দৈনিক বেদবাণী


এই সমগ্র সংসার নিরোগ এবং শুভচিন্তা যুক্ত হোক । যজুর্বেদ ১৬.৪                    সূর্য-এর আলোয় স্বয়ং আলোহীন চাঁদ আলোকিত হয় । ঋগ্বেদ ৫.৪০.৫                    প্রশংসনীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মাতৃভূমি— এই ত্রয়ী সুখ-সমৃদ্ধি প্রদান করে। ঋগ্বেদ ১.১৩.৯                    উত্তম জীবন লাভের জন্য আমাদের জ্ঞানীদের সাহচর্যে চলা উচিৎ। ঋগ্বেদ ১.১২.১৬                    যে ব্যক্তি সম্পদ বা সুখ বা জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে দান করে, সে-ই প্রকৃত মিত্র। ঋগ্বেদ ২.৩০.৭                    মানুষ কর্ম দ্বারাই জগতে মহত্ত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৩.৩৬.১                    হে পতি! তোমার স্ত্রীই গৃহ, স্ত্রীই সন্তানের আশ্রয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৩.৪                    পরমাত্মার নিয়ম বিনষ্ট হয় না; তা অটুট, অচল ও অপরিবর্তনীয়। ঋগ্বেদ ৩.৫৪.১৮                    এই ধর্মের মার্গই সনাতন, এই পথে চলেই মানবগণ উন্নতি লাভ করে। ঋগ্বেদ ৪.১৮.১                    পরমাত্মার নিকট কোনো মানুষই বড় বা ছোট নয়। সকল মানুষই সমান এবং পরস্পরের ভ্রাতৃস্বরূপ। ঋগ্বেদ ৫.৬০.৫                    যে ব্যক্তি অকারণে অন্যের নিন্দা করে, সে নিজেও নিন্দার পাত্র হয়। ঋগ্বেদ ৫.২.৬                    নিশ্চিতরূপে এই চতুর্বেদ কল্যাণপ্রদায়িনী এবং মানবকে জ্ঞান প্রদান করে ধারণকারিণী। ঋগ্বেদ ৫.৪৭.৪                    বীর মানবের জন্য পর্বতও সুগম হয়ে যায়। ঋগ্বেদ ৬.২৪.৮                    আমরা অন্যের সঞ্চিত পাপের কর্মফল ভোগ করি না। ঋগ্বেদ ৬.৫১.৭                    হে মিত্রগণ! ওঠো— উদ্যমী হও, সাবধান হও এবং এই সংসাররূপী নদীকে অতিক্রম করো। ঋগ্বেদ ১০.৫৩.৮







সনাতন বৈদিক গ্রন্থের মাহাত্ম্য নিয়ে পাশ্চাত্য মনীষীরা কী বলেছেন ?

সত্যান্বেষী
0

 

✅সনাতন বৈদিক গ্রন্থের মাহাত্ম্য নিয়ে পাশ্চাত্য মনীষীরা কী বলেছেন ?

সমগ্র বিশ্ববিদ্যৎসমাজের নিকট এটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে প্রাচ্যের প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শনসমূহ বৈশ্বিক মননশীলতার ইতিহাসে এক অনন্য দিগন্তের উন্মোচন করেছে। ‘প্রখ্যাত’ [?] জার্মান প্রাচ্যবিদ ও ভাষাবিদ প্রফেসর ফ্রিডরিখ ম্যাক্স মুলারের (Friedrich Max Müller) ভাষায়—

"The Rigveda is the oldest book in the library of the world."

