ভৌগলিক অবস্থা ও পরিবেশ : বেদের আলোকে
‘পরিবেশ’'—
শব্দটির মোটাদাগে অর্থ হলো কোনো স্থানের ভৌগোলিক পরিস্থিতি অনুসারে সজীব
এবং নির্জীব সৃষ্টির পরিচালন। একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় পরিবেশ হলো
কোনো জীব বা জীবসম্প্রদায়ের চারপাশের সমস্ত সজীব (biotic) এবং অজীব
(abiotic) উপাদানের সমষ্টি, যেগুলো পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সেই
জীবের জীবনযাত্রা, বৃদ্ধি এবং অস্তিত্বকে সরাসরি প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত
করে। পরিবেশের অনুসারে সেখানকার ভৌগোলিক স্থিতির অনুকূল গাছপালা,
পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, মানুষ ইত্যাদির ওপর প্রভাব
পড়ে। ঘন জঙ্গলে লালিত-পালিত হওয়া পশু-পাখি, বৃক্ষ যদি আমরা দেখি তবে দেখবো
সেগুলো মরুভূমির পশু, পাখি তথা বৃক্ষসমূহ থেকে একদম ভিন্ন হয়। শহর ও গ্রামে
বসবাসকারী পোষা পশুদের থেকে জঙ্গলে বসবাসকারী জানোয়ার একদম আলাদা হয়। ঘরের
গোরু, মহিষ, বিড়াল তথা কুকুর থেকে বুনো গোরু, মহিষ, বিড়াল তথা কুকুর
হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর হয়। মরুভূমিতে উট ১৫ দিনের জল এক বারেই পান করে টিকে
থাকতে পারে। অথচ ঘন জঙ্গলের প্রাণীরা দিনে দুই-তিন বার জল পান করে।
মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া খেজুরের বৃক্ষ জল ছাড়াই মাসের পর মাস পর্যন্ত শুকায়
না। কিছু প্রাণী যার মধ্যে সাপ, গিরগিটি তথা পাখি রয়েছে যারা নিজেদের
গাছপালা এবং উদ্ভিদের রঙে অভিযোজনের মাধ্যমে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী
কৌশল অবলম্বন করতে শিখেছে। বিবর্তনের ধারায় মরুভূমি তথা বরফাবৃত
প্রদেশসমূহের পশু-পাখি বালি এবং বরফের সাথে খাপ-খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী
বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।
যেখানকার
ভূমণ্ডলীয় পরিবেশ শুদ্ধ এবং প্রকৃতির অনুকূল হয়, সেখানকার লোকেরা
হৃষ্ট-পুষ্ট, ডিঙি এবং বলবান হয়। অথচ ঘন বস্তিসমূহে বসবাসকারী লোকেরা
রোগা-পটকা হয়। সজীব এবং নির্জীব সৃষ্টির ওপর প্রকৃতি প্রভাব না ফেলে থাকে
না।
আমাদের
আশপাশের ভৌগোলিক স্থীতিসমূহ আমাদের স্বাস্থ্য, বিচার, চালচলন, ব্যবহার এবং
স্বভাবের ওপরও প্রভাব ফেলে। পরিস্থিতিজনিত পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম। জল,
বায়ু, জমি, সূর্য-আলো, অর্থাৎ তত্তদ্দেশীয় পরিবেশের পরিণাম সেখানকার
চেতন-অচেতন পদার্থসমূহের ওপর অবশ্যই পড়ে। এক প্রাণী অন্য প্রাণীর ওপর
নির্ভর, জঙ্গলে সিংহের অস্তিত্ব অন্য প্রাণীদের ওপর আধারিত এবং প্রাণীরা ঘন
গাছপালা তথা উদ্ভিদের ওপর আশ্রিত। যদি ঘন জঙ্গল সমাপ্ত হতে চলে যায় তবে
সম্পূর্ণ সজীব সৃষ্টি নামশেষ হয়ে যাক (হয়ে যাবে)। জঙ্গলের প্রাণী এবং
উদ্ভিদ অন্যোন্যাশ্রিত, তারা অন্য জীবদের রক্ষাও করে এবং বহুসংখ্যক
প্রাণীদের ভারসাম্যও বজায় রাখে।
প্রকৃতিতে
