বেদে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে কী বলা হয়েছে 
বৈদিক
সাহিত্য কেবল উপাসনা বা আচারবিধির গ্রন্থসমষ্টি নয়; ইহা মানবসভ্যতার জন্য
সর্বকালীন একটি সুসংহত জ্ঞানভাণ্ডার যেখানে বিজ্ঞান, নৈতিকতা,
রাষ্ট্রচিন্তা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ব একত্রে প্রতিফলিত। বেদে
‘বিদ্বান’ বা বুদ্ধিজীবী কেবল পুঁথিগত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি নন। তিনি
বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ন্যায়বিচারক, রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক এবং মানবকল্যাণের
কর্মী। বেদের বিভিন্ন মন্ত্রে আমরা দেখতে পাই বিদ্বানদের উদ্দেশ্যে আহ্বান
জানানো হয়েছে তাঁরা যেন প্রকৃতি ও শক্তির বিজ্ঞান অনুধাবন করেন, জ্ঞানকে
সমাজে বর্ষণের ন্যায় বিতরণ করেন, ন্যায়ের আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং
মানবজাতিকে অজ্ঞতা, অশুভতা ও অন্ধকার থেকে মুক্ত করেন।
এই
আলোচনায় বেদের বিভিন্ন মন্ত্রের আলোকে বিদ্বানদের ভূমিকা, কর্তব্য ও
আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বিদ্বানকে কখনো অগ্নি ও শক্তির বিজ্ঞানী,
কখনো রাষ্ট্র ও সমাজের ন্যায়সংরক্ষক আবার কখনো শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়েছে যিনি জ্ঞানকে কেবল সঞ্চয় করেন না বরং মানবকল্যাণে
প্রয়োগ করেন। প্রকৃতি, পৃথিবী ও পরিবেশকে ‘দেবগণের ধেনু’ রূপে বর্ণনা করে
বেদ বিদ্বানদের উপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে যে, তাঁরা গবেষণা, সংরক্ষণ
ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে মানবসভ্যতার অগ্রগতি নিশ্চিত করবেন।
দূতং বো বিশ্ববেদসং হব্যবাহমমর্ত্যম্।
যজিষ্ঠমৃঞ্জসে গিরা ॥
ঋগ্বেদ ৪.৮.১
হে
বিদ্বান এবং অগ্নি ও শক্তির বিজ্ঞানে পারদর্শী আচার্য! আপনি আপনার বাক্য ও
চিন্তার দ্বারা পরমেশ্বরের শক্তিকে অধ্যয়ন ও বিকশিত করুন। সেই পরমেশ্বর
যিনি যোগাযোগের বাহক, এই মহাবিশ্বে সর্বত্র ক্রিয়াশীল, খাদ্য
ও সুগন্ধের ধারক, অবিনশ্বর এবং প্রাকৃতিক ও মানব জগতে সর্বাপেক্ষা
সৃজনশীল, উৎপাদনশীল, সহায়ক এবং মূল্যবান অনুঘটক (Catalytic Agent)। হে
বিশ্বের নর ও নারীগণ, এই বিজ্ঞানীই তোমাদের সকলের জন্য এই শক্তিকে বিকশিত
করেন।
প্র নু বয়ং সুতে যা তে কৃতানীন্দ্র ব্রবাম যানি নো জুজোষঃ।
বেদদবিদ্বাঞ্ছৃণবচ্চ বিদ্বান্বহতেঽয়ং মঘবা সর্বসেনঃ ॥
ঋগ্বেদ ৫.৩০.৩
হে
বিদ্বান! অনুশীলনের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয় এবং যে শক্তি সৃষ্টি হয়,
