দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







'নিরাকার' ঈশ্বরের ঔপনিষদিক প্রমাণ ~ মূখ্য উপনিষদগুলোর প্রমাণের আলোকে

সত্যান্বেষী
0

 
✅'নিরাকার' ঈশ্বরের ঔপনিষদিক প্রমাণ
▪️মূখ্য উপনিষদগুলোর প্রমাণের আলোকে
 
পরমেশ্বর কি সাকার নাকি নিরাকার—আধ্যাত্মিক জগতে এটি একটি চিরন্তন জিজ্ঞাসা। সনাতন দর্শনের সর্বোচ্চ প্রমাণ ও জ্ঞানের আকর উপনিষদসমূহ এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ও যৌক্তিক ভাষায় প্রদান করেছে। উপনিষদের ঋষিগণ সাকারত্বের সমস্ত জড়াভিমান খণ্ডন করে প্রমাণ করেছেন যে, পরমাত্মা স্থূল, সূক্ষ্ম বা কারণ—কোনো প্রকার শরীর ধারণ করেন না। তিনি জন্ম-মৃত্যু, ক্ষয়-বৃদ্ধি এবং ইন্দ্রিয়ের সীমার অতীত এক অখণ্ড নিরাকার চৈতন্য। তিনি চোখ ছাড়া দেখেন, কান ছাড়া শোনেন এবং হাত-পা ছাড়াই সমগ্র মহাবিশ্বকে ধারণ ও চালনা করেন। ঈশ, তৈত্তিরীয়, মুণ্ডক, কঠ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের অমোঘ মন্ত্রের আলোকে ঈশ্বরের সেই পরম 'নিরাকার' রূপের ঔপনিষদিক প্রমাণসমূহ এখানে সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা হলো। 
 
