✅ 'এক' ঈশ্বরের ঔপনিষদিক প্রমাণ
▪️মূখ্য উপনিষদগুলোর প্রমাণের আলোকে
বৈদিক দর্শনের ব্রহ্মবিদ্যার স্বতন্ত্র রচনার শীর্ষস্থানীয় আকর এবং বৈদিক সাহিত্যের অন্তিম ভাগ হলো উপনিষদ, যা 'বেদান্ত' নামেও পরিচিত। উপনিষদের মূল অনুসন্ধান হলো পরম সত্য বা ব্রহ্মের স্বরূপ উদ্ঘাটন করা। দৃশ্যমান এই বহুত্ববাদী জগতের অন্তরালে যে একটিমাত্র শাশ্বত, অবিভাজ্য এবং পরম চেতন সত্তা ক্রিয়াশীল, উপনিষদসমূহ বিভিন্ন উপমা, যুক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির আলোকে তা বারবার প্রমাণ করেছে। ঋষিদের এই উপলব্ধি কোনো বহু-ঈশ্বরবাদের ধারণা নয়, বরং তা এক পরমেশ্বরের অদ্বৈত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান সংকলনটিতে মুখ্য উপনিষদগুলোর (যেমন ঈশ, মুণ্ডক, কঠ, ঐতরেয়, শ্বেতাশ্বতর এবং বৃহদারণ্যক) বিশেষ বিশেষ মন্ত্রের আলোকে সেই 'এক' ঈশ্বরের ঔপনিষদিক প্রমাণসমূহকে সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের বুদ্ধি ও চেতনাকে বহুত্বের মোহ থেকে মুক্ত করে একত্বের পরম শান্তিতে উন্নীত করে।
অনেজদেকং মনসো জবীয়ো নৈনদ্দেবাঽআপ্নুবন্ পূর্বমর্ষৎ।
তদ্ধাবতোঽন্যানত্যেতি তিষ্ঠত্তস্মিন্নপো মাতরিশ্বা দধাতি॥
ঈশোপনিষদ্ ৪ [যজুর্বেদ ৪০।৪]
সরলার্থ: হে বিদ্বান মনুষ্যগণ! যিনি 'একং' = অদ্বিতীয় ব্রহ্ম, তিনি কম্পন-রহিত, তিনি মনের বেগ থেকেও অতি বেগবান, সকলের পূর্বে গমন করেন। চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়সমূহ এই ব্রহ্মকে লাভ করতে বা জানতে পারে না। তিনি স্বয়ং নিজ স্বরূপে স্থির থেকে, নিজের অনন্ত ব্যাপ্তি দ্বারা বিষয়ের প্রতি ধাবমান আত্মস্বরূপ থেকে ভিন্ন মন, বাক্ আদি ইন্দ্রিয়কে অতিক্রম করে যান। যেরূপ অন্তরিক্ষে প্রাণ-সকলকে ধারণকারী বায়ু ক্রিয়াশীল থাকে, ওইরূপ সেই সর্বত্র অভিব্যাপ্ত স্থির ব্রহ্মে জীব নিজের কর্ম বা ক্রিয়াকে ধারণ (স্থাপিত) করে।
তদেতদৃচাঽভ্যুক্তম্ ক্রিয়াবন্তঃ শ্রোত্রিয়া ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ স্বয়ং জুহ্বত একর্ষিং শ্রদ্ধয়ন্তঃ।
তেষামেবৈতাং ব্রহ্মবিদ্যাং বদেত শিরোব্রতং বিধিবদ্য়ৈস্তু চীর্ণম্॥
মুণ্ডকোপনিষদ্ ৩।২।১০
সরলার্থ: ওই ব্রহ্মবিদ্যার বিষয়ে এ কথা ঋক্ দ্বারা বলা হয়েছে— যাঁরা বেদবিহিত কর্মের অনুষ্ঠানকারী, বেদবিদ্যায় কুশল, ব্রহ্মপরায়ণ ও শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে নিজে 'একর্ষিম্' = অদ্বিতীয় ব্রহ্মকে উপাসনা করেন, আর যাঁরা ব্রহ্মবিদ্যার প্রাপ্তিরূপ মুখ্যব্রতকে শাস্ত্রের আজ্ঞাপূর্বক ধারণ করেছেন, তাঁদেরই এই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ দিবে।
