প্রকৃতিতে কোনো ঘটনাই আকস্মিক বা উদ্দেশ্যহীন নয়; Teleology বা 'উদ্দেশ্যমূলক নকশা' হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রাকৃতিক অবস্থায় পরিবেশ একটি Self-sustaining বা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা, যা পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিটি জীবের জন্য পুষ্টি ও জীবনধারণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে। পরমাত্মার সেই সৃষ্টি-পরিকল্পনা আধুনিক বিজ্ঞানের Homeostasis বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে প্রতিটি অণু-পরমাণু এবং জীব একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রাণের বিকাশ ও স্থায়িত্ব।
মানুষের জন্য নির্ধারিত 'কর্মক্ষেত্র' এবং অন্যান্য জীবজন্তুর 'কর্মফল ভোগ' করার বিষয়টি জীববিজ্ঞানের ইকোলজিক্যাল নিস (Ecological Niche) ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রতিটি প্রাণী তার সহজাত প্রবৃত্তি বা Instinct অনুযায়ী কাজ করে, যা পরোক্ষভাবে সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের সেবায় নিয়োজিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ষাঁড় বা গবাদি পশুর কৃষিকাজে অংশগ্রহণ কেবল শারীরিক পরিশ্রম নয়, বরং এটি মানুষের সাথে একটি Mutualistic Symbiosis বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক। পশুপাখিরা তাদের স্বভাবজাত আচরণের মাধ্যমে পরাগায়ন, বীজ বিস্তার এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে যে ভূমিকা রাখে, তা মূলত তাদের প্রাকৃতিক 'সেবা' বা নির্ধারিত ভূমিকা।
সৃষ্টির এই নিগূঢ় রহস্য এবং জীবের আন্তঃনির্ভরশীলতা আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। বৃক্ষ ও ওষুধি উদ্ভিদের বিনাশ কেবল অক্সিজেনের অভাব ঘটায় না, বরং এটি প্রকৃতির সেই আদি ও অকৃত্রিম 'উদ্দেশ্য' বা ভারসাম্যকে ধ্বংস করে দেয়। প্রাচীন বৈদিক দর্শনে বর্ণিত 'সৃষ্টির উদ্দেশ্য' এবং 'জীবের সেবা' এই ধারণাগুলো আজ আধুনিক কনজারভেশন বায়োলজি (Conservation Biology)-র অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ যখন তার কর্মক্ষেত্রে প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল হয়, তখনই কেবল এই মহান সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল হয় এবং পরিবেশ তার পূর্ণাঙ্গ শুদ্ধতা ফিরে পায়।
আ ব্রহ্মন্ ব্রাহ্মণো ব্রহ্মবর্চসী জায়তামা রাষ্ট্রে রাজন্যঃ শূরঽইষব্যোঽতিব্যাধী মহারথো জায়তাং দোগ্ধ্রী ধেনুর্বোঢানড্বানাশুঃ সপ্তিঃ পুরন্ধির্যোষা জিষ্ণূ রথেষ্ঠাঃ সভেয়ো যুবাস্য যজমানস্য বীরো জায়তাং নিকামে নিকামে নঃ পর্জন্যো বর্ষতু ফলবত্যো নঽওষধয়ঃ পচ্যন্তাং যোগক্ষেমো নঃ কল্পতাম্ ॥
যজুর্বেদ ২২.২
অর্থাৎ, হে বিশ্বচরাচরের পরমেশ্বর! আমাদের এই রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণগণ যেন দিব্যজ্যোতিসম্পন্ন এবং বিশ্ববিদ্যার প্রদীপ্ত পণ্ডিতরূপে আবির্ভূত হন। ক্ষত্রিয়গণ যেন রথারোহী বীর যোদ্ধা এবং অব্যর্থ বাণ নিক্ষেপে শত্রুসংহারকারী মহাশক্তিরূপে জাগ্রত হন। আমাদের গাভীগণ যেন উর্বর ও দুগ্ধবতী হয়, বৃষসমূহ যেন ভারবহনে সক্ষম হয় এবং অশ্বগণ যেন দ্রুতগামী হয়। আমাদের নারীগণ যেন দয়াবতী ও মহীয়সী হন; আর এই যজমান অর্থাৎ শাসকের সন্তানগণ (প্রজাগণ) যেন সাহসী, নির্ভীক, রথচালনায় দক্ষ বিজয়ী এবং সভার তেজস্বী ও সুসভ্য সদস্য হন। ঋতুচক্রের প্রয়োজন অনুসারে মেঘদল যেন আমাদের ওপর বারিধারা বর্ষণ করে। ওষধি লতাগুল্ম ও বনস্পতিগণ যেন প্রচুর ফলে সমৃদ্ধ ও পরিপক্ব হয়। আর এই পবিত্র ভূমি যেন নিরন্তর শ্রীবৃদ্ধি এবং সুখ-সমৃদ্ধির অটুট সুরক্ষায় ধন্য হয়।
অর্থাৎ,
