দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







ম্যারিটাল রেইপ (Marital Rape) / বৈবাহিক ধর্ষণ ~ সনাতন ধর্ম কী বলে এই বিষয়ে ?

সত্যান্বেষী
0

✅ ম্যারিটাল রে ই প (Marital R a p e) / বৈবাহিক ধ র্ষ ণ ~ সনাতন ধর্ম কী বলে এই বিষয়ে ?
আধুনিক আইনি ও সামাজিক পরিমণ্ডলে 'ম্যারিটাল রে ই প' বা বৈবাহিক ধ র্ষ ণ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আলোচিত বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারণাটিকে আধুনিক মনে হলেও, সনাতন ধর্মের মূল বৈদিক সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বৈদিক দর্শন দাম্পত্য জীবনে যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির সম্পূর্ণ বিরোধী। বেদ, যা সনাতন ধর্মের পরম প্রমাণ, সেখানে বিয়েকে কোনো শারীরিক ভোগের চুক্তি হিসেবে দেখা হয়নি; বরং একে বিবেচনা করা হয়েছে দুটি আত্মার পবিত্র ও সমঅধিকারভিত্তিক মিলন হিসেবে। বেদের বিবাহ সূক্ত থেকে শুরু করে শতপথ ব্রাহ্মণের ‘অর্ধাঙ্গিনী’ তত্ত্ব—সর্বত্রই দাম্পত্যের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও অহিংসা। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে বৈদিক সিদ্ধান্ত স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রকারান্তরে বৈবাহিক জবরদস্তি বা ম্যারিটাল রে ই প-কে নিষিদ্ধ ও নিন্দা করে।
📍বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে 'অংশীদারী যৌন সহিংসতা' (Intimate Partner Sexual Violence) এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। WHO-এর সংজ্ঞা মতে—
"Any sexual act, attempt to obtain a sexual act, or other act directed against a person’s sexuality using coercion, by any person regardless of their relationship to the victim, in any setting." (অর্থাৎ, যেকোনো পরিস্থিতিতে, ভুক্তভোগীর সাথে সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন (স্বামী হলেও), বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো যৌন আচরণ, বা যৌন আচরণ করার চেষ্টা করাই হলো যৌন সহিংসতা/ধর্ষণ।)
▪️কেমব্রিজ ডিকশনারি (Cambridge Dictionary) অনুযায়ী—"The crime of forcing your husband or wife to have sex when they do not want to." (অর্থাৎ, নিজের স্বামী বা স্ত্রীকে তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক যৌনমিলনে বাধ্য করার অপরাধ।)
CEDAW-এর সাধারণ সুপারিশ নং ১৯ এবং ৩৫ অনুযায়ী, বৈবাহিক ধ র্ষ ণ হলো লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার একটি রূপ যা নারীর মানবাধিকার এবং শারীরিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন।
 
🔰সনাতন ধর্মের পরম প্রমাণ ও আদি উৎস হলো বেদ। বৈদিক সূত্রে দাম্পত্য জীবনের যে শাশ্বত আদর্শ চিত্রিত হয়েছে, তা জবরদস্তিমূলক কোনো অধিকারের কথা বলে না। বেদ ও বেদানুকূল আর্ষগ্রন্থ এই বিষয়ে জ্বাজ্জল্যমান উদ্ধৃতি আমাদের জন্য প্রকাশ করে।
 
সমঞ্জন্তু বিশ্বে দেবাঃ সমাপো হৃদয়ানি নৌ ।
সং মাতরিশ্বা সং ধাতা সমু দেষ্ট্রী দধাতু নৌ ॥
[ঋগ্বেদ ১০।৮৫।৪৭]
অর্থাৎ, (বর-কনের প্রার্থনা)—হে নিখিল বিশ্বদেবগণ = প্রকৃতির দিব্য শক্তিসমূহ এবং মানবজাতির শ্রেষ্ঠ মহাত্মাগণ! আপনারা শ্রবণ করুন এবং অবগতি লাভ করুন—দুইটি নদীর জলধারার ন্যায় আমাদের হৃদয় ও মন আজ একাকার হয়ে গেছে। প্রাণস্বরূপ পরমাত্মদেব যেন আমাদের উভয়কে এক অবিচ্ছেদ্য সত্তায় মিলিত করেন। এই জগতের পরম নিয়ন্তা ঈশ্বর যেন আমাদের এক অভিন্ন ব্যক্তিত্বে রূপান্তর করেন। পরমাত্মদেব যেন আমাদের এই একত্বকে যুক্ত করেন এবং ঘোষণা করেন। সর্বদেব যেন আমাদের হৃদয় ও মনকে এক অবিচ্ছেদ্য ও অনন্য সত্তায় একীভূত ও সুসংহত করেন।
→ এই মন্ত্রে 'সমাপো হৃদয়ানি নৌ' (আমাদের দুজনের হৃদয় এক হোক) বাক্যাংশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৈদিক বিয়েতে জোরজুলুমের কোনো স্থান নেই; এখানে দুজনের হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত মিলন এবং সমমনোভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক 'সম্মতি' বা Consent-এর ধারণাকেই জোরালো করে।
[সূত্র: সংস্কারবিধিঃ - ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী; ঋগ্বেদ - ড. তুলসী রাম শর্মা] 
 