অর্থাৎ, এখানে পরম সত্যকে 'একর্ষি' বা অদ্বিতীয় পরম জ্ঞাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মন্ত্রটি নির্দেশ করে যে, ব্রহ্মবিদ্যা বা ঈশ্বরের একত্বের জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি লাভ করার জন্য পবিত্রতা, সংযম (শিরোব্রত) এবং নিষ্ঠাপূর্ণ উপাসনার প্রয়োজন। যাঁরা সৎকর্মশীল ও শ্রদ্ধাবান, একমাত্র তাঁদের অন্তরেই এই পরম একত্বের বোধ জাগ্রত হয়।
নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহূনাং য়ো বিদধাতি কামান্।
তমাত্মস্থং য়েঽনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্॥
কঠোপনিষদ্ ২।২।১৩
সরলার্থ: যিনি নিত্য প্রকৃতি ও নিত্য জীবের মধ্যে কূটস্থ নিত্য, চেতনধর্মা জীবের মধ্যেও চেতনস্বরূপ এবং পরিচ্ছিন্ন চরাচর বস্তুর মধ্যে একমাত্র অপরিচ্ছিন্ন। যিনি জীবদের কর্মানুসারে ফল দান করেন, সেই পরমাত্মাকে যে বিবেকী মনুষ্য জীবাত্মার মধ্যে স্থিত জানেন, তাঁদের শাশ্বত শান্তি প্রাপ্তি হয়; অন্য কারো হয় না।
আলোচ্য শ্রুতি অনুযায়ী, জগতে প্রকৃতি এবং জীবাত্মা—উভয়কেই নিত্য বলা হলেও, পরমেশ্বর হলেন 'নিত্যেরও নিত্য' এবং 'চেতনেরও চেতন'। অর্থাৎ, তাঁর থেকেই বাকি সব সত্তা স্থায়িত্ব ও চেতনা লাভ করে। বহু জীবের কর্মফল দাতা হিসেবে তিনি এক ও অদ্বিতীয়। চঞ্চল জগতের পেছনে থাকা এই এক পরমাত্মাকে যিনি নিজের অন্তরে উপলব্ধি করেন, তিনিই কেবল শাশ্বত শান্তির অধিকারী হন।
আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ। নান্যৎ কিঞ্চন মিষৎ।
স ঈক্ষত লোকান্নু সৃজা ইতি॥
ঐতরেয় উপনিষদ্ ১।১।১
সরলার্থ: নিশ্চিতরূপে এই পরমাত্মা সৃষ্টির পূর্বে একাই ছিলেন, তিনি ভিন্ন অন্য কেউ তখন ক্রিয়াশীল ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলেন যে, “আমি লোকসমূহ রচনা করবো"।
অর্থাৎ, সৃষ্টির আদি রহস্য প্রকাশ করতে গিয়ে এই মন্ত্রটি স্পষ্ট করে যে, সৃষ্টির পূর্বে উপাদান বা নিমিত্ত হিসেবে অন্য কোনো দ্বিতীয় সত্তা ছিল না; কেবল 'এক' পরমাত্মাই বিদ্যমান ছিলেন। তাঁর আদি সংকল্প বা ইচ্ছার (ঈক্ষণ) ফলেই এই বহুবিস্তৃত মহাবিশ্ব ও লোকসমূহের উৎপত্তি ঘটেছে। ফলে সৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়।
য় একো জালবানীশত ঈশনীভিঃ সর্বাꣳল্লোকানীশত ঈশনীভিঃ।
য় এবৈক উদ্ভবে সম্ভবে চ য় এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।১
সরলার্থ: যিনি অদ্বিতীয়, সংসাররূপী মায়াজালের বিস্তারকারী, নিজের শাসন-শক্তি দ্বারা সংসারের ওপর শাসন করেন, যিনি সূর্যাদি লোকসমূহকে নিজের মহান-শক্তি দ্বারা যথাযথ নিয়মে চালনা করেন এবং যিনি একাই জগতের উৎপত্তি ও স্থিতি করতে সমর্থ— ওই ব্রহ্মকে যাঁরা জানেন, তাঁরা ‘অমৃত’ হন অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হন।
