মহাকালের গল্পে গল্পে মানব বিবর্তনের ইতিহাস; পর্ব ৫ - অগ্নিবীর

মহাকালের গল্পে গল্পে মানব বিবর্তনের ইতিহাস; পর্ব ৫

Share This




বিগত পর্বগুলোতে আমরা প্রায় ৪৪৯ কোটি বছরের ইতিহাস দেখেছি এই পৃথিবীর। কীভাবে প্রথমে স্বতস্ফুর্ত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মৈথুনহীনভাবেই একক কোষীয় প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে। এই প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Abiogenesis ১ম পর্বে যার বর্ণনা করা হয়েছিল। পবিত্র বেদেও এই অমৈথুনী প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর বুকে প্রাণসৃষ্টির কথা উল্লেখিত হয়েছে যা পৃথিবীর আর কোন রিলিজিয়নেই পাওয়া যায়না। পবিত্র ঋগ্বেদের সেই মন্ত্রটি দেখে নিই-


উপ সর্প মাতরং ভূমিমেতামুরুব্যচসং পৃথিবীং সুশেবাম্। ঊর্ণস্রদা য়ুবতির্দক্ষিণাবত এষা ত্বা পাতু নির্ঋতেরুপস্হাত্।।

(ঋগ্বেদ -১০।১৮।১০) 


পদার্থ- (এতাম্-উরুব্যচসং সুশেবাংভূমি মাতরম্-উপসর্প) হে জীব! জন্ম ধারণ করার জন্য তুমি এই বহুব্যক্তকারী  বিস্তৃত আর অনুকূলতার সম্পাদক ভূমি রূপী মাতাকে প্রাপ্ত হও (দক্ষিণাবতে -এষা য়ুবতিঃ ঊর্ণশ্রদাঃ) স্ব-কর্মফল শরীরে ধারণ যোগ্য জীবের জন্য এই যুবতিরূপ ধরণীমাতা   (নির্ঋতেঃ-উপস্হাত্ ত্বা পাতু)  মৃত্যুরূপ ঘোর আপত্তির অঞ্চল হতে তোমার রক্ষা করে। 


অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে জীব কোন মাতা বা যুবতীর গর্ভে নয় বরং যুবতীরূপ ধরণীমাতাকেই জন্মলাভ করার জন্য প্রাপ্ত করেছিল। ধরণীর বুকেই অমৈথুনীভাবে জীবের প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে Abiogenesis.


আমরা ২য় পর্বে দেখেছি কীভাবে প্রথমে আবির্ভাব হয়েছিল জলচর প্রাণীর যারা স্তন্যপায়ী ছিলনা। কীভাবে জল হতে ডাঙ্গায় উঠে এলো সরীসৃপের ন্যায় দেখতে Ichthyostega নামক প্রজাতি আজ হতে প্রায় ৩৮ কোটি বছর পূর্বে। এরপর ধীরে ধীরে লক্ষ লক্ষ বছরের ধীর প্রক্রিয়ায় নবজাতকের পুষ্টির সুরক্ষায় সৃষ্টি হলো প্রাণীদের স্তনগ্রন্থির। ৩য় ও ৪র্থ পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে একের পর এক বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে আবার বিলুপ্তও হয়ে গেছে অনেক প্রজাতি। ডায়নোসরদের দাপটের সময়টা আমরা দেখেছি, মহাজাগতিক এক দূর্ঘটনায় তাদের বিলুপ্ত হওয়া, স্তন্যপায়ী প্রাণীকূলের রক্ষা পাওয়া এসব জেনেছি। অদ্ভুত বিষয় হলো ব্রাহ্মণ গ্রন্থেও বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তির কথা,

প্রথমে অ-স্তন্যপায়ী প্রাণীর সৃষ্টি হবার কথা, খাদ্যাদি সহ বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক প্রজাতির কথা, নবজাতকের পুষ্টির জন্য প্রাণীদেহে স্তনগ্রন্থি সৃষ্টি তথা স্তন্যপায়ী প্রজাতি সৃষ্টির কথা উল্লেখিত হয়েছে! এমনকি একই উৎস বা Last Universal Common Ancestor(LUCA) থেকে সৃষ্ট হওয়ায় মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীর যে দৈহিক সাযুজ্য পাওয়া যায় তাও ইঙ্গিত করা হয়েছে। চলুন দেখে নিই-