অনুবাদ: "বিশ্বের মানব সভ্যতার গ্রন্থাগারে ঋগ্বেদই প্রাচীনতম গ্রন্থ।"

উৎস: তাঁর সম্পাদিত 'Rig-Veda-Sanhita: The Sacred Hymns of the Brahmans' (১৮৪৯-১৮৭৪) এবং তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতাগ্রন্থ— Rig-Veda-Sanhita, 2nd ed., Vol. IV, Preface to the Second Edition, Oxford, 1892, p. clxxxvi.।

তবে বৈদিক সাহিত্য কেবল কালানুক্রমিক প্রাচীনতার পরিচয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দার্শনিক গভীরতা, আধ্যাত্মিক সুউচ্চ ভাবধারা এবং নৈতিক প্রজ্ঞার দিক থেকেও এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশ্চাত্য পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের কীভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত ও আলোড়িত করেছে, তা নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা দাবি করে।

১. ইউরোপে বৈদিক সাহিত্যের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও সূচনা

ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে ভারতীয় শাস্ত্রচর্চার সূচনাপর্ব ছিল জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক। প্রথমদিকে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা বৈচিত্র্যময় বৈদিক চিন্তাধারা সম্পর্কে ইউরোপে এক প্রকার অস্পষ্টতা সৃষ্টি করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি ভাষায় রচিত 'Ezour Vedam' (যজুর বেদম্) নামক এক ছদ্ম-বৈদিক রূপকল্প প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার সহ তৎকালের অনেক চিন্তাবিদের সামনে বেদ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল।

তবে বৈদিক সাহিত্যের প্রকৃত দার্শনিক রূপ ও মৌলিক জ্ঞান ইউরোপীয় বিদ্বৎসমাজে প্রথম প্রামাণিক আলোড়ন সৃষ্টি করে ফরাসি গবেষক আঁকেতিল দ্যুপ্যরোঁর (Anquetil Duperron) অসামান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে। ১৭৬০ সালে ভারতে আগমন করে তিনি ৮০টিরও বেশি দুর্লভ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। এই সংগ্রাহের মধ্যে মুঘল শানজাদা তারা শিকোহ্ (দারা শিকোহ্) কর্তৃক অনূদিত উপনিষদের ফারসি সংস্করণটি অন্যতম। দ্যুপ্যরোঁ উক্ত গ্রন্থের ল্যাটিন অনুবাদ সম্পন্ন করেন, যা ১৮০১-১৮০২ সালে 'ঔপনিষৎ' (Oupnekchat) নামে প্রকাশিত হয়।

২. শোপেনহাওয়ারের দর্শন এবং উপনিষদের গভীর প্রভাব

দ্যুপ্যরোঁর ল্যাটিন অনুবাদ পাঠ করে বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার (Arthur Schopenhauer) গভীরভাবে বিমোহিত হন। উপনিষদীয় দর্শনের মৌলিকতা ও উদারতা সম্পর্কে তিনি তাঁর স্বীয় গ্রন্থে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেন:

"এই অনুপম গ্রন্থ আত্মাকে সুগভীরভাবে নাড়া দেয়। এর প্রতিটি বাক্যে মৌলিক, গম্ভীর এবং চরম জ্যোতিষ্মান চিন্তা উদভাসিত হয়। এটি পাঠমাত্রই আমাদের চার পাশে এক ভারতীয় আবহের সৃষ্টি হয়, যেন এই চিন্তা আমাদের পরম আত্মিক কোনো সুহৃদের। ইহুদি ও খ্রিস্টান অন্ধসংস্কারের যে মেঘ আমাদের মনে ছেয়ে থাকে, তা এই বিচারের জ্যোতিতে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। সমস্ত বিশ্বের সাহিত্যে এর মতো উদার ও মহান গ্রন্থ দ্বিতীয়টি নেই। জীবনে আমি উপনিষদ থেকেই আত্মিক শান্তি লাভ করেছি এবং মৃত্যুর পর শান্তিলাভের মাধ্যমও হবে এই গ্রন্থই।"

মূল ইংরেজি: "It has been the solace of my life, it will be the solace of my death! "

— আর্থার শোপেনহাওয়ার

উৎস: তাঁর কালজয়ী মূল গ্রন্থ 'The World as Will and Representation' (Welt als Wille und Vorstellung, ১৮১৮) এর দ্বিতীয় সংস্করণ/সংযোজনী (Volume II, Chapter 17)। তিনি দ্যুপ্যরোঁর ল্যাটিন অনুবাদ 'Oupnekchat' পাঠ করার পর এই বিখ্যাত উক্তিটি করেন। Max Müller-ও Sacred Books of the East, Vol. 1-এর ভূমিকায় শোপেনহাওয়ারের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