পরিবর্তনের দায়িত্ব যখন মানব নিজের হাতে নেয়, তখন ধীরে ধীরে পরিবেশের নাশ
হতে থাকে। প্রকৃতি মানবের রক্ষক, প্রকৃতিই মানবকে পালন করে, বড় করে, তাকে
সন্তানের মতো স্নেহ করে।
যত্তে মধ্যং পৃথিবি যচ্চ নভ্যং যাস্ত ঊর্জস্তন্বঃ সম্বভূবুঃ।
তাসু নো ধেহ্যভি নঃ পবস্ব মাতা ভূমিঃ পুত্রো অহং পৃথিব্যাঃ পর্জন্যঃ পিতা স উ নঃ পিপর্তু ॥
অথর্ববেদ ১২.১২
=
হে ধরিত্রী মাতা! আপনার অস্তিত্বের মাঝে যা কিছু বিদ্যমান, আপনার কেন্দ্রে
যা রয়েছে, এবং মেঘ ও আকাশ থেকে প্রাপ্ত আমাদের জন্য আপনার উপহার, আর আপনার
শরীর থেকে উৎপন্ন যাবতীয় পুষ্টি ও শক্তি—অনুগ্রহ করে আমাদের সেই সবকিছুর
মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করুন, আমাদের পবিত্র ও শক্তিশালী গড়ে তুলুন। পৃথিবী আমার
মাতা, আমি ধরণী মাতার সন্তান। সূর্য ও আকাশ থেকে আসা আকাশ ও বৃষ্টিবাহী মেঘ
আমার পিতা। আমি প্রকৃতির সন্তান। পিতা ও মাতা আমাদের পূর্ণ পরিপূর্ণতা দান
করুন।
এই
ভূমি আমার মাতা তথা আমি পৃথিবীর পুত্র। কিন্তু আধুনিক মানব হাওয়া, জল,
উদ্ভিদ, ফল, ফুল এবং ভূমিকে নিজের স্বার্থের জন্য দূষিত করছে, তখন প্রকৃতিও
মানবকে দণ্ডিত না করে থাকে না। নিজেকে মানুষ যতটা বুদ্ধিমান মনে করছে,
ততটাই সেই বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পরিবেশকে দূষিত করার কাজে লাগাচ্ছে।
দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োগ করা হয়েছিল। বহু লাখ লোক মারা গেছে,
লাখ লাখ লোক বিকলাঙ্গ হয়ে গেছে। ৫০-৬০ বছর পর তার প্রভাব সেখানকার
প্রদেশসমূহে আজও দেখা যাচ্ছে। সম্পূর্ণ পরিবেশ দূষিত হয়ে গেছে, এই
প্রাকৃতিক প্রকোপের প্রভাব এখনো গর্ভস্থ শিশুদের ওপর হচ্ছে। একইভাবে ভোপাল
গ্যাস কাণ্ডের প্রভাব সেখানকার লোকেরা আজও ভুগছে, হাজার হাজার লোক পূর্ণতঃ
অন্ধত্ব এবং অপঙ্গত্ব (পঙ্গুত্ব) প্রাপ্ত হয়েছে। ১০ হাজার লোক এই কাণ্ডের
শিকার হয়েছে। আজও সেখানকার বায়ুমণ্ডল পূর্বের ন্যায় শুদ্ধ হতে পারেনি।
প্রকৃতির সাথে যে কেউই ছিনিমিনি করবে বা তার কার্যসমূহে হস্তক্ষেপ করবে,
প্রকৃতির উপর স্রষ্টার যে অমোঘ নিয়ম তা তাকে দণ্ড অবশ্যই দেবে।
চিরন্তন
বেদসমূহের স্বাভাবিক প্রবাহবান নিত্য জ্ঞান অনুযায়ী এটা সত্যই যে
তামসিক-রাজসিক প্রবৃত্তির মানব প্রকৃতির নিয়মসমূহের লঙ্ঘন অবশ্যই করবে।
নিজে তো নষ্ট হবেই, অন্যদের জন্যও অশান্তি উৎপন্ন করবে। এই জন্য বেদসমূহে
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী তথা পরিবেশের শান্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে।
দ্যৌঃ
শান্তিরন্তরিক্ষং শান্তিঃ পৃথিবী শান্তিরাপঃ শান্তিরোষধয়ঃ শান্তিঃ ।
বনস্পতয়ঃ শান্তির্বিশ্বে দেবাঃ শান্তির্ব্রহ্ম শান্তিঃ সর্বং শান্তিঃ
শান্তিরেব শান্তিঃ সা মা শান্তিরেধি ॥
যজুর্বেদ ৩৬।১৭
অর্থাৎ,
হে ঈশ্বর, সমস্ত দুঃখ ও কষ্টের প্রশমনকারী! সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রের উর্ধ্বে
অবস্থিত যে অন্তরীক্ষ বা দ্যুলোক, তা যেন পরম কৃপায় সর্বদা শান্ত,