অমোঽহমস্মি সা ত্বং সামাহমস্ম্যৃক্ত্বং দ্যৌরহং পৃথিবী ত্বম্ ।
তাবিহ সং ভবাব প্রজামা জনয়াবহৈ ॥
[অথর্ববেদ, ১৪.২.৭১]
অর্থাৎ, হে বধূ! আমি (বর) জ্ঞানে পরিপূর্ণ, তুমিও প্রজ্ঞায় দীপ্তিময়। মোক্ষজ্ঞানের ন্যায় আমি পরম আনন্দময় ও আকর্ষণীয়, আর নিখিল বস্তুর গুরুত্ব ও উপযোগিতা প্রকাশকারী জ্ঞানের ন্যায় তুমি পরম সুখদাত্রী। সূর্যের ন্যায় আমি পরোপকারী, আর শস্যদায়িনী পৃথিবীর ন্যায় তুমি সন্তান প্রসবিনী ও উৎপাদনশীলা। এসো, আমরা উভয়ে ভবিষ্যৎ সন্তানদের পিতা-মাতা রূপে গৃহস্থাশ্রমরূপ এই আলয়ে একসাথে বসবাস করি।
→ আকাশ ও পৃথিবী যেমন একে অপরের পরিপূরক, কেউ কারও চেয়ে ছোট বা বড় নয়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ঠিক তেমনই। এই সমতার দর্শনে একজনের ইচ্ছার ওপর অন্যজনের হিংসাত্মক বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই।
[সূত্র: সংস্কারবিধিঃ - ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী; অথর্ববেদ - ড. তুলসী রাম শর্মা] 
 
অহং বি ষ্যামি ময়ি রূপমস্যা বেদদিৎপশ্যন্ মনসঃ কুলায়ম্ ।
ন স্তেয়মদ্মি মনসোদমুচ্যে স্বয়ং শ্রথ্নানো বরুণস্য পাশান্ ॥
[অথর্ববেদ, ১৪.১.৫৭]
অর্থাৎ, (বরের বক্তব্য)—আমি এই বধূর প্রেম ও সৌন্দর্যকে আমার অন্তরে চিরতরে ধারণ করেছি; কারণ আমি স্পষ্ট দেখতে ও জানতে পারছি যে, এখানেই আমার হৃদয় ও ভালোবাসার প্রকৃত অধিষ্ঠান। আমি ছদ্মবেশে বা গোপনে কোনো কিছুই গ্রহণ করছি না, কারণ সমস্ত নেতিবাচক বন্ধন আমি নিজেই অবমুক্ত করেছি। আমি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত, অথচ প্রেমের এক মধুর বন্ধনে স্বেচ্ছায় আবদ্ধ।
[সূত্র: সংস্কারবিধিঃ - ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী; অথর্ববেদ - ড. তুলসী রাম শর্মা] 
 
অন্যদিকে ঋগ্বেদে [৮।৩১।৫] 'যা দম্পতী সমনসা' তথা এখানে দম্পতিকে 'সমনসা' = সমমনা বলা হয়েছে তা পারস্পরিক সম্মতিরই নির্দেশক। পাশাপাশি নিম্নোক্ত মন্ত্রসমূহে পত্নী তথা স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে 'সম্রাজ্ঞী'-র ন্যায় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে—
যথা সিন্ধুর্নদীনাং সাম্রাজ্যং সুষুবে বৃষা ।
এবা ত্বং সম্রাজ্ঞ্যেধি পত্যুরস্তং পরেত্য ॥
সম্রাজ্ঞ্যেধি শ্বশুরেষু সম্রাজ্ঞ্যুত দেবৃষু ।
ননান্দুঃ সম্রাজ্ঞ্যেধি সম্রাজ্ঞ্যুত শ্বশ্র্বাঃ ॥ [অথর্ববেদ, ১৪।১।৪৩-৪৪]
সম্রাজ্ঞী শ্বশুরে ভব সম্রাজ্ঞী শ্বশ্র্বাং ভব ।
ননান্দরি সম্রাজ্ঞী ভব সম্রাজ্ঞী অধি দেবৃষু ॥ [ঋগ্বেদ ১০।৮৫।৪৬]
 
