকের সঙ্গে স্তোত্র ও বষট্কার যুক্ত হয়; প্রাণ ও অপানই অধ্বর্যু, কারণ সমস্ত প্রাণী প্রাণ দ্বারা পরিচালিত; চক্ষুই উদ্গাতা, কারণ চক্ষুর দ্বারা জীবসমূহ দর্শন করে; এবং মনই ব্রহ্মা, কারণ মন দ্বারাই বিভিন্ন দিক ও কার্য উপলব্ধি ও সম্পাদিত হয়। ১.২.১২-এ আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—“হোতা” বললে তা বাক্‌, “অধ্বর্যু” বললে প্রাণ–অপান, “উদ্গাতা” বললে চক্ষু এবং “ব্রহ্মা” বললে মন। এরপর ১.২.১৪-এ বলা হয়েছে—“আত্মা দেবযজনম্”, অর্থাৎ আত্মাই দেবযজন; যে আত্মা শরীরে অবস্থান করে, সেটিই যজ্ঞ এবং সেটিই দেবযজন। অতএব গোপথ ব্রাহ্মণের এই অংশে মানবদেহের বাক্‌, প্রাণ–অপান, চক্ষু ও মনকে যথাক্রমে হোতা, অধ্বর্যু, উদ্গাতা ও ব্রহ্মা এবং আত্মাকে দেবযজন ও যজ্ঞ হিসেবে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদের [৩.১৬.১,৭] একটি প্রকরণে মানব শরীরের যজ্ঞের বর্ণনা এই রূপে পাওয়া যায়-
পুরুষো বাব যজ্ঞস্তস্য যানি চতুর্বিংশতিবর্ষাণি তৎপ্রাতঃসবনং চতুর্বিংশত্যক্ষরা গায়ত্রী গায়ত্রং প্রাতঃসবনং তদস্য বসবোঽন্বায়ত্তাঃ প্রাণা বাব বসব এতে হীদংসর্বং বাসয়ন্তি ॥ এতদ্ধ স্ম বৈ তদ্বিদ্বানাহ মহিদাস ঐতরেয়ঃ স কিং ম এতদুপতপসি যোঽহমনেন ন প্রেষ্যামীতি স হ ষোডশং বর্ষশতমজীবৎপ্র হ ষোডশং বর্ষশতং জীবতি য এবং বেদ ॥
অর্থাৎ, পুরুষ শরীর একটি যজ্ঞ, যার আয়ুর প্রথম চব্বিশ বছর প্রাতঃসবন, পরবর্তী চুয়াল্লিশ বছর মাধ্যন্দিন সবন এবং তার পরের আটচল্লিশ বছর তৃতীয় সবন— এভাবে এটি একশো ষোলো বছর চলা যজ্ঞ। এই ভাবনায় যে নিজের শরীরকে পরিচালনা করে, সে একশো ষোলো বছর জীবিত থাকতে পারে।
 
☑️এই শরীর ঋষিভূমি—
এই শরীর ঋষিদের ভূমিও বটে; যজুর্বেদ ৩৪.৫৫-এ বলা হয়েছে যে,
সপ্তঽঋষয়ঃ প্রতিহিতাঃ শরীরে সপ্ত রক্ষন্তি সদমপ্রমাদম্ ।
সপ্তাপঃ স্বপতো লোকমীয়ুস্তত্র জাগৃতোঽঅস্বপ্নজৌ সত্রসদৌ চ দেবৌ ॥
= মানবদেহে সাতজন ঋষি প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন; তাঁরা বিরামহীন সতর্কতায় এই দেহ রক্ষা করে চলেন। যখন মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন এই সাতজন দেহে অবস্থানরত আত্মার মধ্যে বিলীন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সময়েও আত্মার রক্ষকস্বরূপ দুটি অনিমেষ বা নিদ্রাহীন ঐশ্বরিক শক্তি জাগ্রত থাকে।
এখানে~ সপ্ত ঋষি: স্পর্শ, দৃষ্টি, শ্রবণ, স্বাদ, ঘ্রাণ, মন এবং বুদ্ধি; দুটি নিদ্রাহীন দেবশক্তি: শ্বাস ও প্রশ্বাস—অর্থাৎ প্রাণ ও অপান বায়ু।
