ছান্দোগ্য উপনিষদের বিদ্যার্থী নারদ ও বৈদিক ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস - অগ্নিবীর

ছান্দোগ্য উপনিষদের বিদ্যার্থী নারদ ও বৈদিক ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস

Share This





💢আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষে বেদাদি শাস্ত্রের পাশাপাশি তার থেকে সৃষ্ট বিবিধ ভৌতবিজ্ঞান ও অধ্যাত্মবিদ্যার পারস্পরিক সাহচর্যমূলক চর্চা অনুশীলন হতো । ভগবান প্রদত্ত ঋগ্বেদে জ্ঞান , যজুর্বেদে যজ্ঞ - সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োগ , সামবেদ উপাসনা ও অধ্যাত্ম এবং অথর্ববেদে বিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন হতো । এছাড়াও চতুর্বেদে সূক্ষ্মব্রহ্মবিদ্যাতত্ত্ব সম্পর্কে গুরু সমীপে ভগবৎ আরাধনা ও আলোচনা হতো যার চূড়ান্ত রূপ আমরা আরণ্যক ও উপনিষদে দেখতে পাই ।


❄️ সামবেদের ২টি উপনিষদ রয়েছে । ছান্দোগ্যোপনিষদ্ ও কেনোপনিষদ্ । সামবেদীয় ৮ টি ব্রাহ্মণের মধ্যে ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণের শেষ ৮ টি অধ্যায়ের নাম ছান্দোগ্যোপনিষদ্ । ছান্দোগ্যোপনিষদের ৭ম অধ্যায়ের ১ম থেকে ২৬ খণ্ড পর্যন্ত নারদ - সনৎকুমার সংবাদ রয়েছে ।  

🔥 ১ম খণ্ডের ১ম কণ্ডিকায় দেখা যায় , সনৎকুমার নামক ঋষির নিকট নারদ উপস্থিত হয়ে বললেন যে তাকে শিক্ষা প্রদান করার জন্য । সনৎকুমার নারদকে বললেন তিনি কি কি জানেন তার বর্ণনা করার জন্য । যখন জিজ্ঞাসা সম্পূর্ণ ভাবে আচার্যের নিকট নিজেকে সমর্পণ করে তখন তার স্বীয় অধীত বিদ্যা উদঘাটন করা আবশ্যক নয় । কেননা গুরু স্বয়ং তার বিদ্যা যোগ্যতা অবগত হয়ে কল্যাণী শিক্ষা প্রদান করেন । কিন্তু যোগ্যতা মুখকান্তি অবলোকন করেও অবগত হওয়া যায়। এজন্য সনৎকুমারই নারদকে প্রথমে তার অধীত বিদ্যাসমূহের বর্ণনা করতে বলেছেন । তখন নারদ বললেন - 

স হোবাচর্গ্বেদং ভগবোঽধ্যেমি যজুর্বেদংসামবেদমাথর্বণং চতুর্থমিতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং বেদং পিত্র‍্যং রাশিং দৈবং নিধিং বাকোবাক্যমেকায়নং দেববিদ্যাং ব্রহ্মবিদ্যাং ভূতবিদ্যাং ক্ষত্রবিদ্যাং নক্ষত্রবিদ্যাং সর্পদেবজনবিদ্যামেতদ্ভগবোঽধ্যেমি। 
ছান্দোগ্য উপনিষদ ৭।১।২

পদার্থঃ (সঃ হ) সেই তিনি [ নারদ ] (উবাচ) বললেন - (ভগবঃ) হে ভগবন্ ! (ঋগ্বেদম্) ঋগ্বেদ (যজুর্বেদম্) যজুর্বেদ (সামবেদম্) সামবেদ (চতুর্থম্) চতুর্থ (আথর্বণম্) অথর্ববেদ (অধ্যেমি) [ অধি ইক্=স্মরণমাত্র অধ্যয়ন ] জানি । (পঞ্চমম্) পঞ্চম (ইতিহাসপুরাণম্) ইতিহাস পুরাণকে (বেদানাম্+বেদম্) বেদসমূহের বেদ [ জানার সহায়ক ] অর্থাৎ ব্যাকরণ (পিত্র্যম্) পিতৃ-শুশ্রূষা শাস্ত্র (রাশিম্) গণিতবিদ্যা (দৈবম্) উৎপাত বিজ্ঞান (নিধিম্) অর্থ শাস্ত্র (বাকোবাক্যম্) তর্কশাস্ত্র (একায়নম্) নীতিবিদ্যা (দেববিদ্যাম্) নিরুক্ত (ব্রহ্মবিদ্যাম্) বৈদিক বিদ্যা ও ঈশ্বর প্রাপ্তি বিদ্যা (ভূতবিদ্যাম্) ভৌত - জীব বিদ্যা (ক্ষত্রবিদ্যাম্) রাজধর্ম বা ধনুর্বিদ্যা (নক্ষত্রবিদ্যাম্) নক্ষত্র বিদ্যা [ জ্যোতিষ ] (সর্প+দেবজন+বিদ্যাম্) সর্পবিদ্যা এবং নৃত্যগীতবাদ্য শিল্পাদি বিদ্যা (এতৎ) এই সকল বিদ্যা (ভগবঃ) হে ভগবন্ (অধ্যেমি)[ অধি ইক্=স্মরণমাত্র অধ্যয়ন] জানি ।