প্রজাপতির্হ বা ইদমগ্র এক এবাস । স ঐক্ষত কথং নু প্রজায়েয়েতি সোঽশ্রাম্যৎস তপোঽতপ্যত স প্রজা অসৃজত তা অস্য প্রজাঃ সৃষ্টাঃ পরাবভূবুস্তানীমানি বয়াংসি পুরুষো বৈ প্রজাপতের্নেদিষ্ঠং দ্বিপাদ্বা অয়ং পুরুষস্তস্মাদ্দ্বিপাদো বয়াংসি - ২.৫.১.[১]


অর্থাৎ বয়াংসি বা Ornithine Species বা পক্ষীজাতীয় প্রজাতিসমূহের কথা বলা হচ্ছে যারা সেই একই উৎস হতে সৃষ্ট বলে মানুষের ন্যায় তারাও দ্বিপদ। বলা হচ্ছে পরাবূভু বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পক্ষী প্রজাতিসমূহের কথা। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে ৩য় পর্বে বলেছিলাম আজ থেকে ৬.৬ কোটি বছর আগে সংঘটিত মহাদূর্যোগের কথা যখন উল্কাপাতে ডায়নোসর সহ পৃথিবীর অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই Ornithine Species এর অধিকাংশ পূর্বপুরুষ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। টিকে যায় কেবল ৪ টি প্রজাতি। সেই ৪টির মধ্যে Neoaves গণ হতেই বর্তমানের আধুনিক পাখিদের উদ্ভব।


পরের কণ্ডিকায় বলা হচ্ছে-


স ঐক্ষত প্রজাপতিঃ । যথা ন্বেব পুরৈকোঽভূবমেবমু ন্বেবাপ্যেতর্হ্যেক এবাস্মীতি স দ্বিতীয়াঃ সসৃজে তা অস্য পরৈব বভূবুস্তদিদং ক্ষুদ্রং সরীসৃপং যদন্যৎসর্পেভ্যস্তৃতীয়াঃ সসৃজ ইত্যাহুস্তা অস্য পরৈব বভূবুস্ত ইমে সর্পা এতা হ ন্বেব দ্বয়ীর্যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ ত্রয়ীরু তু পুনর্ঋচা - ২.৫.১.[২]


অর্থাৎ সরীসৃপের ন্যায় অনেক প্রজাতির কথা যারা মানুষ সৃষ্টির অনেক আগে তৈরী হয়েছিল। ঠিক যেমনটা ২য় পর্বে আমরা দেখিয়েছি আজ হতে ৩৮ লক্ষ বছর আগে Ichthyostega সহ নানা প্রজাতির কথা যারা ছিল দেখতে সরীসৃপের ন্যায়। এদেরও অনেকেই বভূবুস্ত বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমরা দেখেছিলাম বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পাবার জন্য লক্ষ লক্ষ বছরের ধীর প্রক্রিয়ায় তাদের একটি অংশের মধ্যে তৈরী হয় স্তনগ্রন্থি। শতপথ ব্রাহ্মণও ঠিক একই কথা বলছে-


সোঽর্চঞ্ছ্রাম্যন্প্রজাপতিরীক্ষাং চক্রে । কথং নু মে প্রজাঃ সৃষ্টাঃ পরাভবন্তীতি স হৈতদেব দদর্শানশনতয়া বৈ মে প্রজাঃ পরাভবন্তীতি স আত্মন এবাগ্রে স্তনয়োঃ পয় আপ্যায়যাং চক্রে স প্রজা অসৃজত তা অস্য প্রজাঃ সৃষ্টা স্তনাবেবাভিপদ্যতাস্ততঃ সম্বভূবুস্তা ইমা অপরাভূতঃ - ২.৫.১.[৩]


অর্থাৎ অনেক সৃষ্ট অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরে অনেক প্রজা স্তনপ্রাপ্ত হয়ে জীবনধারণ করল ও তাহাতে তারা অপরাভূত হয়ে(বিলুপ্তি হতে রক্ষা পেয়ে) সম্যকভাবে অবস্থান করল।


(শতপথ ব্রাহ্মণ, ২য় কাণ্ড, ৫ম অধ্যায়, ১ম ব্রাহ্মণ, ১-৫ নং কণ্ডিকা)