আমরা যেন আপনার সেইসব কীর্তির কথা বলি এবং ঘোষণা করি, যা আপনি আমাদের সঙ্গে
ভাগ করে নেন। যারা অজ্ঞ, তাহারাও যেন সে সকল শ্রবণ করে এবং জানতে পারে। যে
বিদ্বান এই জ্ঞান ও শক্তিকে ধারণ করেন, তিনিই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের
পরাক্রমশালী অধিকারী এবং তিনিই সমস্ত শক্তি ও বলসমূহের উপর কর্তৃত্ব করেন।
বাচং সু মিত্রাবরুণাবিরাবতীং পর্জন্যশ্চিত্রাং বদতি ত্বিষীমতীম্।
অভ্রা বসত মরুতঃ সু মায়যা দ্যাং বর্ষয়তমরুণামরেপসম্ ॥
ঋগ্বেদ ৫.৬৩.৬
যেমন
বাষ্পে গভীরভাবে পূর্ণ এবং অত্যন্ত উদার মেঘ বজ্রধ্বনির মাধ্যমে গর্জায়
এবং উর্বরতা দানকারী, উত্তেজক ও বিশুদ্ধ জল বর্ষণ করে; তেমনই, হে বিদ্বান,
শিক্ষক ও প্রচারকগণ! তোমরা প্রীতিময় এবং বিচারশীল হয়ে আমাদের কাছে সেই
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাষায় কথা বলো, যা:
১. সান্ত্বনাদায়ক, সতেজকারী, নবজীবনদায়ী ও প্রাণপ্রদ,
২. অদ্ভুতভাবে মনোগ্রাহী ও আলোকপ্রদ, এবং
৩. বিস্ময় ও বৈচিত্র্যে পূর্ণ এবং জীবনের আলোয় উজ্জ্বল।
বায়ুর
ন্যায় প্রাণবন্ত ও গতিশীল মানুষ যেন মেঘের মতো প্রাচুর্যের মধ্যে
জীবনযাপন করে এবং জ্ঞান ও শক্তির দ্বারা মহৎ আনন্দের আলোর দিকে আরোহণ করে।
শক্তিশালী, উজ্জ্বল এবং উদার হয়ে, তোমরা আমাদের উপর সেই জ্ঞান ও বাণীর
বর্ষণ করো যা পবিত্র, উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান এবং পাপ ও অশুভতা থেকে মুক্ত।
যুক্ষ্বা হি দেবহূতমাংঽঅশ্বাংঽঅগ্নে রথীরিব ।
নি হোতা পূর্ব্যঃ সদঃ ॥
যজুর্বেদ ১৩.৩৭
হে
বিদ্বান ব্যক্তি! যিনি প্রাচীন পণ্ডিতগণের দ্বারা প্রশিক্ষিত এবং
স্বভাবগতভাবে দানশীল; আপনি রথ চালকের ন্যায় আপনার অশ্বগুলিকে যা
বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সুসংযত (সুশিক্ষিত) জোয়ালবদ্ধ করুন (নিয়ন্ত্রিত
করুন)। আপনি ন্যায়ের আসনে উপবেশন করুন।
স নঽইন্দ্রায় যজ্যবে বরুণায় মরুদ্ভ্যঃ ।
বরিবোবিৎপরি স্রব ॥
যজুর্বেদ ২৬.১৭
হে
স্নেহশীল বিদ্বান! আপনি সেবার কর্তব্য সম্পূর্ণরূপে অবগত হয়ে রাজা,
পূজনীয় যজমান এবং আমাদের মতো মানবদের জন্য শিক্ষারস (জ্ঞানের নির্যাস)
প্রবাহিত করুন।
অমেব নঃ সুহবাঽআ হি গন্তন নি বর্হিষি সদতনা রণিষ্টন ।
অথা মন্দস্ব জুজুষাণো অন্ধসস্ত্বষ্টর্দেবেভির্জনিভিঃ সুমদ্গণঃ ॥
যজুর্বেদ ২৬.২৪
হে
মহিমান্বিত বিদ্বান! আপনি আনন্দময় সহচার্যে, মহৎ গুণাবলির সাথে এবং আপনার
মাতা, ভগিনী ও পত্নীর সঙ্গে আপনার গুরুজনের সানন্দে সেবা করে, উত্তম
