বিবাহ সংস্কার আমাদের ১৬ সংস্কারের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। ব্রহ্মচর্য থেকে গার্হ্যস্থ আশ্রমের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এই বিবাহ সংস্কার। তাই অন্যান্য সংস্কারের তুলনায় এই সংস্কারের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য একটু যেন বেশিই। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বেদের প্রচার ও প্রসারের ফলে সনাতনীরা বৈদিক বিবাহ সংস্কার অর্থাৎ বিবাহ বিধিকে বৈদিক শাস্ত্রানুযায়ী পালন করছেন ও অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। আবার অনেকের মনেই জিজ্ঞাসা, বৈদিক বিবাহ আবার কী? এখানে কী কী হয়? তাই এই বিষয়ে একটি সবিস্তর ধারণা থাকা আবশ্যক। আর সেজন্যেই আপনাদের জন্যই আজকের বিশেষ আয়োজন- বৈদিক বিবাহ কী? কেন? এবং কীভাবে?
বিবাহ সংস্কার আদিতে বৈদিক বিবাহই ছিলো। বর্তমান সময়ে প্রচলিত বিবাহ সংস্কারে বৈদিক শাস্ত্রাদির বিধির চেয়ে পৌরাণিক বেদবিরুদ্ধ আচার ও লোকাচারেরই আধিক্য প্রাধান্য পেয়েছে। এটির থেকে বৈদিক বিধি সম্বলিত বিবাহকে পৃথক করার জন্যেই বৈদিক বিবাহ সংস্কার শব্দটির প্রচলন। এটি আমাদের সাধারণ জীবনে যেমন বিবাহ বলে জানি ঠিক সেটাই তবে একদম বৈদিক শাস্ত্র সমর্থিত যেটি বর্তমান সময়ে দেখা যায় না।
সনাতন বৈদিক ধর্মের মূল উৎস বেদ । 'সর্বজ্ঞানময়ো হি সঃ' অর্থাৎ সর্বজ্ঞানময়ত্ব বেদের বেদত্ব । বেদ ঈশ্বরীয় শাশ্বত কল্যাণকারিণী বাণী । পরম পিতা পরমাত্মা অনাদি কাল হতে বারংবার - সগৌরবে জীব মাত্রের কল্যাণের নিমিত্তেই ঋষিদের শুদ্ধন্তঃকরণে বেদজ্ঞান প্রকাশিত করেন । সনাতন আইনশাস্ত্র তথা মানবজাতির প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ । কয়েকশতক আগেও বেদ শব্দটি ছিল প্রতিটি সনাতনিদের প্রাত্যাহিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত । কিন্তু সময়ের বিবর্তনে,অজ্ঞানতা ও তার কলাগ্রাসে ঔপনিবেশিকদের চক্রান্তে, তথাকথিত বিকৃত মস্তিষ্ক প্রসূত ধর্মপ্রচারক তথা স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ীদের অপপ্রচারের কারণে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা আজ মহান বেদের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছি । ফলস্বরূপ আমরা আজ জাতি হিসেবে এক ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে । জ্ঞানের অভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে অপমানের স্বীকার তো হতেহচ্ছে বটেই, এবং নিজেদের প্রতিদিনকার জীবনযাপনেও অজ্ঞতার গ্লানিবয়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে নিরন্তর । বেদ সকল যুগ ও কালের জন্য প্রযোজ্য । এর বাণী কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়না,অচল হয়না । মানবজীবনে প্রয়োজনীয় সকল সংস্কার বেদেই উল্লেখ হয়েছে। তাই বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ীই আমাদের বিবাহ সহ সকল সংস্কারাদি কর্ম পালন করা উচিত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগ) এর ১৬ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে—
এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি॥
অর্থ:এইভাবে (যজ্ঞচক্র) প্রবর্তিত শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী যে ব্যক্তি কর্ম করে না, সে পাপাচরণ করে এবং তার জীবন বৃথা যায়। সে কেবল ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত হয়ে জীবন যাপন করে এবং প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকে না।
