দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







বৃক্ষনিধন সম্পর্কে পবিত্র বেদের বার্তা ~ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে

সত্যান্বেষী
0

 

✅ বৃক্ষনিধন সম্পর্কে পবিত্র বেদের বার্তা ~ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে
বৃক্ষ ও উদ্ভিদজগতের সাথে মানবজীবনের সম্পর্ক কেবল পারস্পরিক নয়, বরং তা অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য বন্ধন। বৈদিক দর্শনে অরণ্যের স্বামিনী হিসেবে স্বীকৃত এই বনস্পতিরা মূলত পৃথিবীর প্রাথমিক উৎপাদক (Primary Producers)। উদ্ভিদকুল তাদের পত্রপল্লবে অবস্থিত Chlorophyll নামক সবুজ রঞ্জক পদার্থের সহায়তায় এক বিস্ময়কর জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং মূলরোমের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ জল আহরণ করে। সূর্যালোকের ফোটন কণা যখন পাতার কোষে আঘাত করে, তখন জল ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের রাসায়নিক বিয়োজনের মাধ্যমে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট এবং জীবনদায়ী অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। এই অক্সিজেন নিরন্তর বায়ুমণ্ডলে বিমুক্ত হয়ে প্রাণীজগতের শ্বাসকার্য সচল রাখে এবং উদ্ভিদের সঞ্চিত শর্করা অন্ন, ফল ও ওষধিরূপে স্থাবর-জঙ্গম সকল সৃষ্টির পুষ্টিসাধন করে।
​প্রকৃতির এই নিরবচ্ছিন্ন চক্রটি মূলত একটি ডাইনামিক ইকুইলিব্রিয়াম (Dynamic Equilibrium) বা গতিশীল সাম্যাবস্থা। বৃক্ষ কেবল অক্সিজেন সরবরাহকারী যন্ত্র নয়, বরং এটি ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সংরক্ষক। বনাঞ্চলের ঘন আচ্ছাদন সূর্যের সরাসরি তাপ থেকে মাটিকে রক্ষা করে এবং মৃত্তিকার অভ্যন্তরে জল ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা Aquifer বা ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে পুনর্ভরণ করতে সাহায্য করে। এই প্রাকৃতিক শৃঙ্খলার অবক্ষয় ঘটলে কেবল অক্সিজেনের অভাব হয় না, বরং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নিচে নেমে যায় এবং পরিবেশ রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। সৃষ্টির এই গূঢ় উদ্দেশ্য এবং উদ্ভিদ ও ওষুধি বৃক্ষের অপরিহার্যতা আজ আধুনিক Environmental Science-এর মাধ্যমে প্রমাণিত, যা বহু সহস্র বছর আগেই আমাদের ঐতিহ্যে পরম শ্রদ্ধার সাথে বর্ণিত হয়েছে।
পরিবেশ সংক্রান্ত সকল সমস্যার একমাত্র প্রতিকার আমরা করতে পারি বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে। পবিত্র বেদের অন্তত দুটি সূক্তে পরমাত্মা বৃক্ষের গুরুত্ব বুঝিয়ে বৃক্ষনিধন করতে নিষেধ করেছেন। বৃক্ষাদি নিয়ে সেই দুটি সূক্ত হল ওষধিস্তুতি সূক্ত [ঋগ্বেদ ১০।৯৭] এবং অরণ্যানী সূক্ত [ঋগ্বেদ ১০।১৪৬]।
অরণ্যকে রূপক অর্থে পৃথিবীর “ফুসফুস” বলা হয়, কারণ উদ্ভিদসমূহ বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদ Photosynthesis (সালোকসংশ্লেষণ) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যালোকের শক্তি ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল থেকে Carbon Dioxide গ্রহণ করে এবং উপজাত হিসেবে Oxygen নিঃসৃত করে। এর ফলে জীবমণ্ডলে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ বজায় থাকে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। সামগ্রিকভাবে অরণ্যসমূহ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে বাসযোগ্য রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