অর্থাৎ, শরীরে সাতজন ঋষি বসে আছেন, সেই সাতজন কোনো প্রমাদ (অসাবধানতা) না করে এই শরীরের রক্ষা করছেন। যখন এই শরীর ঘুমায়, তখন সেই সাত ঋষি আত্মলোকে চলে যান; কিন্তু দুজন দেব এমন আছেন যাঁরা সেই সময়েও শরীরে জেগে থাকেন। নিরুক্তের ব্যাখ্যা অনুসারে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ষষ্ঠ মন এবং সপ্তম বুদ্ধিই শরীরের সাতজন ঋষি। এরা সর্বদা শরীরের রক্ষায় তৎপর থাকে। যদি শরীর থেকে এই ঋষিগণ বেরিয়ে যান এবং মানুষ চোখ দিয়ে না দেখতে পারে, নাসিকা দিয়ে গন্ধ গ্রহণ না করতে পারে, কান দিয়ে না শুনতে পারে, জিহ্বা দিয়ে স্বাদের জ্ঞান এবং ত্বক দিয়ে স্পর্শের জ্ঞান না করতে পারে, মন দিয়ে চিন্তন এবং বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা না করতে পারে—তবে কেউ এসে তার ক্ষতি করতে পারে। চোখ ইত্যাদির অভাবে তার এই জ্ঞানটুকুও হবে না যে কেউ তার হিংসা করতে এসেছে। যখন এই শরীর ঘুমায়, তখন চোখ ইত্যাদি ঋষি স্থূল রূপে নিজেদের কাজ বন্ধ করে দেয়। সেই সময় তারা আত্মলোকে চলে যায়। কিন্তু সেই সময়েও আত্মা এবং প্রাণ—এই দুই দেব শরীরে জেগে থাকেন; কারণ এরাও যদি কোথাও চলে যান, তবে শরীর মৃতই হয়ে যাবে।
 
অথর্ববেদ ১০.৮.৯-এ শরীরের বিষয়ে এই বর্ণনা পাওয়া যায় যে,
তির্যগ্বিলশ্চমস ঊর্ধ্ববুধ্নস্তস্মিন্যশো নিহিতং বিশ্বরূপম্।
তদাসত ঋষয়ঃ সপ্ত সাকং যে অস্য গোপা মহতো বভূবুঃ ॥
= মস্তিষ্ক এবং সুষুম্ণাকাণ্ড একটি উল্টো চামচের সদৃশ—যার ছিদ্র বা মুখ নিচের দিকে এবং মূল বা ভিত্তিটি উপরের দিকে অবস্থিত; তার ভেতরে নানা রূপ যশ অর্থাৎ জ্ঞান নিহিত রয়েছে। সেখানে সাতজন ঋষি একসাথে উপবিষ্ট আছেন, যাঁরা এই মহাশরীরের রক্ষক হিসেবে অবস্থান করছেন।
যশ = জ্ঞান বা কীর্তি। সপ্ত ঋষি = ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন এবং বিদ্যা (বুদ্ধি)। এই সাতটি উপাদান মহাশরীরের রক্ষক। নিরুক্তে 'ঊর্ধ্ববুধ্নঃ' শব্দটির অর্থ "ঊর্ধ্ববোধনো বা" করা হয়েছে, অর্থাৎ যার উপরিভাগে বা উঁচুতে বোধ অর্থাৎ জ্ঞানসম্পন্ন চমস বা পাত্র বিদ্যমান (নিরুক্ত ১২।৪। খণ্ড ৩৮ অথবা পদ ২৫)। মূল অভিপ্রায় হলো, মস্তিষ্কের ঊর্ধ্বভাগেই জ্ঞান বা বোধের প্রধান স্থান, নিচের দিকে নয়।
এই চমস হলো শরীরের মূর্ধা অর্থাৎ ঘাড়ে উপরের অংশ। সাধারণ চমসগুলোতে পিঠ নিচে এবং ছিদ্র উপরে থাকে, তা না হলে তাতে রাখা বস্তু পড়ে যাবে; কিন্তু এটি এমন এক অদ্ভুত চমস যে এর ছিদ্র বা মুখ নিচের দিকে এবং পিঠ বা খুলি উপরের দিকে রয়েছে, তবুও তাতে বিশ্বরূপ যশ তথা সর্ববিধ জ্ঞান ভরা রয়েছে, তা পড়ে যায় না। সাতজন ঋষি হলেন পূর্বোক্ত সাত ইন্দ্রিয় রূপী ঋষি, যারা এতে বসে এর রক্ষা করছেন। এই সাতজন ঋষি দুটি কান, দুটি নাসিকার ছিদ্র, দুটি চোখ এবং একটি মুখ—এগুলোও হতে পারে, যেমনটা অথর্ববেদ ১০.২.৬-এ গণনা করা হয়েছে। এর বাইরে—