এই শ্লোকের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, যারা শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত কর্ম পরিত্যাগ করে, তারা ইন্দ্রিয়সুখে নিমগ্ন হয়ে নিষ্ফল জীবনযাপন করে। তাই গীতার উপদেশ অনুসারে, শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী কর্ম করাই শ্রেষ্ঠ পথ। বৈদিক শাস্ত্রানুযায়ীই আমাদের সকল সংস্কারাদি কর্ম পালন করা শাস্ত্রেরই নির্দেশ।
এক্ষণে জানলাম বৈদিক বিবাহ কী এবং কেন। এবার জানবো বৈদিক বিবাহের বিধিগুলো কী কী এবং সেগুলোর পরিচয়। উল্লেখ্য এখানের প্রতিটি বিধি গুরুত্বপূর্ণ, মাহাত্ম্যপূর্ণ্য ও অর্থবহ। এগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা এক আর্টিকেলে সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তাই এখানে পরিচিতি হেতু অল্প বাক্যে লেখা হলো।
বৈদিক বিবাহের মূল বিধিকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। পূর্ববিধি
২। উত্তরবিধি
এই দুই বিধি বাদেও বিবাহোত্তর কিছু বিধি রয়েছে যেগুলো পালন করাও বিবাহের অংশ।
হৃদয়স্পর্শ: বর ও বধু একে অপরের হৃদয় স্পর্শ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবে যেন একজনের হৃদয় সর্বদা অপরজনের অনুকূলে থাকে।
এরই মাধ্যমে পূর্ববিধি সমাপ্ত। এবার বর ও কনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিবে এবং উত্তরবিধির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
পূর্ববিধি ও উত্তরবিধির মাধ্যমে বিবাহের মূল পর্ব সমাপ্ত। এবার বিবাহোত্তর নিম্নের কাজগুলো করাবে:
এরই মাধ্যমে বৈদিক বিবাহের সকল কার্য সমাপ্ত।
বিবাহের এই বিধিগুলো শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যে নয়, বরং দুটি পরিবারের মধ্যে একটি পবিত্র বন্ধনের প্রতীক। বৈদিক শাস্ত্রানুযায়ী বিবাহ প্রচলিত বিবাহের ন্যায় কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি স্বামী ও স্ত্রীর কর্তব্য, দায়িত্ব, মাহাত্ম্য তথা বৈদিক ভাবগাম্ভীর্যের প্রকাশের মাধ্যমে বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়। বৈদিক শাস্ত্রের মাহাত্ম্য জেনে বিবাহের বিধিগুলো সম্পন্ন করলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং সংসার জীবনে যশ, শ্রী, সুখ, শান্তি, ঐশ্বর্য, মঙ্গল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।
বেদাচারের অতিরিক্ত হিসেবে গৃহীত এই ভিন্ন ভিন্ন লোকাচার শাস্ত্রানুমোদিত কি ?
১. অথ খলূচ্চাবচা জনপদধর্মা গ্রামধর্মাশ্ চ তান্ বিবাহে প্রতীয়াৎ॥ [আশ্বলায়ন গৃহ্য০ ১।৭।১]
অনুবাদ- বিভিন্ন জনপদ ও গ্রামে নানাপ্রকার আচার প্রচলিত থাকে, বিবাহে সেগুলো পালন করতে হবে।
২. গ্রামবচনং চ কুর্য়ুঃ॥ ১১॥ বিবাহশ্মশানয়োর্গ্রামং প্রবিশতাদিতিবচনাৎ॥ ১২॥ তস্মাত্তয়োর্গ্রামঃ প্রমাণমিতি শ্রুতেঃ॥ ১৩॥
[পারস্কর গৃহ্যসূত্র ১।৮।১১-১৩]
অর্থাৎ, (গ্রামবচনং চ) এবং গ্রাম/কুলের পরম্পরানুসারে লৌকিক রীতি-রেওয়াজ, (কুর্য়ুঃ) করবে। (বিবাহশ্মশানয়োঃ) বিবাহ এবং শ্মশান = অন্ত্যেষ্টির বিষয়ে, (গ্রামং প্রবিশতাৎ) লৌকিক আচার, রীতি-রেওয়াজ জিজ্ঞাসা করবে, (ইতিবচনাৎ) এরূপ বচন রয়েছে। (তস্মাত্তয়োর্গ্রামঃ) সেই দুই বিবাহ এবং অন্ত্যেষ্টির সময়ে গ্রাম-লোকাচার, (প্রমাণম্) প্রমাণ হয়। (ইতিশ্রুতেঃ) এরূপ শ্রুতি অর্থাৎ জনশ্রুতি আছে। [পারস্কর গৃহ্য০ - ড. বেদপাল (আর্যসমাজ)]
৩. কাঠক গৃহ্যসূত্রকারও ‘আচারিকাণি’ [কা০ গৃ০ ২৫।৭] বলে বিবাহ সংস্কারে দেশ জাতিকুল প্রভৃতির দৃষ্টিতে পরম্পরাগত কর্মসমূহও বিহিত করেছেন।
৪. বিবাহ নানা সংস্কারে অতিরিক্ত লোকাচার হিসেবে কোন বেদবিরুদ্ধ আচার পালন করা যাবে কী?