৩. ভাষা ও অনুবাদচর্চার বিকাশ: ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতির প্রবর্তন

১৭৮৬ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির অধিবেশনে বক্তৃতা প্রদানকালে স্যার উইলিয়াম জোন্স (Sir William Jones) সংস্কৃত ভাষাকে একটি পরম বিস্ময়কর ভাষা হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন যে, “The Sanscrit language, whatever be its antiquity, is of a wonderful structure; more perfect than the Greek, more copious than the Latin, and more exquisitely refined than either...”

বাংলা অনুবাদ: “সংস্কৃত ভাষা—তার প্রাচীনত্ব যা-ই হোক না কেন—এক বিস্ময়কর গঠনসম্পন্ন ভাষা; গ্রিকের চেয়ে অধিক পূর্ণাঙ্গ, ল্যাটিনের চেয়ে অধিক সমৃদ্ধ এবং উভয়ের চেয়েও অধিক পরিশীলিত...”

উৎস: ১৭৮৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে (Asiatic Society of Bengal) প্রদত্ত তাঁর 'Third Anniversary Discourse: On the Hindus' শীর্ষক ঐতিহাসিক বক্তৃতা।

জোন্সের এই পর্যবেক্ষণ ইউরোপীয় বিদ্বৎসমাজে সংস্কৃত ভাষা ও ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি নতুন ধরনের আগ্রহ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে সংস্কৃত ভাষা, বেদ, উপনিষদ এবং ভারতীয় দর্শন নিয়ে ইউরোপে যে বিস্তৃত গবেষণার ধারা গড়ে ওঠে, তার প্রাথমিক ইতিহাসে জোন্সের এই ভাষাতাত্ত্বিক উপলব্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তবে এখানেও মনে রাখা উচিত—জোন্সের ভাষাতাত্ত্বিক প্রশংসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হলেও, তাঁর সময়কার ভারত-সম্পর্কিত সব ঐতিহাসিক ধারণাকে আজকের গবেষণায় অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন নেই। মূল কথা হলো, সংস্কৃত ও ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যের অসাধারণ ভাষাগত ও বৌদ্ধিক বৈশিষ্ট্য তাঁর মতো একজন ইউরোপীয় পণ্ডিতকেও গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল।

এই জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে উনিশ শতকের সূচনালগ্নের একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ইংরেজ সংস্কৃতজ্ঞ অ্যালেকজান্ডার হ্যামিল্টন (Alexander Hamilton) ১৮০২ সালের দিকে প্যারিসে অবস্থানকালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে সেখানে অবস্থান করতে বাধ্য হন। এই সময় তিনি ফরাসি পণ্ডিতদের সংস্কৃত ভাষা শেখাতে শুরু করেন। তাঁর অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন ফরাসি সংস্কৃতজ্ঞ অঁতোয়ান-লেয়নার দ্য শেজি (Antoine-Léonard de Chézy), যিনি পরবর্তীকালে ইউরোপে সংস্কৃতচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে জার্মান পণ্ডিত আগুস্ট ভিলহেল্ম ফন শ্লেগেল (August Wilhelm von Schlegel) এবং ফরাসি সংস্কৃতজ্ঞ ইউজিন বার্নুফ (Eugène Burnouf) ইউরোপে সংস্কৃত ও ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্য গবেষণাকে আরও সুদূরপ্রসারী করে তোলেন।

এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন ফ্রিডরিখ ম্যাক্স মুলার (Friedrich Max Müller)। তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় সংস্কৃত ও বৈদিক সাহিত্যের গবেষণা, সম্পাদনা ও প্রকাশনায় নিবেদিত করেন। বিশেষত সায়ণাচার্যের ভাষ্যসহ ঋগ্বেদের সংস্কৃত পাঠ সম্পাদনা ও প্রকাশনা তাঁকে বৈদিক গবেষণার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়। ১৮৪৯ থেকে ১৮৭৪ সালের মধ্যে তাঁর সম্পাদিত Rig-Veda-Sanhita: The Sacred Hymns of the Brahmans, Together with the Commentary of Sayanacharya প্রকাশিত হয়।

