মনুস্মৃতিতে ত্রৈতবাদ - অগ্নিবীর

 


ত্রৈতবাদ হচ্ছে বেদভিত্তিক একটি দর্শন । এই দর্শন অনুসারে , পরমাত্মা , জীবাত্মা এবং প্রকৃতি– এই তিনটি সত্তা অনাদি , নিত্য ও পৃথক ৷ এদের মধ্যে পরমাত্মা এই সৃষ্টির নিমিত্ত কারণ , প্রকৃতি উপাদান কারণ এবং জীবাত্মা সাধারণ কারণ ৷ এই দর্শন অনুসারে , পরমাত্মা এক , অদ্বিতীয় , চেতন , সর্বজ্ঞ , সর্বব্যাপী , আনন্দময় , একরস , বিকারশূন্য । অপরদিকে জীবাত্মা বহু , চেতন , একদেশী অল্পজ্ঞ । আর প্রকৃতি অচেতন , সর্বব্যাপী নয় ।

মনুস্মৃতিতে ত্রৈতবাদ ——



🟦🟦 ঈশ্বর 🟦🟦

মনুস্মৃতিতে ব্রহ্ম বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে সেই পরমব্রহ্ম একাক্ষর [ 1 ] অর্থাৎ " ও৩ম্ " নাম দ্বারা অভিহিত হয়েছে । সেই ব্রহ্মের স্বয়ম্ভূ, ভগবান‌ এবং অব্যক্ত নাম সমূহ দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে -- তিনি এই সৃষ্টিকে প্রকাশিত করেন, তাঁর ওজ‌ পৃথিবী, জল তেজ আদি‌ মহাভূত সমূহে বিদ্যমান, তিনিই প্রকৃতিকে প্রেরিত করে থাকেন । [ 2 ]
তিনি ইন্দ্রিয় দ্বারা গ্রাহ্য‌ নন, সূক্ষ্ম, অব্যক্ত তথা সনাতন, সম্পূর্ণ ভূতসমূহে ব্যাপ্ত অচিন্ত্য এবং স্বয়ম্ভূ তিনি । [ 3] তিনিই নিজ‌ শরীর ( প্রকৃতি ) দ্বারা বিবিধ‌ প্রজাগ‌ণকে সৃষ্টি করে থাকেন । [ 4 ] এই প্রসঙ্গে এক পরমাত্মার অনেক নাম এবং গুণের বর্ণনা করা হয়েছে ।
তিনি‌ই এই সৃষ্টির নিমিত্তকারণ‌ তথা প্রকৃতিকে প্রেরণা দানকারী‌ । তিনি নিত্য‌ পরমব্রহ্ম ।

🟦🟦 জীবাত্মা 🟦🟦

দেহী শব্দ বহুবচনে জীবাত্মাকে নির্দেশ করে মনুস্মৃতিতে বর্ণিত হয়েছে । এক স্থানে‌ বর্ণনা করা হয়েছে যে‌, যে‌সব জীবাত্মা পূর্ব কল্পের কর্মকে নতুন সর্গে‌ও প্রাপ্ত করে থাকে । [ 5 ]
ব্রহ্ম এইসব জীবাত্মাকে ধর্ম এবং অধর্মের কর্মানুসারে সুখ এবং দুঃখ দ্বারা যুক্ত করে থাকেন । [ 6 ] এখানে স্পষ্ট যে‌ ব্রহ্ম কর্মফল প্রদাতা এবং জীবাত্মা তার নিজের কর্মানুসারে সুখ-দুঃখ এর ভোক্তা ।
ব্রহ্ম ধর্ম এবং অধর্ম কর্মসমূহের ঊর্ধ্বে । এই জীবাত্মা তার কর্মানুসারে বিবিধ‌ প্রকার শরীর প্রাপ্ত হয়ে থাকে । এই বিষয়ে মনুস্মৃতিতে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে । [ 7 ]
এই প্রকারে মনুস্মৃতিতে জীবাত্মাকে নিত্য‌, কর্মফল ভোক্তা, সুখ-দুঃখ এর বন্ধনে যুক্ত‌ শরীরের বন্ধন দ্বারা বদ্ধ ; ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন সত্তা মানা হয়েছে ।
জীবাত্মা সাধনার মাধ্যমে সেই পরমব্রহ্মকে প্রাপ্ত করে থাকে । [ 8 ]