বৈদিক আর্ষগ্রন্থের মধ্যে—
ত্রিঃ স্ম মাঽহ্নো বৈতসেন দণ্ডেন হতাদকামাং স্ম মা নিপদ্যাসৈ মো স্ম ত্বা নগ্নং দর্শমেষ বৈ ন স্ত্রীণামুপচার ইতি।
[শতপথ ব্রাহ্মণ, ১১।৫।১।১]
অর্থাৎ,
১. ​ত্রিঃ স্ম মাঽহ্নো বৈতসেন দণ্ডেন হতাদ্: দিনে তিনবার (কখনও অর্থে) আমাকে যেন বৈতস দণ্ড (বেতের লাঠি বা এখানে পুরুষাঙ্গের প্রতীকী অর্থ/বলপ্রয়োগ) দ্বারা আঘাত বা জবরদস্তি না করা হয়।
২. অকামাং স্ম মা নিপদ্যাসৈ: আমার কাম বা ইচ্ছা না থাকলে (অকামাং), আমার সাথে যেন শয়ন বা শারীরিক মিলন (নিপদ্যাসৈ), না করা হয়।
৩. ​মো স্ম ত্বা নগ্নং দর্শম্: আমি যেন তোমাকে (স্বামীকে) কখনো উলঙ্গ অবস্থায় না দেখি (এটি একটি বিশেষ রূপক শর্ত ছিল)।
—​এষ বৈ স্ত্রীণামুপচার ইতি: কারণ এটাই হলো নারীদের সাথে আচরণের প্রকৃত বৈদিক নিয়ম বা সদাচার।
[সূত্র: শতপথ ব্রাহ্মণ সুধাসার ~ ড. বেদপাল সুনীথ; শতপথ ব্রাহ্মণ ~ পণ্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ উপাধ্যায়, স্বামী সত্য প্রকাশ সরস্বতী] 
 
অধিকন্তু—
জায় এহি স্বো রোহাবেতি রোহাবেত্যাহ জায়া তদ্যজ্জায়ামামন্ত্রয়তেঽর্ধো হ বা এষ আত্মনো যজ্জায়া তস্মাদ্যাবজ্জায়াং ন বিন্দতে নৈব তাবৎপ্রজায়তেঽসর্বো হি তাবদ্ভবত্যথ যদৈব জায়াং বিন্দতেঽথ প্রজায়তে তর্হি হি সর্বো ভবতি সর্ব এতাং গতিং গচ্ছানীতি তস্মাজ্জায়ামামন্ত্রয়তে।
[শতপথ ব্রাহ্মণ, ৫।২।১।১০]
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই স্ত্রী হলেন স্বামীর নিজের আত্মার (বা শরীরের) অর্ধেক অংশ তুল্য। সেই কারণে, পুরুষ যতদিন পর্যন্ত স্ত্রীকে লাভ না করে (বিবাহ না করে), ততদিন সে পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে না, সে অসমৃদ্ধ বা অপূর্ণই থেকে যায়। অতঃপর, যখনই সে স্ত্রীকে লাভ করে, তখনই সে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং সমৃদ্ধ হয়।
→ শতপথ ব্রাহ্মণোক্ত কণ্ডিকা অনুযায়ী, স্ত্রী কোনো বাহ্যিক ভোগ্যবস্তু বা দাসী নন, তিনি স্বামীর নিজেরই শরীরের ও আত্মার অর্ধেকের ন্যায়। কেউ নিজের শরীরের ওপর জোরজুলুম বা সহিংসতা করে না। তাই অর্ধাঙ্গিনীর ওপর বলপ্রয়োগ বা তাঁর অসম্মতিতে শারীরিক মিলন করা মানে নিজেরই আত্মার অবমাননা করা।
[সূত্র: শতপথ ব্রাহ্মণ সুধাসার ~ ড. বেদপাল সুনীথ; শতপথ ব্রাহ্মণ ~ পণ্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ উপাধ্যায়, স্বামী সত্য প্রকাশ সরস্বতী] 
 
আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র [১।৭।১৯] অনুযায়ী, সপ্তপদীর সময় বর উচ্চারণ করেন, 'সখে সপ্তপদী ভব...'। পত্নীকে যেখানে 'সখী' অর্থাৎ বন্ধু বলা হচ্ছে সেখানে বলপ্রয়োগের চিন্তাই অকল্পনীয়। অন্যদিকে—
যদেতদ্ধৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম ।
যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব ॥
[মন্ত্র ব্রাহ্মণ, ১।৩।৯]
অর্থাৎ, বর-বধূ পরস্পরকে বলছে 'আমার হৃদয় তোমার হোক, তোমার হৃদয় আমার হোক'। এমন সর্বজনীন সর্বোৎকৃষ্ট সাম্যবাদী দর্শনে বৈবাহিক অনৌচিত্যমূলক আচরণের প্রসঙ্গই অবান্তর।
[সূত্র: সংস্কারবিধিঃ - ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী]
 
📍আরেকটি বিষয়। সাধারণত, ব্যবহারিক সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টিতে বৈবাহিক কাম কেবল ও কেবলমাত্র প্রজননের জন্যই বিহিত, যৌনাকাঙ্ক্ষা প্রাচুর্য সেখানে মুক্তির জন্য বাধাদানকারী; হ্যাঁ এটি সত্য যে বিহিত কাম সকামীদের জন্যও শাস্ত্রে অনুমোদিত তবে যদি আমরা সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তে যাই সেখানে কেবল সন্তানই মূখ্য উদ্দেশ্য যেন সৃষ্টিক্রিয়া চলমান থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায়ও [১০.২৮] সেটিরই প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, 'প্রজনশ্চাস্মি কন্দর্পঃ' অর্থাৎ, প্রজা উৎপন্নের জন্য কাম। এই কামই বিহিত ও প্রশংসিত বলেই বিভূতিস্বরূপ হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। 
 
প্রজননের সময় যদি বলপ্রয়োগ ও পত্নীর সম্মতি না থাকে তবে তা উপবেদরূপ আয়ুর্বেদেরও বিরুদ্ধে যায়। যথা—
তত্রাত্যশিতা ক্ষুধিতা পিপাসিতা ভীতা বিমনাঃ শোকার্তা ক্রুদ্ধাঽন্যং চ পুমাংসমিচ্ছন্তী মৈথুনে চাতিকামা বা ন গর্ভং ধত্তে,বিগুণাং বা প্রজাং জনয়তি।
[চরক সংহিতা, শারীরস্থান ৮।৬]
অর্থাৎ, অতিভুক্তা, ক্ষুধিতা, পিপাসিতা, ভীতা, বিমনাঃ, শোকার্তা, ক্রুদ্ধা, রমণকালে অন্য পুরুষাকাঙ্ক্ষিণী, কিংবা অতিকামার্তা স্ত্রী গর্ভ ধারণ করে না অথবা গর্ভ গ্রহণ করলেও বিকৃত সন্তান উৎপাদন করে।
সুতরাং, সন্তানের জন্য হলেও যে জোর করতে হবে, ভয় দেখাতে হবে এই প্রসঙ্গও অবান্তর ও অযৌক্তিক এবং সরাসরি বৈদিক অনুশাসনের বিরুদ্ধে। 
 
☑️ উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক এবং বৈদিক দর্শনের পুনরুজ্জীবক মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ এবং বেদভাষ্যে দাম্পত্য জীবনের এক অত্যন্ত প্রগতিশীল ও মানবিক রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি লৌকিক বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন রীতিনীতিকে পাশ কাটিয়ে সর্বদা মূল বৈদিক সিদ্ধান্তের ওপর জোর দিয়েছেন। মহর্ষি দয়ানন্দের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিবাহিত জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সখ্য ও ধর্মের আধারে, যেখানে একে অপরের প্রতি বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তিনি দাম্পত্যে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। মহর্ষির এই বিপ্লবী বৈদিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর রচনাবলী গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্ত্রীর সম্মতি ও ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে কেবল বৈবাহিক অধিকারের দোহাই দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করাকে তিনি কখনোই শাস্ত্রসম্মত মনে করেননি, বরং একে বৈদিক সদাচারের পরিপন্থী হিসেবেই গণ্য করেছেন।
 