ভোজ্যবস্তু লাভে সুখী হোন। পরবর্তীতে, একটি আরামদায়ক গৃহের ন্যায়, আপনি
অন্যদেরও সুখী করুন। হে বিদ্বানগণ, যাঁদের সম্যকরূপে আবাহন করা হয়েছে,
আপনারা আমাদের ন্যায়সঙ্গত আচরণে (fair dealings) প্রতিষ্ঠিত করুন, আমাদের
নিকট স্বাচ্ছন্দ্যে উপবেশন করুন এবং উত্তম উপদেশ দান করুন।
প্রোতয়ে বরুণং মিত্রমিন্দ্রং মরুতঃ কৃষ্বাবসে নো অদ্য।
প্র পূষণং বিষ্ণুমগ্নিং পুরন্ধিং সবিতারমোষধীঃ পর্বতাংশ্চ ॥
ঋগ্বেদ ৬.২১.৯
হে
বিজ্ঞান-বিশারদ! আপনি গভীর অধ্যয়ন, গবেষণা ও উপলব্ধির মাধ্যমে আমাদের
সুরক্ষা ও অগ্রগতির জন্য প্রকৃতির যে দিব্য ঐশ্বর্যগুলি রয়েছে, তা আনয়ন
করুন। এই ঐশ্বর্যগুলির মধ্যে রয়েছে উদান ও প্রাণ নামক জীবনীশক্তি,
বিদ্যুৎ, বায়ু, সমান শক্তির পুষ্টিদায়ক প্রাণশক্তি, ব্যান ও ধনঞ্জয়
শক্তি, তাপ, বিশ্ব পালনের মহাজাগতিক শক্তি, সৌরশক্তি, এবং বৃষ্টি ও ওষধি
লাভের জন্য প্রয়োজনীয় ওষধি (Herbs), মেঘ ও পর্বতমালা। এই সকল প্রাকৃতিক
সম্পদ মানব সমাজের কল্যাণে ও অগ্রসরে বিশেষভাবে সহায়ক।
অপেত বীত বি চ সর্পতাতো যেঽত্র স্থ পুরাণা যে চ নূতনাঃ ।
অদাদ্যমো অদাদ্যমোঽবসানং পৃথিব্যাঽঅক্রন্নিমং পিতরো লোকমস্মৈ ॥
যজুর্বেদ ১২.৪৫
হে
বিদ্বান ব্যক্তিগণ! বর্তমানে জগতে বিদ্যমান সমস্ত প্রবীণ ও নবীন
বিদ্বানগণ, শিক্ষক ও প্রচারকের ভূমিকায় অবস্থান করে, এই মহৎ সংকল্পে পূর্ণ
শিষ্যকে যেন আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান করেন। তোমার শিক্ষক যেন তোমাকে একটি
মর্যাদাপূর্ণ স্থান প্রদান করেন। তুমি অধর্মকে পরিহার করো এবং ধর্মের পথে
চলো, বিশেষত তার প্রতি দৃঢ়ভাবে নিযুক্ত থাকো।
অমিত্রসেনাং মঘবন্নস্মান্ছত্রূয়তীমভি।
যুবং তানিন্দ্র বৃত্রহন্নগ্নিশ্চ দহতং প্রতি ॥
অথর্ববেদ ৩.১.৩
পরাক্রম
ও ঐশ্বর্যের নেতা এবং সেনাপতি যিনি অশুভ ও অন্ধকার বিনাশকারী এবং তেজস্বী
অগ্রণী বিদ্বান ও শিক্ষক, আমাদের বিরুদ্ধে শত্রু রূপে যে-কোনো শক্তিই উদ্যত
থাকুক না কেন, আপনারা উভয়েই কৃপা করে সেই শত্রুতা, দুঃখ ও অন্ধকারকে
বিনাশ করুন।
বি মিমীষ্ব পয়স্বতীং ঘৃতাচীং দেবানাং ধেনুরনপস্পৃগেষা।
ইন্দ্রঃ সোমং পিবতু ক্ষেমো অস্ত্বগ্নিঃ প্র স্তৌতু বি মৃধো নুদস্ব ॥
অথর্ববেদ ১৩.১.২৭
হে
মানব, হে বিদ্বান, হে শাসক! এই পৃথিবী, এই প্রকৃতি, পবিত্র ধেনু (গাভী)
স্বরূপ। তুমি তোমার উদ্দেশ্যের জন্য এর অধ্যয়ন করো, একে জানো এবং এর
পরিমাপ করো; এটি জল, দুগ্ধ ও ঘৃত দ্বারা পরিপূর্ণ। মানবসমাজের শাসক ও নেতা
যেন এর দানসমূহের অমৃত সোমরস পান করেন। অগ্রণী বিদ্বান যেন স্তুতি ও মহিমা