সরলার্থঃ নারদ বললেন - হে ভগবন্ ! (আমি) ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থ অথর্ববেদ স্মরণমাত্র জানি। পঞ্চম ইতিহাস পুরাণকে (এবং) বেদসমূহের বেদ [ জানার সহায়ক ] অর্থাৎ ব্যাকরণ, পিতৃ-শুশ্রূষা শাস্ত্র, গণিতবিদ্যা, উৎপাত বিজ্ঞান, অর্থ শাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র, নীতিবিদ্যা, নিরুক্ত, বৈদিক বিদ্যা ও ঈশ্বর প্রাপ্তি বিদ্যা, ভৌত - জীব বিদ্যা, রাজধর্ম বা ধনুর্বিদ্যা, নক্ষত্র বিদ্যা [ জ্যোতিষ ], সর্পবিদ্যা এবং নৃত্যগীতবাদ্য শিল্পাদি বিদ্যা, এই সকল বিদ্যা, জানি ।

[ ভাষ্যকারঃ পণ্ডিত শিবশঙ্কর শর্মা কাব্যতীর্থ , মহাত্মা নারায়ণ স্বামী , ড. সত্যব্রত সিদ্ধান্তালঙ্কার ] 

প্রসঙ্গতঃ পরবর্তী অর্থাৎ তৃতীয় কণ্ডিকায় সনৎকুমার বলেছেন নারদ এখানে সবগুলো শাস্ত্রই কেবল নাম [ বাক্য ] মাত্র জানতেন । অর্থাৎ তিনি অধ্যয়ন করেছেন কিন্তু তাৎপর্য বোধগম্য না হওয়ায় তদানুর্গত আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি । ফলশ্রুতিতে তিনি শোক অতিক্রম করতে পারেননি । 

সুস্পষ্টরূপে এখানে চতুর্বেদ এবং ব্রাহ্মণাদির অন্তর্গত ইতিহাস-পুরাণাদি ব্যতীত ১৪ প্রকার বিদ্যার উল্লেখ আছে । উক্ত চতুর্দশ বিদ্যার অন্তর্গত বিষয়গুলোর পর্যালোচনা করলে আমরা অধিকাধিক আরো বিদ্যা সম্পর্কে অবগত হই । উক্ত বিদ্যাসমূহ নিম্নরূপ - 

১। (বেদানাম্+বেদম্) বেদসমূহের বেদ [ জানার সহায়ক ] অর্থাৎ ব্যাকরণ । বর্তমানে মহর্ষি পাণিনি প্রোক্ত ও পতঞ্জলি মুনিকৃত ' পতঞ্জল মহাভাষ্য ' সমন্বিত ৮ অধ্যায়, ৪ পাদ ও ৩৯৯৬ টি সূত্রযুক্ত অষ্টাধ্যায়ীই প্রামাণিক ব্যাকরণ শাস্ত্র । রক্ষা, ঊহ্য, আগম, লঘু ও অসন্দেহ এর ৫টি প্রয়োজন । 

২। (পিত্র্যম্) পিতৃ-শুশ্রূষা শাস্ত্র = পিতরগণ অর্থাৎ পালক মাতা-পিতা ও সমাজের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞান।অধুনা সময়ে সুশ্রুত ও চরক সংহিতা, অষ্টাঙ্গ হৃদয় ইত্যাদি পাওয়া যায় । 

৩। (রাশিম্) গণিতবিদ্যা = যজুর্বেদাদি ও শুল্বসূত্রে গণিত বিদ্যা চর্চা বিদ্যমান । আধুনিক সময়ে ভাস্করাচার্য, আর্যভট্ট ভারতীয় গণিতশাস্ত্র পরম্পরার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । 

৪। (দৈবম্) উৎপাত বিজ্ঞান = ' ক্রীডাবিজিগীষাব্যবহারদ্যুতিস্তুতিমোদমদস্বপ্নকান্তিগতিষু' প্রাকৃতিক ও ভৌতিক দৈব উৎপাত যেমন ভূমিকম্প , ঝড় - বৃষ্টি ইত্যাদি বিজ্ঞান । 

