দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







সৎগুরু ও ভণ্ড গুরুর লক্ষণ

সত্যান্বেষী
0

সৎগুরু ও ভণ্ড গুরুর লক্ষণ

প্রিয় ভ্রাতৃবৃন্দ ও মাতৃশক্তি,
আজ আমরা এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিষয়টি হলো—সৎগুরু কে এবং ভণ্ড গুরু কে? মানুষ যখন জীবনের দুঃখ, অশান্তি, সংশয় ও অজ্ঞতা থেকে মুক্তির পথ খোঁজে, তখন সে একজন পথপ্রদর্শকের সন্ধান করে। আর সেই প্রয়োজন থেকেই সমাজে গুরুর মর্যাদা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি বিপদও রয়েছে। যেখানে সত্যের প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় ভণ্ডামি প্রবেশ করে; যেখানে জ্ঞানের প্রয়োজন, সেখানে অন্ধবিশ্বাস স্থান নেয়; যেখানে মানুষকে মুক্ত করার কথা, সেখানে মানুষকেই কোনো ব্যক্তির প্রতি পরাধীন করে রাখা হয়। তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কাকে আমরা গুরু বলে গ্রহণ করব? কারও বাহ্যিক বেশ দেখে, কারও বিপুল সংখ্যক অনুসারী দেখে, কারও আশ্রমের জাঁকজমক দেখে, কারও অলৌকিকতার দাবি শুনে, নাকি তাঁর বিদ্যা, চরিত্র, উপদেশ ও আচরণ বিচার করে?
 
এই বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সত্যার্থপ্রকাশের একাদশ সমুল্লাসে লিখেছেন—“এই গুরুমাহাত্ম্য ও গুরুগীতাও একটি বড় পোপলীলা। গুরু হলেন মাতা, পিতা, আচার্য ও অতিথি। তাঁদের সেবা করা, তাঁদের কাছ থেকে বিদ্যা ও শিক্ষা গ্রহণ করা এবং দেওয়া—এটাই শিষ্য ও গুরুর কর্তব্য। কিন্তু যে গুরু লোভী, ক্রোধী, মোহগ্রস্ত ও কামাসক্ত, তাকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা উচিত।” কী গভীর কথা! মহর্ষি দয়ানন্দ এখানে গুরুর মর্যাদাকে অস্বীকার করেননি; বরং প্রকৃত গুরুর মর্যাদা রক্ষা করেছেন। তিনি আমাদের বুঝিয়েছেন—গুরু হওয়া কোনো বাহ্যিক পদ বা উপাধি নয়। গুরুর মধ্যে থাকতে হবে বিদ্যা, সদ্‌গুণ, সংযম ও চরিত্র।
তিনি আরও বলেছেন—“যাঁদের মধ্যে বিদ্যা প্রভৃতি সদ্‌গুণের গুরুভাব বা শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যারা মিথ্যা-মিথ্যা কণ্ঠী, তিলক এবং বেদবিরুদ্ধ মন্ত্রের উপদেশ দেয়, তারা গুরু তো নয়ই, বরং মেষপালকের মতো। যেমন মেষপালকেরা নিজেদের ভেড়া-বকরির দুধ ইত্যাদির দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন সিদ্ধ করে, তেমনই তারা শিষ্যদের—চেলা-চেলিদের—ধন হরণ করে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করে।” অতএব, আসুন আমরা বিচার করি—সৎগুরুর লক্ষণ কী এবং ভণ্ড গুরুর লক্ষণ কী কী।
  • সৎগুরুর লক্ষণ
১. সৎগুরু বেদের জ্ঞানী ও উপদেশক হন এবং বেদ অনুযায়ী আচরণ করার শিক্ষা দেন।
প্রকৃত গুরু প্রথমেই জ্ঞানের অধিকারী। তিনি নিজে সত্যকে জানেন এবং অন্যকে সত্য জানার পথে পরিচালিত করেন। শুধু অনেক কথা বলতে পারলেই কেউ জ্ঞানী হন না, অনেক শাস্ত্রের নাম বলতে পারলেই কেউ শাস্ত্রজ্ঞ হন না। গুরুর প্রকৃত পরিচয় হলো—তিনি কী জানেন এবং সেই জ্ঞান মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়। সৎগুরু মানুষকে অন্ধভাবে নিজের কথা মানতে বলেন না। তিনি শিষ্যকে জ্ঞান অর্জন করতে শেখান, সত্য-মিথ্যার বিচার করতে শেখান এবং যুক্তি ও বিবেক প্রয়োগ করতে শেখান। তিনি যদি বেদের কথা বলেন, তাহলে তাঁর নিজের জীবনেও বৈদিক নীতি ও সত্যের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। কারণ যে নিজেই অন্ধকারে রয়েছে, সে অন্যকে আলো দেখাবে কীভাবে? তাই সৎগুরু হলেন তিনি, যিনি নিজে বিদ্যাবান এবং শিষ্যকেও বিদ্যা ও সত্যের পথে এগিয়ে দেন।
২. সৎগুরু সত্যবাদী, ধর্মাত্মা, সংযমী ও সদাচারী হন।