অরণ্য একই সঙ্গে জলচক্রের একটি মৌলিক নিয়ামক। বৃক্ষের বিস্তৃত শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং বৃষ্টির জলকে মাটির গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ জলাধার বা Aquifer পুনরায় পূর্ণ হওয়ার সুযোগ পায়। উদ্ভিদের transpiration প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প নির্গত হয়, যা স্থানীয় আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এই সমন্বিত প্রক্রিয়ার ফলে অরণ্য পরিবেশকে শীতল, সুষম ও জীবনধারণের অনুকূল রাখে। অতএব, অরণ্য সংরক্ষণ কেবল জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নয়, বরং বায়ুমণ্ডলীয় ভারসাম্য, জলসম্পদ সংরক্ষণ এবং মানবজীবনের স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত অপরিহার্য।
অথর্ববেদের [১৪.১.৩] এই মন্ত্রটি প্রাকৃতিক চক্র এবং আত্মিক উন্নতির এক গভীর সমন্বয় প্রকাশ করে-
সোমং মন্যতেপপিবান্যৎসম্পিংষন্ত্যোষধিম্।
সোমং যং ব্রহ্মাণো বিদুর্ন তস্যাশ্নাতিপার্থিবঃ ॥
অর্থাৎ, যখন সোম-অভিষবকারীগণ (যাঁরা পাথর দিয়ে লতা পেষণ করেন) সোমলতাকে চূর্ণ করে রস নিষ্কাশন করেন, তখন যজমান মনে করেন যে তিনি প্রকৃত 'সোম' পান করেছেন। কিন্তু ঋষিগণ যে সোম-তত্ত্ব জানেন এবং যা তাঁরা পান করেন, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মর্ত্যের সাধারণ মানুষ সেই দিব্য আনন্দের আধ্যাত্মিক সোমকে জানতে পারে না এবং তা পান করার সামর্থ্যও তাদের নেই।
[ভাষ্যানুবাদ: ড. তুলসী রাম শর্মা, আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী]
আলোচ্য মন্ত্রে “সোম” ধারণাটি বহুমাত্রিক প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে ভৌত প্রকৃতি ও আত্মিক উপলব্ধির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে। বাহ্যত সোমলতা = ওষধি উদ্ভিদজ্জ উপাদান যা পেষণ [অর্থাৎ প্রক্রিয়াজাত] করে যে রস [সারতত্ত্ব] আহরণ করা হয়, সাধারণ মানুষ তাকে সোম বলে মনে করে; কিন্তু বেদে পরমাত্মা যে সোমের কথা বলেন, তা কেবল উদ্ভিদের রস নয়, বরং এক উচ্চতর চেতনা-অভিজ্ঞতা। এখানে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি দার্শনিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যেমন- উদ্ভিদ সূর্যালোক, জল ও মাটির পুষ্টি গ্রহণ করে রস সঞ্চয় করে, তেমনি মানুষের চিত্তও সাধনা, জ্ঞান ও সংযমের দ্বারা পরিশুদ্ধ হয়ে এক বিশেষ আনন্দচেতনায় উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃতির দৃশ্যমান উপাদান একটি প্রতীক, যার মাধ্যমে অন্তর্লৌকিক সত্যের উপলব্ধি সম্ভব।
এই মন্ত্রের আলোচনায় প্রকৃতির চক্র একটি সহায়ক উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ভিদের অভ্যন্তরে রস সঞ্চালন, বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার যে ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তা মানুষের অন্তর্জীবনের বিকাশের সঙ্গে তুলনীয়। যেমন একটি লতা পরিপক্ব হলে তার রস বিশেষ গুণ ধারণ করে, তেমনি আত্মিক সাধনায় পরিণত ব্যক্তি এক গভীর প্রশান্তি বা আনন্দ অনুভব করে, যা সাধারণ ইন্দ্রিয়গত সুখ থেকে ভিন্ন। এই দৃষ্টিতে সোম কেবল পানীয় নয়, বরং চেতনার উৎকর্ষের প্রতীক, যা নির্দেশ করে যে বাহ্য জগতের উপাদান মানবজীবনের অন্তর্মুখী বিকাশের পথকে ইঙ্গিত করতে পারে।
বেদের মতে, এই সোমের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে হলে কেবল বাহ্য আচার বা পদার্থগত গ্রহণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞান। তাই বলা হয়েছে যে সাধারণ মানুষ সোম পান করেছে বলে মনে করলেও প্রকৃত সোমের অভিজ্ঞতা বিরল এবং তা আত্মিক প্রস্তুতির উপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে মন্ত্রটি একটি মৌলিক বৈদিক ধারণা প্রকাশ করে—প্রকৃতি ও চেতনা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও তাদের স্তর ভিন্ন; প্রকৃতি মানুষকে সহায়তা করে, কিন্তু আত্মিক উপলব্ধি অর্জনের জন্য অভ্যন্তরীণ সাধনাই মুখ্য।