১. যেমন স্বয়ম্বরের রীতি আৰ্যাবৰ্তে পরস্পরাক্রমে প্রচলিত ছিল সেই বিবাহই উত্তম। স্ত্রী-পুরুষ বিবাহ করতে ইচ্ছুক হলে তখন তাদের বিদ্যা, বিনয়, শীল, রূপ, আয়ু, বল, কুল এবং শরীরের পরিমাণাদি বিষয়ে যথাযােগ্য হওয়া উচিত । যে পৰ্যন্ত এদের মিল না হবে সে পর্যন্ত বিবাহে কোন সুখ হয় না এবং বাল্যকালে বিবাহেও সুখ হয় না।
[সূত্র: সত্যার্থ প্রকাশ, ৪র্থ সমুল্লাস]
২. স্ত্রী পুরুষের প্রতি এবং পরস্পর প্রিয় আচরণ করবে এবং পুরুষ স্ত্রীর প্রতি পরস্পরের অনুকূল থাকবে।... স্ত্রী-পুরুষ পরস্পরের প্রসন্নতা ব্যতীত কোন ব্যবহার করবে না।... স্ত্রী স্বামীর প্রতি এবং স্বামী স্ত্রীর প্রতি সর্বদা প্রসন্ন থাকবে।
[সূত্র: সত্যার্থ প্রকাশ, ৪র্থ সমুল্লাস]
৩. যে স্ত্রীপুরুষাঃ পূর্ণেন ব্রহ্মচর্যেণ সর্বা বিদ্যাশিক্ষাঃ সঙ্গৃহ্য পরস্পরং প্রীত্যা স্বয়ংবরং বিবাহং কৃত্বা ঋতুগামিনো ভূত্বা বিধিবৎ প্রজামুৎপাদয়ন্তি, তেষাং সা প্রজা শুভগুণয়ুক্তা ভূত্বা পিতৄন্ সততং সুখয়তি ॥
= যে স্ত্রী-পুরুষ পূর্ণ ব্রহ্মচর্য, সর্ববিদ্যা ও শিক্ষা অর্জন করে পরস্পর প্রেমপূর্বক স্বয়ংবর বিবাহ করে— ঋতুগামী হয়ে বিধিপূর্বক সন্তান উৎপন্ন করে; তাদের সেই সন্তান শুভ গুণসম্পন্ন হয়ে পিতৃগণকে নিরন্তর সুখী করে।
[যজুর্বেদ, ১৯।৪৮ ভাবার্থ]
৪. যথা প্রীত্যা সহ বর্ত্তমানৌ স্ত্রীপুরুষৌ ধর্ম্যেণ সুতং জনয়িত্বা সুশিক্ষ্য শীলেন সংস্কৃত্য ভদ্রং কুরুতস্তথা...॥
= প্রেমপূর্বক আচরণকারী স্ত্রী-পুরুষ ধর্মানুকূলে সন্তান উৎপন্ন করে তাকে উত্তম শিক্ষাযুক্ত করে ও সদাচারে সংস্কৃত করে কল্যাণময়ী কার্য করে।
[ঋগ্বেদ, ১।১৪৪।৪ ভাবার্থ]
৫. তা এব কন্যাঃ সুখং প্রাপ্নুবন্তি যাঃ স্বাভ্যো দ্বিগুণবিদ্যাশরীরবলান্ পতীনভিরূপান্ হৃদ্যান্সুপরীক্ষ্য স্বীকুর্বন্তি তথৈব পুরুষা অপি হৃদ্যা ভার্যা উপয়চ্ছন্তি ত এব পরস্পরেণ প্রীত্যানুকূলব্যবহারেণ বীর্য্যস্থাপনাঽঽকর্ষণবিদ্যাং বুধ্বা গর্ভং ধৃত্বা সুপাল্য সর্বান্ সংস্কারান্ কৃত্বা মহাভাগ্যান্যঽপত্যানি জনয়িত্বাঽতুলমানন্দং বিজয়ঞ্চ প্রাপ্নুবন্তি নাতোঽন্যথা ব্যবহারেণ ॥
= সেই সকল কন্যাই জীবনে প্রকৃত সুখ লাভ করে, যারা নিজেদের তুল্য দ্বিতীয় সত্তাস্বরূপ বিদ্যা এবং শারীরিক বলসম্পন্ন, সুশ্রী ও হৃদয়ের প্রিয় পুরুষদের উত্তমরূপে পরীক্ষা করে পতি রূপে বরণ করে; একইভাবে পুরুষরাও নিজেদের হৃদয়ের প্রিয় নারীদেরই পত্নী রূপে বিবাহ করে। এই ধরনের যোগ্য স্ত্রী-পুরুষই পরস্পরের প্রেমপূর্ণ ও অনুকূল আচরণের মাধ্যমে বীর্যের স্থায়ীকরণ এবং বীর্যের আকর্ষণের বিজ্ঞান বা বিদ্যাকে অনুধাবন করে গর্ভধারণ করেন। অতঃপর উত্তম উপায়ে সেই গর্ভের প্রতিপালন ও সমস্ত সংস্কার সম্পন্ন করে অত্যন্ত ভাগ্যশালী সন্তানদের জন্ম দেন এবং এর মাধ্যমে অনুপম আনন্দ ও পরম বিজয় লাভ করেন; এর বিপরীত আচরণ দ্বারা তা কখনোই সম্ভব নয়।
[ঋগ্বেদ, ৩।৫৭।৩ ভাবার্থ]
৬. পরস্পরমাহ্লাদেন সন্তানোৎপাদনে কৃতে প্রশস্তরূপগুণকর্মস্বভাবান্যপত্যানি জায়ন্ত ইতি বেদ্যম্ ॥
= পরস্পর অতি প্রসন্ন হয়ে একত্রে সন্তানোৎপত্তি করলে প্রশংসনীয় রূপ-গুণ-কর্ম-স্বভাবযুক্ত সন্তান জন্মগ্রহণ করেন— এমন জ্ঞাত হওয়া উচিত।
[যজুর্বেদ, ৮।২৯ ভাবার্থ]
→ এভাবে প্রায় ৯৬টি ভাবার্থ উদ্ধৃত করা সম্ভব যেখানে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী পরস্পরের প্রসন্নতা অর্থাৎ সম্মতির মাধ্যমেই গর্ভাধানের বিষয়টি তথা সমাগমের ব্যাপারটি তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ অনেক সমাজ বা রিলিজিয়ন ম্যারাইটাল রেপ এর অস্তিত্বই যেখানে স্বীকার করেনা, বিষয়টিকে নরমালাইজ করতে চায়, সেখানে শাশ্বত বৈদিক ধর্ম এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ও আধুনিকতম বিধান দিয়েছে। এছাড়াও বাইরে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য, সম্পর্ক ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে অজস্র স্থানে উল্লেখিত হয়েছে, আমরা পূর্বেও তা বিভিন্ন প্রবন্ধে লিখেছি। লেখার কলেবর সীমিতকরণে এই প্রবন্ধে তা পুনরুক্তি করা হলো না। 
 
