বৈদিক দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বর কোনো প্রাকৃত রক্ত-মাংস বা স্নায়ুর তৈরি সাকার দেহের অধিকারী নন। যজুর্বেদ [৪০.৮] স্পষ্ট ঘোষণা করে যে পরমাত্মা “অকায়মব্রণমস্নাভিরং” অর্থাৎ তিনি পরম পবিত্র, শরীরহীন, স্নায়ুবিহীন ও ছিদ্রহীন। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে ঈশ্বরের এই ইন্দ্রিয়হীন অথচ পরম চৈতন্যময় রূপটি সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়ে বলা হয়েছে যে, পরমাত্মা চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা বা ত্বকের মতো সমস্ত প্রাকৃত ইন্দ্রিয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বা বর্জিত।
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং বৃহৎ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৭
সরলার্থ:সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহের প্রকাশক হয়েও স্বয়ং সকল ইন্দ্রিয়-বর্জিত। তিনি সবার প্রভু, নিয়ন্তা এবং সবার মহান আশ্রয়।
কিন্তু জগতের সমস্ত জীবের ইন্দ্রিয়সমূহে যে দর্শন, শ্রবণ বা অনুভূতির শক্তি কাজ করছে, সেই সকল শক্তির আসল উৎস হলেন তিনিই। মানুষ যেমন হাত, পা বা চোখের সাহায্যে কার্য সম্পাদন করে, পরমেশ্বরের কাজ করার জন্য কোনো স্থূল বা সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন হয় না।
ঋগ্বেদ (১০।৯০।১), শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ (৩।১৪, ৩।১৬) এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৩।১৪) ঈশ্বরকে ‘সহস্রাক্ষ’ (সহস্র চোখযুক্ত) বা ‘সর্বতঃ পাণিপাদম্’ (সর্বত্র হাত-পা বিশিষ্ট) বলা হলেও এগুলো মূলত তাঁর রূপক প্রকাশ।
সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাঽত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্॥
ঋগ্বেদ ১০।৯০।১; শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৪
সরলার্থ:যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর অসংখ্য মস্তক, চক্ষু ও চরণ স্থিত, অথবা যিনি সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বগত— সেই পূর্ণ পরমাত্মা সমগ্র জগতের সর্বদিকে ব্যাপ্ত হয়ে দশাঙ্গুল (পঞ্চ-স্থূলভূত ও পঞ্চ-সূক্ষ্মভূত সম্পন্ন জগৎকে) উল্লঙ্ঘন করে স্থিত।
এখানে ‘পাণি’ বা হস্ত হলো বল ও ধারণক্ষমতার প্রতীক; অর্থাৎ তিনি কোনো হাত ছাড়াই নিজের অসীম সামর্থ্য দিয়ে পুরো মহাবিশ্বকে ধারণ করছেন। ‘পাদ’ বা চরণ হলো তাঁর গতির প্রতীক, যা নির্দেশ করে তিনি সর্বগত এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থানে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। একইভাবে ‘অক্ষি’ ও ‘মস্তক’ দিয়ে তাঁর সর্বজ্ঞতা ও সর্বদ্রষ্টা রূপকে বোঝানো হয়েছে, যার অগোচরে বিশ্বের কোনো কর্মই থাকে না। আর ‘শ্রুতি’ বা কর্ণ হলো সর্বশ্রোতা রূপের প্রতীক, যা প্রকাশ করে যে তিনি প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ের আকুতি নিখুঁতভাবে গ্রহণ করেন।
চোখ বা কান ছাড়াই পরমেশ্বর কীভাবে দেখতে ও শুনতে পান, তার উত্তর শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ‘অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা...’ (৩।১৯) মন্ত্রে প্রদান করা হয়েছে।
অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ।
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১৯
সরলার্থ:সেই পরমাত্মার হাত নেই, তবুও নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা তিনি সবকিছু গ্রহণ অর্থাৎ ধারণ করেন। তাঁর পা নেই, তবুও তিনি সর্বব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাধিক বেগবান। তাঁর চক্ষু নেই, তবুও তিনি সবকিছু দর্শন করেন। তাঁর কর্ণ নেই, তবুও তিনি সবই শ্রবণ করেন। তিনি সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় জানেন, অথচ তাঁকে কেউ সম্পূর্ণরূপে জানে না। এজন্য জ্ঞানিগণ তাঁকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ‘সত্যার্থ প্রকাশ’-এর ৭ম সমুল্লাসে এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে—পরমেশ্বরের কোনো প্রাকৃত হস্ত বা হাত নেই, কিন্তু তিনি তাঁর অসীম সামর্থ্যরূপ হাত দ্বারা সমস্ত জগৎ রচনা ও গ্রহণ করেন। তাঁর প্রাকৃত পা নেই, কিন্তু সর্বব্যাপী হওয়ার কারণে তিনি সর্বাপেক্ষা অধিক বেগবান। তাঁর চোখের গোলক নেই, কিন্তু তিনি পরম চেতন হওয়ার কারণে বিশ্বের সবকিছু যথাবৎ দর্শন করেন। তাঁর কান না থাকলেও তিনি সকলের স্তুতি ও কথা শ্রবণ করেন এবং প্রাকৃত হৃদয় না থাকলেও তিনি অতীত-ভবিষ্যৎসহ পুরো জগৎকে জানেন। তিনি কোনো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের অধীন না হয়েও নিজ অসীম ও স্বাভাবিক শক্তির দ্বারা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সর্বকার্য সিদ্ধ করেন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৩।১১) ঈশ্বরকে ‘সর্বভূতগুহাশয়ঃ’ অর্থাৎ সকল প্রাণীর হৃদয়রূপ পরম গুহায় অবস্থানকারী অন্তর্যামী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ।
সর্বব্যাপী স ভগবাংস্তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১১
সরলার্থ: যাঁর মধ্যে সকল প্রাণীর মুখ, মস্তক ও গ্রীবা অবস্থিত, যিনি সকল প্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় শয়নকারী, তিনিই সর্বব্যাপী ভগবান। সেই কারণে তিনি সর্বত্র উপস্থিত এবং কল্যাণকারী।
পরমাত্মা জীবের অতি নিকটে অবস্থান করায় মানুষ মুখে উচ্চারণ না করে কেবল মনে মনে বা সংকল্পের মাধ্যমেও কোনো স্তুতি জানালে, সর্বব্যাপী পরমেশ্বর তা তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করেন; এর জন্য কোনো দূরবর্তী শব্দতরঙ্গ বা প্রাকৃত কানের প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, বেদমন্ত্রে উপাসকের ঈশ্বরকে ‘দেখা’ বা ‘শোনার’ অর্থ প্রাকৃত চোখ বা কান ব্যবহার করা নয়। যখন কোনো সাধক ধ্যান, যোগাভ্যাস ও স্বাধ্যায়ের মাধ্যমে বুদ্ধিতে পরমেশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করেন, সেটিই ঈশ্বরকে ‘দেখা’। আর কোনো অসৎ কাজ করতে গেলে অন্তরে যে দ্বিধা বা ভয় জাগে এবং সৎ কাজ করলে যে আনন্দ অনুভূত হয়, সেটিই পরমেশ্বরের ‘ভেতরের ডাক’ বা বাণী শোনা।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