তদেষ শ্লোকো ভবতি। অর্বাগ্বিলশ্চমস ঊর্ধ্ববুধ্নস্তস্মিন্যশো নিহিতং বিশ্বরূপম্। তস্যাসত ঋষয়ঃ সপ্ত তীরে বাগষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিদানেতি। অর্বাগ্বিলশ্চমস ঊর্ধ্ববুধ্ন ইতি। ইদং তচ্ছির এষ হ্যর্বাগ্বিলশ্চমসঽঊর্ধ্ববুধ্নস্তস্মিন্যশো নিহিতং বিশ্বরূপমিতি প্রাণা বৈ যশো নিহিতং বিশ্বরূপম্প্রাণানেতদাহ তস্যাসত ঋষয়ঃ সপ্ত তীর ইতি প্রাণা বা ঋষয়ঃ প্রাণানেতদাহ বাগষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিদানেতি বাগ্ঘ্যষ্টমী ব্রহ্মণা সংবিত্তে। ইমাবেব গোতমভরদ্বাজৌ। অয়মেব গোতমোঽয়ং ভরদ্বাজ ইমাবেব বিশ্বামিত্রজমদগ্নী অয়মেব বিশ্বামিত্রোঽয়ং জমদগ্নিরিমাবেব বসিষ্ঠকশ্যপাবয়মেব বসিষ্ঠোঽয়ং কশ্যপো বাগেবাত্রির্বাচা হ্যন্নমদ্যতেঽত্তির্হ বৈ নামৈতদ্যদত্রিরিতি সর্বস্যাত্তা ভবতি সর্বমস্যান্নম্ভবতি য এবং বেদ।
শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.৫.২.৪-৬; সম্পূরক বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ২.২.৩-৪
→ এই চমসের মুখ নিম্নদিকে এবং তলদেশ ঊর্ধ্বদিকে; তার মধ্যে বহুরূপ যশ স্থাপিত রয়েছে; তার প্রান্তে সাত ঋষি আসীন এবং অষ্টমী বাক্‌, ব্রহ্মের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত।” এরপর ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এই চমস আসলে মানবশিরের প্রতীক; এর মধ্যে নিহিত “বহুরূপ যশ” হল প্রাণসমূহ এবং “সাত ঋষি” হল সেই প্রাণসমূহ। অষ্টমী হল বাক্‌, যা ব্রহ্মের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। তারপর বলা হয়েছে—এই দুই কানই গৌতম ও ভরদ্বাজ; এই দুই চোখই বিশ্বামিত্র ও জমদগ্নি (শত০ ব্রা০ ৮.১.২.৩); এই দুই নাকই বশিষ্ঠ ও কশ্যপ; আর বাক্‌ই অত্রি। কারণ বাকের দ্বারা অন্ন ভক্ষণ করা হয়; ‘অত্রি’ নামের অর্থই ভোক্তা। যে ব্যক্তি এভাবে জানে, সে সর্বকিছুর ভোক্তা হয় এবং সমস্তই তার অন্ন হয়ে ওঠে। এখানে চমসকে মানবশির বা মানবদেহের প্রতীক এবং সাত ঋষিকে প্রাণের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে; পরবর্তী ব্যাখ্যায় ছয় ঋষিনাম জোড়াকে দুই কর্ণ, দুই চক্ষু ও দুই নাসিকার সঙ্গে এবং এক বাক্‌কে অত্রির সঙ্গে সম্বন্ধিত করা হয়। 
 
🌸 অতএব, এই বৈদিক চিন্তাধারা অনুসারে আমাদের শরীরের প্রতি এই ভাব রাখতে হবে যে, এটি ঋষিদের পবিত্র তপোভূমি এবং একে কোনোভাবেই দূষিত হতে দেওয়া উচিত নয়।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)