স পর্য়গাচ্ছুক্রমকায়মব্রণমস্নাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্।
কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূর্য়াথাতথ্যতোঽর্থান্ ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ॥
ঈশোপনিষদ্‌ ৮ (যজুর্বেদ ৪০.৮)
সরলার্থঃ হে মনুষ্যগণ! পরমাত্মা সর্বশক্তিমান, স্থূল-সূক্ষ্ম-কারণ শরীর রহিত, ছিদ্র রহিত, নাড়ি (শিরা) আদি বন্ধন রহিত, সদা পবিত্র, নিষ্পাপ, সর্বত্র ব্যাপক, সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, দুষ্টের দমনকারী এবং অনাদিস্বরূপ। তিনি তাঁর শাশ্বত প্রজাদের (অনাদি জীবগণের) জন্য যথার্থভাবে বেদ-দ্বারা সমস্ত পদার্থের বিশেষ উপদেশ প্রদান করেছেন।
“স পর্য়গাৎ” সেই পরমাত্মা আকাশবৎ সর্বত্র পরিপূর্ণ (ব্যাপক)। “শুক্রম্” তিনিই অখিল বিশ্বের রচয়িতা। “অকায়ম্” তিনি কখনো শরীর (অবতার) ধারণ করেন না। কেননা তিনি অখণ্ড, অনন্ত ও নির্বিকার। এই কারণে তিনি শরীর ধারণ করেন না। তাঁর চেয়ে অধিক এই সংসারে আর কিছুই নেই। এজন্য ঈশ্বরের শরীর ধারণ কখনো সম্ভব নয়। “অব্রণম্” তিনি এক অখণ্ড সত্তা, অচ্ছেদ্য, অভেদ্য, নিষ্কম্প ও অচল; এজন্য তাঁর মধ্যে অংশ-অংশী ভাব নেই, কেননা তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার ছিদ্র থাকতে পারে না। “অস্নাবিরম্” নাড়ি আদির প্রতিবন্ধও (নিরোধ) তাঁর মধ্যে থাকা সম্ভব নয়। অতিসূক্ষ্ম হওয়ার কারণে ঈশ্বরের কোনো আবরণ থাকতে পারে না। “শুদ্ধম্” সেই পরমাত্মা সর্বদাই নির্মল; অবিদ্যাদি জন্ম-মৃত্যু, হর্ষ-শোক, ক্ষুধা-তৃষ্ণাদি দোষ এবং অপরাধ থেকে মুক্ত। শুদ্ধের উপাসক শুদ্ধই এবং মলিনের উপাসক মলিনই হয়ে থাকে। “অপাপবিদ্ধম্” পরমাত্মা কখনো অন্যায় করেন না, কেননা তিনি সদা ন্যায়কারী। “কবিঃ” ত্রিকালজ্ঞ (সর্ববিৎ) মহাবিদ্বান - যাঁর বিদ্যার অন্ত (সীমা) কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। “মনীষী” সমস্ত জীবের মন (বিজ্ঞান) অধিকৃত সাক্ষী, সকলের মনের স্বামী। “পরিভূঃ” সর্ব দিকে ও সর্ব স্থানে পরিপূর্ণ রূপে বিদ্যমান এবং সর্বোপরি বিরাজমান। “স্বয়ম্ভূঃ” যাঁর আদিকারণ মাতা, পিতা, উৎপাদক কেউ নেই, কিন্তু তিনি সকলের আদিকারণ। “য়াথাতথ্যতোঽর্থান্‌ ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ” সেই ঈশ্বর নিজের প্রজাবর্গকে যথাবৎ সত্য-বিদ্যা, যা চার বেদ সমগ্র মানব সমাজের পরম হিতার্থে উপদেশ দিয়েছেন, তিনি আমাদের দয়াময় পিতা— ‘পরমেশ্বর’। তিনি অতিশয় কৃপাপূর্বক অবিদ্যান্ধকার নাশক, বেদবিদ্যারূপ সূর্য প্রকাশিত করেছেন। পরমাত্মাই সকলের আদি কারণ— এরূপ সকলের জানা উচিত। এভাবে ঈশ্বরকেই বিদ্যাপুস্তকের আদিকারণ বলে মান্য করা উচিত। ঈশ্বর করুণা করে বিদ্যার উপদেশ দিয়েছেন। কেননা, তিনি আমাদের জন্য সমস্ত পদার্থ দান করেছেন, তবে বিদ্যা দান করবেন না কেন? সর্বোৎকৃষ্ট বিদ্যা ও পদার্থ পরমেশ্বরই দান করেছেন। এই সংসারে ‘বেদ’ ব্যতীত অন্য কোনো বিদ্যাপুস্তক ঈশ্বরোক্ত নয়। ঈশ্বর যেরূপ ন্যায়কারী ও পূর্ণ বিদ্বান, তদ্রূপ বেদ পুস্তকও (ন্যায় ও বিদ্যার আধার)। ঈশ্বরকৃত বেদ তুল্য বা বেদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অন্য কোনো পুস্তক নেই।
 