একজন গুরুর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর চরিত্র। তিনি কী বলেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি নিজে কীভাবে জীবনযাপন করেন। যিনি সত্যের কথা বলেন কিন্তু নিজে অসত্য বলেন, যিনি সংযমের কথা বলেন কিন্তু নিজে অসংযমী, যিনি ধর্মের কথা বলেন কিন্তু নিজের আচরণে অধর্ম করেন—তাঁর কথার সঙ্গে তাঁর জীবনের সামঞ্জস্য থাকে না। সৎগুরুর মধ্যে সত্যনিষ্ঠা থাকবে, নৈতিকতা থাকবে, সংযম থাকবে, সদাচার থাকবে। তাঁর জীবনই হবে তাঁর শিক্ষার জীবন্ত উদাহরণ। তাই গুরু নির্বাচন করার সময় শুধু তাঁর বক্তৃতা শুনলেই হবে না; দেখতে হবে—তিনি বাস্তব জীবনে কেমন মানুষ।
৩. সৎগুরু লোভী হন না; ধনের প্রতি আসক্ত না হয়ে সরল জীবনযাপন করেন।
মহর্ষি দয়ানন্দ বিশেষভাবে বলেছেন—লোভী গুরু হলে তাঁকে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ যার কাছে শিষ্যের কল্যাণের চেয়ে শিষ্যের ধন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি কীভাবে শিষ্যের প্রকৃত হিত করবেন? সৎগুরু শিষ্যের বিশ্বাসকে নিজের অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানাবেন না। ধর্মের নামে মানুষের ভয় ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজের ধনসম্পদ বৃদ্ধি করবেন না। প্রয়োজনীয় জীবিকা বা ধর্মীয় কাজের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এক বিষয়; কিন্তু ধর্মকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত লোভ, ভোগবিলাস ও সম্পদসঞ্চয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তির আশ্রম যত বড়, তাঁর অনুসারী যত বেশি, তাঁর জীবনযাপন যত জাঁকজমকপূর্ণ—তাতেই তাঁর গুরুভাব প্রমাণিত হয় না। গুরুর মহত্ত্ব তাঁর সম্পদে নয়; তাঁর ত্যাগ, সরলতা ও চরিত্রে।
৪. সৎগুরু সকলের হিত কামনা করেন; তাঁর মধ্যে দয়া, ক্ষমা, প্রেম ও সেবার ভাব থাকে।
সৎগুরুর হৃদয় সংকীর্ণ হয় না। তিনি শুধু নিজের অনুসারীদের কল্যাণ চান না; তিনি সকল মানুষের হিত কামনা করেন। তিনি মানুষের দুঃখে সহানুভূতিশীল হন, দুর্বলকে সাহায্য করেন, ভুলকারীকে সংশোধনের সুযোগ দেন এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি শিষ্যকে কেবল নিজের সেবা করতে শেখাবেন না। তিনি শেখাবেন—পরিবারের সেবা করো, সমাজের সেবা করো, মানুষের উপকার করো, সত্য ও ন্যায়ের জন্য কাজ করো। কারণ প্রকৃত ধর্ম মানুষকে সংকীর্ণ করে না; বরং হৃদয়কে বিস্তৃত করে। যে শিক্ষায় দয়া নেই, সেবা নেই, পরহিত নেই—সেই শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে।
৫. সৎগুরু শিষ্যকে আত্মজ্ঞান, বিদ্যা ও সত্যের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করেন।
এখানে গুরু ও ভণ্ড গুরুর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সৎগুরু শিষ্যকে নিজের উপর নির্ভরশীল করেন না; জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল করেন। তিনি শিষ্যকে বলেন না—“তুমি কিছু জানো না, শুধু আমাকে অনুসরণ করো।” বরং তিনি শিষ্যকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেন, প্রশ্ন করতে শেখান, চিন্তা করতে শেখান এবং নিজের জীবনের সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শেখান। শিষ্য যেন অন্ধ অনুসারী না হয়ে একজন জ্ঞানী, বিবেকবান ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ হয়ে ওঠে—সৎগুরুর উদ্দেশ্য সেটিই। তাই কোনো গুরুর সান্নিধ্যে গিয়ে যদি আমাদের জ্ঞান, বিবেক ও সত্যবোধ বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটি ইতিবাচক লক্ষণ। আর যদি আমরা ক্রমশ নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে শুধু একজন ব্যক্তির কথার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
৬. সৎগুরু নিন্দা ও প্রশংসায় সমভাবাপন্ন এবং ক্রোধ ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকেন।