অর্থাৎ, এই মন্ত্রে ব্রহ্মের অচিন্ত্য, রূপবর্জিত ও পরম গতির কথা বলা হয়েছে। তিনি জড় ইন্দ্রিয় বা চঞ্চল মনের ধারণার অতীত, কারণ ইন্দ্রিয়গুলো সসীম আর তিনি অসীম। তিনি পরম স্থির হয়েও সর্বব্যাপী হওয়ায় জগতের সমস্ত গতিশীল বস্তুর আগেই বিদ্যমান থাকেন। মহাজগতে বায়ু যেমন সমস্ত প্রাণশক্তি ও গতিকে ধারণ করে, তেমনি সেই এক পরমেশ্বর নিজের স্থির সত্তায় সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের কর্ম ও শক্তিকে ধারণ করে আছেন।
এই শ্রুতিতে, ঈশ্বরকে জগৎরূপী জালের নিয়ন্তা বলা হয়েছে। এই দৃশ্যমান জগৎ একটি জটিল জালের মতো, যার সৃষ্টি, স্থিতি এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে এক পরম চালিকাশক্তি। তিনি নিজের শাসন-শক্তি বা নিয়ম দ্বারা সূর্য, নক্ষত্রসহ সমগ্র মহাবিশ্বকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছেন। এই একত্বকে জানাই অমৃতত্ব বা মুক্তির পথ।
একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ য় ইমাংল্লোকানীশত ঈশনীভিঃ।
প্রত্যঙ্ জনাংস্তিষ্ঠতি সঞ্চুকোচান্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।২
সরলার্থ: নিশ্চয়ই পরমাত্মা এক, অদ্বিতীয়; পরমাত্মা দুই অথবা তারও অধিক— এরূপ যারা বলে, তারা সঠিক নয়। যিনি এই লোকসমূহকে নিজের মহান শাসন-শক্তি দ্বারা যথাযথ নিয়মে চালনা করেন, তিনি প্রত্যেক জীবের অন্তরে স্থিত। তিনিই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড রচনা করে, এই সৃষ্টির রক্ষক হন অর্থাৎ স্থিতি প্রদান করেন এবং প্রলয়কালে সংহার করেন।
এখানে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বহু-ঈশ্বরবাদের ধারণাকে খণ্ডন করে বলা হয়েছে যে পরমাত্মা এক এবং অদ্বিতীয়, দ্বিতীয় কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। তিনিই 'রুদ্র'—যিনি সৃষ্টির আদি, মধ্য ও অন্তের নিয়ন্তা। তিনি দূরে কোথাও নন, বরং প্রত্যেকটি জীবের অন্তরে অন্তর্যামী রূপে অবস্থান করেন এবং প্রলয়কালে সমস্ত সৃষ্টিকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেন।
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৩।৩ (যজু০ ১৭।১৯ ॥ ঋ০ ১০।৮১।৩)
সরলার্থ: যিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্ববক্তা, সর্বধারক ও সর্বগত, তিনি অদ্বিতীয় পরমাত্মদেব। তিনিই প্রকৃতির ত্রিগুণাত্মক পরমাণুসমূহ দ্বারা সূর্যাদি প্রকাশমান লোকসমূহ ও পৃথিবীকে যথার্থরূপে উৎপন্ন করে, স্বীয় অনন্ত বল (সামর্থ্য) দ্বারা সম্পূর্ণ জগৎকে চালনা করছেন।