জীবাশ্ম জ্বালানি (পাথুরে কয়লা, খনিজ তেল) এবং কল-কারখানা থেকে নির্গত অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিষাক্ত ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse Effect) সৃষ্টি করছে। এই দূষণের ফলে উদ্ভিদের পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্র বা স্টোমাটা (Stomata) কার্বন কণা দ্বারা রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের বৃদ্ধি ও অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অরণ্য ধ্বংসের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩৭.৫ লক্ষ একর বনভূমি বিলীন হচ্ছে, যার ফলে আনুমানিক ১২০০ কোটি টন উর্বর মাটি ধুয়ে যাচ্ছে (Soil Erosion)। এর চরম পরিণতি হিসেবে কলকাতা বা মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলোতে বায়ুর গুণমান সূচক বা AQI বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে মাস্ক বা অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ছে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার উচ্চে অবস্থিত ওজোন (O_3) স্তরটি পৃথিবীর জন্য এক অভেদ্য বর্ম। সূর্যের ১০,০০০°C তাপমাত্রার বিকিরণ থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays) এই স্তরে প্রতিহত হয়। পরিবেশগত অবক্ষয়ের ফলে ওজোন স্তরে ফাটল দেখা দেওয়ায় এই রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে, যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশে ক্যানসার ও অন্যান্য চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজি কেবল কার্বন শোষণই করে না, বরং ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানো অতিবেগুনি রশ্মির তীব্রতা হ্রাস করে প্রাণিকুলকে এক অদৃশ্য সুরক্ষা প্রদান করে।
বৈদিক দর্শনে 'অগ্নি' কেবল দৃশ্যমান শিখা নয়, বরং এটি মহাজাগতিক শক্তি বা Thermal Energy-র প্রতীক। অথর্ববেদের (১২।১।১৯) ভগবান এই শক্তির সর্বব্যাপিতা বর্ণনা করেছেন-
অগ্নির্ভূম্যামোষধীষ্বগ্নিমাপো বিভ্রত্যগ্নিরশ্মসু।
অগ্নিরন্তঃ পুরুষেষু গোষ্বশ্বেষ্বগ্নয়ঃ ॥
অর্থাৎ, অগ্নি বা তাপশক্তি এই পৃথিবীর গভীরে বিদ্যমান; এই অগ্নিই ওষধি, লতা-গুল্ম ও বৃক্ষরাজির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের জীবনীশক্তি জোগায়। জলরাশিও অগ্নিতত্ত্বের আধার, এবং মেঘ বা পাথরের গঠনের নেপথ্যেও অগ্নির ভূমিকা রয়েছে। এই একই অগ্নি মানুষের শরীরে জঠরাগ্নি ও প্রাণশক্তি হিসেবে বিদ্যমান। গরু, ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীর দেহের তাপ ও শক্তির মূলে রয়েছে এই বিভিন্ন রূপের অগ্নি—তা সে বৈদ্যুতিক হোক, চৌম্বকীয় হোক বা শুদ্ধ আলোকশক্তিই হোক।
[ভাষ্যানুবাদ: ড. তুলসী রাম শর্মা, আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী]
এই মন্ত্রটি শক্তির নিত্যতা সূত্রের একটি প্রাচীন প্রতিফলন। ভূমির অভ্যন্তরীণ তাপ (Geothermal Energy), উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তি এবং প্রাণীর বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় (Metabolism) উৎপন্ন তাপ সবই এই 'অগ্নি'র বিভিন্ন রূপ। মেঘের ঘর্ষণজনিত বিদ্যুৎ কিংবা পাথরের আণবিক কম্পন সর্বত্রই শক্তির এই প্রবাহ বিদ্যমান। ঈশ্বরের এই প্রাকৃতিক বিধানে প্রতিটি জীব ও জড় পদার্থ নির্দিষ্ট মাত্রার তাপীয় ভারসাম্য বজায় রেখে বৃদ্ধি ও পুষ্টি লাভ করে।