প্রশংসা কে না ভালোবাসে? কিন্তু প্রকৃত মহত্ত্ব তখনই প্রকাশ পায়, যখন মানুষ নিন্দা ও প্রশংসা—উভয়কেই সংযমের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে। কেউ প্রশংসা করলে সৎগুরু নিজের মহত্ত্ব প্রচার করতে ব্যস্ত হন না। আবার কেউ যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন বা সমালোচনা করলে তিনি ক্রোধে ফেটে পড়েন না। কারণ তাঁর উদ্দেশ্য নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা নয়; সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা। অহংকারী ব্যক্তি চায়—সবাই তাকে মানুক। কিন্তু সৎগুরু চান—মানুষ সত্যকে মানুক। এই পার্থক্যটি খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. সৎগুরু নিজের জীবনকে আদর্শ করে তোলেন এবং আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দেন।
ভ্রাতৃবৃন্দ, একটি কথা মনে রাখবেন—উপদেশ শোনা যায়, কিন্তু চরিত্র দেখা যায়। একজন গুরু যদি বলেন—সত্যবাদী হও, অথচ নিজে মিথ্যা বলেন, তাহলে তাঁর উপদেশ কতটা কার্যকর হবে? যদি বলেন—লোভ ত্যাগ করো, অথচ নিজেই অর্থের জন্য ব্যাকুল থাকেন? যদি বলেন—অহংকার ত্যাগ করো, অথচ নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করেন? যদি বলেন—সংযমী হও, অথচ নিজে সংযমহীন জীবনযাপন করেন? তাহলে তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সৎগুরুর জীবন তাঁর উপদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তিনি যা শেখান, নিজেও তা পালন করেন। এটাই প্রকৃত গুরুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
  • ভণ্ড গুরুর লক্ষণ
এবার আমাদের আরও সতর্ক হয়ে দেখতে হবে—ভণ্ড গুরু কাকে বলা যায়? কারণ ভণ্ডামি সবসময় বাহ্যিকভাবে সহজে ধরা পড়ে না। অনেক সময় বাহ্যিক ধর্মীয় বেশ, মিষ্টি কথা, বড় আশ্রম, বিপুল অনুসারী কিংবা অলৌকিকতার দাবি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দেয়। তাই ব্যক্তির প্রচার নয়, তাঁর জ্ঞান ও চরিত্র বিচার করতে হবে।
১. তিনি বেদের জ্ঞানী নন এবং বেদের বিপরীত মত প্রচার করেন।
ভণ্ড গুরু অনেক সময় ধর্মীয় শব্দ ও শাস্ত্রের নাম ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত শাস্ত্রজ্ঞান থাকা এবং শাস্ত্রের নাম ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। যিনি বেদের বক্তব্য না জেনেই নিজের মনগড়া মতকে বৈদিক বলে প্রচার করেন, তাঁর বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মহর্ষি দয়ানন্দ বিশেষভাবে বেদবিরুদ্ধ মন্ত্রোপদেশ এবং বিদ্যাহীন গুরুর সমালোচনা করেছেন। তাই শুধু কণ্ঠী, তিলক, বিশেষ পোশাক, জটা, দাড়ি কিংবা কোনো বাহ্যিক চিহ্ন দেখে কাউকে বৈদিক গুরু বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। বাহ্যিক পরিচয় নয়—জ্ঞানই বিচার্য।
২. তিনি অসত্যবাদী, ভণ্ড, কপট ও দুরাচারী হন।
ভণ্ডামির মূল হলো—বাহ্যিকভাবে একরকম দেখানো, অথচ বাস্তবে অন্যরকম হওয়া। ধর্মীয় ভাষায় সুন্দর সুন্দর কথা বলা খুব সহজ; কিন্তু সেই কথাকে নিজের জীবনে পালন করা কঠিন। তাই কোনো গুরুর বক্তৃতায় মুগ্ধ হওয়ার আগে তাঁর আচরণ দেখতে হবে। তিনি মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন? অর্থের ব্যাপারে কেমন? ক্ষমতা ও সম্মানের ব্যাপারে কেমন? নিজের ভুল স্বীকার করেন কি? শিষ্যের সঙ্গে তাঁর আচরণ কেমন? এই বাস্তব বিষয়গুলিই তাঁর চরিত্রকে প্রকাশ করে।
৩. তিনি ধন, মান ও যশের লোভী এবং বিলাসিতাপূর্ণ জীবনযাপন করেন।
মহর্ষি দয়ানন্দের সতর্কবাণী এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—লোভী গুরুকে পরিত্যাগ করতে হবে। ধর্ম যদি মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের পথ হয়, তাহলে সেই ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও বিলাসিতা বৃদ্ধি করা গুরুসুলভ আচরণ নয়। যদি কোনো ব্যক্তি ক্রমাগত শিষ্যের কাছ থেকে অর্থ, উপহার, সম্পত্তি বা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে নিজের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করতে থাকেন, তাহলে তাঁর উদ্দেশ্য বিচার করা প্রয়োজন। প্রশ্ন করতে হবে—শিষ্য কি গুরুর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে, নাকি গুরু শিষ্যের দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. তিনি নিজের স্বার্থে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, ভয় দেখান, হুমকি দেন ও প্রতারণা করেন।