য়দ্বৈ তৎ সুকৃতম্। রসো বৈ সঃ। রসꣳহেবায়ং লব্ধ্বাঽঽনন্দী ভবতি। কো হ্যেবান্যাত্কঃ প্রাণ্যাৎ। য়দেষ আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ। এষ হ্যেবানন্দয়াতি। য়দা হ্যেবৈষ এতস্মিন্নদৃশ্যেঽনাত্ম্যেঽনিরুক্তেঽনিলয়নেঽভয়ং প্রতিষ্ঠাং বিন্দতে। অথ সোঽভয়ং গতো ভবতি। য়দা হ্যেবৈষ এতস্মিন্নুদরমন্তরং কুরুতে। অথ তস্য ভয়ং ভবতি। তত্ত্বেব ভয়ং বিদুষোঽমন্বানস্য। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি॥
তৈত্তিরীয় উপনিষদ্‌ ব্রহ্মানন্দবল্লী ৭.২
সরলার্থঃ যিনি সেই সুকৃত ব্রহ্ম, তিনিই রস অর্থাৎ আনন্দস্বরূপ। কারণ জীব এই আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মকে লাভ করেই আনন্দিত হন। যদি এই ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ না হতেন, তবে কে প্রাণকে ধারণ করে শ্বাস নিতে পারত? নিশ্চয়রূপে ব্রহ্মই এই জীবের আনন্দদাতা। কেননা যখন এই জীব অদৃশ্য, নিরাকার, অনির্বচনীয়, নিরাধার ব্রহ্মে অভয়রূপ প্রতিষ্ঠাকে লাভ করেন, তখন তিনি নির্ভীক হন। আর যখন তিনি এই ব্রহ্মে অল্পমাত্রও অন্যরূপ বুদ্ধি করেন, তখন তার ভয় হয়। কারণ বিদ্বানের ব্রহ্মজ্ঞান রহিত হওয়াই ভয়। 
শ্রুতিতে পরমাত্মাকে তাঁর ব্যাপকত্বের কারণে ‘আকাশ’ বলা হয়। এজন্য এখানে বলা হয়েছে যে, যদি সেই আনন্দরূপ ব্রহ্ম (আকাশ) না হতেন, তবে সংসারে জীব কীভাবে জীবিত থাকত? আর শ্বাসই কে নিতে পারত? অর্থাৎ জগতের সকল ক্রিয়া ঈশ্বরের গতি দ্বারাই হচ্ছে। যদি তিনি জড় প্রকৃতিতে গতির সঞ্চার না করতেন, তাহলে প্রকৃতি থেকে জগতের সৃষ্টি হতো না। অতএব সমস্ত জগতের ক্রিয়া পরমাত্মার জগতে ব্যাপক থাকার কারণেই হচ্ছে। তিনিই অধিকারী মানুষকে আনন্দ প্রদান করেন। যখন মুমুক্ষু (মুক্তিকামী) পুরুষ সেই অদৃশ্য, নিরাকার, অনির্বচনীয়, নিরাধার ঈশ্বরে অভয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, তখন তিনি অভয়পদের অধিকারী হয়ে নির্ভীক হন। কিন্তু যে পুরুষ পরমাত্মাতে অন্যরূপ বুদ্ধি করেন, তিনি অভয় পদ প্রাপ্ত করতে পারেন না এবং ভয়ভীত হন। এই ভয় কেবল সেই ব্রহ্মজ্ঞানরহিত পুরুষেরই হয়, অন্যদের নয়।
 