অর্থাৎ, এখানে শ্রুতিটি ঈশ্বরের সর্বব্যাপী রূপক প্রকাশ করে। তাঁর চোখ, মুখ, হাত ও পা সর্বত্র—এর অর্থ তিনি একাধারে সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা এবং সর্বব্যাপী। জড় প্রকৃতির সূক্ষ্মতম পরমাণুগুলোকে একত্রিত করে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পেছনে কেবল সেই 'এক' পরম দেবেরই অনন্ত সামর্থ্য কাজ করছে, যাঁর কোনো অন্য সহায়ক নেই।
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মং কলিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্।
বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাত্বা শিবং শান্তিমত্যন্তমেতি॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৪।১৪
সরলার্থ: যিনি গহন সংসারের মধ্যে বিদ্যমান, সূক্ষ্ম থেকেও অতি সূক্ষ্ম, অনেক রূপবান পদার্থসমূহের রচয়িতা এবং সম্পূর্ণ জগতের একমাত্র পরিব্যাপক, সেই কল্যাণস্বরূপ পরমাত্মাকে জেনেই মানুষ অত্যধিক শান্তি লাভ করে।
অর্থাৎ, সংসারের এই জটিল ও গহন আবর্তের মাঝেও ঈশ্বর সূক্ষ্ম থেকে অতি সূক্ষ্মতর রূপে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তিনি এক হয়েও জগতের বিচিত্র রূপের রচয়িতা। মহাবিশ্বের কোণায় কোণায় পরিব্যাপ্ত সেই এক কল্যাণময় সত্তাকে যখন মানুষ চিনতে পারে, তখন তার জাগতিক সকল দুঃখের অবসান ঘটে এবং সে পরম শান্তি লাভ করে।
য়ো য়োনিং য়োনিমধিতিষ্ঠত্যেকো বিশ্বানি রূপাণি য়োনীশ্চ সর্বাঃ।
ঋষিং প্রসূতং কপিলং য়স্তমগ্রে জ্ঞানৈর্বিভর্তি জায়মানং চ পশ্যেৎ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৫।২
সরলার্থ: যে পরমাত্মা প্রত্যেক যোনির 'একঃ' = একমাত্র অধিষ্ঠাতা এবং সমস্ত আকৃতিযুক্ত পদার্থের রূপ এবং সকলের উৎপত্তির কারণ, যিনি পুরাকালে উৎপন্ন কপিল ঋষিকে জ্ঞান দ্বারা পূর্ণ করেছিলেন; সৃষ্টিতে প্রকট সেই পরমাত্মাকে মুমুক্ষুগণ দর্শন (সম্যক্ উপলব্ধি) করেন।
অর্থাৎ, যিনি সমগ্র সৃষ্টির আদি উৎস এবং সমস্ত রূপ ও গুণের পরম অধিষ্ঠাতা, তিনিই এক ঈশ্বর। যিনি মহর্ষি কপিলকে দিব্য জ্ঞানে পূর্ণ করেছিলেন, তিনি কোনো সাধারণ সত্তা নন—তিনি সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর, যাঁর জ্ঞান স্বয়ম্ভূ ও আদিহীন।
একৈকং জালং বহুধা বিকুর্বন্নস্মিন্ ক্ষেত্রে সংহরত্যেষ দেবঃ।
ভূয়ঃ সৃষ্ট্বা পতয়স্তথেশঃ সর্বাধিপত্যং কুরুতে মহাত্মা॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৫।৩
সরলার্থ: এই দিব্য গুণযুক্ত 'একৈকং' = এক পরমেশ্বরই প্রত্যেক সংসাররূপী জালকে নানাভাবে বিস্তার করে আবার প্রলয়কালে এই সৃষ্টির সংহার করেন। হে সংযমী বিদ্বানগণ! জগতের স্বামী পরমাত্মা পূর্বের ন্যায় পুনরায় এই সৃষ্টিকে রচনা করে সবার ওপর আধিপত্য করেন।