ভণ্ড গুরু মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে পারেন। মানুষের দুঃখ, ভয়, অসহায়তা কিংবা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করা ভণ্ডামির একটি রূপ। যদি কোনো ব্যক্তি এমন ধারণা সৃষ্টি করেন যে—তাঁকে অনুসরণ না করলে ঈশ্বরের কৃপা পাওয়া যাবে না, তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো কল্যাণ সম্ভব নয়, অথবা তাঁকে অমান্য করলে বিপদ ঘটবে—তাহলে মানুষকে সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি বিচার করতে হবে। সৎগুরু মানুষের ভয় বাড়ান না; জ্ঞান দিয়ে ভয় দূর করেন। তিনি মানুষকে নিজের কাছে বন্দী করেন না; সত্যের পথে এগিয়ে দেন।
৫. তিনি শিষ্যের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস, পরাধীনতা ও ভক্তির নামে মূর্খতা ছড়িয়ে দেন।
ভক্তি মানে নিজের বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দেওয়া নয়। শ্রদ্ধা থাকা ভালো; কিন্তু অন্ধতা কখনও জ্ঞানের লক্ষণ নয়। যে গুরু বলেন—“আমার কথা প্রশ্নহীনভাবে মানতে হবে”, “আমাকে প্রশ্ন করা যাবে না”, “আমার কাজের বিচার করার অধিকার কারও নেই”—সেখানে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সৎগুরু শিষ্যের মধ্যে বিদ্যা ও বিবেক বৃদ্ধি করেন। ভণ্ড গুরু শিষ্যকে নিজের উপর এমনভাবে নির্ভরশীল করতে পারেন, যাতে শিষ্য ধীরে ধীরে নিজের বিচারক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। মহর্ষি দয়ানন্দের বৈদিক আদর্শে বিদ্যা, যুক্তি ও সত্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই ভক্তির নামে যদি অজ্ঞতা ও অন্ধবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, তবে সেটিকে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করা যায় না।
৬. তিনি ক্রোধী, অহংকারী এবং নিন্দা-প্রশংসায় অস্থির থাকেন।
একজন মানুষকে বোঝার একটি সহজ উপায় হলো—তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে তাঁর আচরণ কেমন হয় তা দেখা। সবাই যখন প্রশংসা করছে, তখন শান্ত থাকা সহজ। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করলে, কেউ যুক্তি দিলে, কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে কিংবা কেউ সমালোচনা করলে সেই সময় তাঁর আচরণ কেমন? সৎগুরু যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন শুনবেন, প্রয়োজন হলে উত্তর দেবেন এবং সত্যকে গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে অহংকারী ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্বকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে চান। তাই যে ব্যক্তি নিজের সম্মান রক্ষার জন্য ক্রোধ, ভয় বা চাপ সৃষ্টি করেন, তাঁর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত।
৭. তাঁর উপদেশ একরকম, কিন্তু আচরণ অন্যরকম—তিনি দ্বৈধ জীবনযাপন করেন।
ভ্রাতৃবৃন্দ, ভণ্ড গুরুকে চেনার জন্য এই লক্ষণটি বিশেষভাবে মনে রাখুন—কথা ও কাজ কি এক? তিনি যদি বলেন—লোভ ত্যাগ করো, কিন্তু নিজে লোভী হন; তিনি যদি বলেন—অহংকার ত্যাগ করো, কিন্তু নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করেন; তিনি যদি বলেন—সত্য বলো, কিন্তু নিজে অসত্য বলেন; তিনি যদি বলেন—সংযমী হও, কিন্তু নিজে সংযমহীন জীবনযাপন করেন—তাহলে তাঁর উপদেশ এবং তাঁর আচরণের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ধর্মের শিক্ষক হিসেবে এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে নিজে পথে চলে না, সে অন্যকে সেই পথে পরিচালিত করার নৈতিক অধিকার কতটা রাখে—এটি অবশ্যই বিচার্য।
  • তাহলে আমরা কাকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করব?