১. ব্রাহ্মণো ব্রহ্মবর্চসী: রাষ্ট্রে যেন উচ্চমানের বিদ্বান ও জ্ঞানীরা থাকেন (Education & Research)।
২. রাজন্যঃ শূরঃ: শাসকরা যেন বীর ও প্রজাবৎসল হন (Defense & Governance)।
৩. ধেনুঃ/অনড্বান/সপ্তিঃ: গাভী (দুগ্ধ), বলদ (কৃষি) ও অশ্ব (পরিবহন) যেন শক্তিশালী হয় (Economy & Agriculture)।
৪. পুরন্ধির্যোষা: নারীশক্তি যেন বিদুষী ও সুসংস্কারী হন (Social Foundation)।
৫. সভেয়ো যুবা: যুবসমাজ যেন বিনয়ী এবং সভার অলঙ্কারস্বরূপ হয় (Youth Power)।
৬. পর্জন্যো বর্ষতু: আবহাওয়া বা বৃষ্টি যেন সময়মতো হয় (Environment)।
৭. ফলবত্যো ওষধিঃ: ওষধি ও উদ্ভিদরা যেন ফলদায়ী হয় (Agriculture & Health)।
৮. যোগক্ষেমঃ: আমাদের যা নেই তার প্রাপ্তি এবং যা আছে তার সুরক্ষা যেন বজায় থাকে (Prosperity & Security)।
বৈদিক স্তোত্রে পরমাত্মার নিকট গরু, বলদ ও অশ্বের জন্য যে প্রার্থনা করা হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি Carbon-neutral এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি (Circular Economy)-র উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গবাদি পশুর মল-মূত্র কেবল বর্জ্য নয়, বরং তা নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়ামের আধার। এই জৈব উপাদানগুলো মাটির হিউমাস (Humus) বৃদ্ধি করে এবং মাটির গঠনবিন্যাস বা Soil Texture উন্নত করে। এর ফলে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমে এবং মাটির উর্বরতা প্রাকৃতিক উপায়ে পুনর্জীবিত হয়।
আধুনিক বিশ্বে প্রাকৃতিক উপাদানের পরিবর্তে ট্র্যাক্টর ও মোটরের ব্যবহার বাড়ায় বায়ুমণ্ডলের রসায়নে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। যান্ত্রিক উপকরণের দহন প্রক্রিয়ায় (Combustion) প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস (CO₂, NOₓ, SOₓ) নির্গত হয়, যা বায়ুমণ্ডলের তাপীয় ভারসাম্যকে নষ্ট করছে।
কার্বন ফুটপ্রিন্ট (Carbon Footprint): যান্ত্রিক কৃষি উপকরণ জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে পরিবেশে কার্বন যোগ করে, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর অন্যতম কারণ।
বায়ুদূষণ ও কণা পদার্থ (Particulate Matter): ধোঁয়া নির্গতকারী এই উপকরণগুলো বাতাসে ক্ষুদ্র কণা (PM2.5) ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুসংস্থানের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বৈদিক দর্শনে পশুপাখিকে যে 'সহায়ক' হিসেবে দেখা হয়েছে, তা মূলত একটি ইকোলজিক্যাল কো-অপারেশন (Ecological Cooperation)। গরু বা বলদ যখন কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকে, তারা কেবল শ্রম দিচ্ছে না, বরং পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে মাটিকে পুষ্ট করছে। বিপরীতে, বর্তমানের কৃত্রিম উপকরণগুলো সাময়িকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির মাইক্রোবায়োম (Microbiome) বা অণুজীবের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
প্রাকৃতিক সার ও পশুপাখির সাহচর্য বাদ দিয়ে মানুষ যে যান্ত্রিকতার পথে এগোচ্ছে, তা পরিবেশে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের আধিক্য ঘটিয়ে বিশুদ্ধ বায়ুর ঘাটতি সৃষ্টি করছে। বৈদিক প্রার্থনা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি একটি Sustainable Living বা টেকসই জীবনযাত্রার বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা, যা পরিবেশকে দূষণমুক্ত রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার পথ দেখায়।