৫। (নিধিম্) অর্থ শাস্ত্র = [ নি + ধা + কি = নিধি ~ নিধীয়তে অস্মিন্ ইতি নিধিঃ অর্থাৎ যাতে কোন পদার্থ রাখা হয় ] নিধি শব্দটি সম্পদ হিসেবে যজুর্বেদ ২৩। ১৯ ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩।৯।৬।১ দ্রষ্টব্য । 
৬। (বাকোবাক্যম্) তর্কশাস্ত্র = কথোপকথন রূপে সিদ্ধান্তপ্রতিপাদক শাস্ত্র । 
৭।(একায়নম্) নীতিবিদ্যা । এক + অয়ন = এক গতি । মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে ধর্মার্থীগণের নিকট বেদই একমাত্র প্রামাণ্য ও চক্ষুস্বরূপ [ ১২।৯৪ ] । বেদ প্রতিপাদিত ও সমর্থিত নীতিবিদ্যাই গ্রহণীয় [ ৭।১৪ ] । 
৮। (দেববিদ্যাম্) নিরুক্ত । নিরুক্তে বেদের দেবতা = বিষয় নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়েছে । নিরুক্তের ৭-১২ অধ্যায়কে দৈবতকাণ্ডও বলা হয় । এছাড়াও তাতে শব্দ বিজ্ঞানও প্রাচুর্যময় ব্যাখ্যাযুক্ত [ ১-৬ অধ্যায় ] । 
৯। (ব্রহ্মবিদ্যাম্) বৈদিক বিদ্যা ও ঈশ্বর প্রাপ্তি বিদ্যা । ব্রহ্ম অর্থ ঈশ্বরূপে প্রসিদ্ধ । শ্রীমদভগবদ্গীতা ৩।১৫ , শতপথ ব্রাহ্মণ ৭।১।১।৫ এবং জৈমিনীয় উপনিষদ ব্রাহ্মণ ৪।২৫।৩ ব্রহ্ম = বেদ করা হয়েছে । 
১০। (ভূতবিদ্যাম্) ভৌত - জীব বিদ্যা । যজুর্বেদ ৫।১৬ তে উৎপন্ন সর্বজগত, যজুর্বেদ ১।১১ ও ১৬।৫৯ এ প্রাণীগণকেও ভূত বলা হয়েছে । 
১১। (ক্ষত্রবিদ্যাম্) রাজধর্ম বা ধনুর্বিদ্যা । ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৭।২২ - তে ক্ষত্রকেই রাষ্ট্র বলা হয়েছে । একই ব্রাহ্মণের ৮ম পঞ্চিকার ৬ষ্ঠ খণ্ডে রাজন্য অর্থাৎ রাজমানবগণকেই ক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে । 
১২। (নক্ষত্রবিদ্যাম্) নক্ষত্র বিদ্যা [ জ্যোতিষ ] । লগধকৃত বেদাঙ্গ জ্যোতিষ বর্তমানে প্রাপ্ত একমাত্র বৈদিক জ্যোতিষ । যজুর্বেদ ৩০।১০ নক্ষত্রবিদ্যার প্রতি সংকেত প্রদর্শন করে । 
১৩-১৪। (সর্প+দেবজন+বিদ্যাম্) সর্পবিদ্যা এবং নৃত্যগীতবাদ্য [ ললিত কলা ] শিল্পাদি বিদ্যা । এখানে সর্প অর্থ কেবল বিষয়ধর সাপ নয় বরং দুষ্টসকল পীড়াদায়ক প্রাণীও । যজুর্বেদ ১৫।১৭, যজুর্বেদ ১৩।৭,৮ উক্ত অর্থ প্রতিপাদন করে । দেবজন= দেব শব্দের অর্থ ক্রীড়া ও সাত্ত্বিক প্রমোদের জন্যও ব্যবহৃত হয় । ধাতুপাঠ ৪।১ এ বলা হয়েছে ' দিবুং ক্রীডাবিজিগীষাব্যবহারদ্যুতিস্তুতিমোদমদস্বপ্নকান্তিগতিষু' । দেবজনের বিদ্যার মধ্যে ক্রীড়া আমোদপ্রদায়ক বিদ্যাও অন্তর্ভুক্ত । 

🔥 পুরাণে নারদকে যেভাবে কূটচরিত্র কিংবা টিভিসিরিয়ালে সেভাবে বিদূষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তা প্রকৃত সত্য থেকে কতটা দূরে বুঝতে পারছেন পাঠক ? যে নারদ বিবিধ বিদ্যার জ্ঞাতা ছিলেন ও সনৎকুমারের নিকট আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েছেন যা কিনা উপনিষদের ন্যায় শ্রেষ্ঠ বৈদিক সিদ্ধান্ত প্রতিপাদক গ্রন্থে গ্রন্থিত হয়েছে পুরাণ এবং আধুনিক টিভিসিরিয়ালের অভিশাপে তাকে আজ আমরা দেখি বিদূষক ও কূটনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে । সময় এসেছে বিশুদ্ধ নারদ চরিত্র সমাজে তুলে ধরার এবং সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যেন আমরাও উপরিউক্ত বিদ্যাসমূহ চর্চা ও বৈদিক বিজ্ঞান ধারা অব্যহত রাখতে যেন সমর্থ হই । 

বাংলাদেশ অগ্নিবীর 🖤
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক 

1 comment:

  1. অনেক গর্ববোধ হয় যখন পবিত্র বেদের কথা মনে হয়।♥

    ReplyDelete

Pages