✅পরিবেশ ও মানুষ : বেদ যা জানায় আমাদের
৪০–৫০ বছর পূর্বে আমরা ‘পরিবেশ’ শব্দের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অপরিচিত ছিলাম। অনেকের আপত্তি এই যে, যখন বেদে ‘পরিবেশ’ শব্দটির উল্লেখই নেই, তখন আপনারা বেদে পরিবেশের কথা কীভাবে বলেন? তাঁদের প্রতি আমার নিবেদন এই যে নাম গুরুত্বপূর্ণ, না কাজ গুরুত্বপূর্ণ? বেদে ‘পরিবেশ’ নামটি না থাকলেও শত শত মন্ত্রে পরিবেশকে বিশুদ্ধ ও সুষম রাখার কথা বলা হয়েছে।
যখন ৪০–৫০ বছর আগে ‘পরিবেশ’ শব্দটির গুরুত্বই শিক্ষাগতভাবে কেউ জানত না, বা নাম তো দূরের কথা, পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখার বিষয়েও কেউ অবগত ছিল না তখন কি পরিবেশকে সুস্থ ও সুষম রাখার প্রয়োজন ছিল না? যখন উক্ত শব্দটিই প্রচলিত ছিল না, তখন হাজার হাজার বছর পূর্বে এর কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু বৈদিক ঋষিরা এই বিষয়ে অবগত হয়েছিলেন যে, বেদে ঈশ্বর পৃথিবীর পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখার জ্ঞান দিয়েছেন।
‘পরি + আবরণ’ থেকে ‘পর্যাবরণ=পরিবেশ’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ চারদিক থেকে আবৃত করা বা আচ্ছাদিত করা। উভয় শব্দই সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। ঋষিরা জেনে গিয়েছিলেন যে, পৃথিবীর পরিবেশ মানুষের শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক এবং আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।
ইন্দ্র জীব সূর্য জীব দেবা জীবা জীব্যাসমহম্।
সর্বমায়ুর্জীব্যাসম্ ॥
অথর্ববেদ ১৯।৭০।১
অর্থাৎ, হে পরমাত্মা! আপনি আমাদের মাঝে নিত্য বিরাজ করুন। হে সূর্যসদৃশ তেজস্বী আত্মা! আপনি দীপ্তিমান থাকুন, আমাদের কল্যাণময় জীবন দান করুন। হে দিব্য শক্তিসমূহ! আপনারা জ্যোতির্ময় হয়ে উঠুন। আমিও যেন এক দিব্য আত্মা হিসেবে জাজ্বল্যমান ও দীপ্তিময় জীবন লাভ করি। আমাকে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গরূপে, অখণ্ডভাবে, তেজস্বী ও ঐশ্বরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
“যৎ পিণ্ডে তৎ ব্রহ্মাণ্ডে” = যা শরীরে আছে, তা ব্রহ্মাণ্ডেও আছে; এবং যা ব্রহ্মাণ্ডে দেখা যায়, তা শরীরেও বিদ্যমান। মানবদেহ ব্রহ্মাণ্ডেরই একটি ক্ষুদ্র রূপ; তার প্রতিরূপ। ব্রহ্মাণ্ড পঞ্চমহাভূত দ্বারা গঠিত, আমাদের শরীরও পঞ্চমহাভূত দ্বারা নির্মিত। পৃথিবী, অপ (জল), তেজ (অগ্নি), বায়ু এবং আকাশ এই পাঁচ তত্ত্বের যথাযথ সমন্বয়ই সৃষ্টির কার্য-কারণ সম্পর্ক।
যখন পঞ্চমহাভূত সূক্ষ্ম অবস্থায় থাকে এবং দৃশ্যমান সৃষ্টি বিনষ্ট হয়ে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, তখন তা কারণরূপ প্রকৃতি হিসেবে অবস্থান করে। আর যখন তা স্থূল, অর্থাৎ দৃশ্যমান রূপে প্রকাশিত হয়, তখন তাকে কার্যরূপ প্রকৃতি বলা হয়।