দুই কোটিরও বেশি মানুষের মেগাসিটি ঢাকা আজ এক চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। একটি আদর্শ শহর যেখানে সুস্থ নিশ্বাসের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা, সেখানে ঢাকা প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য এবং ১.৫ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য উৎপাদন করছে, যার বড় অংশই বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছে। বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে (AQI) ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় স্থান পায়; এখানে প্রতিদিন যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া, ইটভাটার কার্বন এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের ধূলিকণা মিলে প্রায় ৫০০ টনেরও বেশি ক্ষতিকারক পিএম ২.৫ (PM2.5) কণা বাতাসে ছড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এই দূষণের কারণে ঢাকায় শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ ও ফুসফুসের ক্যানসারের হার গত এক দশকে ভয়াবহভাবে বেড়েছে, যার ফলে বছরে হাজার হাজার মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে এবং দেশের জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। আমরা বহুতল ভবন গড়েছি, মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভারের মতো মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে নাগরিক জীবনকে গতিশীল করেছি এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছি কিন্তু এই উন্নয়নের ভিড়ে পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখার ন্যূনতম দায়িত্বটুকু আমরা এড়িয়ে গেছি। শিল্পায়নের দম্ভে আমরা 'নোংরা করা' শিখেছি ঠিকই, কিন্তু আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার (ETP) কার্যকর করা কিংবা বনায়নের মাধ্যমে প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতাটুকু আজও আমাদের অবহেলায় ধুঁকছে।
আমরা নিজেদের ঘরে আবর্জনা করি, কিন্তু পরের দিন তা পরিষ্কারও করি। দেশের ক্ষেত্রে কি তেমন করা হয়? শিল্পপতিরা কি মনে করেন যে তাদের কারণে সমগ্র বায়ুমণ্ডল দূষিত হচ্ছে এবং একে বিশুদ্ধ রাখা তাদের কর্তব্য? সরকার কি শিল্প স্থাপনের পূর্বে শিল্পপতিদের এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ করে? করলেও তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
আমাদের দেশে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, বিভিন্ন ধাতুর সূক্ষ্ম কণা, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) এবং বৃক্ষনিধনের ফলে পরিবেশে CO₂-এর পরিমাণ অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। সালফার ডাই-অক্সাইডের কারণে ফুসফুস ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। CFC (ক্লোরোফ্লুরো কার্বন)-এর কারণে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, যার ফলে মানুষের চর্মরোগ ছাড়াও রক্তের রোগ ও ক্যান্সার প্রভৃতি দেখা দিচ্ছে। যেন সরকার শিল্পপতিদের রোগ বৃদ্ধি করার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে, আর শিল্পপতিরাও মনে করছেন যে পরিবেশ দূষণ করা তাদের জন্মগত অধিকার।
বেদে বায়ুর গুরুত্ব বহু স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন বন্ধু অন্য সব সম্পর্কের তুলনায় অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়, তেমনই বায়ু সকল প্রাণীর নিকটতম এবং অপরিহার্য উপাদান বলে গণ্য হয়। যথা-
উত বাত পিতাসি ন উত ভ্রাতোত নঃ সখা । স নো জীবাতবে কৃধি ॥
ঋগ্বেদ ১০.১৮৬.২
অর্থাৎ, এই যে চরাচরে প্রবহমান বায়ু, এ আমাদের পিতার মতো পরম পালক, ভ্রাতার মতো আমাদের জীবন ধারণের সামগ্রী দানকারী এবং এক অকৃত্রিম বন্ধুর মতো আমাদের সর্বদা কল্যাণকামী। এই প্রাণবায়ু আমাদের সজীব ও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও প্রেরণা দান করে।