↗️ পরিশেষে বলা যায়, কালপ্রবাহে সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট কিছু স্মার্ত অনুশাসন বা পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক ব্যাখ্যাকে সনাতন ধর্মের সামগ্রিক বৈদিক সিদ্ধান্ত বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। সনাতন ধর্মের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে বেদের শাশ্বত সাম্যবাদে। যেখানে নিজের সহধর্মিণীকে গৃহের 'সম্রাজ্ঞী' এবং নিজের অস্তিত্বের অর্ধেক বা 'অর্ধাঙ্গিনী' রূপ দেওয়া হয়েছে, সেখানে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করা কেবল সামাজিক অপরাধই নয়, বরং সনাতন আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিতে এক পরম অধর্ম। বৈদিক যুগে ঋষিরা যে দাম্পত্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ছিল পারস্পরিক 'অনুব্রত' বা সমমনোভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত, কোনো জোরজুলুমের ওপর নয়। অতএব, আধুনিক সমাজ যখন নারীর শারীরিক স্বায়ত্তশাসন ও সম্মতির অধিকার নিয়ে লড়াই করছে, তখন সনাতন ধর্মের প্রকৃত বৈদিক সিদ্ধান্ত সেই লড়াইকে তাত্ত্বিক ও নৈতিকভাবে সমর্থন জোগায়। যেখানে মানবসৃষ্ট অনেক মতবাদই এই বিষয়ে মধ্যযুগীয় নেতিবাচক চিন্তাধারা লালন করে, বিয়ে মানেই নারীর কনসেন্টের কোন প্রয়োজন নেই এমনটা গায়ের জোরে খাটাতে চায়, সেখানে যুগের প্রয়োজনে সনাতন ধর্মের এই সদা প্রগতিশীল ও মানবিক রূপটি প্রকাশ করা এবং বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতরে যেকোনো ধরনের সহিংসতাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নিন্দা করা আজ অত্যন্ত জরুরি।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)