য়ত্তদদ্রেশ্যমগ্রাহ্যমগোত্রমবর্ণমচক্ষুঃশ্রোত্রং তদপাণিপাদম্।
নিত্যং বিভুং সর্বগতং সুসূক্ষ্মং তদব্যয়ং য়দ্ভূতয়োনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ॥
মুণ্ডকোপনিষদ্‌ ১.১.৬
সরলার্থঃ সেই যিনি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের অজ্ঞেয়, কর্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, বংশ-পরম্পরা রহিত,
লাল-পীতাদি বর্ণ রহিত, চক্ষু, কর্ণাদি রহিত, হস্ত-পদ রহিত, সর্বত্র ব্যাপক, অত্যন্ত সূক্ষ্ম, বৃদ্ধি ও ক্ষয় রহিত, অবিনাশী, সর্বব্যাপী, যে চরাচর সৃষ্টির কারণকে বিবেকী পুরুষগণ জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা সর্বত্র দর্শন করেন, তিনিই ব্রহ্ম।
যাঁকে পরাবিদ্যা দ্বারা জানা যায়, সেই অক্ষর (অবিনাশী) বস্তু কী? এর উত্তর এই শ্রুতিতে দেওয়া হয়েছে। ‘অদ্রেশ্যম্’ শব্দ দ্বারা কেবল চক্ষুগ্রাহ্য বিষয়েরই নিষেধ করা হয়নি। বরং জ্ঞানেন্দ্রিয়েরও যিনি বিষয় নন, সেই ইন্দ্রিয়ের অবিষয় পরমাত্মাকে ‘অদ্রেশ্যম্’ বলা হয়। এইপ্রকারে ‘অগ্রাহ্য’ শব্দ দ্বারা কেবল সেই পদার্থ নয়, যা হাত দিয়ে গ্রহণ করা যায় না। বরং পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় দিয়েও যে পরমাত্মাকে গ্রহণ করা যায় না, তাই তাঁকে ‘অগ্রাহ্য’ বলা হয়। ‘গোত্র’ শব্দ মূল বা আধারের বাচক, এজন্য মানুষের নামে গোত্র হয়ে থাকে, কিন্তু যাঁর কোনো আদি কারণ নেই, বরং যিনি সবার আদি পুরুষ, তাঁকে ‘অগোত্র’ বলা হয়। শুক্ল, কৃষ্ণ, স্থূল, কৃশ আদি ভৌতিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে কোনো ব্যক্তি বা পদার্থের ‘বর্ণ’ বলে। যিনি সেই বর্ণাদি রহিত, তাঁকে ‘অবর্ণ’ বলা হয়। চক্ষু ও কর্ণ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের উপলক্ষণ; অর্থাৎ “পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ” যিনি চক্ষু ছাড়াই দেখেন এবং কর্ণ ছাড়াই শ্রবণ করেন। এইপ্রকারে হস্ত ও পদ কর্মেন্দ্রিয়ের উপলক্ষণ অর্থাৎ “অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা” হস্ত ছাড়াই সবকিছু গ্রহণ করতে পারেন এবং পদ ছাড়াই সর্বত্র ব্যাপক। তিনি অভৌতিক ও সর্বদা একরস হওয়ার কারণে অর্থাৎ তাঁর মধ্যে কোনো বিকার বা পরিবর্তন উৎপন্ন না হওয়ার কারণে তিনি ‘অব্যয়’। অনুৎপন্ন হওয়ার কারণে এবং ত্রিকালে সদা বিদ্যমান থাকার কারণে তিনি ‘নিত্য’। দেশ, কাল ও পদার্থের সাথে ব্যবধান না হওয়ার কারণে ‘বিভু’, চরাচর জগতে ওতপ্রোত (পরিব্যাপ্ত) হওয়ার কারণে তিনি ‘সর্বগত’। অচ্ছেদ্য ও অভেদ্য হওয়ার কারণে তিনি ‘সূক্ষ্ম’। এরূপ চরাচর সৃষ্টির যিনি একমাত্র আদি কারণ, সেই পুরুষ ‘অক্ষর’ বাচ্য; তাঁকে ধীর-পুরুষ জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা দর্শন করেন। তাৎপর্য এই যে, উক্ত অদৃশ্যতাদি ধর্মযুক্ত অক্ষর ব্রহ্মের প্রাপ্তির সাক্ষাৎ সাধন পরাবিদ্যা ; এটিই মুমুক্ষুগণের (মুক্তিকামীদের) জন্য উপাদেয়। 
 
দিব্যো হ্যমূর্তঃ পুরুষঃ সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ।
অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রো হ্যক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ॥
মুণ্ডকোপনিষদ্‌ ২.১.২
সরলার্থঃ নিশ্চয়ই ব্রহ্ম স্বপ্রকাশস্বরূপ ও মূর্তি-রহিত। তিনি সর্বব্যাপক, জগতের প্রত্যেক পদার্থের বাইরে এবং অভ্যন্তরে ব্যাপ্ত। তিনি জন্ম-রহিত, প্রাণের ক্রিয়া-রহিত এবং মন-রহিত। অতএব, তিনি শুদ্ধ এবং সূক্ষ্ম অব্যাকৃতরূপ প্রকৃতি থেকেও পরম সূক্ষ্ম।
এখানে পরম-পুরুষ পরমাত্মার স্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছে। জায়তে = উৎপন্ন হওয়া, অস্তি = উৎপত্তির পর স্থিতি লাভ করা, বর্দ্ধতে = বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া,‌ বিপরিণমতে = পরিণামপ্রাপ্ত হওয়া, অপক্ষীয়তে = ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া, নশ্যতি= নাশপ্রাপ্ত হওয়া— এই ষড়বিধ বিকার থেকে রহিত হওয়ার কারণে পরমাত্মাকে ‘অমূর্ত’ বলা হয়। তিনি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডরূপী পুরীতে ব্যাপকরূপে শয়ন (অবস্থান) করার কারণে ‘পুরুষ’। জগতের সকল পদার্থ একদেশী, কিন্তু ব্রহ্ম সর্বদেশী অর্থাৎ সর্বত্র পরিপূর্ণ হওয়ার কারণে তিনি ‘বাহ্যাভ্যন্তর’। সকল কার্যবস্তু অপেক্ষা প্রকৃতি সূক্ষ্ম, কিন্তু সেই অব্যক্ত প্রকৃতির থেকেও পরম সূক্ষ্ম হওয়ার কারণে তাঁকে ‘পর’ বলা হয়েছে। সেই পরম সূক্ষ্ম ও চেতনস্বরূপ ব্রহ্ম প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। এভাবে প্রকৃতির সাথে ব্রহ্মের ভিন্নতার বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট সিদ্ধ হয় যে, জগতের সাথে ব্রহ্মের ঘট-মৃত্তিকার ন্যায় কার্য-কারণরূপ সম্বন্ধ নেই, বরং ব্রহ্ম জগতের নিমিত্ত-কারণ এবং প্রকৃতি উপাদান-কারণ। 
 