এই বায়ু আমাদের পিতার ন্যায় পালক, বন্ধুর ন্যায় ধারক-পোষণকারী এবং মিত্রের ন্যায় সুখদাতা; আমাদের জীবনকে সার্থক ও প্রাণবন্ত করে তোলে। অর্থাৎ, বায়ু আমাদের জীবনধারণের উপযোগী প্রাণবায়ু দান করে মানুষের সাথে এক পরম মিত্রের ন্যায় স্নেহপূর্ণ আচরণ করে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল মূলত গ্যাসীয় উপাদানের একটি সূক্ষ্ম মিশ্রণ, যেখানে নাইট্রোজেন (৭৮.০৮%), অক্সিজেন (২০.৯৫%) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড (০.০৪০%) এর অনুপাত একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক হারে বিন্যস্ত। এই অনুপাত বজায় রাখার প্রধান নিয়ামক হলো উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যেকার গ্যাসীয় বিনিময় (Gas Exchange)। প্রাণিকুল নিরন্তর শ্বাসক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং বিপাকীয় বর্জ্য হিসেবে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। অন্যদিকে, উদ্ভিদকুল দিনের আলোয় সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং উপজাত হিসেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন বিমুক্ত করে। এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়া বায়ুমণ্ডলে একটি গতিশীল সাম্যাবস্থা বা ডাইনামিক ইকুইলিব্রিয়াম (Dynamic Equilibrium) বজায় রাখে।
উর্ধ্বাকাশে বা Stratosphere-এ অক্সিজেনের অণুগুলো সূর্যের উচ্চ-শক্তির বিকিরণের প্রভাবে বিয়োজিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ফটোলিসিস (Photolysis) বলা হয়। যখন একটি মুক্ত অক্সিজেন পরমাণু অন্য একটি অক্সিজেন অণুর (O2) সাথে যুক্ত হয়, তখন ওজোন (O3) গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই ওজোন স্তরটি পৃথিবীর জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং সূর্যের অত্যন্ত ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV-B ও UV-C) শোষণ করে নেয়। অতিবেগুনি রশ্মির এই প্রাক-শোষণ প্রক্রিয়া না থাকলে ভূপৃষ্ঠে প্রাণিজগতের কোষীয় ডিএনএ (DNA) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং উদ্ভিদজগতের প্রজনন ও সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা লোপ পেত।
অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন এবং বনভূমি নিধনের ফলে বর্তমানে বায়ুমণ্ডলের এই চিরায়ত ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বৃক্ষ নিধনের কারণে কার্বন সিঙ্ক (Carbon Sink) বা কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক ক্ষেত্রগুলো হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়ে গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse Effect) সৃষ্টি করছে। একইসাথে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) জাতীয় গ্যাসের প্রভাবে ওজোন স্তরের ঘনত্ব কমে যাচ্ছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ওজোন স্তরের ক্ষয় (Ozone Depletion) বলা হয়। এই ভারসাম্যহীনতা কেবল জলবায়ু পরিবর্তনই আনছে না, বরং জনবহুল অঞ্চলে অক্সিজেনের আংশিক চাপ কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রকৃতির এই অমোঘ শৃঙ্খলা এবং উদ্ভিদ ও ওষুধি বৃক্ষের অপরিহার্যতার ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক আগেই আমাদের প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডার শব্দব্রহ্ম বেদে ইঙ্গিত করা হয়েছিল।