🟦 🟦 প্রকৃতি 🟦🟦

প্রলয়কালে প্রকৃতির অবস্থার বর্ণনা মনুস্মৃতিতে ——
এই জগত ( প্রলয়াবস্থায় ) তমস্ ( প্রকৃতি ) রূপে লক্ষণ রহিত তর্কের অযোগ্য, অবিজ্ঞেয় এবং নিদ্রিত ছিলো । [ 9 ]
কুল্লুক ভট্ট এখানে " তমস " শব্দ‌ প্রকৃতি অর্থে বর্ণনা করেছেন । মনুস্মৃতিতে একটি শব্দে পরমাত্মাকে নির্দেশ করে " তমোনুদঃ " [ 10 ] প্রযুক্ত‌ হয়েছে । এই শব্দ দুইটি ভাগে বিভক্ত ;
" তমস‌+নুদঃ ' নুদ ' শব্দ তুদাদিগণের ' নুদ ' প্রেরণে ধাতু দ্বারা গঠিত হয়েছে, যার‌ অর্থ প্রেরণাকারী । " তমোনুদঃ " এর অর্থ জগতের উৎপত্তির সময় প্রকৃতিকে প্রেরণা দানকারী ।
কুল্লুক ভট্ট‌ও প্রদত্ত শব্দের এক‌ই অর্থ বর্ণনা করেছেন । অত‌এব এখানে ' তমস‌ ' শব্দের অর্থ প্রকৃতি‌ই গ্রহ‌ণ করা উচিত । [ 11 ]
হরগোবিন্দ শাস্ত্রী‌ও তমস শব্দের অর্থ প্রকৃতি করেছেন । [ 12 ] এক স্থানে বর্ণনা করেছেন, সেই ব্রহ্ম তাঁর শরীর দ্বারা বিবিধ‌ প্রজাগণকে সৃষ্টি করে থাকে । [ 13 ] এখানে ব্রহ্মের শরীর বলতে প্রকৃতিকে নির্দেশ করা হয়েছে কেননা প্রকৃতি প্রলয়কালে ব্রহ্মের মধ্যে ব্যাপক রূপে অবস্থান করে ।
যদি ব্রহ্ম তাঁর চেতন‌রূপ দ্বারা সৃষ্টি করে থাকে তাহলে তিনি পরিণামী সিদ্ধ হবেন পরন্তু ব্রহ্ম অপরিণামী । পরিণাম ধর্ম প্রকৃতির অত‌এব এটাই মানতে হবে যে‌ ব্রহ্ম প্রকৃতি দ্বারা জগত‌ সৃষ্টি করে থাকেন ।
এই বিষয়ে মহর্ষি মনু একটি শ্লোকে স্পষ্ট বর্ণনা করেন —— " যা‌ অব্যক্ত কারণ ( প্রকৃতি ) তাকে নিত্য‌ এবং সদসদাত্মক বলা হয় ‌ ; [ 14 ] তার ( প্রকৃতি ) দ্বারা এই সৃষ্টি রচনাকারীকে পুরুষ ব্রহ্ম বলা হয় ‌। [ 15 ]
এখানে প্রকৃতিকে জগতের মূল উপাদান কারণ এবং ব্রহ্মকে নিমিত্ত কারণ মানা হয়েছে । এভাবে এখানে স্পষ্টভাবে প্রকৃতিকে নির্দেশ করা হয়েছে ‌।

মনুস্মৃতিতে ব্রহ্ম, জীবাত্মা এবং প্রকৃতি এই তিনটি সত্তার স্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান । তিনটি সত্তা একত্রিত না হয়ে ভিন্ন-ভিন্ন তথা‌ অনাদি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে ; অত‌এব মনুস্মৃতিতে‌ও " ত্রৈতবাদ " সিদ্ধান্ত প্রতিপাদিত হয়েছে ।

‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌ ‌🟦 তথ্যসূত্র 🟦

১. একাক্ষরং পরং ব্রহ্ম।। (মনু. ২/৮৩)

২.ততঃ স্বয়ম্ভুর্ভগবানব্যক্তো ব্যঞ্জয়ন্নিদম্। মহাভূতাদিবৃত্তৌজাঃ প্রাদুরাসীৎ তমোনুদঃ।। (মনু. ১/৬)

৩. যোহসাবতীন্দ্রিয়গ্রাহ্যঃ সূক্ষ্মোহব্যক্তঃ সনাতনঃ। সর্বভূতময়োহচিন্ত্যঃ স এব স্বয়মুদ্বভৌ।। (মনু. ১/৭)

৪. সোহভিধ্যায় শরীরাৎ স্বাৎ সিসৃক্ষুর্বিবিধাঃ প্রজাঃ। (১/৮)

৫. স্বানি স্বান্যভিপদ্যন্তে তথা কর্মাণি দেহিনঃ।। (১/৩০)

৬. কর্মণাঞ্চ বিবেকার্থং ধর্মাধর্মৌ ব্যবেচয়ৎ। দ্বন্দ্বৈরযোজয়চ্চেমাঃ সুখদুঃখাদিভিঃ প্রজাঃ।। ( মনু. ১/২৬)

৭. মনু. (১/৩৭-৪০) তথা ৪৩-৪৬

৮. স ব্রহ্ম পরমভ্যেতি।। (মনু. ২/৮২)

৯. আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্। অপ্রতর্ক্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ।। (মনু. ১/৫)

১০. ইন্দংজগৎ তমোভূতং তমসি স্থিতং লীনমাসীৎ। তমঃ শব্দেন গুণবত্যা প্রকৃতিনিদিশ্যতে।।
—— কুল্লূকভট্টভাষ্য‌, মনু. পৃ. ৪

১১. মনু. ২/৬

১২. তভোনুদঃ প্রকৃতিপ্ররেকঃ।। ( কুল্লূকভট্টভাষ্য, পৃ. ৬)

১৩. দেখিয়ে - মণিপ্রভা হিন্দী ভাষ্য, পৃ. ৩

১৪. দেখুন --- (মনু. ১/৮)

১৫. য়তকারণমব্যক্তং নিত্যং সদসদাত্মকম্। তদ্বিসৃষ্টং স পুরুষো লোকে ব্রহ্মেতি কীর্ত্যতে।। (মনু. ১/১)

[ ব্রহ্মপুরাণ (১/৩৩)। বিষ্ণুপুরাণ (১/২/১৯-২০)। কূর্মপুরাণ পূর্বার্দ্ধ ৪/৬) ]

নমস্কার 

No comments:

Post a Comment

Pages