পৃথিবীর সুরক্ষায় ওজোন স্তর (O_3) একটি অদৃশ্য 'অগ্নিবাসা' বা অগ্নিবস্ত্রের ন্যায় কাজ করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০-৪০ কিমি উচ্চতায় অবস্থিত এই স্তরটি সূর্যের ১০,০০০°C তাপমাত্রার অগ্নিগোলক থেকে নির্গত প্রাণঘাতী অতিবেগুনি রশ্মি (UV-B ও UV-C) প্রতিহত করে। অথর্ববেদের (১২।১।২১) মন্ত্রে পৃথিবীকে 'ত্বিষিমন্তম্' বা দীপ্তিময় করার যে প্রার্থনা করা হয়েছে, তা মূলত এই সৌরশক্তির সুষম বণ্টনেরই ইঙ্গিত। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার দান ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) এবং নাইট্রাস অক্সাইড এই ওজোন স্তরকে ক্ষয়প্রাপ্ত করছে। ফলে সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ সরাসরি ভূমিতে পৌঁছে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মাটির আর্দ্রতা শোষণ করে পৃথিবীকে মরুভূমিতে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম হলো অ্যালবেডো প্রভাব (Albedo Effect)~যেখানে সূর্য থেকে আগত ৫১% তাপ পৃথিবী গ্রহণ করে এবং সমপরিমাণ তাপ পুনবিকিরিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে কল-কারখানা ও জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের ফলে বায়ুমণ্ডলে মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিথেন প্রতি বছর ৯% এবং CFC ৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডলে একটি স্বচ্ছ তাপীয় আবরণ তৈরি করছে, যা আগত তাপকে আর বাইরে যেতে দিচ্ছে না। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা Global Warming ঘটছে, যা মেরু অঞ্চলের বরফ গলিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে এবং বাস্তুসংস্থানকে তাসের ঘরের মতো পতনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অথর্ববেদের [১২।১।২০] অন্য একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে যে, সূর্য থেকে আগত শক্তি অন্তরিক্ষ ও পৃথিবীকে প্রাণবন্ত করে এবং মানুষ যজ্ঞ বা হব্যদ্রব্যের মাধ্যমে সেই শক্তিকে পরিশুদ্ধ রাখে-
অগ্নির্দিব আ তপত্যগ্নের্দেবস্যোর্বন্তরিক্ষম্।
অগ্নিং মর্তাস ইন্ধতে হব্যবাহং ঘৃতপ্রিয়ম্ ॥
অর্থাৎ, তাপ বা বিদ্যুৎশক্তি মূলত সূর্য থেকে উৎপন্ন হয়ে এই পৃথিবীতে আশ্রয় গ্রহণ করে। এটি বিশাল অন্তরীক্ষ বা আকাশকেও পূর্ণ করে রাখে। মর্ত্যের মানুষ এই শক্তিকেই 'যজ্ঞাগ্নি' হিসেবে প্রজ্বলিত করে, যা ঘৃত ও দাহ্য পদার্থের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয় এবং যা সুগন্ধি দ্রব্য আহুতির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলকে সুরভিত করে। সৌরলোকে অগ্নি সূর্যরূপে প্রদীপ্ত ও বিকিরিত হয়; এই দিব্য অগ্নির প্রভাবেই বায়ু প্রবাহিত হয় এবং বিদ্যুৎশক্তি হিসেবে মেঘে চমকায়। মানুষ সেই অগ্নিকেই মর্ত্যে আবাহন করে, যা ঘৃত আহুতি প্রিয় এবং যা মর্ত্যের সংকল্প ও প্রার্থনাকে ঊর্ধ্বে দ্যুলোকে বহন করে নিয়ে যায়।
[ভাষ্যানুবাদ: ড. তুলসী রাম শর্মা, আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী, স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতী, পণ্ডিত দেবীচাঁদ এম.এ.]
এই মন্ত্রের মূল শিক্ষা হলো পরিবেশের তিনটি প্রধান স্তম্ভ~ বায়ু, জল এবং উদ্ভিদকে কলুষমুক্ত রাখা। যান্ত্রিক ধোঁয়া ও অরণ্য বিনাশের ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা একটি বদ্ধ ঘরে কয়লা জ্বালিয়ে রাখার মতো শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। একটি বট বা অশ্বত্থ বৃক্ষ দৈনিক যে বিশাল পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন ও কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে, তার কোনো যান্ত্রিক বিকল্প নেই।
সুতরাং, ওজোন স্তর রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণ কেবল বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। পরিবেশের এই নিরবচ্ছিন্ন শৃঙ্খলা রক্ষা করলেই কেবল পৃথিবী তার স্বাভাবিক উর্বরতা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
▪️ম কাকম্বীরমুদ্বৃহো বনস্পতিমশস্তীর্বি
ঋগ্বেদ ৬.৪৮.১৭
~ বৃক্ষাদি বিনষ্ট কোরো না।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)