তবে ম্যাক্স মুলারের বেদসম্পাদনার ইতিহাসকে কেবল নিরপেক্ষ ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা হিসেবে দেখলে বিষয়টি সম্পূর্ণ হয় না। তাঁর নিজের কিছু চিঠি ও নথিতে ভারতীয় ধর্মজীবন এবং খ্রিস্টীয় মিশনারি কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। ১৮৬৬ সালে স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে তিনি ঋগ্বেদের সংস্করণ ও অনুবাদ সম্পর্কে লিখেছিলেন—

“It is the root of their religion, and to show them what that root is, I feel sure, is the only way of uprooting all that has sprung from it during the last 3,000 years.”

বাংলা অনুবাদ: “এটি তাদের ধর্মের মূল; আর সেই মূলটি আসলে কী, তা তাদের দেখিয়ে দেওয়াই—আমি নিশ্চিত—গত তিন হাজার বছরে সেই মূল থেকে যা কিছু বিকশিত হয়েছে, তা উপড়ে ফেলার একমাত্র উপায়।”

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ম্যাক্স মুলার তাঁর বৈদিক গবেষণার সম্ভাব্য ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁর আরও কিছু চিঠিতে ভারতে খ্রিস্টধর্মের প্রসার এবং ভারতীয় ধর্মব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে তাঁর গবেষণাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ধর্মীয় ও ঔপনিবেশিক বৌদ্ধিক পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর সম্পূর্ণ বেদসম্পাদনাকে একটি পরিকল্পিত জালিয়াতি বা নিছক “ষড়যন্ত্র” বলে বাতিল করা যায়। তাঁর সম্পাদিত বৈদিক পাঠ ও গবেষণা ইউরোপে বেদচর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে তাঁর অনুবাদ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর সময়ের ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

অতএব পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের গবেষণা থেকে আমরা জ্ঞান গ্রহণ করব, তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করব; কিন্তু বেদের চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে কোনো আধুনিক পণ্ডিতের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করব না। বেদকে জানতে হলে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে বেদের মূল মন্ত্র, বৈদিক ভাষা, নিরুক্ত, ব্রাহ্মণ-আরণ্যক-উপনিষদের ধারাবাহিকতা এবং ভারতীয় বৈদিক ব্যাখ্যা-পরম্পরার কাছে।

ম্যাক্স মুলার তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হলেও বৈদিক সাহিত্যের সসম্পাদনায় নিবেদিত করেন। ঋগ্বেদের বিখ্যাত সংস্করণটি সম্পাদনা করার সময় তিনি ভূমিকায় সংস্কৃত ভাষায় নিজের পরিচয় তুলে ধরেন:

শার্মণ্যদেশজাতেন শ্রী 'গোতীর্থ' নিবাসিনা ।

মোক্ষমূলরভট্টেন গ্রন্থোঽয়ং সংবিশোধিতঃ ॥

অর্থ: শার্মণী [জার্মান] দেশে জন্মগ্রহণকারী, গোতীর্থবাসী [অক্সফোর্ড] 'মোক্ষমূলরভট্ট' বা ম্যাক্স মুলার কর্তৃক এই গ্রন্থ সম্পাদিত ও সংশোধিত হলো।

উৎস: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ঋগ্বেদের সায়নাচার্যের ভাষ্যসহ মূল সংস্করণের ('Rig-Veda Samhita', Vol. I, 1849) ভূমিকা ও প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা। এখানে 'শার্মণী দেশ' বলতে জার্মানি এবং 'গোতীর্থ' বলতে অক্সফোর্ড (Ox-ford=গো-তীর্থ) শহরকে বোঝানো হয়েছে।

৪. পাশ্চাত্য মনীষার বৈদিক মূল্যায়ন: মূল ইংরেজি উদ্ধৃতিসহ পর্যবেক্ষণ

বৈদিক চিন্তা ও জ্ঞান যে কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না, তা বিশ্বনন্দিত চিন্তাবিদদের মূল্যায়নে স্পষ্ট ধরা পড়ে:

[১] রেভারেন্ড মরিস ফিলিপ (Rev. Maurice Phillips):

"After the latest researches into the History and chronology of old testament, we may safely now call Rig-veda as the oldest book, not only of the Aryan race but of the whole world."