অর্থাৎ আমরা স্পষ্ট দেখছি ব্রাহ্মণ গ্রন্থে-


১) স্তন্যপায়ীদের আগে অন্য প্রজাতিদের সৃষ্টির কথা আছে।

২) খাদ্যের অভাবে বহু প্রজাতির বিলুপ্তির কথা আছে।

৩) স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাব, স্তনগ্রন্থি সৃষ্টি ও বিলুপ্তি থেকে রক্ষায় এর গুরুত্বের কথা আছে।

৪) মানুষ যে অনেক পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছে সেই কথা আছে।


এভাবেই ক্রমে ক্রমে গত পর্বে আমরা দেখেছি আজ হতে প্রায় ৪৪ লক্ষ বছর পূর্বে দুইপায়ে ভর দিয়ে চলতে পারে মানুষের পূর্বজ এমন স্তন্যপায়ী প্রজাতি Ardipithecus এর উৎপত্তির ইতিহাস। কিন্তু এরপর কী হলো? কীভাবে Homo Sapiens প্রজাতির উৎপত্তি হলো?


দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারার ফলে আমাদের খাদ্যসংগ্রহ আগের হতে অনেকগুণে সহজ হয়ে গেল। বৃক্ষচারী জীবন ছেড়ে স্থলে বসতি গড়ায় খাদ্যের উৎসও বাড়ল অনেক। হাতের উপর আট ভর দিতে হলো না, হাত প্রধান অস্ত্রে পরিণত হলো খাদ্য সংগ্রহের। গড়ে ৮০ পাউন্ড ছোট মস্তিস্কযুক্ত Ardopethicus এর জন্য তা হলো খুব চমকপ্রদ। বেশী খাদ্য দ্রুত বর্ধিত করতে লাগল মস্তিস্কের আয়তন, মাংসপেশীর শক্তি, চলাচলের ক্ষমতা। এভাবে পরবর্তী ১২ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হতে লাগল তারা। তবে একটি সমস্যা হয়ে গেলো, হাঁটার পরিমাণ বাড়ার কারণে ও দুইপায়ের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় পেলভিস বা শ্রোণীচক্রের ছিদ্র হয়ে আসতে লাগল ছোট। এতে বাচ্চা জন্মদান কঠিন হয়ে দাঁড়াল। ভেবে দেখুন আজ হতে ৪০ লক্ষ বছর আগে কি বাচ্চা ডেলিভারির সিজার অপারেশনের দরকার ছিল? ছিলনা। কিন্তু দিনদিন বিশ্বজুড়ে এর প্রয়োজন বেড়েই চলেছে। কারণ হলো লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আমাদের দুইপেয়ে বা Bipedal অভ্যেসের কারণে শ্রোণীচক্রের আকার ছোট হতে থাকা।


এতে আরও একটি সমস্যা হলো, অন্যান্য অনেক স্তন্যপায়ী দেখবেন অনেকদিন পর্যন্ত গর্ভধারণ করে। হাতি গর্ভধারণ করে ২ বছর, উট প্রায় ১৩ মাস। ডলফিন প্রায় ১২ মাস, গাধা ১ বছরেরও বেশী, জিরাফ ১৪ মাসের বেশী। কিন্তু শ্রোণীচক্রের ছিদ্রের আকার হ্রাস পেতে থাকার কারণে Ardipithecus সহ পরবর্তী প্রজাতিদের পক্ষে অনেকদিন গর্ভে থেকে বেশী বড় হয়ে যাওয়া বাচ্চার জন্ম দেয়া কঠিন হয়ে পড়ল। বিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতি তাই ধীরে ধীরে গর্ভধারণকাল কমিয়ে দিতে থাকল। আগের চেয়ে অনেক আগেই গর্ভ থেকে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে লাগল ক্রমেই। এজন্যই আমরা দেখি মানবশিশু জন্মের সময় অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় খুব ই অপরিপক্ক থাকে কারণ তারা প্রয়োজনীয় সময়ের অনেক আগেই জন্ম নিয়ে নেয়। তাদেরকে বেশ অনেকদিন ধরে খুব যত্ন করে লালনপালন করতে হয় যেখানে অনেক প্রজাতির বাচ্চারা জন্মের পরপর ই অনেক শক্তিশালী থাকে। আবার এই কারণেই আমাদের মস্তিস্কের খুলির আকার হতে লাগল ছোট, আজ তাই দেখবেন আমাদের শরীরের তুলনায় আনুপাতিক হারে বড় হলেও খুলির আকার অন্যান্য Ape দের তুলনায় ছোট।