উপদ্রবহীন এবং আমাদের জন্য সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের উৎস হয়। মধ্যবর্তী অঞ্চল
(আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান) এবং এর মধ্যে থাকা বায়ু ইত্যাদি, এই
পৃথিবী ও তার বস্তুরাজি, সেগুলির গুণাবলী, ওষধি গাছপালা, শাকসবজি এবং
সেগুলির সমস্ত গুণাগুণ যেন আপনার কৃপায় শান্ত, ধীর, নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তি
প্রদানকারী এবং আমাদের কল্যাণের জন্য অনুকূল হয়। বিশ্বের সমস্ত বিদ্বান
ব্যক্তিগণ, বৈদিক মন্ত্রসমূহ, আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ, সূর্য, জল এবং সেগুলির
গুণাবলী যেন আপনার কৃপায় আমাদের জন্য শান্ত, শান্তিময় এবং সুখের দাতা
হয়।
হে
সর্বশক্তিমান পরমাত্মা! আপনার কৃপায় এই সমগ্র বিশ্ব—সূক্ষ্ম ও তার সমস্ত
বস্তু যেন সর্বদা শান্ত, অনুকূল এবং শান্তিপ্রদ হয়। হে ঈশ্বর! আপনার
কৃপায় আমি যেন সেই প্রশান্তি লাভ করি, যার দ্বারা আমি শান্ত হতে পারি এবং
ক্রোধ ইত্যাদির মতো কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারি। এই বিশ্বের সমস্ত
জীবও যেন কাম, ক্রোধ ইত্যাদির মতো কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হতে পারে।
এই
পৃথিবী মানবের জন্য একটি সুন্দর ঘরের মতো। এই সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থ
মানবের উপভোর্গাথ (ব্যবহারের উদ্দেশ্যে)। তার কাছে বুদ্ধি আছে, কলা-কৌশল
আছে, বাণীর বরদান আছে, কর্মের স্বাধীনতা আছে। এটি অন্য প্রাণীদের কাছে নেই,
এইজন্য মানব প্রাণীজগতে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এই বুদ্ধিমত্তা ও বোঝাপড়ার
ব্যবহার কি সে এই ঘরকে (পৃথিবীকে) সুন্দর ও সুবিধাজনক বজায় রাখতে করেছে? জড়
পদার্থ এর সেবায় সর্বদা তৎপর রয়েছেই, পরন্তু প্রাণীজগৎও এর সহায়তার জন্য
হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
গোরু,
মহিষ, ঘোড়া, কুকুর, বিড়াল, ছাগল, ভেড়া, উট, হাতি, সাপ, তোতা, পায়রা
ইত্যাদি প্রাণী মানুষকে সাহায্য করার জন্য জন্ম নিয়েছে। এরা যতক্ষণ জীবিত
থাকে তখনও মানুষের সাহায্য করে, কিন্তু মৃত্যুর পরেও নিজেদের চামড়া, হাড়,
পশম, শিং, দাঁত আদি দিয়ে মানবের ওপর উপকার করে।
গোপতৌ স্যাৎ বহ্বীর্যজমানস্য পশূন্ পাহি ॥
যজুর্বেদ ১.১
=
হে প্রভু! ভূমি ও গবাদিপশুর অধিপতি প্রভু যেন এদের পূর্ণ ও নিরবচ্ছিন্ন
মালিকানায় অধিষ্ঠিত থাকেন। আপনি যেন সেই পুণ্যবান আত্মার গবাদিপশু,
ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে রক্ষা করেন।
ইন্দ্রো বিশ্বস্য রাজতি। শন্নোঽঅস্তু দ্বিপদে শং চতুষ্পদে ॥
যজুর্বেদ ৩৬.৮
=
হে সকল ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের অধিপতি! ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ এই
সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র শাসক আপনি। আপনিই সবার প্রকাশক। হে সবার রক্ষক!