পরমেবাক্ষরং প্রতিপদ্যতে স য়ো হ বৈ তদচ্ছায়মশরীরমলোহিতং শুভ্রমক্ষরং বেদয়তে য়স্তু সোম্য। স সর্বজ্ঞঃ সর্বো ভবতি। তদেষ শ্লোকঃ॥
প্রশ্নোপনিষদ্‌ ৪.১০
সরলার্থঃ হে প্রিয়দর্শন! আর যে ব্যক্তি সেই অজ্ঞানরহিত, শরীররহিত, রক্ত-পীতাদি বর্ণরহিত, শুদ্ধ, অবিনাশী ব্রহ্মকে জানেন, তিনি পরম অবিনাশী পরমাত্মাকেই প্রাপ্ত হন।
এখন এই শ্রুতিতে আচার্য ব্রহ্মজ্ঞানের ফল প্রতিপাদন করছেন। সেই পরমাত্মা অজ্ঞানরহিত, শরীর রহিত, রক্ত-পীতাদি বর্ণরহিত, শুদ্ধ ও অবিনাশী। যার মধ্যে পঞ্চভূত থেকে শুরু করে জীবাত্মা পর্যন্ত এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যায়, সেই পরমাত্মাকে যে পুরুষ জানেন, তাঁর জানার কিছুই বাকি থাকে না। সেই পরমাত্মাকে জ্ঞাত হলে সবকিছু জানা হয়ে যায় অর্থাৎ তার যা কিছু জ্ঞাতব্য বিষয় আছে, তা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন এবং তার জীবনে যা কিছু কামনা ছিল, সকল কামনা পূর্ণ হয়। তখন সেই ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ সর্বজ্ঞ (অপ্রতিহতজ্ঞান) এবং জীবন্মুক্ত হয়ে ব্রহ্মানন্দে রমণ করেন।
 