প্রিয়জনেরা, আমাদের কাউকে শুধু তাঁর বাহ্যিক বেশ দেখে গুরু বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। দেখতে হবে—তিনি বিদ্যাবান কি না, তিনি সত্যবাদী কি না, তিনি সংযমী ও সদাচারী কি না, তিনি লোভমুক্ত কি না, তিনি সকলের হিত কামনা করেন কি না, তিনি শিষ্যকে জ্ঞানী করছেন নাকি অন্ধ অনুসারী করছেন, তিনি প্রশ্ন ও যুক্তিকে গ্রহণ করেন কি না এবং তিনি যা বলেন, নিজে তা পালন করেন কি না।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—গুরুর মহত্ত্ব তাঁর অনুসারীর সংখ্যায় নয়, তাঁর আশ্রমের বিশালতায় নয়, তাঁর ধনসম্পদে নয়, তাঁর প্রচারের জাঁকজমকে নয়, তাঁর অলৌকিকতার দাবিতেও নয়। গুরুর প্রকৃত মহত্ত্ব তাঁর বিদ্যা, সত্যনিষ্ঠা, চরিত্র, সংযম ও সদাচরণে।
তাই আসুন, আমরা অন্ধভাবে কাউকে গুরু বলে গ্রহণ না করি। আবার প্রকৃত গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাকেও যেন অবহেলা না করি। যিনি আমাদের অজ্ঞতা দূর করে জ্ঞানের দিকে নিয়ে যান, যিনি আমাদের সত্যের পথে পরিচালিত করেন, যিনি আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখান, যিনি নিজের প্রতি নয়, সত্যের প্রতি আমাদের নিষ্ঠাবান করেন—তাঁকে শ্রদ্ধা করি।
আর যে ব্যক্তি ধর্মের নামে লোভ, ভয়, অন্ধবিশ্বাস, প্রতারণা ও পরাধীনতা সৃষ্টি করেন, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিষ্যদের ব্যবহার করেন এবং কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য রাখেন না—তাঁর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
মহর্ষি দয়ানন্দ তাই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—“যে গুরু লোভী, ক্রোধী, মোহী ও কামী, তাকে সর্বথা ত্যাগ করা উচিত।”
সুতরাং আমাদের জীবনে গুরুর প্রয়োজন আছে—কিন্তু সেই গুরু হতে হবে যোগ্য, বিদ্বান, সত্যনিষ্ঠ, বেদজ্ঞ, সদাচারী, সংযমী ও নিঃস্বার্থ। কারণ প্রকৃত গুরু আমাদের নিজের দাস বানান না; সত্যের সেবক বানান। প্রকৃত গুরু আমাদের অন্ধ করেন না; জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করেন। প্রকৃত গুরু আমাদের নিজের ব্যক্তিত্বের পূজারি বানান না; সত্য ও ধর্মের অনুসারী করেন।
তাই সর্বদা মনে রাখুন—গুরুর পরিচয় তাঁর বেশে নয়—বিদ্যায়; তাঁর কথায় নয়—চরিত্রে; তাঁর প্রচারে নয়—আচরণে; তাঁর অনুসারীর সংখ্যায় নয়—সত্যনিষ্ঠায়। সত্যকে জানুন, সত্যকে বিচার করুন, সত্যকে গ্রহণ করুন এবং সত্যের পথে যিনি আপনাকে পরিচালিত করেন, সেই সৎগুরুর কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করুন।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)