আপনার অসীম কৃপায় আমাদের সন্তান-সন্ততি এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের জন্য
যেন শান্তি, প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে। আমাদের গৃহপালিত পশুদের ওপরও
(যেমন: হাতি, ঘোড়া ও গোরু ইত্যাদি) অনুগ্রহ করে শান্তি বর্ষণ করুন, যাতে
আমরা সর্বদা সুখে বসবাস করতে পারি।
মানুষের
হিতার্থে এই সৃষ্টি তৈরি হয়েছে, তার জীবনযাপনের অনুকূল হওয়ার কারণে এটি
মানুষ উৎপন্ন হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছে। যে প্রকারে সন্তানকে জীবিত রাখার জন্য
মায়ের স্তনে দুধের উৎপত্তি আগেই হয়ে থাকে, সেই প্রকারে মানবকে জীবিত রাখার
জন্য সৃষ্টি এবং তার পদার্থসমূহ আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে।
সূর্যাচন্দ্রমসৌ ধাতা যথাপূর্বমকল্পয়ৎ ।
দিবং চ পৃথিবীং চান্তরিক্ষমথো স্বঃ ॥
ঋগ্বেদ ১০.১৯০.৩
=
পরম প্রভু স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক অনাদিকাল থেকে পূর্বের ন্যায় সূর্য ও
চন্দ্র, দ্যুলোক ও ভূলোক, অন্তরীক্ষ এবং অন্যলোকসমূহ পরিকল্পনা ও সৃষ্টি
করেছেন।
এখানে
‘যথাপূর্বমকল্পয়ৎ’ পদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানবের কল্যাণার্থে শুধু এই
কল্পেই নয়, বরং কল্প-কল্পান্তরেও পরমেশ্বর এই প্রকারেরই সৃষ্টি করেছিলেন
এবং করবেন। এই সৃষ্টি এবং পরিবেশ কার জন্য? স্বয়ং পরমাত্মা নিজের জন্য তো
বানাননি? কর্মে আবদ্ধ থাকা পশু-পাখি ও জীব-জন্তুদের জন্যও নয়, কেবল এবং
কেবল সেই মানুষের জন্য যাকে কর্ম-স্বাধীনতা, চিন্তা-স্বাধীনতা ও উন্নতি
করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু
মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে চেতন-অচেতন জগতের নিজের স্বার্থের জন্য প্রয়োজনের
চেয়ে অধিক দোহন এবং শোষণ করছে। প্রকৃতির সীমা রয়েছে। নিজের সীমার অধিক সে
কারও ভার বহন করতে পারে না। প্রয়োজনের চেয়ে অধিক ঘোড়ার ওপর ভার চাপিয়ে
দেওয়া হলে ঘোড়া ভারে চেপে যাবে এবং নিচে বসে পড়বে। সেই প্রকারে প্রকৃতিও
নিজের শক্তি অনুসারেই সাধন ও সম্পত্তি সরবরাহ করতে পারে। অতি-দোহন সবার
জন্যই ক্ষতিকর। গোরুর ক্ষমতা অপেক্ষা অধিক দুধ দোহানো, গোরু এবং বাছুর
দুজনের জন্যই কষ্টদায়ক হতে পারে। গাধার ওপর প্রয়োজনের চেয়ে অধিক বোঝা