দ্বারা ইহার অধ্যয়ন ও বর্ণনা করেন। হে মানব! এই পৃথিবী ও পরিবেশের সমস্ত
শত্রু, বিরোধী শক্তি, দূষণকারী এবং বিনাশকারীদেরকে তুমি বিতাড়িত করো।
যূয়ং হ রত্নং মঘবৎসু ধত্থ স্বর্দৃশ ঋভুক্ষণো অমৃক্তম্।
সং যজ্ঞেষু স্বধাবন্তঃ পিবধ্বং বি নো রাধাংসি মতিভির্দয়ধ্বম্ ॥
ঋগ্বদ ৭.৩৭.২
হে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিদ্বানগণ, হে আলোর দূরদর্শীগণ! আপনারা ক্ষমতা ও
শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী মানবগণের জন্য অবিনশ্বর ঐশ্বর্যের রত্নরাজি আনয়ন
করুন। হে অন্ন, স্থিতি ও শক্তির নিয়ন্ত্রকগণ! আপনারা সংঘবদ্ধ কর্মসূচি বা
শিল্প-যজ্ঞসমূহের সফলতার সুফল আস্বাদন করুন এবং আপনাদের গবেষণা ও প্রজ্ঞার
দ্বারা আমাদের জাতির উন্নয়ন ও সাফল্যের জন্য পরিকাঠামো (Infrastructure)
নির্মাণ করুন।
যজা নো মিত্রাবরুণা যজা দেবাং২ঽঋতং বৃহৎ।
অগ্নে যক্ষিস্বং দমম্॥
যজুর্বেদ ৩৩.৩
হে
বিদ্বান ব্যক্তি! তুমি আমাদের বন্ধু, শ্রদ্ধেয় জন এবং অন্যান্য
বিদ্বানদের সম্মান করো। তুমি আমাদের কাছে মহৎ সত্য প্রচার করো এবং তোমার
পারিবারিক বিষয়াদি পরিচালনা করো।
অতএব
স্পষ্ট যে, বেদের দৃষ্টিতে বিদ্বান বা বুদ্ধিজীবী কোনো বিচ্ছিন্ন, নির্জন
চিন্তক নন; তিনি সমাজের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর জ্ঞান বিজ্ঞানসম্মত, তাঁর
চরিত্র ন্যায়নিষ্ঠ, তাঁর জীবন আনন্দময় ও দায়িত্বপূর্ণ, এবং তাঁর কর্ম
মানবসমাজের কল্যাণে নিবেদিত। বিদ্বানকে বেদ আহ্বান করেছে, জ্ঞানকে মেঘের
ন্যায় উদারভাবে বর্ষণ করতে, শক্তিকে অগ্নির ন্যায় শুদ্ধ ও সৃজনশীল রাখতে,
এবং পৃথিবীকে মাতৃরূপে জেনে তার রক্ষা ও উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করতে।
আজকের
যুগে, যখন জ্ঞান প্রায়শই ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠছে এবং প্রযুক্তি
নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তখন বৈদিক এই আহ্বান আরও প্রাসঙ্গিক। হে
আধুনিক বিজ্ঞানী, শিক্ষক, গবেষক, রাষ্ট্রনায়ক ও বুদ্ধিজীবীগণ আপনারা বেদের
এই আদর্শকে স্মরণ করুন। জ্ঞানকে স্বার্থের জন্য নয়, মানবকল্যাণের জন্য
ব্যবহার করুন; প্রকৃতিকে শোষণ নয়, সংরক্ষণ করুন; সমাজকে বিভক্ত নয়,
আলোকিত করুন। বেদের এই শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিয়ে আসুন আমরা জ্ঞান, ন্যায়
ও কল্যাণের পথে একসাথে অগ্রসর হই এবং একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও
আলোকোজ্জ্বল মানবসভ্যতা গড়ে তুলি।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