আর এই একটি জায়গা মানব ইতিহাসে মূলত  নারীপুরুষের কর্মবিভাগের অন্যতম কারণ যাকে আমরা বর্তমানে অনেকক্ষেত্রেই লিঙ্গবৈষম্য রূপে পাই যদিও আসলে এই বিষয়টির সৃষ্টি হয়েছিল অনেকটাই প্রাকৃতিক কারণে।


প্রাকৃতিকভাবেই বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা পুরুষদের নেই, আছে নারীদের। একে তে শিশু জন্ম দেয়ার সময়টায় নারীসদস্যদের কার্যক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ত। তার উপর মানবশিশু তুলনামূলক দ্রুত গর্ভ হতে ভূমিষ্ট হতে লাগল, তাদেরকে জন্মের পরেও বেশ কয়েকবছর মনোযোগ দিয়ে লালনপালন করতে হলো। আবার তখনকার সময়ে জন্মহারও ছিল বেশী, মানুষের গড় আয়ুও ছিল কম। এতে দেখা গেল বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাকে লালনপালন করতে করতেই নিজেদের আয়ুর প্রায় পুরোটাই চলে যেত নারী সদস্যদের। এতে তারা বাইরের কাজে যেমন খাদ্য সংগ্রহ,শিকার ইত্যাদিতে অংশ নিতে পারতনা বরং নিজেদের গুহা বা আশ্রস্থলে বাস করত।

আবার প্রায়সময় গুহায় থাকার কারণে ও শিশু জন্মদানের হরমোনসমূহের কারণে এদের মাংশপেশীর শক্তিও হতে লাগল পুরুষ সদস্যদের তুলনায় ক্ষীণ। এই কারণেই নারী সদস্যদের শারীরিক গঠন হয়ে উঠল কোমলতর। পরবর্তীতে এইসব কারণেই গৃহে অধিক অবস্থান করতে হওয়া গৃহমুখী কাজসমূহ নারী সদস্যদের কাঁধে এবং বহির্মুখী কাজসমূহ পুরুষ সদস্যদের কাঁধে পড়ল। এভাবেই সমাজে সৃষ্টি হলো নারীপুরুষ শ্রমবিভাগ।


আজ হতে ৩২ লক্ষ বছর আগে এভাবে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হলো মানবের প্রথম সরাসরি পূর্বপুরুষ Australopethicus প্রজাতির যাকে বিজ্ঞানের শতরুপা বা হাওয়া বলা হয়ে থাকে। ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ায় এই Australopithecus গোত্রের এক নারী সদস্যের ৩২ লক্ষ বছরের প্রাচীন ফসিল আবিস্কৃত হয়, হইচই পড়ে যায় পুরো বিজ্ঞান মহলে। সনাতন ধর্ম গ্রহণ করা জগৎখ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ডদল The Beatles এর Lucy in the Sky with Diamonds গানটির নামানুসারে এই নারীর নামকরণ করা হয় Lucy. 


ধীরে ধীরে অধিক খাদ্যগ্রহণ করার সক্ষমতার ফলে মানুষের খুলির আকার কমলেও মস্তিস্কের আকার বাড়তে থাকলে। এই প্রক্রিয়াটিকে সম্ভব করার জন্য কমতে থাকল আমাদের চোয়ালের মাংসপেশীর জোর। এতে মস্তিস্কের আকার বর্ধনের স্থান বৃদ্ধি পেলো। এভাবে মস্তিস্ক বা ব্রেনের সাইজ বাড়তে বাড়তে ২৩ লক্ষ বছর আগে এমন একটি প্রজাতি সৃষ্টি হলো যার নাম হলো Homo Habilis।এরা Australopithecus দের চেয়ে আকারে অনেক বড়, মস্তিস্কের আকার তাদের চেয়ে দ্বিগুণ, পেটের ক্ষিধেও এদের বেশী। তাই অধিক খাদ্য শিকারের পরিকল্পনা ঘুরতে লাগল তাদের মাথায়। এভাবে একসময় তারা তৈরী করতে শিখল ইতিহাসের প্রথম অস্ত্র, তার নাম পাথর! পাথরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শেখা প্রথম এই প্রজাতিকে তাই Handyman নামেও ডাকা হয় বিজ্ঞান মহলে। পূর্ব আফ্রিকায় থাকা এই প্রজাতিটির এই আবিস্কার আজ থেকে ২৩ লক্ষ বছর আগে বদলে দিল ধরণীর ইতিহাসের মোড়। অস্ত্রধারণ করার হাতে বৃদ্ধাঙ্গুলি হতে লাগল ক্রমশ বড়, অন্য প্রাণীরা যা পারেনা সেই ক্ষমতা লাভ হতে লাগল বৃদ্ধাঙ্গুলির যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা বলি Opposable Thumb বা আঙ্গুল বাঁকিয়ে কলম ধরা, সুঁই ধরা