একশব্দে উত্তর হলো, না! কারণ গৌতম ধর্মসূত্র আমাদের স্পষ্ট করে জানাচ্ছে কেবল বেদশাস্ত্রের অনুকূল দেশ, জাতি, কুলের ধর্মই প্রমাণরূপে গণ্য হবে। বেদবিরুদ্ধ আচার নয়।
দেশজাতিকুলধর্মাশ্চাঽঽআম্নায়ৈরবিরুদ্ধাঃ প্রমাণম্॥ [গৌতম ২।২।২০]
অর্থাৎ, বেদাশাস্ত্রের অনুকূল দেশ, জাতি, কুলের ধর্মও প্রমাণ।
১. অথ খলূচ্চাবচা জনপদধর্মা গ্রামধর্মাশ্ চ তান্ বিবাহে প্রতীয়াৎ॥ [আশ্বলায়ন গৃহ্য০ ১।৭।১]
অনুবাদ- বিভিন্ন জনপদ ও গ্রামে নানাপ্রকার আচার প্রচলিত থাকে, বিবাহে সেগুলো পালন করতে হবে।
২. গ্রামবচনং চ কুর্য়ুঃ॥ ১১॥ বিবাহশ্মশানয়োর্গ্রামং প্রবিশতাদিতিবচনাৎ॥ ১২॥ তস্মাত্তয়োর্গ্রামঃ প্রমাণমিতি শ্রুতেঃ॥ ১৩॥
[পারস্কর গৃহ্যসূত্র ১।৮।১১-১৩]
অর্থাৎ, (গ্রামবচনং চ) এবং গ্রাম/কুলের পরম্পরানুসারে লৌকিক রীতি-রেওয়াজ, (কুর্য়ুঃ) করবে। (বিবাহশ্মশানয়োঃ) বিবাহ এবং শ্মশান = অন্ত্যেষ্টির বিষয়ে, (গ্রামং প্রবিশতাৎ) লৌকিক আচার, রীতি-রেওয়াজ জিজ্ঞাসা করবে, (ইতিবচনাৎ) এরূপ বচন রয়েছে। (তস্মাত্তয়োর্গ্রামঃ) সেই দুই বিবাহ এবং অন্ত্যেষ্টির সময়ে গ্রাম-লোকাচার, (প্রমাণম্) প্রমাণ হয়। (ইতিশ্রুতেঃ) এরূপ শ্রুতি অর্থাৎ জনশ্রুতি আছে। [পারস্কর গৃহ্য০ - ড. বেদপাল (আর্যসমাজ)]
৩. কাঠক গৃহ্যসূত্রকারও ‘আচারিকাণি’ [কা০ গৃ০ ২৫।৭] বলে বিবাহ সংস্কারে দেশ জাতিকুল প্রভৃতির দৃষ্টিতে পরম্পরাগত কর্মসমূহও বিহিত করেছেন।
৪. বিবাহ নানা সংস্কারে অতিরিক্ত লোকাচার হিসেবে কোন বেদবিরুদ্ধ আচার পালন করা যাবে কী?
একশব্দে উত্তর হলো, না! কারণ গৌতম ধর্মসূত্র আমাদের স্পষ্ট করে জানাচ্ছে কেবল বেদশাস্ত্রের অনুকূল দেশ, জাতি, কুলের ধর্মই প্রমাণরূপে গণ্য হবে। বেদবিরুদ্ধ আচার নয়।
দেশজাতিকুলধর্মাশ্চাঽঽআম্নায়ৈরবিরুদ্ধাঃ প্রমাণম্॥ [গৌতম ২।২।২০]
অর্থাৎ, বেদাশাস্ত্রের অনুকূল দেশ, জাতি, কুলের ধর্মও প্রমাণ।