অর্থাৎ, এই শ্রুতিটি ঈশ্বরের মহাজাগতিক লীলা বা চক্রকে নির্দেশ করে। তিনি একাই এই সৃষ্টিরূপ জালকে বারবার বিস্তার করেন (সৃষ্টি) এবং আবার তা গুটিয়ে নেন (প্রলয়)। সময়ের এই অনন্ত চক্রে পরমাত্মা পরম স্বতন্ত্র থেকে জগতের প্রতিটি স্তরে তাঁর সর্বাধিপত্য ও মহিমা বজায় রাখেন।
সর্বা দিশ ঊর্ধ্বমধশ্চ তির্যক্ প্রকাশয়ন্ ভ্রাজতে য়দ্বনড্বান্।
এবং স দেবো ভগবান্ বরেণ্যো য়োনিস্বভাবানধিতিষ্ঠত্যেকঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৫।৪
সরলার্থঃ যেরূপ সূর্য সকল দিকে ঊর্ধ্বে, নিম্নে, তির্যকভাবে প্রকাশ করে স্বয়ং প্রকাশমান, তদ্রূপ সেই ঐশ্বর্যবান, বরণীয় পরমাত্মা 'একঃ' = একাই সকল যোনির ও এদের স্বভাবের অধিষ্ঠাতা।
অর্থাৎ, আকাশে সূর্য যেমন একাকী উদিত হয়ে কোনো বৈষম্য ছাড়াই উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম—সব দিককে আলোড়িত ও প্রকাশিত করে, ঠিক তেমনি পরমেশ্বর এক ও অদ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও নিজের মহিমায় সমগ্র সৃষ্টি, সব দাতা শক্তি এবং প্রকৃতির সমস্ত স্বভাবকে উদ্ভাসিত ও নিয়ন্ত্রণ করছেন।
একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা।
কর্মাধ্যক্ষঃ সর্বভূতাদিবাসঃ সাক্ষী চেতা কেবলো নির্গুণশ্চ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৬।১১
সরলার্থ: পরমদেব পরমেশ্বর এক (অদ্বিতীয়); তিনি সকল প্রাণীর মধ্যে গূঢ়ভাবে বিদ্যমান, সর্বব্যাপক হয়ে সকল প্রাণীর আত্মার মধ্যে অন্তর্যামীরূপে স্থিত এবং সবার কর্মের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ যথাযোগ্য কর্মফল প্রদানকারী। তিনিই সর্বভূতের নিবাসস্থান, সকল জীবের শুভাশুভ কর্মের দ্রষ্টা, চেতনস্বরূপ এবং গুণাতীত।
অর্থাৎ, এটি উপনিষদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্ত্র, যা ঈশ্বরের সম্পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে। ঈশ্বর এক; কিন্তু তিনি জগতের বাইরে নন, বরং সর্বভূতে গূঢ় বা প্রচ্ছন্ন আছেন। তিনি আমাদের সকল কর্মের সাক্ষী ও চেতনাস্বরূপ। তিনি জগতের সবকিছুর আধার হয়েও নিজে 'নির্গুণ' এবং 'কেবল', অর্থাৎ সমস্ত জাগতিক সীমাবদ্ধতা ও গুণের অতীত।
নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহূনাং য়ো বিদধাতি কামান্।
তৎ কারণং সাংখ্যয়োগাধিগম্যং জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাশৈঃ॥
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্ ৬।১৩
সরলার্থ: যিনি নিত্যগণের মধ্যে নিত্য, চেতনগণের মধ্যে চেতন, যিনি 'একঃ' = একাই অনেক জীবের কামনাসমূহ পূর্ণ করেন, এই জগতের কারণভূত, সাংখ্য ও যোগ দ্বারা অধিগম্য, সেই পরমাত্মাকে জেনেই মানুষ সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হন।