সহ যে কোন সুক্ষ্ম কাজ করতে পারা। আঙ্গুলের এই ক্ষমতার জন্যই আজ মানুষ পৃথিবীতে এত বিখ্যাত সব সভ্যতা গড়ে তুলতে পেরেছে। তবে এই বৈশিষ্ট্য একদিনে তৈরী হয়নি, অস্ত্র ব্যবহার করতে শেখার ফলে গড়ে উঠলেও অনেক লক্ষ বছর সময় লেগেছিল এটি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে।


এভাবে সময় যেতে লাগল, ১৮ লক্ষ বছর পূর্বে আবির্ভাব হলো আমাদের একদম নিকটতম অন্য একটি প্রজাতি Homo Erectus এর। এরা পুরোদমে দলবদ্ধ, গুহাবাসী, শিকারী প্রজাতি। লম্বাপথ ধরে দৌড়ে এরা শিকার করতে লাগল অন্যান্য প্রাণীদের। লম্বা সময় ধরে দৌড়ালে শরীরে অনেক তাপ উৎপন্ন হয়। কিন্তু সেই তাপ নির্গমন তো করতে হবে, কী তার উপায়? হ্যাঁ সেই উপায় ই সৃষ্টি হলো শরীরে যাকে আমরা আজ বলি 'ঘাম'! আর এই Homo Erectus রাই আবিস্কার করেছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্ববহ জিনিসটি, শিখেছিল তার ব্যবহার যা বেদে অগ্নি নামে খ্যাত। হ্যাঁ, এই আগুনের আবিস্কার ই সমাজ, সভ্যতা সবকিছুর ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল যেন। ঝলসে খাওয়া খাদ্য হজম করা অনেক সহজ, এতে পুষ্টি পাওয়াও হয়ে গেল সহজতর। অল্প খাদ্যেই অধিক পুষ্টি পাওয়া যেতে লাগল। আগের মতো বেশী শিকার করে শ্রম ও সময় নষ্ট করতে হলোনা।  খাবার চিবানোর কষ্ট কমে গেল। এতে আস্তে আস্তে সবচেয়ে বড় আক্কেল দাঁতের প্রয়োজনীয়তা কমে গেলো। দাঁতটি ছোট হতে লাগল। আজ যদি আমরা দেখি দেখব ৩০% মানুষের ই ওই দাঁতটি আর উঠেইনা। তার কারণও ১৮ লক্ষ বছর পূর্বের সেই আগুন আবিস্কার।


আবার অন্ধকারে এই আগুন ই দিলো নিরাপত্তা। এই আগুনের চারপাশে গোত্রের সবাই একসাথে বসে থাকত অন্ধকারে নিরাপত্তার জন্য ও শীতকালে উষ্ণতার জন্য। সবাই একত্রে বসে থাকায় ধীরে ধীরে গাঢ়তর হলো সমাজবদ্ধতার সুযোগ। এদিকে অধিক পুষ্টির কারণে মস্তিস্ক হতে লাগল আরও বড়। অথচ আগুন আবিস্কারের আগে Homo Erectus দের মস্তিস্কের আকার ছিল একটি সফট বল এর সমান! এভাবে চলতে থাকল আরও প্রায় ১৫ লক্ষ বছর। এরপর কী হলো? আগামীদিনের শেষ পর্বেই আমরা দেখব এরপরের ইতিহাস, কীভাবে আমরা আধুনিক মানুষ অর্থাৎ Homo Sapiens রা এলাম, কীভাবে ভাষার আবিস্কার হলো। কীভাবে সমাজ, গোত্র তৈরী হলো, কীভাবে কৃষিব্যবস্থা তৈরী হলো, কীভাবে পবিত্র বেদ ও সনাতন ধর্ম প্রকটিত হলো।ততক্ষণ পর্যন্ত বিদায়!


ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি 


বাংলাদেশ অগ্নিবীর 

সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক 

No comments:

Post a Comment

Pages