বাংলা অনুবাদ: "ওল্ড টেস্টামেন্টের ইতিহাসের আধুনিকতম অনুসন্ধানের পর এখন আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, ঋগ্বেদ কেবল আর্যদের নয়, বরং সমস্ত মানবজাতির ও সমগ্র বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থ।"

উৎস: তাঁর রচিত বই 'The Teaching of the Vedas: What Light does it Throw on the Origin and Development of Religion?' (লন্ডন, ১৮৯৫, পৃষ্ঠা ৫-৬)।

[২]প্রফেসর এ. এইচ. এল. হিরেন (A. H. L. Heeren):

"The Vedas are without doubt the oldest books composed in Sanskrit. They stand alone in their solitary splendour, as become of Divine light for the onward march of humanity."

বাংলা অনুবাদ: "নিঃসন্দেহে সংস্কৃতে রচিত বেদই সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থমালা। মানবতার অগ্রগামী অগ্রগতির জন্য 'ঐশ্বরিক আলো'-এর প্রদর্শক হিসেবে বেদ তার নিজস্ব মহিমায় অনন্য।"

উৎস: তাঁর বহু খণ্ডে প্রকাশিত ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থ 'Historical Researches into the Politics, Intercourse, and Trade of the Principal Nations of Antiquity' (১৮৩৮),Vol. II, p. 127 ।

[৩] গুইনো/গুইগনো (Guignault/Guigault) :

"The Rigveda is the most sublime conception of the great high-ways of humanity."

বাংলা অনুবাদ: "মানবতার সুউচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শিক মহাসড়কসমূহের সবচেয়ে মহান উচ্চ বিচার প্রদানকারী গ্রন্থ হলো ঋগ্বেদ।"

উৎস: প্যারিসে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্র/বক্তৃতা 'L'Ésotérisme des Védas' (১৮৯০); Har Bilas Sharada, Hindu Superiority, pp. 179–180।

[৪] লেয়ন দেলবস (Léon Delbos)

“There is no monument of Greece or Rome more precious than the Rig Veda.”

বাংলা অনুবাদ: “গ্রিস বা রোমের কোনো স্মৃতিস্তম্ভই ঋগ্বেদের চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়।”

উৎস: Speeches and Writings, p. 142-এ উদ্ধৃত; সেখানে “Mons Leon Delbos says” হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

[৫] ফ্রেডরিখ নিটশে (Friedrich Nietzsche):

"A work which is spiritual and superior beyond comparison, even to name in one breath with the Bible would be a sin."

বাংলা অনুবাদ: "এটি সমস্ত তুলনার ঊর্ধ্বে একটি আধ্যাত্মিক সুউচ্চ স্তরের গ্রন্থ, যার নামের সাথে বাইবেলের নাম এক নিঃশ্বাসে নেওয়াও পাপ বা অবিচারের সামিল।"

উৎস: তাঁর গ্রন্থ 'The Antichrist' (Der Antichrist, ১৮৮৮, অনুচ্ছেদ ৫৬) এবং তাঁর চিঠিপত্র। তিনি ১৮৮৮ সালে মনুস্মৃতি পাঠ করে বাইবেলের সাথে এর তুলনা করে এই মন্তব্যটি করেছিলেন।