চাপানো তাকে কষ্ট পৌঁছাতে পারে। সেই প্রকারে প্রাকৃতিক পদার্থসমূহের
অপব্যবহার পরিবেশকে নষ্ট করায় সহায় প্রদান করে।
পদার্থ
কখনো নষ্ট হয় না, তার রূপ পরিবর্তিত হয়ে যায় তথা তা কারণ-প্রকৃতে অবস্থিত
থাকে—এটি সত্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে ফলদায়ী হওয়ার জন্য কার্যরূপে (স্থূলরূপে)
পরিবর্তিত হওয়া আবশ্যক। কারণ-প্রকৃতি থেকে মনুষ্য ভৌতিক পদার্থসমূহের লাভ
ওঠাতে পারে না। প্রলয় অবস্থায় প্রকৃতি কারণরূপে অবস্থিত থাকে। সেই প্রকৃতির
থেকে কারও লাভ নেই। ঈশ্বরীয় ব্যবস্থার অন্তর্গত পরমাণু প্রকৃতির দ্বারা
পুনরায় সৃষ্টির রচনা করে, এই জগৎই সব প্রাণীদের জন্য আনন্দের অনুভূতি
প্রদান করে।
হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ত্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ।
স দাধার পৃথিবীং দ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম॥
যজুর্বেদ ১৩.৪
=
যে পরমাত্মা জ্যোতিষ্কমণ্ডল ধারণ করে আছেন, যিনি এই সৃষ্টির উৎপত্তির
পূর্ব থেকেই বিদ্যমান আছেন এবং যিনি এই উৎপন্ন জগতের সর্ববিদিত স্বামী,
তাঁরই আশ্রয়ে পৃথিবীলোক ও দ্যুলোক স্থিত রয়েছে। আমরা সেই সুখস্বরূপ
সৃষ্টিকর্তা পরমাত্মাতে আত্মসমর্পণ করে স্তুতি ও উপাসনা করছি।
যখন
পরমেশ্বর মানব অপেক্ষা পূর্বেই এই সৃষ্টিকে রচনা করেছেন, তখন জীবিত থাকার
অধিকার সর্বপ্রথম সৃষ্টির রয়েছে। গঙ্গা-যমুনা নদী, হিমালয়, বিন্ধ্যাচল,
ঝরনাগুলোর বেঁচে থাকার অধিকার মানুষের থেকে আগে রয়েছে, কারণ মানবের জীবন
অথবা প্রাণীদের জীবন এই প্রাকৃতিক সাধনসমূহের ওপর টিকে রয়েছে। কিন্তু এখানে
উল্টো হচ্ছে, মানুষ সবাইকে শেষ করে নিজে সুখে জীবিত থাকতে চাইছে।
এই
প্রকৃতিরূপী সুন্দরী বৃক্ষ, লতা, উদ্ভিদের সবুজ শাড়ি পরিধান করে নদী, ঝরনা
তথা সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলায় মেতে নাচবে, দুলবে, তখন সব মনুষ্য,
পশু-পাখি তার সাথে আনন্দ মানাবে, গাইবে, দুলবে। জীবনে উৎসব উদযাপন করবে।
"বন সবুজ তো মন সবুজ"—এটিকে যদি সার্থক করতে হয়, তবে প্রকৃতিকে মানবের
ভালোবাসতে হবে, তাও নিঃস্বার্থ, নিষ্কপটভাবে। তবেই গিয়ে মনুষ্য নিজে সুখী
হবে এবং অন্যদের সুখী করতে সক্ষম হবে।
© বাংলাদেশ অগ্নিবীর