অশরীরং শরীরেষ্বনবস্থেষ্ববস্থিম্।
মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি॥
কঠোপনিষদ্‌ ১.২.২২
সরলার্থঃ এই পরমাত্মা প্রাণিদের নশ্বর শরীরে সর্ববিধ শরীর রহিত হয়ে বিরাজমান এবং অনিত্য কার্য-বস্তুর মধ্যে নিত্যরূপে অবস্থিত। সর্বাপেক্ষা মহান সেই ব্যাপক পরমাত্মাকে জেনে বিবেকী পুরুষ শোক করেন না।
পরব্রহ্ম সকল প্রকার শরীর রহিত। বেদে এজন্য তাঁকে “অকায়মব্রণম্ (যজু ৪০।৮)” অর্থাৎ সর্ববিধ শরীর রহিত বলা হয়েছে। তিনি নিরাকার হয়ে সকল প্রাণির শরীরে ব্যাপ্ত। এই উপনিষদের অন্যত্র— “একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা (কঠ০ ২।২।১২)” পরমাত্মাকে সকল প্রাণীর অন্তরাত্মা বলা হয়েছে। তাঁর ‘আত্মা’ নামও সর্বত্র ব্যাপ্ত হওয়ার কারণে প্রসিদ্ধ। যেমন নিরুক্তকার স্পষ্ট লিখেছেন— “অততের্বাপ্তের্বা (নিরুক্ত ৩।১৫)” এবং সেই পরব্রহ্ম কূটস্থ নিত্য, তাঁর কোনো প্রকারের পরিণাম হয় না। কিন্তু তিনি সাংসারিক সকল পরিণামী পদার্থে ব্যাপক-ব্যাপ্য সম্বন্ধে অবস্থিত। তাঁকে জানলে শোকাদি দুঃখের নিবৃত্তি হয়। আর যারা পরমাত্মার ঔপাধিক শরীর স্বীকার করে, তাদের মতের খণ্ডন এই শ্রুতির দ্বারা স্পষ্টভাবে হয়ে যায়। আর যুক্তিতেও পরমাত্মার শরীর কখনো সিদ্ধ হতে পারে না। কেননা, যদি পরমাত্মাকে শরীরধারী মানা হয়, তাহলে সেই শরীরের নির্মাতা স্বয়ং পরমাত্মা না কি অন্য কেউ? যদি অন্য কাউকে মানা হয়, তাহলে পরমাত্মা সর্বকর্তা হতে পারেন না। আর যদি পরমাত্মাকেই সেই শরীরের নির্মাতা মানা হয়, তাহলে বুঝতে হবে পরমাত্মা শরীর ছাড়াই কার্য করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে শরীরধারী মানার কী আবশ্যকতা? 
 
ততো য়দুত্তরতরং তদরূপমনাময়ম্।
য় এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্ত্যথেতরে দুঃখমেবাপিয়ন্তি॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্‌ ৩.১০
সরলার্থঃ যিনি সেই কার্যরূপ জগৎ থেকেও অধিকতর উত্তম, সেই পরমাত্মা রূপ-রহিত অর্থাৎ অবয়বশূন্য এবং মৃত্যু-জরা-ব্যাধি থেকে মুক্ত। যাঁরা এই পরমাত্মাকে জানেন, তাঁরা মোক্ষপ্রাপ্ত হন এবং যারা এই পরমাত্মাকে জানে না, তারা নিশ্চিতরূপে দুঃখই প্রাপ্ত হয়।
সৃষ্টির রচয়িতা পরমেশ্বর এই কার্যরূপ জগতের চেয়েও অধিকতর শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ এই কার্যরূপ জগতের উপাদানস্বরূপ যে ‘কারণরূপ প্রকৃতি’ রয়েছে, পরমেশ্বর তার থেকেও ঊর্ধ্বে। তিনি সর্বপ্রকার রূপ বা অবয়ব বর্জিত অর্থাৎ নিরাকার। এই কারণে তিনি জন্ম-মৃত্যু, জরা-ব্যাধি অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখ থেকে মুক্ত। যাঁরা সেই পরমাত্মার শাশ্বত স্বরূপকে জানতে সমর্থ হন, তাঁরাই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হতে পারেন। অপরদিকে যারা পরমেশ্বরকে জানতে পারে না, তারা গভীর দুঃখ সাগরে নিমজ্জিত হয়। কেননা পার্থিব সুখই চিরস্থায়ী সুখ নয়, পরমানন্দের প্রাপ্তি তো ব্রহ্মকে জানার পরই হয়ে থাকে ।
 
সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং বৃহৎ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্‌ ৩.১৭
সরলার্থঃ সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহের প্রকাশক হয়েও স্বয়ং সকল ইন্দ্রিয়-বর্জিত। তিনি সবার প্রভু, নিয়ন্তা এবং সবার মহান আশ্রয়।
মানুষ যেমন চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সংযোগে কর্ম করে থাকে, তেমনই পরমাত্মার কর্ম করার জন্য কোনো ইন্দ্রিয় বা করণের প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ইন্দ্রিয়-বর্জিত, কিন্তু সকল ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক অর্থাৎ জীবগণের ইন্দ্রিয়সমূহে যে দর্শন, শ্রবণ, আঘ্রাণ, স্পর্শন, চিন্তন, মনন ও বিবেচন করার ভিন্ন-ভিন্ন শক্তি আছে, সেগুলো পরমাত্মার অনন্ত শক্তি থেকেই প্রাপ্ত। তিনিই সমস্ত জড়-চেতন জগতের স্বামী ও নিয়ামক। একমাত্র তিনিই সবার পরম আশ্রয়স্থল, কেননা জীবজগৎ তাঁর আশ্রয়েই বর্ধিত হচ্ছে ।
 
অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ।
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্‌ ৩.১৯
সরলার্থঃ সেই পরমাত্মার হাত নেই, তবুও নিজের অনন্ত শক্তি দ্বারা তিনি সবকিছু গ্রহণ অর্থাৎ ধারণ করেন। তাঁর পা নেই, তবুও তিনি সর্বব্যাপক হওয়ার কারণে সর্বাধিক বেগবান। তাঁর চক্ষু নেই, তবুও তিনি সবকিছু দর্শন করেন। তাঁর কর্ণ নেই, তবুও তিনি সবই শ্রবণ করেন। তিনি সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় জানেন, অথচ তাঁকে কেউ সম্পূর্ণরূপে জানে না। এজন্য জ্ঞানিগণ তাঁকে সর্বাগ্রণী, সর্বাপেক্ষা মহান পুরুষ বলেন।
এই শ্রুতিবাক্যে স্পষ্টভাবে পরমাত্মার ইন্দ্রিয়ের প্রতিষেধ করা হয়েছে। পরমেশ্বর চক্ষু-কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও হস্ত-পদাদি কর্মেন্দ্রিয়ের সাহায্য ছাড়াই গ্রহণ, দর্শন, শ্রবণাদি কার্য সিদ্ধ করতে পারেন, আর এটিই তাঁর সর্বশক্তিমত্তা। সংসার সাগরে নিমজ্জিত অল্পজ্ঞ মানব সেই সর্বজ্ঞ ব্রহ্মকে জানতে পারে না। কিন্তু বৈরাগ্য-প্রাপ্ত, শ্রদ্ধাবান, ধার্মিক মনুষ্যগণ ব্রহ্মবিদ্যার চর্চা ও ধ্যানাদি যোগাভ্যাস দ্বারা তাঁকে জানতে সমর্থ হন।
 
এছাড়াও বৃহদারণ্যক ২.৫.১-১৯ ও বৃহদারণ্যক ৩.৭.১-২৩ সম্পূর্ণ ব্রহ্মের নিরাকারত্বই প্রতিষ্ঠা করে। 
 
সমগ্র আলোচনা ও ঔপনিষদিক প্রমাণসমূহ পর্যালোচনা করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, উপনিষদের মূল প্রতিপাদ্য ঈশ্বর হলেন পরম 'নিরাকার' ও 'অশরীরী'। বৈদিক ঋষিগণ ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি, মূর্তি বা সীমাবদ্ধ শরীরে আবদ্ধ করেন নি। কারণ যা-ই সাকার বা আকৃতিযুক্ত, তা-ই দেশ, কাল ও বস্তু দ্বারা পরিচ্ছিন্ন এবং বিনাশশীল। উপনিষদ আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বর নিরাকার বলেই তিনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হতে পেরেছেন এবং সর্বজ্ঞ রূপে সবার অন্তরে অবস্থান করতে পারেন। বাহ্যিক রূপের উপাসনা মনের প্রাথমিক স্তরের জন্য সহায়ক হলেও, আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছাতে হলে এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে হলে ঈশ্বরের এই সত্য, নিরাকার ও শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত স্বরূপকে জানা ও ধ্যান করা অপরিহার্য। এটিই উপনিষদের পরম সিদ্ধান্ত।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)