আমাদের শরীরেও এই পাঁচ তত্ত্ব জীবিত অবস্থায় কার্যরূপে অবস্থান করে। কারণরূপ প্রকৃতির যথাযথ সংযোগ বা সংগঠন দ্বারা আমাদের শরীর গঠিত হয়, এবং এর বিচ্ছেদ দ্বারা শরীর নষ্ট হয়ে যায়।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের সময় যখন শরীরের প্রতিটি উপাদান পৃথক হয়ে কারণরূপ প্রকৃতিতে মিলিত হয়, তখন বেদমন্ত্রের মাধ্যমে সেই সেই উপাদানকে তাদের নিজ নিজ মূল অবস্থায় বিলীন হওয়ার উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়া হয়। এখানে সেই আহুতিগুলির উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলি শরীরের অঙ্গসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বাহাপ্রাণেভ্যঃ সাধিপতিকেভ্যঃ পৃথিব্যৈ স্বাহেগ্নয়ে স্বাহেন্তরিক্ষায় স্বাহা বায়বে স্বাহা । দিবে স্বাহা । সূর্যায় স্বাহা ॥ দিগ্ভ্যঃ স্বাহা চন্দ্রায় স্বাহা নক্ষত্রেভ্যঃ স্বাহা অদ্ভ্যঃ স্বাহা বরুণায় স্বাহা । নাভ্যৈ স্বাহা পূতায় স্বাহা ॥ বাচে স্বাহা প্রাণায় স্বাহা প্রাণায় স্বাহা চক্ষুষে স্বাহা চক্ষুষে স্বাহা শ্রোত্রায় স্বাহা শ্রোত্রায় স্বাহা ॥ লোমভ্যঃ স্বাহা লোমভ্যঃ স্বাহা ত্বচে স্বাহা ত্বচে স্বাহা লোহিতায় স্বাহা লোহিতায় স্বাহা মেদোভ্যঃ স্বাহা মেদোভ্যঃ স্বাহা । মাংসেভ্যঃ স্বাহা মাংসেভ্যঃ স্বাহা স্নাবভ্যঃ স্বাহা স্নাবভ্যঃ স্বাহাস্থভ্যঃ স্বাহাস্থভ্যঃ স্বাহা মজ্জভ্যঃ স্বাহা মজ্জভ্যঃ স্বাহা । রেতসে স্বাহা পায়বে স্বাহা ॥
অর্থাৎ, পৃথিবী, প্রাণ, অগ্নি, অন্তরীক্ষ, বায়ু, জল, চক্ষু, কর্ণ, লোম, ত্বক, মেদ (চর্বি), রক্ত, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, মজ্জা (Bone Marrow), রজ, বীর্য প্রভৃতি তাদের মূল অবস্থা কারণরূপ প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে সত্য ক্রিয়া সম্পাদন করে।
উক্ত আহুতিগুলো শরীরের উপাদান ও অঙ্গসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই মন্ত্রগুলো যজুর্বেদের ৩৯তম অধ্যায়ের মন্ত্র ১-৩,১০ অন্তর্ভুক্ত।
পঞ্চমহাভূত দ্বারা আমাদের স্থূল শরীর গঠিত। শরীরের স্থূল পদার্থ যেমন মাংস, অস্থি, মজ্জা, টিস্যু (শরীরের একক), দাঁত, নখ, লোম, মেদ প্রভৃতি পৃথিবী তত্ত্ব থেকে গঠিত। ‘আপ’ অর্থাৎ জল থেকে রক্ত, কফ, মূত্র প্রভৃতি তরল পদার্থ তৈরি হয়েছে। রক্তে জলের অংশ অত্যন্ত বেশি। যেমন পৃথিবীর অধিকাংশ অংশ (৭১%) জল দ্বারা পরিব্যাপ্ত, তেমনি শরীরেও জলের অংশ অধিক পরিমাণে রয়েছে। এই জলীয় অংশ সামান্য কমে গেলেও আমাদের জীবন বিপদের মধ্যে পড়ে। তাই খাদ্যে অন্নের দ্বিগুণ জল গ্রহণ করা উচিত।
তৃতীয় তত্ত্ব তেজ, অর্থাৎ অগ্নি মহাভূত, যা শরীরে গতি ও শক্তি বজায় রাখে। অগ্নির শিখা সর্বদা উপরের দিকে ওঠে। এটি মানুষের চেতনার ঊর্ধ্বগতির প্রতীক। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অগ্নির মতো সবসময় নিম্নগামিতা ত্যাগ করে উচ্চতর আদর্শের দিকে ধাবিত হওয়া। আমাদের শরীরে পাঁচ প্রকার অগ্নি কাজ করে। এই অগ্নিই শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে শক্তি পৌঁছে দিয়ে সচল রাখে। অগ্নির দ্বারাই শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অঙ্গসমূহের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যখন মানুষ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হয়, তখন প্রথমে অগ্নি শরীরকে ত্যাগ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সমস্ত অঙ্গ শিথিল ও শীতল হতে থাকে। আমাদের কষ্টার্জিত সৎ উপার্জন এবং অন্তরের নিষ্কাম প্রেমই হলো 'বিশুদ্ধ ঘৃত' । যখন আমরা এই পবিত্র ভাব অগ্নিরূপী ঈশ্বরের চরণে উৎসর্গ করি, তখন আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং আমাদের মন উভয়ই পবিত্র হয়ে ওঠে।
অগ্নিই শরীরের অধিপতি। যেমন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত সোনা শুদ্ধ হয়ে বেরিয়ে আসে, তেমনি অগ্নি শরীরের সমস্ত দোষ দূর করে তাকে সুস্থ করে। অগ্নির একটি নাম হলো 'পাবক' বা যা সবকিছুকে পবিত্র করে। আগুন নিজের মধ্যে কোনো অপবিত্রতা রাখে না, বরং যা কিছু তার সংস্পর্শে আসে, তাকেই সে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত করে। একইভাবে, ঈশ্বরের জ্ঞানাগ্নি মানুষের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহকে পুড়িয়ে আত্মাকে মুক্ত করে।
সুসমিদ্ধায় শোচিষে ঘৃতন্তীব্রং জুহোতন ।
অগ্নয়ে জাতবেদসে ॥
যজুর্বেদ ৩।২
অর্থাৎ, সেই সর্বব্যাপী, প্রজ্জ্বলিত, ঊর্ধ্বগামী, ভাস্বর ও দেদীপ্যমান ব্রহ্মের প্রতি পারমার্থিক ও যাজ্ঞিক উদ্দেশ্য সমর্পণ করুন, যিনি চারপাশের সমস্ত কিছুকে পবিত্র ও শোধন করেন আপনারা বিশুদ্ধ, সুগন্ধি, দাহ্য এবং পরম পাবন ঘৃতের আহুতি উৎসর্গ করুন। এই ঘৃতাহুতির মাধ্যমে আমাদের অন্তরের ও বাহ্যিক জগতের সমস্ত নেতিবাচকতা দগ্ধ হয়ে পবিত্রতায় রূপান্তরিত হোক।
অগ্নি যেমন জাগতিক পদার্থকে শুদ্ধ ও রূপান্তরিত করে, তেমনি শরীরের জীবাণু ও রোগাণুকেও নষ্ট করে। অগ্নি সকল পদার্থের মধ্যে শক্তিশালী। যজুর্বেদে বলা হয়েছে,
অগ্নিরস্মি জন্মনা জাতবেদা ঘৃতম্মে চক্ষুরমৃতম্ম আসন্ ।
অর্কস্ত্রিধাতূ রজসো বিমানো জস্রো ঘর্মা হবিরস্মি নাম ॥
যজুর্বেদ ১৮।৬৬
অর্থাৎ, আমিই অগ্নি—জন্মসূত্রে উৎপন্ন প্রতিটি জীবের মাঝে আমিই পরিব্যাপ্ত (জাতবেদা)। এই যজ্ঞের ঘৃতই হলো আমার চক্ষুর জ্যোতি এবং অমৃতই হলো আমার মুখ। আমি যা কিছু গ্রহণ করি, তা-ই অমৃতে রূপান্তরিত হয়। ঋক, যজু এবং সামবেদের মন্ত্রসমূহ দ্বারা আমি নিত্য পূজিত ও সমাদৃত। আকাশ (মহাশূন্য), বায়ু (প্রাণশক্তি) এবং স্বয়ং অগ্নি—এই ত্রিমাত্রিক উপাদানের দ্বারা আমার সৃজনী সত্তার প্রকাশ গঠিত। আমি অনন্ত আকাশকে ব্যাপ্ত ও আবৃত করে রেখেছি; আমি চির-গতিশীল এবং সদা সক্রিয়। আমিই সূর্যের উত্তাপ, আমিই গ্রীষ্মের প্রখর আলো। আমিই যজ্ঞের পবিত্র অন্ন, এবং এই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডে আমার একটি স্বতন্ত্র নাম ও চিরন্তন পরিচয় রয়েছে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