অর্থাৎ, সমস্ত নিত্য বস্তুর যিনি পরম আশ্রয় এবং সমস্ত চেতনের যিনি মূল চেতনা, সেই এক ঈশ্বরই বহু জীবের অগণিত কামনা ও প্রয়োজন পূরণ করেন। জ্ঞান (সাংখ্য) এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সাধনা (যোগ) দ্বারা লভ্য এই আদি কারণকে জানতে পারলে মানুষের অন্তরের সমস্ত জাগতিক বন্ধন ও মোহ চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায়।
তদাহুঃ, যদয়মেক ইবৈব পবতে, অথ কথমধ্যর্ধ ইতি; যদস্মিন্নিদং সর্বমধ্যার্ধ্নোৎ, তেনাধ্যর্ধ ইতি; কতম একো দেব ইতি; প্রাণ ইতি স ব্রহ্ম ত্যদিত্যাচক্শতে ॥
বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৩।৯।৯
ভাবার্থ: যিনি এক, তিনিই বহুরূপে প্রকাশিত। আপাতদৃষ্টিতে প্রাণশক্তি বা বায়ু যখন জগতে প্রবাহিত হয়, তখন তাকে এক মনে হলেও তা জগতের সমস্ত কিছুকে নিজের ভেতর পুষ্ট ও বর্ধিত করে (অধ্যর্ধ)। বহু দেবতার ধারণার গভীরে গিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য স্পষ্ট করেছেন যে, পরম সত্য আসলে 'একই'—যিনি প্রাণস্বরূপ ব্রহ্ম।
মনসৈবানুদ্রষ্টব্যং, নেহ নানাস্তি কিঞ্চন ।
মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানেব পশ্যতি ॥
একধৈবানুদ্রষ্টব্যমেতদপ্রময়ং ধ্রুবম্ ।
বিরজঃ পর আকাশাদজ আত্মা মহান্ধ্রুবঃ ॥
বৃহদারণ্যক ৪।৪।১৯-২০
ভাবার্থ: পরমেশ্বরকে কেবল শুদ্ধ ও একাগ্র মন দিয়েই অনুভব করা যায়। এই সত্যে কোনো বহুত্ব বা নানাভাব নেই। যে অজ্ঞ ব্যক্তি এখানে বহু বা ভিন্ন কিছু দেখে, সে বারবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হয়। সেই জন্মরহিত, পবিত্র, আকাশের চেয়েও মহান এবং ধ্রুব পরমাত্মাকে এক ও অদ্বিতীয় রূপেই দর্শন করা উচিত।
উপরিউক্ত উপনিষদসমূহের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনা করলে এটি সুষ্পষ্ট হয় যে, বৈদিক ঋষিদের পরম অনুভূতি কোনো বহুত্ববাদী উপাসনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। উপনিষদের ঋষিগণ জগৎ ও জীবনের বৈচিত্র্যের গভীরে প্রবেশ করে এক পরম অখণ্ড সত্তার সন্ধান পেয়েছিলেন। ঈশ্বরের এই 'একত্ব' কেবল সংখ্যার দিক থেকে এক নয়, বরং তা এক পরম তত্ত্ব—যিনি সৃষ্টির আদি কারণ, স্থিতির আধার এবং প্রলয়ের পরম আশ্রয়। তিনি সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ, সর্বভূতের অন্তরাত্মা এবং নিয়ন্তা। উপনিষদের এই একমেবাদ্বিতীয়ম্ শিক্ষা মানুষকে সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র সৃষ্টির মাঝে একাত্মবোধ জাগ্রত করতে শেখায়। এই পরম সত্যের উপলব্ধিই মানুষের জীবনের চরম লক্ষ্য এবং শাশ্বত শান্তি ও মুক্তির একমাত্র পথ।
🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ-বেদান্ত-স্মৃতি-পৌরোহিত্য-আয়ুর্বেদতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