আমেরিকার প্রখ্যাত দার্শনিক থোরো (Henry David Thoreau), নোবেল বিজয়ী মরিস মেটারলিঙ্ক (Maurice Maeterlinck), ফরাসি গবেষক ড. জেমস কাজিন্স, রাশিয়ান প্রাচ্যবিদ বলিংগার এবং প্রফেসর হুয়ান মাসকারো বৈদিক জ্ঞানের সর্বজনীন সত্যকে সম্মান জানিয়েছেন। স্প্যানিশ-ভারতীয় পণ্ডিত, অনুবাদক ও চিন্তাবিদ হুয়ান মাসকারো (Juan Mascaró) উপনিষদের আধ্যাত্মিক মহিমায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Himalayas of the Soul: Translations from the Sanskrit of the Principal Upanishads (১৯৩৮)-এর ভূমিকায় তিনি উপনিষদসমূহকে মানবাত্মার সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের এক মহিমান্বিত শিখর হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি লিখেছেন— “Amongst the sacred books of the past, the Upanishads can be called in truth Himalayas of the Soul.”

বাংলা অনুবাদ: “অতীতের পবিত্র গ্রন্থসমূহের মধ্যে উপনিষদকে যথার্থই ‘আত্মার হিমালয়’ বলা যেতে পারে।”

এই একটি উপমার মধ্যেই মাসকারো উপনিষদের যে অসাধারণ আধ্যাত্মিক উচ্চতা অনুভব করেছিলেন, তা গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে উপনিষদ কেবল প্রাচীন কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়; এগুলো মানুষের আত্মা, চেতনা, সত্য ও পরম সত্তার অনুসন্ধানের এমন এক সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি, যার শিখরে পৌঁছানোর সাধনা মানবজীবনের অন্যতম মহৎ যাত্রা।

গ্রন্থ: Himalayas of the Soul: Translations from the Sanskrit of the Principal Upanishads, প্রকাশক: John Murray, London, প্রকাশকাল: ১৯৩৮।

তবে এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—পাশ্চাত্যের কোনো মনীষী বেদ সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন বলেই তাঁর প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক, দার্শনিক বা ব্যাখ্যাগত মতকে আমাদের সত্য বলে গ্রহণ করতে হবে—এমন নয়। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ সময়ের জ্ঞান, পদ্ধতি, ভাষাতাত্ত্বিক ধারণা ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমার মধ্য থেকেই বেদকে বিচার করেছেন। ফলে তাঁদের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত আজকের গবেষণার আলোকে সংশোধনযোগ্য বা বিতর্কযোগ্য হতে পারে।

কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—বেদের মহিমা তাঁদের চিন্তাজগতে গভীর বিস্ময় ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল। ভারতীয় বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনত্ব, ভাষার বৈশিষ্ট্য, দার্শনিক অনুসন্ধান এবং মানুষের জীবন ও বিশ্বজগতকে বোঝার গভীর প্রচেষ্টা তাঁদের বহুজনকে মুগ্ধ করেছিল।

অতএব পাশ্চাত্য মনীষীদের প্রশংসাকে আমরা বেদের সত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং বেদের অসাধারণ বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক মহিমা যে বিশ্বমানবের মনেও গভীর রেখাপাত করেছে—তার একটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে দেখতে পারি। বৈদিক দর্শনের নিগূঢ় সত্য এবং প্রজ্ঞার গভীরতাকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য—উভয় সমাজই একবাক্যে স্বীকার করেছে। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী প্রবর্তিত আর্যসমাজের নীতিমালার ৩য় বাক্যটিকে স্মরণ করে বলা যায়— "বেদ সর্ব সত্যবিদ্যার পুস্তক।"

বেদের মাহাত্ম্য কোনো পাশ্চাত্য পণ্ডিতের প্রশংসার উপর নির্ভরশীল নয়। বেদ নিজের জ্ঞান, দর্শন ও মানবকল্যাণের বাণীর মধ্যেই নিজের মহিমা বহন করে। পাশ্চাত্যের মনীষীরা যখন সেই মহিমার কোনো একটি দিক দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, তখন তাঁদের সেই বিস্ময় আমাদের জন্য অবশ্যই স্মরণীয়—কিন্তু বেদকে বুঝতে হলে শেষ পর্যন্ত বেদের কাছেই ফিরে যেতে হবে।

© বাংলাদেশ অগ্নিবীর

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)