অপা ররুং পৃথিব্যৈ দেবযজনাদ্বধ্যাসং ব্রজং গচ্ছ গোষ্ঠানং বর্ষতু তে দ্যৌর্বধান দেব সবিতঃ পরমস্যাং পৃথিব্যাং শতেন পাশৈর্যোঽস্মান্বেষ্টি যং চ বয়ং দ্বিষ্মস্তমতো মা মৌক্। অররো দিবং মা পপ্তো দ্রপ্সস্তে দ্যাঁ মা স্কন্ ব্রজং গচ্ছ গোষ্ঠানং বর্ষতু তে দ্যৌর্বধান দেব সবিতঃ পরমস্যাং পৃথিব্যাং শতেন পাশৈর্যোঽস্মান্বেষ্টি যং চ বয়ং দ্বিষ্মস্তমতো মা মৌক্॥
যজুর্বেদ ১.২৬
অর্থাৎ, হে সর্বব্যাপী পরমেশ্বর, হে আনন্দদাতা! যে পৃথিবীতে ঋষিগণ যজ্ঞ সম্পাদন করেন, সেখানে আমরা যেন দুষ্ট ও পাপাচারী শক্তিকে দমন করতে সমর্থ হই। আমরা যেন বিদ্বান ও জ্ঞানীদের সাহচর্য লাভ করি এবং এভাবেই বৈদিক ঋষিসমূহ-প্রোক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থাকে সর্বত্র অবাধে বিস্তার করতে পারি। আমার (ঈশ্বরের) জ্ঞানালোক যেমন সকলের নিকট সমাদৃত, তোমাদের জ্ঞানও যেন তেমনই আদরণীয় হয়। অন্ধকারে নিমজ্জিত যে সকল অজ্ঞ ব্যক্তি জ্ঞানীদের বিরোধিতা করে এবং যাদের জ্ঞান-বিদ্বেষের কারণে বিদ্বান সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের লভ্য শত শত উপায়ে পুণ্যের পথে ফিরিয়ে আনা উচিত; এবং যতক্ষণ না তাদের অন্তরে জ্ঞানদয় হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের ওপর অর্পিত শাসন বা বিধিনিষেধ শিথিল করা উচিত নয়। পাপাচারীরা যেন কখনোই সমৃদ্ধি ও জ্ঞানজ সুখের অধিকারী না হয়। হে কর্তব্যপরায়ণ মানবগণ! তোমরা যেন নিরন্তর পুণ্যের পথ অনুসরণ করো। সূর্যের আলো যেমন অন্তরীক্ষকে উদ্ভাসিত করে, ঈশ্বরও তেমনই আমাদের সৎকামনাগুলো পূর্ণ করেন। সূর্য যেমন মহাকর্ষ বলের দ্বারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে, একে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং নিজ কক্ষপথে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে; ঈশ্বরও তেমনই এই নিখিল বিশ্বকে ধারণ করে আছেন।
দ্যুলোক পৃথিবী থেকে অত্যন্ত উচ্চে ও দূরে অবস্থিত হলেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। এই পৃথিবীতেই যজ্ঞ সম্পাদন করে মানুষ ঐশ্বরিকত্ব লাভ করে। এই যজ্ঞের জন্য যজমান প্রতিজ্ঞা করে যে, আমি পৃথিবীতে যজ্ঞস্থল থেকে দানহীন রাক্ষসস্বভাব শত্রুকে দূর করব। আমি যজ্ঞোপযোগী ঔষধির মূল ধ্বংস করব না অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা করব। এর ফলস্বরূপ এই যজ্ঞ (ঔষধিযুক্ত বায়ু) আকাশমণ্ডল অতিক্রম করে মেঘ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং দ্যুলোক থেকে বৃষ্টি হয়।
নদীমাতৃক ও পলিগঠিত বদ্বীপ বাংলাদেশে বনভূমি উজাড়ের হার বর্তমানে এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতি বছর উন্নয়নের দোহাই দিয়ে হাজার হাজার একর বনভূমি ও গ্রামীণ বন কেটে ফেলার ফলে মাটির প্রাকৃতিক বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উপরিভাগের কয়েক কোটি টন উর্বর মৃত্তিকা (Topsoil) ধুয়ে নদী ও সাগরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জুম চাষ ও গাছ কাটার ফলে ভূমিক্ষয় এতই তীব্র হয়েছে যে, প্রতি বছর সেখানে পাহাড় ধসের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। বৃক্ষহীনতার কারণে মাটির জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং ভূ-গর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের উত্তরাঞ্চলকে ধীরে ধীরে মরুভূমিকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে যে পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে শীতল রাখত, বন ধ্বংসের ফলে সেই প্রাকৃতিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে দেশজুড়ে অসহনীয় তাপপ্রবাহ ও বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যদি এখনই বনায়ন ও মৃত্তিকা সংরক্ষণে সচেতন না হই, তবে এই উর্বর সোনার বাংলা অদূর ভবিষ্যতে এক প্রাণহীন ও অনুর্বর প্রান্তরে পরিণত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
